৫ আগস্ট: বিজয়ের যে দিন

0
1

বাংলাদেশের ইতিহাসে কিছু দিন আছে, যেগুলো আমাদের বারবার ভাবায়, শেখায় এবং অনুপ্রেরণা জোগায়। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট তেমনই একটি দিন। ছাত্র-জনতার দীর্ঘ আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় এ দিন দেশে একটি বড় রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটে। অনেক মানুষের কাছে এটি ছিলো নতুন আশার সূচনা। তাই প্রতি বছর দিনটি এলেই আমরা সেই সময়ের ঘটনাগুলো স্মরণ করি এবং যারা জীবন দিয়েছেন, তাঁদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানাই।
এই লেখায় আমরা সেই সময়ের ঘটনাগুলো জানবো, যাতে নতুন প্রজন্ম বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাস সম্পর্কে ধারণা পায়।

আন্দোলনের শুরু
২০২৪ সালে সরকারি চাকরিতে কোটা পদ্ধতির সংস্কারের দাবিতে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা আন্দোলন শুরু করেন। তাঁদের দাবি ছিলো, চাকরিতে নিয়োগের ক্ষেত্রে মেধা, যোগ্যতা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হবে।
প্রথমদিকে আন্দোলন শান্তিপূর্ণ ছিলো। শিক্ষার্থীরা মানববন্ধন, বিক্ষোভ মিছিল এবং ‘বাংলা ব্লকেড’ নামে পরিচিত সড়ক অবরোধ কর্মসূচি পালন করেন। দেশের নানা প্রান্তের শিক্ষার্থীরা এতে অংশ নেন।

আন্দোলন আরও জোরদার হয়
১৬ জুলাই রংপুরে আন্দোলন চলাকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান। তাঁর মৃত্যু সারা দেশে গভীর আলোড়ন সৃষ্টি করে। এরপর আন্দোলন আরও বিস্তৃত হয়। দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি অভিভাবক, শিক্ষক, শ্রমজীবী মানুষ এবং নানা শ্রেণি-পেশার মানুষও আন্দোলনের প্রতি সংহতি প্রকাশ করেন।
পর্যায়ক্রমে আন্দোলনের দাবি শুধু কোটা সংস্কারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তনের দাবিও সামনে আসে। আন্দোলন একসময় অসহযোগ কর্মসূচিতে রূপ নেয়।

৪ আগস্ট : ভিন্ন পরিস্থিতি
৪ আগস্ট রাজধানী ঢাকায় ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। ওই সময় দেশের বিভিন্ন স্থানে সংঘর্ষ ও সহিংসতার ঘটনা ঘটে। বহু মানুষ আহত হন এবং প্রাণহানির ঘটনাও ঘটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকার কারফিউ জারি করে এবং কয়েক দিনের সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে। কিন্তু আন্দোলনকারীরা কর্মসূচি এক দিন এগিয়ে এনে ৫ আগস্ট তা পালনের ঘোষণা দেন।

৫ আগস্ট : ইতিহাস রচনার দিন
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বা ৩৬ জুলাই ছিলো সোমবার। সেদিন সকাল থেকেই কারফিউ উপেক্ষা করে হাজার হাজার মানুষ রাজধানী ঢাকার দিকে রওনা হন। বিভিন্ন জেলা থেকে মানুষ মিছিল নিয়ে রাজধানীতে প্রবেশ করেন। শাহবাগ, কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার, জাতীয় প্রেসক্লাবসহ গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলো জনসমুদ্রে পরিণত হয়।
দুপুরের দিকে খবর ছড়িয়ে পড়ে যে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে দেশ ছেড়েছেন। এ খবর ছড়িয়ে পড়ার পর রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে মানুষ আনন্দ প্রকাশ করেন। তবে একই সঙ্গে অনেক জায়গায় বিশৃঙ্খলা ও সহিংসতার ঘটনাও ঘটে, যা কারও জন্যই কাম্য নয়।

অনেক প্রাণের বিনিময়ে
জুলাই-আগস্টের আন্দোলনে বহু মানুষ প্রাণ হারান। বিভিন্ন সূত্রে নিহতের সংখ্যা ভিন্ন হলেও শত শত মানুষের মৃত্যুর খবর প্রকাশিত হয় এবং হাজারো মানুষ আহত হন। নিহতদের মধ্যে শিক্ষার্থী, শিশু, সাধারণ মানুষ ও বিভিন্ন পেশার নাগরিকও ছিলেন।
প্রতিটি প্রাণ অমূল্য। তাই যারা এই আন্দোলনের সময় জীবন হারিয়েছেন, তাঁদের স্মরণ করা এবং তাঁদের পরিবারের প্রতি সহমর্মিতা জানানো আমাদের দায়িত্ব।

এরপর কী হয়েছিলো?
দেশের পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন এবং জনগণকে শান্ত থাকার আহ্বান জানান। তিনি দেশে আইন-শৃঙ্খলা বজায় রাখার এবং হত্যাকাণ্ডের বিচার নিশ্চিত করার আশ্বাস দেন।
পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ ও বিভিন্ন পক্ষের আলোচনার মাধ্যমে ৮ আগস্ট ২০২৪ নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করে। এরপর ধীরে ধীরে প্রশাসনিক কার্যক্রম স্বাভাবিক হতে শুরু করে।

শিশু-কিশোরদের জন্য কী শিক্ষা?
ইতিহাস শুধু মুখস্থ করার বিষয় নয়, ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেওয়াও গুরুত্বপূর্ণ। জুলাই-আগস্টের ঘটনাগুলো আমাদের কয়েকটি বিষয় মনে করিয়ে দেয়-
নিজের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হতে হবে। মত প্রকাশ করতে হলে শান্তিপূর্ণ ও দায়িত্বশীল হতে হবে। ভিন্ন মতের মানুষের প্রতি সম্মান দেখাতে হবে। দেশের আইন ও শৃঙ্খলা রক্ষা সবার দায়িত্ব। কোনো সমস্যার সমাধানে সংলাপ, ধৈর্য ও পারস্পারিক শ্রদ্ধা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

ভবিষ্যতের বাংলাদেশ
আজ ৫ আগস্টের সেই ঘটনাপ্রবাহের দুই বছর পেরিয়ে গেছে। সময় বদলেছে, কিন্তু ইতিহাসের শিক্ষা রয়ে গেছে। নতুন প্রজন্মের দায়িত্ব হবে এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তোলা, যেখানে সবাই সমান সুযোগ পাবে, আইনের শাসন থাকবে, মানুষের মত প্রকাশের স্বাধীনতা থাকবে এবং সবাই শান্তিপূর্ণভাবে নিজের স্বপ্ন পূরণ করতে পারবে।
শিশু-কিশোররাই আগামী দিনের বাংলাদেশ গড়বে। তাই এখন থেকেই তাদের সত্যবাদী, দায়িত্বশীল, পরিশ্রমী এবং দেশপ্রেমিক নাগরিক হিসেবে গড়ে উঠতে হবে। বই পড়া, বিজ্ঞানচর্চা, খেলাধুলা, সৃজনশীল কাজ এবং মানবিক মূল্যবোধের চর্চার মাধ্যমে তারা নিজেদের যোগ্য করে তুলতে পারে।

ইতিহাসের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ দিন আমাদের একটি করে বার্তা দেয়। ৫ আগস্টও তেমন একটি দিন যে দিন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, একটি দেশের ভবিষ্যৎ গড়তে সচেতন নাগরিক, পারস্পারিক সম্মান, শান্তি এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের গুরুত্ব অপরিসীম।

প্রকাশকাল: আগস্ট ২০২৬