নবান্ন ও পিঠাপুলির উৎসব : আমাদের সোনালি ঐতিহ্য

0
2

হেমন্ত বাংলাদেশের ছয়টি ঋতুর একটি। এই ঋতুতে সারা দেশে হয় নবান্ন উৎসব। হেমন্তের প্রথম মাস কার্তিকে ধান পরিপক্ব হয়। অগ্রহায়ণে কাটা হয়। এখন চলছে কার্তিক মাস। কিছু দিন পর আসবে অগ্রহায়ণ মাস। তখন গ্রাম বাংলায় ধান কাটা শুরু হবে। এর পর মাড়াইয়ের উৎসব। মাড়াই শেষে শুকানোর পালা ও গোলায় তোলা। কিছু ধান কল কিংবা ঢেঁকিতে করে ছেঁটে বানানো হয় চাল। তবে আজকাল আর গ্রামে গ্রামে ঢেঁকির ব্যবহার নেই। কিন্তু ঐতিহ্য রয়ে গেছে। রান্নার চাল ঢেঁকিতে ছাঁটা না হলেও পিঠে তৈরির কাজে এখনো গ্রামে কোনো কোনো জায়গায় ঢেঁকির ব্যবহার আছে।
এক সময় বাংলায় বছর শুরু হতো অগ্রহায়ণ দিয়ে। অগ্রহায়ণ অর্থ হায়ণের শুরু বা বছরের শুরু। সে কারণে বহু পূর্বে অগ্রহায়ণ ছিল বছরের শুরুর মাস। পরে বাদশাহ আকবর বাংলা সন প্রবর্তন করলে বৈশাখ মাস দিয়ে বছর শুরু হয়। অগ্রহায়ণ হয় অষ্টম মাস। আর ধান উৎপাদনের ঋতু হলো এই হেমন্ত। বর্ষার শেষ দিকে বোনা আমন-আউশ শরতে বেড়ে ওঠে। আর হেমন্তে ঘরে তোলার মতো হয়। হেমন্ত এলে পাল্টে যায় প্রকৃতি ও মানুষ। গ্রামের পরিবেশে আনন্দ বিরাজ করে। নবান্ন বাংলাদেশ ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গের ঐতিহ্যবাহী ধানের বা পিঠার উৎসব। বাংলার কৃষিজীবী সমাজে শস্য উৎপাদনের বিভিন্ন পর্যায়ে যে সকল আচার-অনুষ্ঠান ও উৎসব পালিত হয়, নবান্ন তার মধ্যে অন্যতম। ‘নবান্ন’ শব্দের অর্থ ‘নতুন অন্ন’ বা ‘নব অন্ন’। নবান্ন উৎসব হলো নতুন আমন ধান কাটার পর সেই ধান থেকে প্রস্তুত চালের প্রথম রান্না উপলক্ষে আয়োজিত উৎসব। বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী শস্যোৎসব এটি। নবান্নে জামাইকে নিমন্ত্রণ করা হয়, মেয়েকেও বাপের বাড়িতে ‘নাইওর’ আনা হয়।
ঘরে নতুন ধান আসাকে উপলক্ষ করে গ্রামে গ্রামে হয় এই নবান্ন উৎসব। নতুন চাল দিয়ে বানানো হয় চিতই পিঠা, পুলি পিঠা, পাটিসাপ্টাসহ আরো অনেক পিঠা। এসব পিঠা আমাদের সোনালি ঐতিহ্য। নবান্ন উৎসবে যে পিঠাপুলির প্রচলন শুরু হয় তা থাকে শীতকাল পর্যন্ত। অগ্রহায়ণের নবান্ন নিয়ে আসে খুশির বার্তা। নতুন ধান ঘরে উঠানোর কাজে ব্যস্ত থাকে কৃষাণ কৃষাণিরা। আর ধান ঘরে উঠলে পিঠে পায়েস খাওয়ার ধুম পড়ে যায়। নবান্ন আর পিঠেপুলির উৎসবে আনন্দে মাতোয়ারা হয় সবাই। তাই অগ্রহায়ণ এলেই সর্বত্র বেজে ওঠে নতুন ধ্বনি। যেহেতু নবান্ন ঋতুকেন্দ্রিক একটি উৎসব তাই প্রতি বছর ঘুরেফিরে আসে নবান্ন উৎসব।

নবান্নে নানা ধরনের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয়। লাঠিখেলা, বাউলগান, নাগরদোলা, বাঁশি, শখের চুড়ি, খই, মোয়ার পসরা বসে গ্রাম্য মেলায়। বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের কিছু কিছু এলাকায় নবান্ন উৎসব অত্যন্ত উৎসব মুখর পরিবেশে উদযাপিত হয়। বাংলাদেশের বগুড়া, দিনাজপুর, কুষ্টিয়াসহ উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জেলায় আবহমানকাল ধরে নবান্ন উৎসব অত্যন্ত উৎসবমুখর পরিবেশে উদযাপিত হয়ে আসছে। বগুড়ার আদমদিঘির উৎসবটি নামকরা। একই চিত্র দেখা যায় কুমিল্লা, চাঁদপুর, খুলনা, বরিশাল অঞ্চলসহ দক্ষিণের জেলাগুলোতে। পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ, বীরভূম, বর্ধমানসহ বিভিন্ন স্থানে আনুষ্ঠানিক নবান্ন উৎসব উদ্যাপিত হয়।

রাজধানী ঢাকা শহরে আনুষ্ঠানিকভাবে নবান্ন উৎসব হয়। বিভিন্ন সংগঠন নবান্নের গান, লোকগীতি, লালন গীতি, বাউল গান, সাপ খেলা, বানর খেলা, লাঠি খেলা, নাগর দোলা, পুতুল নাচ, পালকি, পথনাটকসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক পরিবেশনার আয়োজন করে। এই নবান্ন উৎসবের সমাপনী দিনে সেরা পিঠা শিল্পীদের পুরস্কার প্রদান করা হয়। তাই বলাই যায় যে নবান্ন বাংলার অন্যতম জনপ্রিয় একটি উৎসব।
হেমন্তে নতুন ফসল ঘরে তোলার সময় এই উৎসব পালন করা হয়। হাজার বছরের পুরনো এই উৎসবটি যুগ যুগ ধরে একইভাবে পালন হয়ে আসছে। নবান্ন উৎসবে গ্রামগঞ্জে আয়োজন করা হয় গ্রামীণ মেলার। এসব মেলায় শিশুকিশোর থেকে শুরু করে সব শ্রেণী-পেশার মানুষের ঢল নামে। আনন্দ দেখা যায় ছোটবড় সব বয়সের মানুষের মধ্যে। গ্রামের খেটে খাওয়া মানুষ এই উৎসব ভিন্নভাবে পালন করে।

প্রকাশকাল: নভেম্বর ২০২৪