আলীর গুহায় যাওয়ার ইচ্ছা অনেক আগে থেকেই। সময়ের অভাবে যাওয়া হয়ে ওঠে না। এবার যুক্ত হলাম লেক্সাস ট্যুরস অ্যান্ড ট্রাভেলস এর সাথে। ভ্রমণ সঙ্গী তরুণ কবি আহমেদ ইউসুফ। রাতের বাসে ঢাকা থেকে রওয়ানা হয়ে ভোরে পৌঁছি বান্দরবন জেলার আলীকদম উপজেলায়। সকালের নাশতা সেরে কাঙ্ক্ষিত গন্তব্য আলীর গুহার উদ্দেশ্যে যাত্রা। বাস থেকে নেমে কিছুটা পথ অটোরিকশা দিয়ে যেতে হয়। পাহাড়ি এলাকার গ্রামীণ পরিবেশ, মনকাড়া দৃশ্য। রাস্তার দু’পাশের সবজি বাগান যেন সবুজের সমারোহ। অটো থেকে নেমে গুহায় প্রবেশ করতেই একটা শীতল আবহ তৈরি হলো। সবসময় এখানে তাপমাত্রা কম থাকে। আর এর ঠান্ডা আবহাওয়া বেশ উপভোগ্য। গ্রীষ্মে ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা হলেও ঝিরিতে থাকবে মাত্র ১৮ ডিগ্রির আশপাশে। সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে ঝিরিঝিরি পানিতে পা ফেলতেই শরীর শিউরে ওঠে। দু’পাহাড়ের মাঝ দিয়ে গুহার সম্মুখপানে এগিয়ে চললাম।
প্রকৃতির এমন কিছু রহস্য থাকে, যা কখনো উন্মোচন করা যায় না। তেমনি রহস্যঘেরা আলীর গুহা। বিশাল একটি পাহাড় মাঝখানে দুই ভাগ হয়ে গেছে। এ পাহাড়ে তিনটি গুহা কীভাবে সৃষ্টি হলো, সেই রহস্য এখনো কেউ ভেদ করতে পারেনি। প্রকৃতির রহস্যেঘেরা এ গুহার সৌন্দর্য উপভোগ করতে প্রতিদিন দেশের নানা প্রান্ত থেকে হাজারো পর্যটক আসেন। গুহার সৌন্দর্য দেখতে দেখতে আমরাও এগুতে থাকলাম মূল গুহার দিকে। দুই পাহাড়ের মাঝ দিয়ে সূর্যের আলো উঁকি দিচ্ছে। মাঝখানে সরু পথ ধরে এগিয়ে যেতে হয়। কেউ কেউ ছবি তোলা ও ভিডিও করাতে ব্যস্ত।
আলীকদম সদর থেকে ৪ কিলোমিটার পূর্বে মাতামুহুরী-তৈল খাল ঘেঁষে দুই পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত এই গুহা নিয়ে রহস্যের শেষ নেই। আলীর গুহাকে স্থানীয়রা ‘আলীর সুড়ঙ্গ’ নামে চেনে। ঐতিহাসিক বিবেচনায় আলীর গুহাকে পুরাকীর্তির মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। নামকরণের সঠিক কোনো তথ্য কারও জানা নেই। দুই পাশে আলীর পাহাড়, মাঝে ঝিরিপথে গুহায় যেতে হয়। পথটি পিচ্ছিল। ঝিরিপথে ১৫ মিনিট হাঁটার পর আলীর গুহার ১ নম্বর সুড়ঙ্গটির দেখা মিলে।
গুহার কাছে যেতেই গুহাতে পর্যটকদের ওঠা-নামায় ব্যস্ত দেখা গেল। শুরুতেই আমি লোহার সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে থাকি। আমাকে অনুসরণ করে ইউসুফ উপরে উঠলো। গুহার পাহাড়ে ওঠা বেশ কষ্টকর। পাথরবেষ্টিত গুহায় কিছুদিন আগেও উঠতে হলে দড়ি বা পাহাড়ের লতা ধরে ধীরে ধীরে উঠতে হতো। পর্যটকদের সুবিধার্থে আলীকদম সেনা জোনের উদ্যোগে তিনটি সিঁড়ি স্থাপন করা হয়েছে। ফলে বড় কোনো সমস্যা হয় না। অনায়াসেই গুহায় ওঠা যায়। দেখতে অনেকটা ভয়ংকর। পাহাড়ের মাঝখানের গুহাটি প্রায় ১০০ ফুট লম্বা। পাশেই আরও দুটি গুহা রয়েছে। গুহার ভেতর পুরোটা অন্ধকার। ভেতরে যাওয়ার জন্যে টর্চ লাইট বা মশাল নিয়ে যেতে হয়। আমরা মোবাইলের আলো জ্বালিয়ে ভেতরে প্রবেশ করি।
কেউ কেউ ১ম গুহা দেখেই বেরিয়ে পড়ছে। আমরা ২য় গুহার দিকে এগিয়ে গেলাম। সুড়ঙ্গটি পাহাড়ের একপাশ থেকে ভেদ করে অপর পাশে বের হয়েছে। শুরুর দিকে গুহামুখ খুবই ছোট। প্রথমে প্রবেশ করতে ভয় পাচ্ছিলাম। স্থানীয় কয়েকজন ছেলে আমাদের সাহস যুগিয়েছে। ওরা প্রথমে প্রবেশ করলো। একজনের বেশি প্রবেশ করা যায় না, তাও আবার হামাগুড়ি দিয়ে প্রবেশ করতে হয়। ভেতরে স্যাঁতস্যাঁতে গা ছমছমে পরিবেশ। প্রবেশ করার সাথে সাথেই এক অজানা জগতের সাথে পরিচিত হলাম। এই গুহাগুলোর ভিতর ছোট বড় অনেক বাদুড়ের বসবাস। মানুষ দেখে বাদুড়গুলো এদিক সেদিক ছুটাছুটি করবে, এতে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। ২০ ফুট যেতেই দেখা মিলবে বিশাল গুহাপথ। দেয়াল ঘেমে ভেতরের পথ পিচ্ছিল হয়ে থাকে। মাঝখানে উঁচু-নিচু পথ। অন্ধকারে দেখে দেখে পা ফেলতে হয়। না হলে বিপদ হতে পারে।
আলীর গুহা নিয়ে রহস্যের শেষ নেই। আলীকদম নাম নিয়ে যেমন নানা কথা ও নানা মত আছে, তেমনি রহস্যময় এই গুহা নিয়েও মজার মজার সব গল্প আর কাহিনি পাওয়া যায়। ইতিহাস পর্যালোচনা করে জানা যায়, আলোহক্যডং থেকে আলীকদম নামটির জন্ম। যার অর্থ পাহাড় আর নদীর মধ্যবর্তী স্থান। বান্দরবানের রাজা বোমাং সার্কেল চিফ এর নথিপত্রে ও পাকিস্তান আমলের মানচিত্রে আলোহক্যডং নামের অস্তিত্ব পাওয়া যায়। পার্বত্য অঞ্চলের সবচেয়ে পুরনো মানচিত্রেও (Ensea Det Bengalla) পর্তুগীজ পণ্ডিত জোয়াও ডে বারোজ (Jao De Barros) আলোহক্যডং নামটি ব্যবহার করেছেন। আরকানি ভাষায় অনেক পাহাড় ও জায়গার নামে ডং, থং বা দং উপসর্গ জুড়ে আছে। সম্ভবত ডং মানেই পাহাড়। তাই ধারণা করা হয়, তাজিংডং ও কেওক্রাডং পাহাড়ের মতোই আলোহক্যডং একটি পাহাড়ের নাম, যা কালক্রমে আলীকদম নাম নিয়েছে।
ইতিহাস বলছে, নবম শতাব্দী থেকে আরাকানি শাসনে থাকা আলীকদম পঞ্চদশ ও ষোড়শ শতকে বাংলার সুলতান জালালউদ্দিনের রাজত্বে আসে। ১৭৫৬ সালে মুঘলরা এ অঞ্চল জয় করলে আরাকানি শাসনের কফিনে শেষ পেরেক ঠুকার কাজটি হয়ে যায়। আরাকান রাজা কং হ্লা প্রু বোমাংগ্রীকে (১৭২৭-১৮১১) আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য করে স্বপরিবারে। পার্বত্য অঞ্চল থেকে বিতাড়িত করা হয়েছে অনেক আগে। শাসন পরিচালনার ফায়দা লুটাতে ১৮ জন আরকানি রাজা মুসলিম উপাধি গ্রহণ করেছিলেন। এদের মধ্যে ১৪৩৪-১৪৫৯ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত এ অঞ্চল শাসন করেন রাজা মাং খারি। তার মুসলিম উপাধি ছিল আলী খান। ১৫৩১ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত রাজত্ব পরিচালনাকারী রাজা থাজাথা’র মুসলিম উপাধি ছিল আলী শাহ্। এ দুই নামের প্রভাবে আলীকদম নামটি এসে থাকতে পারে। অপর এক ব্যাখ্যায় বলা হচ্ছে, আরবিতে কদম অর্থ পা। প্রয়োগ ভেদে যার অর্থ পদাচারণাও হতে পারে। আলী নামের কেউ একজন কোনো এক রহস্যময় এ অঞ্চলে পা রেখে নিরঙ্কুশ আধিপত্য বিস্তার করতে সক্ষম হয়েছিলেন। পরে তাঁর নামের সঙ্গে কদম শব্দটি যুক্ত হয়ে আলীকদম নামটির জন্ম। তবে এমনও ধারণা প্রচলিত যে, হজরত শাহজালাল এর নেতৃত্বে ৩৬০ আউলিয়া ধর্মপ্রচারের জন্য সিলেট অঞ্চলে এলে তাদের একটি অংশ পার্বত্য এলাকায় আসেন, যাদের কারো নামের আলী উপাধি থেকে আলীকদম নামের জন্ম।
আলীর গুহায় যেতে হলে আপনাকে প্রথমে বান্দরবান জেলার আলীকদম আসতে হবে। কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলা হয়ে আলীকদম অথবা বান্দরবান শহর থেকে থানচি-আলীকদম রোড দিয়ে আলীকদম আসতে পারবেন। তবে চকরিয়া হয়ে যাওয়াটাই সবচেয়ে সুবিধাজনক ও সময় সাশ্রয়ী। চকরিয়া থেকে আলীকদম যাওয়ার লোকাল বাস রয়েছে। এসব বাস প্রতিদিন সকাল ৭টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা ৩০ মিনিট পর্যন্ত আলীকদমের উদ্দেশে ছেড়ে যায়। যারা প্রকৃতি উপভোগ করতে চান চাঁদের গাড়ির মাধ্যমে চকরিয়া থেকে আলীকদম যেতে পারেন।
তবে আলীর গুহার ভেতর এমন কোনো অলৌকিক ঘটনার সম্মুখীন হতে হয়নি আমাদের। আমরা ঘণ্টা দুয়েক এখানে ভালোভাবেই ঘুরে বেড়িয়েছি। এ উপজেলায় আলীর গুহার মতো আরও অনেক দর্শনীয় স্থান রয়েছে। এসব দর্শনীয় স্থানে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে তেমন পর্যটন স্থাপনা গড়ে ওঠেনি। পর্যটন শিল্পের সম্ভাবনাময় আলীকদম উপজেলাকে পর্যটনবান্ধব করে গড়ে তুললে এখানকার আর্থ-সামাজিক দৃশ্য পাল্টে যাবে।
প্রকাশকাল: আগস্ট ২০২৬



