উদ্যোক্তা হবার ম্বপ্ন

নিজকে গড়ো

0
3

পার্সোনালিটি টাইপ এবং ক্যারিয়ার চয়েস নিয়ে আমরা গত দুটি পর্বে আলোচনা করেছি। বড় হয়ে তুমি কোন দিকে ক্যারিয়ার করবে সেটা নিয়ে মাথায় অনেক প্রশ্ন জেগেছে, তাই না! এবার আলোচনা করা যাক ক্যারিয়ারের দুটো মূল ধরন সম্পর্কে। একটি হলো ব্যবসা, অন্যটি চাকুরি। দুটোর মধ্যে মৌলিক তফাত হলো চাকুরিতে তুমি কারো অধীনে কাজ করবে, আর ব্যবসার ক্ষেত্রে তুমি কাজটা নিজের অধীনে অর্থাৎ নিজের স্বাধীন চিন্তা, সময় ও সামর্থ্যরে মধ্যে করবে। দুই ক্ষেত্রেই কাজ করতে হবে, আলাদীনের দৈত্য এসে কাজ করে দিয়ে যাবে না। যে যত পরিশ্রম করবে, সে অনুযায়ী সে উন্নতি করবে। কাজ পছন্দ করার ক্ষেত্রে একটি প্রচলিত কথা আছে- তুমি এমন একটা কাজকে তোমার পেশা অর্থাৎ চাকুরি বা ব্যবসা হিসেবে বেছে নিবে যেটা তুমি এতটাই পছন্দ করো, যে বিনা পারিশ্রমিকেও যদি কেউ করতে বলে, তুমি সেটা করবে। তাহলে দেখা যাবে তুমি ভবিষ্যতে সে পেশাতে কখনোই ক্লান্তি বা হতাশা বোধ করবে না।
বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে বেকারত্ব একটি চরম অভিশাপ। ২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বেকারের সংখ্য ২৬ লাখ ২৪ হাজার। এর মধ্যে স্নাতক পাশ শিক্ষিত বেকার হলো ৮ লাখ ৮৫ হাজার। অর্থাৎ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গ্রাজুয়েশন শেষ করেও চাকুরির পেছনে ছুটে সুবিধা করতে পারছে না কর্মক্ষম জনসংখ্যার বিশাল অংশ। প্রতিবছর ২০-২২ লাখ তরুণ-তরুণী চাকুরির বাজারে প্রবেশ করে। তাদের মধ্যে সাত-আট লাখ কোনো চাকুরি পায় না। সুতরাং চাকুরির বাজারকে বড় করার জন্য ব্যবসায়ী বা উদ্যোক্তা হওয়া প্রয়োজন।
ব্যবসা করলে লাভ-ক্ষতির হিসেব মাথায় রেখেই করতে হয়। সেজন্য ব্যবসায়ে সাহস ও আত্মবিশ্বাস থাকা জরুরি। তবে এই ঝুঁকি নিয়ে ব্যবসায়ে নামতে পারলে আর সঠিকভাবে পরিশ্রম করতে পারলেই ব্যবসায়ে আর্থিক উন্নতি করা যায় দ্রুত, যেটা চাকুরিতে করা খুবই কঠিন।
ব্যবসা হচ্ছে মানুষের ‘প্রয়োজন’ বা ‘চাহিদা’র যোগান দেয়া। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এই চাহিদা তৈরিই থাকে। যেমন- আমাদের মৌলিক চাহিদা- খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা ও শিক্ষা। এগুলো আমাদের লাগবেই। এই সব উপাদান সরবরাহ করাটাই ব্যবসায়ীদের কাজ। সেজন্য খাদ্য বা খাদ্য উপাদানের দোকান, কাপড়ের দোকান, ফ্ল্যাট/বাড়ি, হাসপাতাল/ক্লিনিক, স্কুল-কলেজ-কোচিং সেন্টার এগুলো হলো ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান। এসব প্রতিষ্ঠান পণ্য বা সেবা সরবরাহ করে।
এখন তোমাকে খুঁজে বের করতে হবে যে কোন পণ্য বা সেবা তোমার এলাকার মানুষ বা তোমার দেশের মানুষ পাচ্ছে না। সেই পণ্য বা সেবা তৈরি করে সরবরাহ করতে হবে অথবা সেটা আমদানি করে মানুষকে সরবরাহ করতে হবে। এটাই হলো ব্যবসায়ের মূল। আবার অনেক ক্ষেত্রে মানুষের কাজকে সহজ করার জন্য অনেক সেবা আছে, যা মানুষ হয়তো ভাবেওনি। সেই সেবা তৈরি করে সেগুলো সরবরাহ করাটাও একটা চাহিদার যোগান দেয়া।
এবার একটা গল্প বলা যাক। গল্পটি তিলক মেহতা নামের এক ভারতীয় শিশুর গল্প। মুম্বাই শহরের ১৩ বছর বয়সী স্কুলছাত্র তিলক একবার মামাবাড়িতে বেড়াতে যায়। সেখান থেকে বাড়িতে ফিরে সে খেয়াল করে যে তার স্কুলের কিছু বই মামা বাড়িতে ফেলে এসেছে। সে কয়েকটি কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে চেষ্টা করে সেদিনই বইগুলো আনাতে। কিন্তু ব্যর্থ হয়। কেউই দিনে দিনে ডেলিভারি দিতে পারবে না বলে জানায়। তখন তার মাথায় প্রশ্ন জাগলো, কেন মুম্বাই শহরের মধ্যে একদিনের মধ্যেই পার্সেল ডেলিভারি করা সম্ভব হবে না? সে উপায় পেয়ে গেল। তার চোখে পড়লো শহরে কিছু লোক সাইকেলে করে টিফিন ক্যারিয়ারে খাবার সরবরাহ করে। তাদেরকে বলে ডাব্বাওয়ালা। তিলক ভাবলো তারা যেহেতু প্রতিদিন খাবার ডেলিভারি দিচ্ছে, তাহলে ডকুমেন্ট পার্সেলও তো একই সাথে নিয়ে দিয়ে আসতে পারে! ব্যস, সে একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান শুরু করলো। নাম দিলো- পেপার অ্যান্ড পার্সেল (পিএনপি)। এটি ডিজিটাল কুরিয়ার সার্ভিস। এর সেবা হলো- দিনের মধ্যেই মুম্বাই শহর ও এর আশেপাশের এলাকায় তিন কেজি পর্যন্ত ওজনের পার্সেল ডেলিভারি দেয়া। আর ডিজিটাল ট্র্যাকিং সিস্টেম থাকায় গ্রাহক বুঝতে পারেন তার পার্সেল কখন কোথায় আছে। বর্তমানে তার প্রতিষ্ঠানে কাজ করে ২০০’র মতো কর্মচারী আর ৩০০’র বেশি ডেলিভারিম্যান বা ডাব্বাওয়ালা। প্রতিদিন তারা ১২০০’র বেশি পার্সেল ডেলিভারি দেয়। ২০১৮ সালে শুরু করা তিলকের এই কোম্পানির মাসিক আয় এখন দুই কোটি টাকা। ২০২০ সালে সে ‘গ্লোবাল চাইল্ড প্রোডিজি’ অ্যাওয়ার্ড লাভ করে। ভাবতে পারো! একটি মাত্র সেবা যা মুম্বাই শহরের মানুষের কাজকে সহজ ও দ্রুততর করেছে, আর পাল্টে দিয়েছে তিলক মেহতার জীবন!
এবারে দেশের এক কিশোরের গল্পে আসি। ঢাকার রায়েরবাজারের কিশোর তানজিম। থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত তানজিমের জীবনটা এমনিতেই চ্যালেঞ্জের। কিন্তু তার মনে অদম্য সাহস- নিজের পায়ে দাঁড়ানোর। ১২ বছর বয়স থেকে সে ফ্রিল্যান্সিং করে টুকটাক আয় শুরু করে। সেই আয় দিয়ে ২০২৪ সালে শুরু করে ‘গেজেট বিক্রেতা’ নামের একটি ব্যবসায়িক উদ্যোগ। অনলাইনে অর্ডার নিয়ে নানা রকম ইলেকট্রনিক গেজেট ডেলিভারি দিতো সে। পেইজ চালানো, মার্কেটিং করা, অর্ডার নেয়া, কুরিয়ার করা, সব একাই করতো। এক বছর পর ২০২৫ সালে শুরু করে ‘থ্রেডভার্স’ নামের একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। সেখানে সে অনলাইনে অর্ডার নিয়ে টি-শার্ট ডিজাইন করে বিক্রি করতো। নিজে শিখে নেয় ডিজাইন করা। এরপর তার মাথায় এলো দেশে নিজস্ব পারফিউম ব্র্যান্ড তৈরি করবে। সে শুরু করলো ‘সেলিওরা ফ্র্যাগরান্স’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান। প্রথমে তারা বিভিন্ন ব্র্যান্ডের পারফিউম বিক্রি করে। তারপর তার স্কুলের এক বন্ধুকে নিয়ে কীভাবে পারফিউম বানায় সেটা শিখে নেয়। তারপর নিজেদের ব্র্যান্ডের নামে আলাদা পারফিউম তৈরি করে। তাদের পারফিউমের জন্য বিএসটিআই এর লাইসেন্সও নেয়। সবে এসএসসি পাশ করা এক কিশোর তিন বছরে তিনটি ব্যবসা তৈরি করেছে, ভাবা যায়?
তবে সাবধান! আমি কিন্তু বলছি না পড়াশুনা বাদ দিয়ে কাল থেকেই নেমে পড়ো ব্যবসায়! বোঝানোর জন্য বলছি যে কীভাবে ব্যবসা দাঁড় করানো যায় শূন্য থেকে। তিলক মেহতা বা তানজিম, দুজনের কেউই কিন্তু বড় ব্যাংক লোন নিয়ে কিংবা পরিবার থেকে জমি বিক্রি করে লাখ লাখ টাকা নিয়ে ব্যবসা করতে নামেনি। একেবারেই নিজের সামর্থ্যে শুরু করেছে।

তুমি যদি বড় হয়ে ব্যবসায়ী হতে চাও তাহলে এখন থেকেই মনে মনে খুঁজতে থাকো যে তোমার দেশের মানুষকে তুমি ভবিষ্যতে কোন পণ্য বা সেবাটি দিতে চাও? অথবা বিদেশে দেশের কোন পণ্য বা সেবাটি রপ্তানি করা যাবে যা বিদেশের মানুষের প্রয়োজন। তোমার ব্যবসা তোমার এলাকার কোনো সমস্যার সমাধান করে দিতে পারে। এমন কোন‘ সমস্যা খুঁজতে থাকো যা এলাকার মানুষের জন্য তুমি সমাধান করবে। এমন ‘অভাব’ খোঁজো, যার প্রয়োজনীয় উপকরণ তুমি উৎপাদন করবে অথবা আমদানি করে সরবরাহ করবে।

মনে রাখবে, স্বপ্ন থাকতে হবে অনেক বড়। তুমি দেশে-বিদেশে তোমার পণ্য বা সেবা রপ্তানি করবে, এমনটাই সাহস রাখতে হবে। তবে সেজন্য শুরুটা যত ক্ষুদ্রই হোক, তাতে দ্বিধা করা যাবে না।

এপ্রিল ২০২৬