বিজয়ের মাস ডিসেম্বর। ১৬ই ডিসেম্বর আমাদের মহান বিজয় দিবস। আমাদের একটি গৌরব ও অহংকারের দিন। লাখ লাখ বীর মুক্তিযোদ্ধার শাহাদাতের বিনিময়ে আমরা দেশটাকে পেয়েছি। সকলের সীমাহীন ত্যাগের বিনিময়ে নয় মাসের যুদ্ধ শেষে অর্জিত হয়েছিল মহান এই বিজয়। ৫৩ বছর আগে এই দিনে বিশ্বের মানচিত্রে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের অভ্যুদয় জাতিকে এনে দিয়েছিল আত্মপরিচয়ের ঠিকানা। কৃতজ্ঞ চিত্তে জাতি স্মরণ করবে দেশের বীর সন্তানদের। সাভারে জাতীয় স্মৃতিসৌধে জনতার ঢল নামবে। রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশের সব প্রান্তের মানুষ অংশ নেবে বিজয় দিবসের অনুষ্ঠানে। এবারের বিজয় দিবস এসেছে নতুন একটা প্রেক্ষাপটে। আমাদের সব গৌরব গাঁথা হারিয়ে যেতে বসেছিল কিছু লোকের কারণে, কয়েকটি দলের কারণে। তারা ১৫ বছর দমিয়ে রেখেছিল। না ছিল অধিকার, না ছিল কথা বলার স্বাধীনতা না ছিল সামাজিক শান্তি। শান্তি সাম্য আর সমাজিক ন্যায় বিচারের জন্য যে দেশ স্বাধীন হয়েছিল তা যেন হারিয়ে গিয়েছিল। হারিয়ে গিয়েছিল সকলের ভোট দেয়ার অধিকার। পড়াশোনা করে ছেলে মেয়েরা চাকরি পাবে না। পাবে কিছু লোক কয়েকটি দলের লোকজন আর কোটার নামে একটি গোষ্ঠী। ছাত্র সমাজ তা মেনে নেয়নি। তারা প্রতিবাদ করে বিক্ষোভ করে। আন্দোলন করে, প্রতিরোধ করে। তাদের সমর্থনে রাস্তায় নামে সব পেশার মানুষ। আর ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা। তারা এক সময় গুলির মুখে দাঁড়ায়। শেষ পর্যন্ত প্রাণপণ সংগ্রামে তারা সব অনাচার হটিয়ে আবার ফিরিয়ে আনে হারানো অধিকার। এটাকে বলা হয়েছে দ্বিতীয় স্বাধীনতা। সে হিসেবে এটা দ্বিতীয় বিজয়ও।
বিজয়ের ৫৩ বছর পেরিয়ে এবার ৫৪ তম বিজয় দিবস। এবারের বিজয় দিবস এসেছে ভিন্ন এক প্রেক্ষাপটে। সে কথা আগেই বলেছি। দ্বিতীয় স্বাধীনতা অর্জনের পর তা এখন সংহত করার সময়। হারানো অধিকার যেমন ফিরে পাব তেমনি আমার কাজের মধ্য দিয়ে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাব এই প্রত্যয়ও দরকার সবার মাঝে।
বিজয় এলো যেভাবে : ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর জাতি পরাধীনতার শেকল ভেঙে পূর্ণাঙ্গ দেশ হিসেবে স্বাধীনতার স্বাদ গ্রহণ করে। জাতির ভাগ্যাকাশে দেখা দেয় এক নতুন সূর্যোদয়। প্রভাত সূর্যের রক্তাভা ছড়িয়ে পড়ে বাংলাদেশের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে। সমস্বরে একটি ধ্বনি যেন নতুন বার্তা ছড়িয়ে দেয়, পূর্ব দিগন্তে সূর্য উঠেছে, রক্ত লাল, রক্ত লাল, রক্ত লাল। মহামুক্তির আনন্দঘন এই দিনে এক নতুন উল্লাস জাতিকে প্রাণ সঞ্চার করে সজীবতা এনে দেয়। যুগ যুগ ধরে শোষিত বঞ্চিত মানুষগুলোর চোখে আনন্দ অশ্রু আর ইস্পাত কঠিন দৃঢ়তা নিয়ে এগিয়ে যায় সামনে। বিন্দু বিন্দু স্বপ্নেরা অবশেষে মিলিত হয় জীবনের মোহনায়। এ দেশ যেন খুঁজে পায় তার আপন সত্তাকে।
আগুন জ্বলে উঠেছিল ’৫২-র একুশে ফেব্রুয়ারি। ফাগুনের আগুনে ভাষা আন্দোলনের দাবি আর উন্মাতাল গণমানুষের মুষ্টিবদ্ধ হাত একাকার হয়ে যায় সেদিন। ভাষার জন্য লড়াই করতে গিয়ে আমরা খুঁজে পেয়েছিলাম আপন অধিকার প্রতিষ্ঠার ধারাটি। এই ধারার সূচনা করেছিল তমদ্দুন মজলিস নামের একটি সাংস্কৃতিক সংগঠন আর এর প্রাণপুরুষ ছিলেন প্রিন্সিপাল আবুল কাসেম। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান অর্জনের মধ্য দিয়ে বাঙালি মুসলিম জাতি পেয়েছিল আপন ঠিকানা। কিন্তু শাসকবর্গ আমাদের অধিকার বিশেষ করে ভাষার অধিকার দিতে চাইল না। ফলে স্বাধীনতা অর্জনের ধারাটি হারিয়ে গিয়েছিল চোরাগলির মধ্যে। পূর্ব বাংলার মানুষের প্রতি পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠীর শোষণ, বঞ্চনা আর অবহেলা চরম আকার ধারণ করলে প্রতিবাদে ক্রমে অগ্নিগর্ভ হয়ে ওঠে এই অঞ্চল তথা পূর্ব পাকিস্তান। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে জনগণের রায়ের প্রতি শ্রদ্ধা না দেখিয়ে শাসকবর্গ ষড়যন্ত্রের আশ্রয় নেয় ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রাখার জন্য। ফলে ক্ষোভে-বিক্ষোভে উত্তাল হয়ে ওঠে পূর্ব পাকিস্তান। ১৯৭১ সাল নিয়ে এল নতুন এক উদ্দীপনা। ২৫ মার্চ রাতে হামলা চালানো হলো নিরস্ত্র মানুষের উপর। ২৬ মার্চ থেকে শুরু হয় চূড়ান্ত লড়াই। সেদিন তৎকালীন মেজর জিয়াউর রহমান চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। শুরু হয় স্বাধীনতা সংগ্রাম। অবশেষে নয় মাসের দুঃস্বপ্নের অবসান ঘটিয়ে বাঙালি জাতির জীবনে এলো নতুন প্রভাত। অর্জিত হয় মহান বিজয়। এতে শহিদ হন লাখ লাখ মুক্তিকামী মানুষ। শুরু হয় স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের পথচলা। স্বাধীন দেশে পথচলা নির্বিঘ্ন হয়নি। স্বাধীনতার পর আবার অধিকার হারা হয় জনগণ। আসে চুয়াত্তরের দুর্ভিক্ষ। নানা অনাচার ছড়িয়ে পড়ে। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সেনা বাহিনী ও আমাদের জনসাধারণ এ ঐতিহাসিক বিপ্লবের মাধ্যমে স্বাধীনতাকে সংহত করে। দেশ এগিয়ে যেতে শুরু করে। নানা ঘাত প্রতিঘাত পার হয়ে চলছিল দেশ। কিন্তু দেশকে আবার নিয়ে যাওয়া হয় অন্ধকারে। ১৬ বছর সেই দমবদ্ধ অবস্থা শেষে ৫ আগস্ট বা ৩৬ জুলাই দেশ আবার সঠিক খাতে ফিরে আসে।
আরও কিছু তথ্য: বিজয় দিবস বাংলাদেশে বিশেষ দিন হিসেবে রাষ্ট্রীয়ভাবে দেশের সর্বত্র পালন করা হয়। প্রতি বছর ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশে দিনটি বিশেষভাবে পালিত হয়। ১৯৭২ সালের ২২ জানুয়ারি প্রকাশিত এক প্রজ্ঞাপনে দিনটিকে বাংলাদেশের জাতীয় দিবস হিসেবে উদযাপন করা হয় এবং সরকারিভাবে ছুটি ঘোষণা করা হয়। –বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে যারা নিহত হয়েছেন তাদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের অংশ হিসেবে ঢাকার সাভারে অবস্থিত জাতীয় স্মৃতিসৌধে রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, বিরোধী দলীয় নেতা-কর্মী, বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনসহ সর্বস্তরের মানুষ পুষ্পস্তবক অর্পণ করে থাকেন।
নতুন করে স্বাধীনতা অর্জনের ফলে এ বছরের বিজয় দিবসের তাৎপর্য অনেক। ৫ আগস্ট সমগ্র জাতি রাস্তায় নেমে এসে যেভাবে আনন্দ করেছে তাতে একটা বিরাট জিনিস হয়েছে। মানুষ বুঝিয়ে দিয়েছে তারা কী চায়। সেই মিছিলে ছিল শিশুকিশোররাও। সবার পথচলা সার্থক হবে তখনই যখন সবাই ঐক্যবদ্ধ থেকে দেশকে এগিয়ে নেবে। নানা অনিয়ম দূর করে দেশে আবার সুবাতাস বয়ে চলুক, এই হোক বিজয় দিবসের কামনা।
প্রকাশকাল: ডিসেম্বর ২০২৪



