এবার সবার নজর গিয়ে পড়ল সুন্দর পাখিটার উপর।
‘বলো এবার তোমার কাহিনি।’ তাগাদা দিয়ে বললো আনাস।
‘তোমার চোখজোড়া বেশ মায়াবী। ঠোঁটজোড়াও তেমন।’ বললো জামান মিয়া। ‘এতো সুন্দর একটা মানুষরেও ওরা বাঁচতে দিল না!’
‘ওই বর্বর পাষণ্ডরা আমার মতো আরও প্রায় পনেরো শত জনরে খুন করছে।’ এবার মুখ খুললো আমিনুল ইসলাম আমিন। ষোলো বছরের কিশোর আমিন। শাহাদাত বরণ করার সময় একটি কারখানায় চাকরি করতো। মাত্র পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেছে আমিন। অটোরিকশাচালক ওবায়দুল ইসলাম আর তার স্ত্রী সেলিনা বেগমের একমাত্র সন্তান সে। পরিবারে অভাব অনটন লেগেই থাকে। তাই আর পড়াশোনাটা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি। আমিনুল ইসলাম আমিনের গ্রামের বাড়ি পটুয়াখালী জেলার বাউফল উপজেলার কেশবপুর ইউনিয়নের ভরিপাশা গ্রামে। রাজধানীর যাত্রাবাড়ির দনিয়া এলাকার এ কে স্কুল অ্যান্ড কলেজের পাশে একটি ভাড়া বাসায় থাকে তারা। বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান আমিন। সে জন্য বেশ আদরের। ইচ্ছে ছিলো তাকে লেখাপড়া করিয়ে মানুষের মতো মানুষ করে তুলবে। তারপর সংসারের হাল ধরবে সে। কিন্তু অভাবের সংসারে সেটা আর হয়ে ওঠে না। মাসে আট হাজার টাকা বেতনে একটি কারখানায় চাকরি নিতে বাধ্য হয় আমিন। মা সেলিনা বেগমের মনে অনেক দুঃখ। আদরের ধনকে এই বয়সেই কাজে পাঠিয়ে এক মুহূর্ত স্বস্তিতে থাকতে পারেন না তিনি। সারাক্ষণ ছেলের ভবিষ্যৎ চিন্তায় কাটিয়ে দেন। কাজ থেকে বাড়ি ফিরলে আদর করে ভাত বেড়ে খাওয়ান। আর এটা ওটা বলে সান্ত্বনা দিতে চান। কিন্তু আমিন ছোট হলেও বেশ বুদ্ধিমান। উল্টো মাকে বুঝায়।
বলে, ‘মা, তুমি কান্না করবা না। তুমি কান্না করলে তোমার চোখের পানি আমার ভালো লাগে না।’
মা আর কিছু বলতে পারেন না। কোথায় তিনি ছেলেকে কান্না করতে বারণ করবেন, উল্টো ছেলে তাকে কান্না করতে নিষেধ করছে। খুশিতে বুকটা ভরে ওঠে মায়ের। এমন ছেলের মা হতে পারা সত্যিই গর্বের।
আমিন যখন কারখানা শ্রমিকের কাজে যোগ দেয়, তখন ওর বয়স মাত্র ষোলো বছর। আমিন ভালো ফুটবল খেলে। কারখানায় কাজের ফাঁকে যখনই সুযোগ পায়, খেলায় মেতে ওঠে। বিশেষ করে প্রতি শুক্রবার বাড়ির পাশের মাঠে ফুটবল খেলতে যায়। খেলাধুলা করে বেশ কয়েকটি পুরস্কারও পেয়েছে।
পুরস্কার নিয়ে বাসায় এসে প্রথমেই মাকে দেখায়। মা দেখে অনেক খুশি হন। ছেলের মাথায়-পিঠে হাত বুলিয়ে দেন। অনেক দোয়া করেন। ছেলে তাদের অভাবের সংসারে অর্থের জোগান দেয়ার জন্য কাজে যোগ দিয়েছে, তাই তার উত্তম প্রতিদানের জন্য আল্লাহর কাছে বলেন সেলিনা বেগম।
‘আল্লাহপাক,’ মুনাজাত ধরে বলেন মা। ‘আমার আমিনকে তুমি অনেক বড় বানিয়ে দাও। আমি ওর প্রতি খুশি। তুমিও খুশি হয়ে যাও। এতোটুকু ছেলে আমার। ওর বাবার কষ্টের কথা ভেবে নিজে লেখাপড়া ছেড়ে দিয়ে কারখানায় কাজ করছে। তুমি ওর প্রতি রহম করো মা’বুদ!’
মায়ের এই দোয়া ইথারে ভাসতে ভাসতে আরশে আজিমের দিকে চলে যায়। আল্লাহও খুশি হন মায়ের প্রতি। আমিনকেও তাই প্রিয় করে নেন। মায়ের দোয়া তিনি কবুল করে ফেলেন।
মা একদিন রাতে স্বপ্নে দেখেন তার আমিন কোথায় যেনো চলে গেছে! অনেক খুঁজেও তাকে আর পাওয়া যাচ্ছে না। বাবা হন্যে হয়ে চারপাশে খুঁজে চলেছেন। এর ওর কাছে জানতে চাইছেন ছেলের খবর। কিন্তু কেউ কোনো খবর দিতে পারে না। যেনো হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে ছেলেটা। মায়ের ভীষণ কান্না পাচ্ছে। কী হয়েছে তার আদরের ধনের? কোথায় খুঁজে পাবে বুকের মানিককে?
মা হঠাৎ দেখতে পেলেন, কয়েকটা সবুজ পাখির সাথে খেলা করছে তার আমিন। বুকের মাঝে যেন প্রাণ ফিরে এলো সেলিনা বেগমের। কিন্তু ভেবে অবাকও হন, ছেলেটা কেনো সবুজ পাখির সাথে খেলছে? আর পাখিগুলোও বা কেনো মানুষের সাথে খেলছে? দেখে তো মনে হচ্ছে ওরা একে অপরের কতো দিনের পরিচিত! আমিনটা চোখের সামনে কেমন বড় হয়ে উঠছে। এই তো সেদিন শিশু থেকে কিশোরে পা রাখলো ছেলেটা। দেখতে দেখতেই কেমন ডাঙর হয়ে গেল! ছেলেটার চেহারার মাঝেও বেশ উজ্জ্বলতা ফিরে এসেছে। রাজপুত্রের মতো দেখতে হয়েছে আমিন! চারপাশে থু থু ছিটায় মা। খবরদার! তার ছেলের ওপর যেনো কারোর বদ নজর লাগে না।
২০২৪ সালের জুলাই মাস জুড়ে এক আন্দোলন গড়ে ওঠে। শ্রাবণের বর্ষার মাঝে ছাত্রজনতার এক তীব্র আন্দোলন সারাদেশের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে পড়ে। আসলে শেখ হাসিনার একটা বক্তব্যকে কেন্দ্র করে আন্দোলনের তীব্রতা প্রচণ্ড রূপ ধারণ করে। চীন সফর উপলক্ষ্যে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, ‘কোটা নিয়ে আদালত থেকে সমাধান না আসলে সরকারের কিছু করার নেই।’
অবশ্য দুই হাজার আঠারো সালেই ব্যাপক ছাত্র আন্দোলনের মুখে সরকারি চাকরিতে প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণিতে মুক্তিযোদ্ধাসহ সবরকম কোটা পদ্ধতি বাতিল করে একটি পরিপত্র জারি করেছিলো সরকার। কেউ কিন্তু কোটা পুরোপুরি বাতিল চায়নি তখন। বরং যৌক্তিক পর্যায়ে নামিয়ে আনার জন্য আন্দোলন করেছিলো। সরকার আগ বাড়িয়েই পুরো কোটা পদ্ধতিই বাতিল করে দেয়। আর এই দুই হাজার চব্বিশ সালে এসে সেটাকে আবারও ফিরিয়ে আনে। এটা কোনো অসৎ উদ্দেশ্যে করা হয়েছে, তা বেশ বোঝা-ই যায়। শেষ পর্যন্ত বিষয়টা আদালতের ঘাড়ে গিয়ে পড়ে মীমাংসার জন্য।
কোটা নিয়ে বৈষম্যের বিরুদ্ধে যে সকল শিক্ষার্থী তখন যৌক্তিক আন্দোলন করছে, তাদেরকে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী একটি বিশেষ গোষ্ঠীর বলে উল্লেখ করেন। তারা ক্ষমতায় এসেছিলো ক্ষমা চেয়ে। অতীতের মতো আর ভুল করবে না, এখন থেকে ভালো হয়ে যাবে। ক্ষমতায় গেলে মানুষের কল্যাণেই কেবল কাজ করবে। ঘরে ঘরে চাকরি দেবে।
এই সব নানান চটকদার কথাবার্তা আর প্রতিশ্রুতিতে জনগণ ভুল করে বসে। অবশ্য একটি পাতানো নির্বাচনের মাধ্যমে তাদেরকে ক্ষমতায় বসিয়ে দেয়া হয় জোর করে। তারপর তারা তাদের পুরোনো খোলস ছেড়ে আবারও বেরিয়ে আসে। শুরু করে ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি। সারাদেশে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে। ঘরে ঘরে যে চাকরির কথা বলেছিলো, বিনিময়ে প্রায় প্রতিটি ঘরে মামলা ঠুকে দেয়। জনগণকে বিশেষ করে যারা এসব অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে চায়, তাদেরকেই হামলা-মামলা দিয়ে নাজেহাল করে দেয়। ঘরছাড়া করে দেয়। মানুষজন বনে-বাদাড়ে কাদা-পানিতে রাত্রিযাপন করতে বাধ্য হয়। প্রচুর সংখ্যক প্রতিবাদী কণ্ঠকে গুম করে রাখা হয়। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে তৈরি করা হয় আয়নাঘর। সেসব আয়নাঘরে বন্দি করে রাখা হয় তাদেরকে। কাউকে কাউকে বুড়িগঙ্গা-শীতলক্ষ্যা প্রভৃতি নদীর মাঝে নিয়ে গিয়ে হত্যা করে লাশ ডুবিয়ে দেয়া হয়।
নতুন করে জুলাইয়ের শুরুতে যখন কোটা নামক বৈষম্যের বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তোলে শিক্ষার্থীরা, তখন তাদেরকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে নানান বক্তব্য দিতে থাকেন শেখ হাসিনা। হঠাৎ করে সংবাদ সম্মেলনের মাঝে বলে বসেন তিনি, ‘মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধাদের বিরুদ্ধে এতো ক্ষোভ কেনো? মুক্তিযোদ্ধাদের নাতি-পুতিরা চাকরি পাবে না, তাহলে কি রাজাকারের নাতিপুতিরা পাবে?’
আসলে শিক্ষার্থীদের মূল দাবি ছিল মুক্তিযোদ্ধারা সরকারি চাকরিতে কোটার সুবিধা পাবে, সেটা মেনে নেয়া যায়। তাই বলে তাদের পরে যারা চাকরি পাবে, তারাও কি মুক্তিযোদ্ধা? এখানে অবশ্যই সংস্কার করতে হবে। এটা পরিবর্তন করতে হবে। উল্টো স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী কটাক্ষ করে বক্তব্য রাখলেন। ঢালাওভাবে সবাইকে রাজাকারের নাতি-পুতি বানিয়ে দিলেন।এই বক্তব্যের পর সেদিন মধ্যরাতেই বিক্ষোভে ফেটে পড়ে সারা দেশ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেটের শাহজালাল ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা হল ছেড়ে বেরিয়ে আসে। তারা এবার নিজেদের স্লোগানের ভাষা ঠিক করে নেয়—
তুমি কে, আমি কে?
রাজাকার রাজাকার।…
কে বলেছে, কে বলেছে?
স্বৈরাচার স্বৈরাচার।…
চাইতে গেলাম অধিকার
হয়ে গেলাম রাজাকার।…
কোটা না মেধা
মেধা মেধা…
ইত্যাদি স্লোগান।
ছোট্ট আমিন এসব দেখে ও শুনে আসছিলো। নিজের মনের মধ্যেও এক ধরনের আক্রোশ পুষে রেখেছিলো। কিন্তু সুযোগ পাচ্ছিলো না তা প্রকাশ করার। কাজ থেকে ফিরে আন্দোলনে যোগ দিতে আরম্ভ করলো।
আজ একুশে জুলাই। আকাশটা সকাল থেকেই বেশ ভারী হয়ে আছে। বর্ষা মৌসুম শুরু হয়ে গেছে চারধারে। থেমে থেমে বৃষ্টি হচ্ছে। আর তার সাথে পাল্লা দিয়ে পড়ছে গরম। জলবায়ু পরিবর্তনের কুফল বেশ ভালোভাবেই উপলব্ধি করছে মানুষ।
‘মা, আজ আর আমি কাজে যাবো না। শরীরটা ভালো লাগছে না।’ মাকে ডেকে বললো আমিন।
তারপর সারাদিন ঘুমিয়ে কাটিয়ে দিল। বিকেল হতেই ঘর থেকে বের হয়ে এলো কিশোর আমিনুল ইসলাম আমিন।
‘মা, আমি নাশতা করতে যাচ্ছি মোড়ে।’
মা কিছু বলতে গিয়েও বলতে পারেন না। ততক্ষণে বেরিয়ে গেছে ছেলেটা।
আসলে আমিন মাকে না জানিয়ে চললো শনির আখড়ার দিকে, যেখানে ইতোমধ্যে আন্দোলনকারীরা জড়ো হয়েছে। আমিন গলা ফাটিয়ে স্লোগানের জবাব দিতে থাকে। এতে উৎসাহিত হয়ে অন্যরাও গলা মেলায়।
একটু আগে ও যখন রাস্তা দিয়ে হেঁটে আসছিলো, তখন ও তার প্রতিবেশী মিতু বেগমকে সামনে পেয়ে বললো, ‘আমি আন্দোলনে যাচ্ছি। আমার যদি এখানে মৃত্যু হয়, তাহলে আমি শহীদ হবো।’
‘না আমিন সোনা,’ মা তাকে মানা করে বলেন। ‘তুমি ছোট মানুষ। ওসব ঝামেলায় যেও না।’
কিন্তু আমিন সে কথায় কোনো কর্ণপাত করে না। বলে, ‘এতো টেনশন করো না? আমার এখানে মৃত্যু হলে আমি শহীদ হবো। আমার জন্য কোনোই টেনশন করবে না।’
স্লোগান দেয়ার জন্য মুখ খুললো আমিন। ঠিক এই সময় একটা গুলি এসে তাকে আঘাত করে। মুখ থেকে আর স্লোগান বের হয় না। পরিবর্তে একটা গোঙানি বেরিয়ে আসে। মাটিতে ঢলে পড়ে আমিনের ছোট্ট দেহটা। একে একে তার পাশে আরও ছয়জন ঢলে পড়ে। সবাই গুলিবিদ্ধ। আমিন এখন একটুও নড়তে পারছে না। শরীরের সমস্ত বল হঠাৎ করে উধাও হয়ে গেল।
পাশ থেকে অন্য ছাত্ররা আহত আমিনসহ অন্যদের হাসপাতালে নেয়ার জন্য অটোরিকশা ডাকে। এগিয়ে আসে একটা অটোরিকশা। গুরুতর আহত আমিনকে রিকশায় তুলতে গিয়েই ভীষণভাবে চমকে ওঠেন চালক। আমিন স্পষ্ট ওই চোখজোড়াতে শোকের ছায়া দেখতে পায়। ও ঠিকই চিনতে পারে লোকটাকে।
আমিনের বাবা ওবায়দুল ইসলাম গুলিবিদ্ধ ছেলেকে দেখে কান্নায় আকাশ-পাতাল ভারী করে তোলেন। আমিন বাবাকে সান্ত্বনা দিতে চেষ্টা করে। কিন্তু কিছুই বলতে পারে না। বাবা তাকে রিকশায় তুলে ঢাকা মেডিকেলে নিয়ে যান। সেখানকার ডাক্তাররা তাকে মৃত ঘোষণা করে।
নিজের মৃত্যুর খবর ঘোষণা করতে শুনতে পেয়েই বাবার দিকে তাকায় আমিন। বাবার মুখটা তখন কী যে অসহায় লাগছিলো! আসলে সন্তানের লাশ কাঁধে নেয়া কোনো বাবার জন্যই সুখের না। আমিন সেটা বুঝলো।
আমিন মুহূর্তে একটা সবুজ পাখির মধ্যে ঢুকে গেল। আর নিচে পড়ে রইলো কেবল তার নিথর দেহটা। উড়তে উড়তে বাড়ির সামনে চলে এলো সে। দেখলো, তার মা বারবার আছড়ে পড়ছেন মাটিতে। আর বিলাপ করে কান্নাকাটি করছেন। ও ফুটবল খেলে যে পুরস্কারগুলো পেয়েছিলো, সেগুলো হাতে নিয়ে মা চুমু খাচ্ছেন। আর কান্না করতে করতে বলছেন, ‘এখন আমার আমিন নেই। কে খেলবে ফুটবল? আর কে আনবে পুরস্কার? কে আমাকে মা বলে ডাকবে? আমার কলিজাটা যে ফেটে যাচ্ছে!…’
আমিন আর থাকতে পারে না সেখানে। মুখে শুধু উচ্চারণ করে, ‘আর কেঁদো না মা!’
মুহূর্তে যেন মুখ তুলে তাকান মা। তিনি কি আমিনের উপস্থিতি টের পেলেন?
প্রকাশকাল: জুলাই ২০২৬



