বিশ্ব শিশু দিবস : তাদের জীবন হোক আনন্দের

তোমরা যারা স্কুলে পড়ো হয়তো জানো তোমাদের জন্য একটি বিশেষ দিবস আছে। তার নাম বিশ্ব শিশু দিবস। কিন্তু যে ছেলে বা মেয়েটি স্কুলে যায় না সে কিন্তু এটা জানেই না। আজ সেই শিশু দিবসের কথা বলবো।
প্রতি বছর অক্টোবর মাসের প্রথম সোমবার বাংলাদেশে বিশ্ব শিশু দিবস পালিত হয়। এ বছর ৫ অক্টোবর দিবসটি পালন করা হচ্ছে। এই দিনটির সাথে জড়িয়ে আছে শিশুর অধিকার, সুরক্ষা এবং শিশুর উন্নয়ন ও বিকাশের বিষয়টি। আমাদের দেশে একই সাথে পালিত হয়ে থাকে শিশু অধিকার সপ্তাহ। শিশুদের তুলনা করা চলে ফুলের সাথে। হ্যাঁ শিশুরা ফুলের মতো। বিশ্ব এত সুন্দর আর প্রাণবন্ত শিশুরা আছে বলেই। বিশ্বকে সুন্দর করার পূর্বশর্ত হচ্ছে শিশুদের সুন্দর করে গড়ে তোলা। পূর্বশর্ত শব্দটি কঠিন হয়ে গেল। সহজ করে বললে, যা না হলেই নয়।
আজকে যারা শিশু, তারাই জাতি গঠনের মূল ভিত্তি। সুন্দর আগামী প্রতিষ্ঠার কারিগর। শিশুদের শারীরিক, মানসিক ও সাংস্কৃতিক বিকাশের জন্য পুষ্টি, শিক্ষা, নিরাপত্তা ও সুস্থ বিনোদনের বিকল্প নেই। একটি ভালো পরিকল্পনা ও সঠিক দিকনির্দেশনার মাধ্যমেই শিশুদের পরিপূর্ণ বিকাশ সম্ভব হতে পারে।

কী করে এলো বিশ্ব শিশু দিবস?
এই শিশু দিবসের মূল উদ্দেশ্য হলো শিশুদের স্বাস্থ্য, শিক্ষা, আনন্দ ও অধিকার নিশ্চিত করা এবং তাদের একটি উন্নত ভবিষ্যৎ গড়তে সহায়তা করা। বিশ্বজুড়ে জাতিসংঘের কার্যক্রমের সাথে সামঞ্জস্য রেখে এই দিবসগুলো পালন করা হয়। শিশুদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য, আনন্দ অধিকার ও উন্নয়ন ভাবনার জন্য এই দিনটি নির্ধারিত।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধে মানবাধিকার চরমভাবে লঙ্ঘিত হলে ১৯২৪ সালে লিগ অব নেশনস প্রথম শিশু অধিকারের ওপর জেনেভা কনভেনশন ঘোষণা গ্রহণ করে। অবশ্য এর আগে শিশু অধিকার সম্পর্কে বহু দেশে অনেক আলোচনা হয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে ভেঙে যায় লিগ অব নেশনস। জাতিসংঘ ১৯৪৫ সালে প্রতিষ্ঠার পর ১৯৪৮ সালে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সনদ ঘোষণা করে। সেই সনদে প্রথমেই বলা হলো শিশুদের কথা। প্রতিটি শিশুরই মানুষের মতো মানুষ হওয়ার অধিকার রয়েছে। শিশুদের আহার-আশ্রয় ও সামাজিক নিরাপত্তার সাথে প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণের নিশ্চয়তা চাই। অগণিত, অসহায় অবহেলিত শিশুর সব রকমের সমস্যা সমাধান হওয়া অবশ্যই প্রয়োজন। জাতিসংঘ ঘোষিত এই সনদে শিশুর বেশ কয়েকটি মৌলিক অধিকারের কথা বলা হয়েছে। উল্লেখ্য, শিশুদের এই মৌলিক অধিকারগুলোর সাথে বিশ্বের সমাজসচেতন মানুষ একাত্মতা প্রকাশ করেন। বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন ও প্রতিষ্ঠান পৃথিবীর ভবিষ্যৎ নাগরিকদের নিরাপত্তার প্রয়োজন অনুভব করেন। এ লক্ষ্যেই গঠন করা হয় আন্তর্জাতিক শিশুকল্যাণ ইউনিয়ন (ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর চাইল্ড ওয়েলফেয়ার বা ইউনিসেফ) ১৯৫২ সালে বিশ্বব্যাপী শিশু দিবস পালনের সিদ্ধান্ত নেয় ইউনিসেফ। দিনটি পালনের জন্য নির্ধারিত হয় অক্টোবর মাসের প্রথম সোমবার। উল্লেখ্য, ১৯৫৩ সালের ৫ অক্টোবর বিশ্বের ৪০টি দেশ প্রথম বিশ্ব শিশু দিবস উদযাপন করে। ১৯৫৯ সালের ২০ নভেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ গ্রহণ করে শিশু অধিকার ঘোষণা। এই ঘোষণা তখন জাতিসংঘের ৭৮টি দেশ গ্রহণ করে। ফলে সময়ের সাথে সাথে শিশু অধিকারের প্রয়োজনীয়তাও বেড়েছে। ১৯৮৯ সালের ২০ নভেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ আবার গ্রহণ করে শিশু অধিকার সনদ। তখন জাতিসংঘের সদস্যসংখ্যা ছিল ১৬০টি। শিশু অধিকার সনদে সংযুক্ত ৫৪টি ধারা সম্পর্কে দশ বছর ধরে আলোচনার পরই সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয় এই সনদ। এতে ১৮ বছর পর্যন্ত সব ছেলেমেয়েকে শিশু-কিশোর হিসেবে ধরা হয়েছে। অর্থাৎ পূর্ণবয়স্ক হয়ে ওঠার আগ পর্যন্ত সবাই শিশুদের এই বিশেষ অধিকারগুলো ভোগ করতে পারবে। এই সনদ অনুমোদনকারী ২২টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। শিশু অধিকার সপ্তাহ হলো বিশ্ব শিশু দিবসকে কেন্দ্র করে শিশুর অধিকার ও সুরক্ষা বিষয়ক সচেতনতা বাড়াতে সপ্তাহব্যাপী পালন করা বিভিন্ন কর্মসূচি।

শিশু অধিকার কী?
শিশুরা কতটুকু তাদের অধিকারগুলো ভোগ করছে? নাকি তা আনুষ্ঠানিকতার মধ্যেই সীমিত রয়েছে। এ বিষয়টি এখন বিশেষভাবে ভাবার সময় এসেছে। আজকের শিশু আগামী দিনের আলোকিত পৃথিবী গড়ার কারিগর। আজকে যে শিশু একদিন সে পৃথিবীকে চালিত করবে। শিশু একদিন দেশ, সমাজ ও রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রণ করবে সে শিশুকে আমরা বড় অবহেলায় অনাদরে লালন করছি কি? এ প্রশ্ন সামনে আসছে। বড় হওয়ার সুন্দর পরিবেশ অনেক শিশুরই নেই, সুন্দরভাবে বেড়ে ওঠার পথে নানান বাঁধা-বিঘ্ন রয়েছে, অনেক শিশু ফোটার আগেই কুঁড়িতেই ঝরে যায়।
প্রত্যেক শিশু কিছু অধিকার নিয়েই জন্মায়। শিশুর সেই অধিকার প্রাপ্তিতে বাঁধার সৃষ্টি হলে শিশুর প্রতিভা বিকাশের পথ অবরুদ্ধ হয়ে যায়। তাই শিশুর অধিকার ও নিরাপত্তার বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। শিশুটি ধনী পরিবারের হোক বা দরিদ্র পরিবারের, শহরে থাকুক বা গ্রামে, ছেলে হোক বা মেয়ে তার অধিকার সমান। কী কী তার অধিকার এবার বলছি-
বেঁচে থাকার অধিকার : প্রতিটি শিশুর জীবন রক্ষা করা এবং প্রয়োজনীয় যত্ন পাওয়ার অধিকার আছে।
নাম ও পরিচয়ের অধিকার : প্রতিটি শিশুর একটি নাম, পরিচয় ও জন্মনিবন্ধনের অধিকার রয়েছে।
শিক্ষার অধিকার : প্রতিটি শিশুর শিক্ষা লাভের অধিকার আছে।
স্বাস্থ্যসেবার অধিকার : অসুস্থ হলে চিকিৎসা পাওয়া এবং সুস্থভাবে বেড়ে ওঠার অধিকার শিশুর রয়েছে।
নিরাপত্তার অধিকার : নির্যাতন, সহিংসতা, শোষণ, পাচার ও বিপজ্জনক পরিস্থিতি থেকে শিশুর রক্ষা পাবার অধিকার আছে।
খেলাধুলার অধিকার : খেলাধুলা, বিশ্রাম ও বিনোদনের অধিকার রয়েছে।
মতামত প্রকাশের অধিকার : শিশুর বয়স ও পরিপক্কতা অনুযায়ী তার মতামত শোনা ও গুরুত্ব দেওয়ার অধিকার রয়েছে।
শিশুরা কল-কারখানাসহ নানা জায়গায় কাজ করে নিজেদের উপার্জনে দুস্থ পঙ্গু অসহায় বাবা-মাসহ নিজেরা কোনো মতে বেঁচে আছে। সেই সব অসহায় শিশুর প্রতি নজর দিতে হবে। তাদেরকে পড়ালেখার সুযোগ করে দিতে হবে। শিশুর প্রাপ্য অধিকারের প্রতি সবাই সচেতন হতে পারলে শিশুর মেধা, মনন, সৃজনশীলতা বিকাশে সহায়ক হবে।

শিশুর মন কল্পনাপ্রবণ। তার কল্পনাশক্তির বিকাশের পথকে উন্মুক্ত করে দিতে হবে। গল্প, ইতিহাস, ঐতিহ্য, জীবনীবিষয়ক বই তাকে পড়তে দিতে হবে, যাতে করে তারা আলোকিত মানুষ হয়ে গড়ে উঠতে পারে।
বিশ্ব শিশু দিবসের আয়োজনগুলো শিশুদের অধিকার সম্পর্কে একটি ইতিবাচক বার্তা প্রদান করে এবং তাদের ভবিষ্যৎ জীবনে উজ্জ্বল হওয়ার জন্য অনুপ্রাণিত করে। আজকের শিশুটি একদিন পরিপূর্ণ মানুষ হবে। আর এই পরিপূর্ণ মানুষ হয়ে ওঠার জন্য শিশুর চাই কতগুলো জিনিস। যেগুলো শিশুর পক্ষে একা কখনোই অর্জন করা সম্ভব নয়। বড়রা যদি সে সুযোগ সৃষ্টি করে না দেয়। যেমন- একটি পরিবারের আশ্রয়, পুষ্টির জন্য খাদ্য, রোগ নিরাময়ের জন্য চিকিৎসা, সর্বোপরি স্নেহপ্রীতি-ভালোবাসাময় পরিবেশ। প্রতিকূল পরিবেশ মোকাবেলায় বড়রা যতটুকু শক্তি প্রয়োগ করতে পারে, শিশুরা ঠিক ততটুকু অসহায়।
প্রাকৃতিক দুর্যোগে, যুদ্ধ-বিগ্রহে শিশুরাই আক্রান্ত হয় সবার আগে। শিশুদের এই অসহায়ত্ব দূর করতে পারে বড়রা প্রয়োজনীয় কিছু চাহিদা মিটিয়ে। ওই চাহিদাগুলোই হলো শিশুর অধিকার, যা আগেই বলেছি। আজ যারা শিশু, ভবিষ্যতে তারাই হবে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের কর্ণধার। এই ভবিষ্যৎ নাগরিকরা যাতে সুনাগরিক হিসেবে গড়ে উঠতে পারে, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতি তাদের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করতে পারে, সে জন্য উপযুক্তভাবে তাদের গড়ে তুলতে হবে।
এই গড়ে ওঠার সর্বোত্তম সময়টি হচ্ছে শৈশব। শৈশবে যদি শিক্ষা থেকে কেউ বঞ্চিত হয়, যদি কেউ উপযুক্ত খাদ্য পুষ্টি ও স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হয়, যদি কেউ ভালোবাসা ও নিরাপত্তা থেকে বঞ্চিত হয়, তাহলে কী হবে? ভবিষ্যতে সমাজ একজন অশিক্ষিত, দুর্বল স্বাস্থ্যের, আত্মবিশ্বাসহীন, কখনো কখনো নিষ্ঠুর প্রকৃতির একজন নাগরিক পাবে। তা যেন না হয় সেটা ভাবতে হবে। শিশুর সুন্দর আগামী নিশ্চিত করতে হবে।
বিশ্ব শিশু দিবস ও শিশু অধিকার সপ্তাহ উদযাপনে ইউনিসেফ, ফুলকুঁড়ি আসরসহ বিভিন্ন শিশু সংগঠন, দেশি ও বিদেশি উন্নয়ন সংস্থা শিশুদের কবিতা আবৃত্তি, চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা, দেয়ালিকা, বিতর্ক প্রতিযোগিতা, কুইজ প্রতিযোগিতা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, শিশু সংলাপ, ক্রীড়া, বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি ও গোলটেবিল ˆবঠকের আয়োজন করে থাকে প্রতি বছর। এ বছরও তা হচ্ছে।
বিশ্ব শিশু দিবস পালন তখনই সার্থক হবে যখন শিশুরা সঠিকভাবে বেড়ে উঠবে, তাদের অধিকার নিশ্চিত হবে। তাই আসুন, আমরা শিশুদের এই অধিকারগুলো বাস্তবায়ন করতে হাতে হাত রেখে কাজ করি।

প্রকাশকাল : অক্টোবর ২০২৬