সে সময় কলেরা অসুখের কোনো ঔষধ ছিলো না। গ্রামে অল্প শিক্ষিত কিছু কবিরাজ এবং ঝাড়ফুঁক দেয়ার জন্য কিছু ‘খোনকার’ ছিলো। তারা ‘তুকতাক’ কিছু চিকিৎসা করতো। আমার দাদা ছিলেন আলেম। তিনি তাঁর সাধ্যমতো সেবা ও শশ্রুষার চেষ্টা করেছেন। ততোদিনে মাজার সংলগ্ন বাড়ি থেকে আমরা নতুন বাড়িতে এসেছি। নতুন বাড়ির সামনে পূর্ব থেকেই দিঘি ও মসজিদ ছিলো। মসজিদে খোদাই করা চিহ্ন থেকে জানা যায় বাংলা ১২৬০ সালে এই মসজিদের গোড়াপত্তন। শুরুতে এই মসজিদ ছিলো ছনের ছাউনি, দেয়াল ছিলো বাঁশের। দাদার আমলে মসজিদে টিনের ছাউনি উঠে। এখনতো মেঝে ও দেয়ালে টাইলস লাগানো ঝকঝকে তকতকে মনমাতানো সুন্দর মসজিদ। আমাদের এলাকায় এটাই প্রাচীন মসজিদ।
এ বছরেই এ মসজিদটি দোতলা হয়ে যাবে। আমার দাদা মসজিদের সাথে ফোরকানিয়া মাদরাসাও গড়েছিলেন। বুনিয়াদি পরিবারটিকে তিনি ইসলামের দিকে আনতে চেয়েছিলেন। তিনি আমারই মতো বেটে ও শ্যামলা ছিলেন। তাঁর হাতের লেখা ছিলো খুবই সুন্দর। মসজিদের ওয়াক্ত ও বাড়ির দলিলপত্রে তাঁর হস্তরেখার যে চিহ্ন আমরা পাই তা দেখে সত্যিই অভিভূত হই। দাদার হাতে অংকন করা কালো, সবুজ ও লাল কালিতে লেখা একটা অনেক বড়সড়ো কুরআনশরীফ ছিলো যা আব্বাজান যক্ষের ধনের মতো আগলে রেখেছিলেন। এতো গুণের সেই দাদাজান, দাদি, চাচা ও ফুফুসহ একই সাথে ইন্তেকাল করেছেন। মহামারী থেকে শুধু বেঁচে গিয়েছিলেন আমার আব্বা ও ফুফু। আব্বার বয়স ছিলো তখন মাত্র ১২ বছর।
আমার আব্বার জন্মকাল ছিলো ১৯০৩ সালের ৩১ ডিসেম্বর। সেদিক থেকে শৈশবেই আমার আব্বাজান এতিম হয়ে পড়েন। আব্বা তখন কবিরহাট হাইস্কুলে ৬ষ্ঠ শ্রেণীতে পড়া-লেখা করতেন। খুব মেধাবী ছাত্র ছিলেন আমার আব্বাজান। এতিম শিশুর দায়িত্ব গ্রহণ করেন আব্বার ছোট চাচা মুজাহিদ মিয়া। দাদাজানের মৃত্যুর পর ছোট দাদা মুজাহিদ মিয়া এই পরিবারের দায়িত্বগ্রহণ করেন। গ্রামসহ সবার দায়িত্ব গ্রহণ করে তিনি এমনই হিমশিম খান যে, আব্বার পড়াশোনার ব্যাপারে খুব একটা নজর দিতে তিনি পারেননি। তখন সারাদেশ সহ আমাদের এলাকায় চলছিলো স্বদেশী আন্দোলন। আত্মীয়স্বজনের মধ্যে অনেকেই তখন কংগ্রেসী আন্দোলন করতেন। ঢাকার নবাবগঞ্জে কংগ্রেসী নেতা আশরাফউদ্দীন চৌধুরীর বাড়িতে ও নানার বাড়ি হিসেবে আব্বাজান কিছুদিন ছিলেন। এখানেই তাঁর রাজনীতির হাতেখড়ি হয়। মহাত্মাগান্ধী তখন সর্বভারতীয় মহান নেতা। হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে তখন তিনি সকলের নেতা। ইংরেজদের কাপড় পরবো না। মসলিনসহ সুতা ও কাপড় ইংল্যান্ডে রফতানী করবো না। স্বদেশেই সবকিছু বানাবো, স্বদেশী জিনিস ক্রয় করবো। এমন একটা আন্দোলনের জোয়ার আসে তখন। স্বদেশী আন্দোলনের সাথে অসহযোগ আন্দোলনও শুরু হয়। শাসক ইংরেজদের কোনো সহযোগিতা করা হবে না। অর্থাৎ ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের সূচনা বেশ ভালোভাবেই গড়ে উঠেছিলো। কুমিল্লার নবাব ফয়জুন্নেছার জ্ঞাতী-গোষ্ঠীর একজন ছিলেন নোয়াখালীর সোনাপুরে। কি চৌধুরী যেনো। এলাকার লোকজন কালোমিয়া চৌধুরী বলে ডাকতো। আত্মীয় হিসেবে এই বাড়িতেও আসতেন আমার আব্বা। এরাও তখন স্বদেশী ও অসহযোগ আন্দোলনে এলাকার নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন। গ্রামের বাড়িতে বাড়িতে তখন তাঁত বসানো হচ্ছিলো। লোকেরা যাতে নিজেদের শাড়ি ও লুঙ্গি বানাতে পারে। সেই ব্যবস্থার সাথে গ্রামের ছাত্র ও তরুণরা জড়িয়ে পড়েছিলো। আমার নানার বাড়িতে তখনও সেই তাঁতের চিহ্ন রয়েছে।
আব্বা ছিলেন উৎসাহী মানুষ। তিনি মানুষের বাড়িতে বাড়িতে তাঁত বসানোর কাজে লেগে গেলেন। মাথায় তখন স্বদেশী আন্দোলন, অসহযোগ আন্দোলন সবকিছু মিলিয়ে স্বাধীনতা আন্দোলন। ইংরেজ শাসকদের হাত থেকে দেশকে মুক্ত করতে হবে, এই ছিলো রাত-দিনের চিন্তা। ফেনী থেকে আমাদের এলাকায় আসতেন আবদুল জব্বার খদ্দর। পরবর্তীতে তিনি জাতীয় পর্যায়ে নেতা হয়েছিলেন। পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধীকার আন্দোলন, আরো পরে বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনে মাওলানা আবদুল জব্বার খদ্দরের অসামান্য অবদান রয়েছে। তিনি নিজ হাতে বুনা খদ্দরের টুপি, পাঞ্জাবী ও পাজামা পরতেন। সবাইকে খদ্দরের কাপড় বুনতে ও পরতে উৎসাহ দিতেন। বলতেন, আমরা গরীব মানুষ, আমাদের মিহি কাপড়ের কোনোই প্রয়োজন নেই। মোটা ভাত ও মোটা কাপড় পেলেই আমরা খুশি। আমরা স্বাধীনতা চাই, দেশীয় জিনিস ব্যবহার করে আমরা খুশি থাকতে চাই। আমাদের যা আছে তা নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে চাই। পরাধীন থেকে আমরা মাছ-গোশত বা মিহি কাপড় পরতে চাই না। আমরা স্বাধীন হবো, স্বাধীন থাকবো এখন এটাই আমাদের একমাত্র সাধনা।
আমার এক মামার বাড়ি পদুয়া গ্রামে। তিনি চিস্তিয়া তরীকার পীরসাহেব। সে বাড়িতে আসতেন তাঁর চাচাতো ভাই লক্ষ্মীপুর অঞ্চলের শামপুরের মাওলানা গোলাম সরওয়ার। তিনি ছিলেন শামপুর দরগার পীরসাহেব। বেশির ভাগ সময় থাকতেন কলকাতায়। মুসলিম লীগের অন্যতম প্রধান নেতা শহীদ সোহরাওয়ার্দীর ডান হাত ছিলেন। তিনিও আসতেন আমাদের এলাকায়। ডাকসাইটে লোক ছিলেন তিনি। আমাদের এলাকায় মুসলিমলীগকে তিনিই সংগঠিত করেছিলেন। এই মাওলানা গোলাম সরওয়ারকে নিয়ে অনেক গল্প, কাহিনী ও কিংবদন্তী রয়েছে। মুসলমানদের জাগতিক স্বার্থের বিষয়ে তিনি ছিলেন উচ্চকণ্ঠ। চল্লিশের দশকে কলকাতায় যে দাঙ্গা-হাঙ্গামা হয়, বলা হয়ে থাকে তার প্রতিশোধ তিনি নিয়েছিলেন নোয়াখালীতে। এসবই অভিযোগ শোনা কথা ও কিংবদন্তী। ইতিহাসবিদরাই সঠিক তথ্য দিতে পারবে। নোয়াখালীর দাঙ্গা-হাঙ্গামা থামানোর জন্য দক্ষিণ ভারত থেকে ছুটে এসেছিলেন মহাত্মাগান্ধী। গান্ধীর সাথে সবসময়ই ছাগল থাকত। তিনি নিয়মিতভাবে ছাগলের দুধ পান করতেন। কিংবদন্তী রয়েছে যে, গোলাম সরওয়ারের নেতৃত্বে গান্ধীর ছাগলটি এলাকার লোকজন খেয়ে ফেলে। এছাড়াও গোলাম সরওয়ার সম্পর্কে আরো নানা কথা রয়েছে। ঘনিষ্ঠ আত্মীয় হিসেবে আব্বাজান এদের কাছ থেকে স্বাধীনতা আন্দোলনের উৎসাহ ও উদ্দীপনা বিভিন্নভাবে পেয়েছেন। ১৯১৫ থেকে ১৯২০ এর মধ্যে আমাদের এলাকা ছিলো কংগ্রেসের দখলে।
স্বদেশী ও অসহযোগ আন্দোলন ছিলো কংগ্রেসের। এলাকার হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে সবাই এই আন্দোলনে যোগদান করেছিলেন। পরবর্তীতে এলাকার মুসলমানরা মুসলিমলীগে যোগদান করে। হিন্দুরা রয়ে যান কংগ্রেসে। এলাকায় দু’ধরনের রাজনীতি চলতে থাকে। নোয়াখালীতে সনাতন ধর্মের লোক কম ছিলো না। এলাকার হাট-বাজার, শিল্প-বাণিজ্য, শিক্ষা-স্বাস্থ্য, বিনোদন ও সংস্কৃতি সকল ক্ষেত্রে ছিলো সনাতন ধর্মের লোকদের দখলে। এক চৌমুহনী বাজারেই ৩৬টি সরিষা তেলের মিল ছিলো। এখান থেকে সরিষার তেল সারা বাংলায় রপ্তানী হতো। একটি ব্যাংকের সেন্ট্রাল অফিস ছিলো চৌমুহনীতে। ছিলো অতি প্রাচীন সিনেমা হল, যার নাম “রূপভারতী”। এখনও সে সিনেমা হল আছে কিনা জানি না। কলকাতার পর বইয়ের ব্যবসা গড়ে ওঠে এই চৌমুহনীতে। এখানে যতো প্রিন্টিং প্রেস ছিলো বাংলাদেশের অন্য কোনো শহরে এতো ছিলো না। অথচ মজার ব্যাপার কি জনো? চৌমুহনী মাত্রই একটি বাজার। জেলা ও মহকুমা শহর দূরে থাক এটা কোনো থানা শহরও ছিলো না। খাল দ্বারা সহজ সংযোগের ব্যবস্থা ছিলো বলেই ব্রিটিশ আমলের আগেই এখানে একটি বড় বাজার গড়ে উঠেছিলো।
আদি নোয়াখালী শহরেও সনাতন ধর্মের লোকরা কম ছিলো না। যেখানে একসময় সাহিত্য সম্রাট বঙ্কিম চন্দ্র ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে চাকরি করেছিলেন। তাঁর একটি জনপ্রিয় কথা এখনও লোকের মুখে মুখে শোনা যায় পড়েছি যবনের হাতে ভাত খেতে হবে একসাথে। এটা একটা গল্পের সারাংশ। আমরা আমাদের ছোটোকালে শিক্ষকদের কাছ থেকে যেভাবে শুনেছি, সেভাবেই বলছি। সাহিত্য সম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে নোয়াখালীতে এসেছিলেন। সাহিত্যিক হিসেবে তখন তাঁর অনেক নাম-ডাক। জেলার মুসলিম নেতৃবৃন্দ তাঁকে দাওয়াত দিয়েছেন। তিনিতো পড়েছেন মহা বিপাকে। কারণ তিনি তো ব্রাহ্মণ। ব্রাহ্মণরাতো অন্য কারো দাওয়াত গ্রহণ করতে পারে না। মুসলমান দূরে থাক, ব্রাহ্মণ ছাড়া হিন্দুদের অন্য কোনো বংশ বা গোত্রের লোকদের সাথে তারা খাওয়া-দাওয়া করতে পারেন না। মুসলিমদের মধ্যে তো এই জাত-পাত নেই। মুসলিমরাতো সবাই ভাই ভাই। একপাত্রে থেকেই অনেকেই বিভিন্ন ধরনের মানুষ একসঙ্গে খাবার খেতে পারে। এটাই মুসলমানিত্বের সৌন্দর্য ও ইসলামের সৌন্দর্য। ধর্মের চোখে সবাই সমান। এ কারণে মুসলিম নেতৃবৃন্দ বারবার বঙ্কিমচন্দ্রকে দাওয়াত দেয়ার জন্য চাপ দিতে থাকে। এই চাপের মুখে অপারগ হয়ে বঙ্কিমচন্দ্র ঐ শ্লোকটি বলেছিলেন। (চলবে)
প্রকাশকাল : আগস্ট ২০১০



