জঙ্গলের ভেতর এক জলাশয়ে বাস করত জলহস্তি। এক গণ্ডার তার শরীরের কাদামাটি ধোয়ার জন্য এলো জলহস্তির জলাশয়ে।
গণ্ডার জলহস্তিকে বলল, ‘তুমি কি জানো তুমি দেখতে কেমন অদ্ভুত আর হাস্যকর?’
জলহস্তি বলল, ‘আমি তো কাদাপানি পছন্দ করি। আমার গায়ে তো কাদামাটি থাকবেই।’
গণ্ডার বলল, ‘আমিও তো কাদামাটিতে থাকি, কিন্তু তোমাকে অদ্ভুত লাগে তোমার ওই বিশ্রী নাকের জন্য।’
জলহস্তি নিচু হয়ে তার নাক দেখে বলল, ‘কই আমার নাক অদ্ভুত লাগছে না।’
‘তোমার কাছে কি মনে হয় না তোমার কিছু একটা নেই’, গণ্ডার জিজ্ঞেস করল।
জলহস্তি মাথা নেড়ে বলল, ‘না।’
‘তোমার কি মনে হয় না যে তোমার কোনো শিং নেই?’ গণ্ডার জিজ্ঞেস করল।
‘শিং!’ অবাক হয়ে বলল জলহস্তি।
‘হ্যাঁ, সত্যি সত্যিই তোমার নাকের উপর কোনো শিং নেই। আর শিং ছাড়া ওই নাকের জন্য তোমাকে অদ্ভুত আর হাস্যকর লাগে।’
জলহস্তি কাদা থেকে উঠে আবার নিচু হয়ে তার নাক দেখার চেষ্টা করল। ততক্ষণে গণ্ডার চলে গেছে। জলহস্তি ভাবল, যদি আমার নাকের উপর গণ্ডারের মতো একটা শিং থাকত তাহলে আমাকে আর অদ্ভুত দেখাত না।
এই ভাবনা জলহস্তির মাথায় ঘুরপাক খেতে লাগল। সে খুব অস্বস্তি বোধ করতে থাকে। তাকে কি সত্যিই খুব খারাপ দেখায়? এটা জানার জন্য সে বনের সবার কাছে যাবে। সবাইকে জিজ্ঞেস করবে তাকে কি দেখতে অদ্ভুত লাগে? যদি সবার কাছেই লাগে তবে সে নিশ্চিত হবে যে আসলেই একটা অদ্ভুত প্রাণী।
জলহস্তি প্রথমে সিংহের কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘তোমার কি মনে হয় আমাকে দেখতে অদ্ভুত লাগে?’
সিংহ কিছুক্ষণ ভেবে বলল, ‘আসলে আমি যদি সত্যি কথাটা বলি, তাহলে বলব হ্যাঁ তোমাকে সত্যিই অদ্ভুত লাগে। দেখ, তোমার কিন্তু আমার মতো কেশর নেই। যেটা থাকলে তোমাকে আমার মতোই রাজকীয় লাগত।’
সিংহ তার কেশর এদিক-ওদিক নেড়ে প্রমাণ করার চেষ্টা করল যে তাকে সত্যিই রাজকীয় লাগে।
সিংহ বলল, ‘আমার কথায় তুমি কষ্ট পেয়ো না।’
জলহস্তি মন খারাপ করে হাঁটতে লাগল আর ভাবল, আমার যদি সিংহের মতো চমৎকার কেশর থাকত তাহলে আমাকে আর অদ্ভুত দেখাত না।
হাঁটতে হাঁটতে জলহস্তির দেখা হলো বাঘের সাথে।
সে বাঘকে জিজ্ঞেস করল, ‘তোমার কি মনে হয় আমি একটা অদ্ভুত প্রাণী?’
বাঘ ভালোভাবে জলহস্তির মাথা থেকে পা পর্যন্ত দেখল। তারপর বলল, ‘তুমি কিছু মনে কোরো না, আমার মনে হয় আমার মতো যদি তোমার গায়েও এরকম ডোরা কাটা দাগ থাকত, তাহলে তোমাকেও চমৎকার দেখাত। অনেকটা আমার মতো।’
গায়ের প্রতিটি ডোরা দাগে তাকে কতটা সুন্দর লাগে তা দেখানোর জন্য বাঘ নিজের শরীরটাকে টানটান করে দেখানোর চেষ্টা করল। তারপর বাঘ বলল, ‘মুখের উপর সত্য কথা বললাম বলে তুমি কিছু মনে করো না।’
জলহস্তি কোনো কথা না বলে ভাবল, ইস, আমার যদি বাঘের মতো অমন সুন্দর ডোরা থাকত। আমাকে তাহলে আর অদ্ভুত দেখাত না। ভাবতে ভাবতে সে হাঁটতে লাগল।
এবার হাতির সাথে দেখা হলো জলহস্তির। বলল, ‘তোমার কি মনে হয় আমি দেখতে খুব কুৎসিত?’
হাতি তার প্রশ্ন শুনে অবাক হয়ে বলল, ‘আমি আসলে এটাই ভাবছি।’
‘কী ভাবছ?’ জলহস্তি খুব অস্থির হয়ে জিজ্ঞেস করল।
‘তোমার কি কোনো কান নেই?’
‘আমার কান নেই!’ আশ্চর্য হয়ে বলল জলহস্তি।
‘কান নেই বলতে আমি বোঝাচ্ছি তোমার আরও বড় কানের প্রয়োজন ছিল। দেখ, আমার কান দুটো কত বড়।’
হাতি তার বড় বড় কান নাড়াতে নাড়াতে বলল, ‘দেখেছো আমার কানদুটোর কারণেই আমাকে দেখতে কতো সুন্দর লাগে।’
জলহস্তি মন খারাপ করে বলল, ‘যদি আমার তোমার মতো বড় বড় কান থাকত তাহলে আমাকে আর অদ্ভুত লাগত না।’
এবার জলহস্তির দেখা হলো বানরের সাথে।
বানরকেও সে একই প্রশ্ন করল।
বানর বলল, ‘যদি তুমি মনে কর লেজ না থাকলে খুবই হাস্যকর দেখায় তো আমি বলব তোমাকে তেমনই লাগে।’
‘লেজ নেই মানে?’ জলহস্তি প্রশ্ন করল।
‘লেজ নেই মানে আমার মতো লেজ। আমার শরীর তোমার মতো বড় না অথচ আমার লেজ কত বড়।’ এই বলে বানর তার লেজ দিয়ে এক গাছ থেকে ঝুলে অনায়াসে আরেক গাছের ডালে চলে গেল।
জলহস্তির মন আরও খারাপ হলো। মনে মনে ভাবল, আমার যদি বানরের মতো লেজ থাকত তো আমাকে আর এরকম অদ্ভুত দেখাত না।
জলহস্তি ভাবছে আর হাঁটছে।
এবার তার দেখা হলো জিরাফের সাথে। সে জিরাফকে একই প্রশ্ন জিজ্ঞেস করল।
জিরাফ বলল, ‘হ্যাঁ, তোমাকে আসলেই অদ্ভুত লাগে। কারণ, তোমার আমার মতো লম্বা গলা নেই। যে গলা দিয়ে তুমি বড় বড় গাছের পাতা খাবে আর সুন্দর পৃথিবীটাকে দেখবে।’
জলহস্তি বলল, ‘কেন, আমি তো ফুল, পাখি, রাতের তারা সবকিছুই দেখতে পাই।’
জিরাফ বলল, ‘তুমি কি গাছের চূড়ো, দূরের পাহাড় দেখতে পাও?’
‘তা দেখতে পাই না’, জলহস্তি বলল।
তোমার আসলে আমার মতো একটা লম্বা গলার প্রয়োজন ছিল। এটা বলে জিরাফ তার গলাটাকে লম্বা করে চারদিকের প্রকৃতি দেখতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল আর লম্বা গাছের পাতা টেনে খেতে লাগল।
জলহস্তি মন খারাপ করে বলল, ধন্যবাদ তোমাকে।
জলহস্তি আবার ভাবছে আর হাঁটছে…
এবার তার সাথে দেখা হলো ছোট্ট এক কচ্ছপের সাথে। সে বলল, আচ্ছা তোমার কি মনে হয় আমি দেখতে অদ্ভুত?
কচ্ছপ বলল, ‘আমার মনে হয় তোমাকে কেউ কিছু বলেছে।’
জলহস্তি বলল, ‘হ্যাঁ, গণ্ডার, সিংহ, বাঘ, হাতি, বানর, জিরাফ সবাই বলেছে আমি নাকি দেখতে খুব অদ্ভুত। তুমিও কি তাই ভাবো?’
কচ্ছপ বলল, ‘তুমি দেখতে আসলেই অদ্ভুত, কারণ তোমার যে কোনো খোলস নেই।’
‘খোলসের কী দরকার!’ বলল জলহস্তি।
কচ্ছপ বলল, ‘খোলস আসলেই চমৎকার। আমি এই খোলস ছাড়া মোটেই বাঁচতে পারতাম না। যখন গরম পড়ে তখন এটা আমাকে শীতল রাখে। আবার যখন শীত পড়ে তখন এটা আমাকে গরম রাখে। আবার আমার যখন পালানোর প্রয়োজন হয় তখন আমি খোলসের ভেতরে ঢুকে পড়ি।’
জলহস্তি বলল, ‘আমি বুঝতে পেরেছি আমার যদি খোলস থাকত, তাহলে আমাকে আর অদ্ভুত দেখাত না।’
জলহস্তি এবার গেল গানের পাখির কাছে।
পাখি তাকে বলল, ‘আসলে তোমার গলাটা বেসুরো। তুমি যদি আমার মতো গান গাইতে পারতে তাহলে তোমাকে আর বিশ্রি দেখাত না।’ এই বলে পাখি খুব করুণ সুরে একটা গান ধরল।
গান শুনে জলহস্তি খুব খুশি হলো। তার মনে হলো সে মোটেই কুৎসিত না। নিজেকে দেখানোর জন্য সে সবার সামনে দিয়ে দৌড়াতে লাগল।
সবাই এবারও তাকে দেখে হাসতে লাগল। সে বুঝতে পারল না কেন সবাই তাকে দেখে অমন করে হাসছে।
হঠাৎ সে জমে থাকা বৃষ্টির পানিতে তার ছায়া দেখতে পেল।
এবার নিজের চেহারা দেখে সে চিৎকার করে উঠল।
‘ওহ্ আমি আসলেই দেখতে কুৎসিত! অদ্ভুত!’
ঘুম ভেঙে গেল জলহস্তির। এতক্ষণ সে স্বপ্ন দেখছিল।
জলহস্তি আর সহ্য করতে পারল না। সে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল, আমাকে এমন একটা জায়গা খুঁজে বের করতে হবে যেখানে কেউ আমাকে কখনও দেখবে না।
জলহস্তি দৌড়াতে শুরু করল। দৌড়াতে দৌড়াতে সে আবার তার জলাশয় খুঁজে পেল। সেই জলাশয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে পানির নিচে ডুব দিল।
পানির নিচে গিয়ে সে ভাবল, আমার— অন্যদের মতো কেশর, শরীরে ডোরা দাগ, বড় কান, লম্বা লেজ, লম্বা গলা, কচ্ছপের মতো খোলস এবং পাখির মতো সুরেলা কণ্ঠ নেই তাতে কী হয়েছে, সে তো তার বিরাট মোটা শরীর নিয়ে সারাক্ষণ পানির ভেতর কাটিয়ে দিতে পারে, কাদার ভেতর সারাক্ষণ ঘুমিয়েও থাকতে পারে— অন্যরা তো তা পারে না।
জলহস্তির সকল অস্বস্তি কেটে গেল। সেই থেকে তার গর্ব হতে লাগল এই ভেবে যে, সে একটা বড়, মোটা, চমৎকার প্রাণী। জলাশয়ে সেই সবচেয়ে সুন্দর!
প্রকাশকাল: ডিসেম্বর ২০২৫



