প্রতিরাতে ঘুমোবার আগে কত কিছু মনে হয়; সকালে উঠে এটা করবো সেটা করবো, ক্লাসের জন্য এই চ্যাপ্টার পড়বো, ওই হোমওয়ার্কটা করবো ইত্যাদি। কিন্তু সকালে ঘুমই ভাঙতে চায় না। মনে হয় আরেকটু ঘুমাই, এই কয়েক মিনিট। কিন্তু কয়েক মিনিট আর মিনিট থাকে না। ঘণ্টা পার হয়ে যায়। ঘুম থেকে উঠতে আলসেমি লাগার কারণে অনেকের পরীক্ষার হলে যেতেও দেরি হয়ে যায়।
আলসেমির দরুণ হোমওয়ার্ক হয় না, পরীক্ষার প্রস্তুতি হয় না, সকালের নাশতা হয় না, ঠিকমতো নামাজ পড়া হয় না। অথচ তুমি মেধাবী, বুদ্ধিমান এবং বড় কিছু করার স্বপ্নে বিভোর। কিন্তু সব চিন্তা চেষ্টা ওই এক জায়গায় এসে মুখ থুবড়ে পড়ছে যে তুমি অলস। বাবা- মা, স্কুলের টিচার, বাসার টিচার সবারই তোমার প্রতি একটিই অভিযোগ- ও পড়লে ঠিকই পারে, কিন্তু পড়ে না। আর তোমার কথা হলো- আমি তো পড়তে চাই; কিন্তু হয়ে ওঠে না। শুধু ক্লান্ত লাগে।
এই ক্রমাগত ক্লান্তি লাগা হচ্ছে অলসতা। এটি মূলত দুর্বলতা। দুই ধরনের দুর্বলতা- শারীরিক এবং মানসিক।
শারীরিক আলস্য তৈরি হতে পারে কয়েকটি কারণে। যেমন-
জীবনযাপনের অনিয়ম-
১. অপর্যাপ্ত ঘুম- তোমাদের বয়সে ৭-৮ ঘণ্টা ঘুম দরকার। রাতে ঠিকমতো না ঘুমালে সকালে ঘুম থেকে উঠে সজীবতা অনুভব হয় না। তাই সারা সকাল ক্লান্ত লাগে, আলস্য লাগে।
২. খাদ্যাভ্যাসে অনিয়ম- পর্যাপ্ত পানি পান না করলে শরীরে সতেজতা আসে না। অধিক পরিমাণ চিনি বা কার্বোহাইড্রেট জাতীয় খাবার খেলে অবসাদগ্রস্ত লাগে। খাবারে ভিটামিন এবং আয়রনের অভাব হলে দুর্বল লাগে। প্রোটিন এবং এন্টি অক্সিডেন্ট সমৃদ্ধ খাবার কম খেলেও দুর্বলতা হয়।
৩. শারীরিক পরিশ্রম না করা- নিয়মিত ব্যায়াম বা শারীরিক পরিশ্রম না করলে শরীর কার্যক্ষম থাকে না।
৪. রুটিন বা শৃঙ্খলার অভাব- প্রতিদিনের কাজগুলোর নির্দিষ্ট সময় বণ্টন করা না থাকলে, অর্থাৎ এই কাজ এই সময়ে করতে হবে- এমন বাধ্যবাধকতা না থাকলে কাজে আলসেমি আসবেই।
অসুস্থতাজনিত আলস্য-
১. রক্তাল্পতা- রক্তে আয়রন বা হিমোগ্লোবিন কম থাকলে শরীরে অক্সিজেন সরবরাহ কমে যায়। তাই নিস্তেজ, অবসাদ লাগে।
২. থাইরয়েডজনিত- থাইরয়েড হরমোন কম নিঃসরণ হলেও শরীর দুর্বল থাকে।
৩. ডায়বেটিস- রক্তে গ্লুকোজের অস্বাভাবিক পরিমাণ উপস্থিতিও ক্লান্তি/অবসাদ তৈরি করে।
৪. ফ্লু বা ব্যাক্টেরিয়াজনিত অসুস্থতা।
মানসিক আলস্য-
মানসিক আলস্য হলো অদৃশ্য রোগ। সুস্থ শরীর, দুর্দান্ত খেলাধূলা করছো কিন্তু পড়ার বিষয় আসলেই- নাহ! এখন না, পরে। ভাল্লাগছে না, ইত্যাদি ভাবনা কাজ করে। এগুলো মানসিক আলস্য। এই আলস্য কয়েক কারণে হতে পারে-
১. না পারার ভয়- হতে পারে তুমি গণিতে কাঁচা। করতে গেলেই ভুল হয় আর স্যারের বকা খাও। সেজন্য হোমওয়ার্ক করতে গেলেই মনে হয় করলেই ভুল হবে, আবার বকা শুনতে হবে; থাক পরে করি কিংবা না করি। কারণ, না করে বকা খাওয়ার চাইতে ভুল করে বকা খাওয়া – প্রেস্টিজ ইস্যু! কি বলো? ভুল করার কারণে ক্লাসভর্তি ছাত্রের সামনে স্যার অপমান করলে অনেক কষ্ট লাগে না! এই ভয়েই অনেকে শুরু করতে আলসেমি করে।
২. মানসিক অবসাদ বা হতাশা- পারিবারিক দারিদ্র্য, দুঃখ, শোক বা অন্যান্য কারণে হতাশা থেকে কাজকর্ম বা পড়াশুনায় অনাগ্রহ /আলসেমি আসে।
৩. দিবাস্বপ্ন- অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসের ফলে অনেকে দিবাস্বপ্নে ভোগে। মনে করে আমি একবার পড়লেই পারবো, একবার করলেই পারবো। কিন্তু সেই একবারটাই করা হয় না, পড়া হয় না।
৪. ডিভাইস এবং বিনোদনে আসক্তি- গেমস, ফেসবুক, টিকটক ইত্যাদি আমাদের অধিক আনন্দ দেয়, উত্তেজিত করে। তাই বেশি সময় ধরে ডিভাইস ব্যবহার করলে স্নায়ু ক্লান্ত হয়। তখন পড়ালেখা বা অন্যান্য কাজে অলসতা লাগে, কারণ সেগুলো তুলনামূলকভাবে কঠিন এবং বোরিং বা বিরক্তিকর কাজ।
এছাড়া আলসেমির জন্য আমাদের দেশের নাতিশীতোষ্ণ আবহাওয়া এবং খাদ্যাভ্যাসও কিছুটা দায়ী। পেট ভরে ভাত খাওয়ার পর শরীর একটু শুতে চায়, এটাকে আমরা নাম দিয়েছি ভাতঘুম। আবার গুড়িগুড়ি বৃষ্টি শুরু হলে হালকা ঠান্ডা পরিবেশে কাঁথা গায়ে দিয়ে খানিক শুয়ে থাকতে ইচ্ছে হয়। তাই না! এগুলো সহজাত।
তবে আলসেমি যখন দীর্ঘস্থায়ী হয়ে যায়, যখন তোমার কাজকর্মে বাঁধার সৃষ্টি করে তখন সতর্ক হতে হবে। কারণ আলসেমির ফলে তোমার আত্মবিশ্বাস হ্রাস পেতে থাকবে। জীবনে বিশৃঙ্খলা আসতে থাকবে। একটি কথা আছে-
পরিশ্রমে ধন আনে, পুণ্যে আনে সুখ
আলস্যে দারিদ্র্য আনে, পাপে আনে দুখ।
রাসুল সা. নামাজে কয়েকটি বিষয় থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাইতেন, তার মধ্যে একটি হলো আলস্য। কারণ অলস হলে তুমি ঠিকমতো ইবাদাতও করতে পারবে না। তিনি বলেছেন- আল্লাহর কাছে দুর্বল মুমিনের তুলনায় সবল মুমিন অধিক প্রিয়।
এবার এসো, আলসেমি দূর করার উপায় নিয়ে আলোচনা করা যাক। প্রথমেই দেখতে হবে যে তুমি কি আসলেই অলস কি না? কারণ, হতে পারে লোকে তোমাকে অলস বলে কিন্তু তুমি আসলে কাজে ব্যস্ত, কিন্তু কাজের কাজ হচ্ছে না। অর্থাৎ তুমি অগ্রাধিকার সেট করতে পারছো না, যে কোন কাজ কতটা গুরুত্বপূর্ণ সে অনুযায়ী করা। সেক্ষেত্রে তোমার কাজগুলোকে লিখে, গুরুত্ব অনুযায়ী সাজিয়ে কোনটা কখন করবে তা ঠিক করবে।
যদি তোমার মনে হয়, যে তুমি সত্যিই অলস, তাহলে এর কারণ খুঁজে বের করতে হবে। তারপর সে অনুযায়ী সমাধান করতে হবে। যদি অসুস্থতাজনিত দুর্বলতা থাকে সেটির চিকিৎসা নিতে হবে।
অলসতা থেকে মুক্তির কিছু উপায় হলো-
১. কাজে শৃঙ্খলা আনয়ন- অর্থাৎ রুটিন করে কাজ করা। সেক্ষেত্রে কোন কাজ কতদিনে করা হবে, কীভাবে করা হবে তার একটা প্ল্যান মাথায় থাকে।
২. পর্যাপ্ত শারীরিক পরিশ্রম- পরিশ্রমের কাজু হোক, খেলাধূলা হোক আর ব্যায়াম হোক; প্রতিদিন শারীরিক পরিশ্রম করতে হবে।
৩. পর্যাপ্ত পানি পান- প্রতিদিন ২ লিটার পানি পান করা উচিত। যদি বেশি ঘাম হয় সেক্ষেত্রে পরিমাণ বাড়াতে হবে। পানি শরীরকে সতেজ করে, ক্লান্তি দূর করে।
৪. পর্যাপ্ত গভীর ঘুম- দিনের বেলা যতই ঘুমাও না কেন, তা রাতের ঘুমের বিকল্প হতে পারে না। কারণ অন্ধকার বা রাতেই ঘুম গভীর হয়, যা শরীরের সতেজতার জন্য অপরিহার্য। প্রতিদিন মোট ৭-৮ ঘণ্টা ঘুমাতে হবে।
৫. পুষ্টিকর খাবার- চিনি জাতীয় খাবার কমিয়ে, শাকসব্জি এবং প্রোটিন জাতীয় খাবার পর্যাপ্ত খেতে হবে।
৬. অল্প অল্প উন্নতি- জাপানি এ নিয়মকে বলে- কাইজেন। তুমি যে কাজে দুর্বল বা যে সাবজেক্টে দুর্বল সে সাবজেক্টে প্রতিদিন অল্প অল্প করে কাজ করলে দেখবে ভয় কেটে যাচ্ছে, কাজে সাফল্য আসছে।
৭. শুরুর ভয় কাটানো- ওয়ান মিনিট রুল এর মাধ্যমে কাজ শুরু করার ভয় কাটানো যায়। যে কাজটা শুরু করতে পারছো না এই ভয়ে যে ওটা অনেক কঠিন, অনেক দিন লাগবে করতে, কীভাবে শুরু করি; নিজেকে বলো যে- ওকে, বেশি না, এক মিনিট করবো কাজটা। কাজটা লিখে ফেলো কাগজে, ছোট ছোট অংশে ভাগ করে ফেলো। হতে পারে ত্রিশ ভাগ বা পঞ্চাশ ভাগ। দেখবে কাজটা ছোট মনে হবে। ওই এক মিনিট শুরু করলে দেখবে না করার জড়তাটা কেটে গেছে।
৮. প্রফুল্ল থাকা- আলসেমি কাটাতে মনকে ফুরফুরে রাখতে হবে। সেজন্য সারাক্ষণ মোবাইল বা কম্পিউটার নিয়ে পড়ে থাকা বাদ দিতে হবে। যেসব বন্ধুরা কর্মচঞ্চল তাদের সাথে মিশতে হবে। তাহলে কাজে উদ্দীপনা আসবে। একঘেয়েমিপূর্ণ কাজকে বিরতি দিয়ে বিশ্রাম নিয়ে করতে হবে।
৯. আলো-বাতাসপূর্ণ পরিচ্ছন্ন পরিবেশে থাকতে হবে। নিজেও পরিষ্কার থাকতে হবে। প্রতিদিন সকালে গোসল করে নিলেই শরীরের জড়তা অনেকটা কমে যায়।
১০. নিজেকে উৎসাহ দেয়া- যে কাজটি আলসেমির জন্য এতদিন করতে পারোনি, সে কাজটি শুরু করার আনন্দে নিজেকে বলো- ‘সাবাশ! তুমি পেরেছ! তুমি পারবে’।
একদিন রুটিন মানতে পারলে নিজেকে পুরস্কৃত করো। এভাবে তোমার মধ্যকার নেতিবাচকতা কমবে, আত্মবিশ্বাস বাড়তে থাকবে।
প্রকাশকাল: আগস্ট ২০২৪



