টাকার ফাঁদ

পর্ব : ৯২

0
0

তোমার বন্ধু নতুন একটা সানগ্লাস চোখে দিয়ে স্কুলে এসেছে। অথবা নতুন গেমিং গেজেট কিনেছে, ঘড়ি কিনেছে। তুমি জিজ্ঞেস করলে- কী রে টাকা পেলি কই? সে জবাব দিলো- নতুন অ্যাপ এসেছে। একাউন্ট খুললেই টাকা। তারপর সে কীভাবে সেখানে ‘উইন’ করেছে তা খুলে বললো। তুমিও স্বাভাবিকভাবেই আগ্রহী হয়ে উঠলে। বাহ! এতো খুব সহজ। বিনা পরিশ্রমে টাকা আর টাকা। তারপর তুমিও টাকা পাওয়া শুরু করলে। কিছুদিন পর দেখলে টাকা ‘পাওয়া’র বদলে টাকা ‘যাওয়া’ শুরু করেছে। তখন সেই টাকা উদ্ধারের জন্য তুমি বন্ধুদের কাছ থেকে টাকা ধার করে ইনভেস্ট করলে। পরে সেই টাকাও ‘উধাও’। তুমি হয়ে পড়লে ঋণগ্রস্ত। বাবা-মা’কে জানাওনি, এখন আর জানাতেও সাহস হচ্ছে না যে তুমি এত টাকা ঋণী হয়ে পড়েছো। কী করবে, কী করবে সেই চিন্তায় তুমি হতাশায় ভুগতে শুরু করলে আর তোমার পড়াশুনা ডুবতে শুরু করলো। এভাবেই একজন ‘টাকার ফাঁদে’ পড়ে। তারপর সেখান থেকে উদ্ধার পেতে তাকে অনেক অনেক ভুগতে হয়।
টাকা কামানোর এই ‘সহজ’ পথকে বলে জুয়া। জুয়া হলো বিনা পরিশ্রমে অর্থাৎ যেখানে শারিরীক, মানসিক পরিশ্রম কিংবা আর্থিক ক্ষতির আশংকা থাকে না, কেবল ‘লাভ’ পাওয়ার ‘লোভ’ দেখানো হয়। জুয়ার একদম প্রাথমিক পর্যায় হলো বাজি ধরা। যেমন- খেলাধূলায় আমরা বাজি ধরি- ‘তোর দল হারলে তুই কোক/বিরিয়ানি খাওয়াবি’। আমাদের কাছে এটাকে অপরাধ বলে মনে হয় না, মনে করি সামান্য কোক/বিরানিই তো! কিন্তু এটাই হলো জুয়ার সূচনা। এরপর এই কোক/বিরিয়ানির চ্যালেঞ্জ চলে যায় লাখ-লাখ, কোটি-কোটি টাকায়।
অতীতে জুয়া খেলার নানান পদ্ধতি ছিলো। তবে বর্তমানে অনলাইন জুয়ার বিস্তার সবকিছুকে ছাড়িয়ে গেছে। হাতে একটি স্মার্টফোন থাকলেই পেশাজীবি থেকে শুরু করে ব্যবসায়ী, ছাত্র-ছাত্রী এমনকি গ্রামের কৃষক-জেলে পর্যন্ত অনলাইন জুয়ায় জড়িয়ে পড়ছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হিসাবমতে, দেশে বর্তমানে প্রতিদিন সাতশো থেকে এক হাজার কোটি টাকা পর্যন্ত লেনদেন হচ্ছে অনলাইন জুয়ায়।
ব্যাপারটা খুব সহজ। সোশাল মিডিয়ায় স্ক্রল করতে করতে দেখলে তোমার পরিচিত কোনো তারকা বলছে এই ওয়েবসাইটে ঢুকলেই টাকা পাওয়া যায়। অথবা টাকা জমা করলেই কত গুন টাকা বেশি পাওয়া যাবে তার বিজ্ঞাপন দিচ্ছে। তাদের ভাষা কিন্তু খুব চটকদার, নজরকাড়া! ‘আজই জিতুন ৫০০০ টাকা’, ‘একাউন্ট খুললেই পাবেন ৫০০ টাকা’, ‘ফ্রি বোনাস জিতুন’, প্রথম বেটেই নিশ্চিত পুরস্কার’, ‘আজই তোমার বন্ধু জিতেছে’, কিংবা ‘এই সাইটের সাথে আছে বিখ্যাত অমুক’। তুমি ভাবলে – এ আর এমনকি! দু’শো/পাঁচশো টাকা তো দেয়াই যায়, যদি কয়েকগুন লাভ করতে পারি! এই যে ‘লোভ’ করলে, তুমি টাকার ফাঁদে পড়ে গেলে। প্রথম প্রথম হাজার হাজার টাকা লাভ হবে, এর পর লাখ লাখ টাকা লস হবে।
অনলাইন বেটিং সাইট, অ্যাপ কিংবা গেমিং সাইটের মাধ্যমে নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছে হাজার হাজার মানুষ। এই আসক্তি একদিনে হয় না। মাদকাসক্তি যেমন ধূমপান দিয়ে শুরু হয়ে নানা রকম নেশাদ্রব্যে গিয়ে ঠেকে, অনলাইন জুয়ার আসক্তিও এভাবে পাঁচশো, একহাজার থেকে শুরু করে লাখ, কোটিতে গিয়ে ঠেকে।

অনলাইন জুয়ার কারণে কী ক্ষতি হয়? প্রথমত, অনলাইন জুয়া একটি ভয়ানক আসক্তি। মোবাইলে চার্জ আর ইন্টারনেট থাকলে দিনে-রাতে যেকোনো সময় বেটিং, গেমিং করা যায়। তাছাড়া অ্যাপ, ওয়েবসাইটগুলো খুব নজরকাড়া গ্রাফিক্স, মিউজিক দিয়ে তৈরি করা, যাতে দীর্ঘসময় ধরে মানুষকে খেলায় আটকে রাখা যায়। তাই খেলা শুরু করলে পয়েন্ট আর পয়েন্ট কামানোর নেশায় ধরে যায়। তখন দিন-রাতের খেয়াল থাকে না। মাদকাসক্তির মতোই আসক্তিতে আটকে যায় মানুষ।
দ্বিতীয়ত, এর ফলে শারিরীক ও মানসিক ক্ষতি হয়। ঘুম না হওয়ার ফলে মেজাজ খিটমিটে হয়ে যায়। ক্ষুধামন্দা দেখা দেয়। শরীর দুর্বল হয়ে পড়ে। মনোযোগ কমে যায়, মানসিক অস্থিরতা বাড়ে। দিনের অন্যান্য স্বাভাবিক কাজগুলো করার আগ্রহ হারিয়ে ফেলে।
তৃতীয়ত, ধীরে ধীরে আর্থিক ক্ষতির রাস্তা তৈরী হয়। নিজের টাকা ফুরিয়ে গেলে তখন পরিবার-বন্ধুবান্ধব থেকে ঋণ নেয়া শুরু হয়। তারপর অন্য ঋণদাতা প্রতিষ্ঠান থেকে চড়া সুদে ঋণ নেয়। এই ফাঁদ অতল গহ্বরের মত, বেশিরভাগ মানুষ এখান থেকে বের হতে পারে না।
চতুর্থত, ক্রমাগত আর্থিক ক্ষতি হতাশা এবং মাদকাসক্তির দিকে ঠেলে দেয়। জুয়ার টাকা যোগাড় করতে না পেরে পরিবারের সদস্যদের উপর মারধোর এমনকি হত্যা ও আত্মহত্যার ঘটনাও ঘটেছে। জুয়া এক সর্বনাশা নেশা।
পঞ্চমত, সামাজিক অবক্ষয় ঘটে। জুয়ার কারণে সামাজিক সম্পর্কে ভাঙন ঘটে। জুয়ায় ঋণগ্রস্ত হতে হতে নিজের ভিটেমাটি পর্যন্ত বিক্রি করে দিয়ে এলাকাছাড়া হয় অনেক মানুষ। ঋণ করতে করতে তখন কারোও কাছে মুখ দেখাতে পারে না। পরিণামে চুরি, ছিনতাই এর দিকে ধাবিত হয়।
এতকিছু তোমাকে বলছি কারণ এখন অল্প বয়সেই অনেকে এই ফাঁদে জড়িয়ে যাচ্ছে। কোনো জুয়াড়ির হঠাৎ উন্নতি, বিলাসবহুল জীবনযাপন, দামি মোটর সাইকেল, গাড়ি, বাড়ি দেখে আকর্ষিত হওয়াটাই স্বাভাবিক। কিন্তু এসবের লোভে পড়া যাবে না কোনোভাবেই। কারণ এগুলো অবৈধ উপার্জন। আর অবৈধ বা হারাম উপার্জন কখনোই দীর্ঘস্থায়ী হয় না। কথায় আছে- টাকা যেভাবে আসে, সেভাবেই চলে যায়। হুড়হুড় করে দেখলে অ্যাকাউন্টে টাকা জমছে, পরে দেখবে হুড়হুড় করে অ্যাকাউন্ট খালি হয়ে যাচ্ছে।
তোমার বন্ধুবান্ধব, পাড়াপ্রতিবেশী, আত্মীয়-স্বজনকেও জুয়ার ব্যাপারে হুঁশিয়ার করবে। কাউকে জুয়ায় জড়াতে দেখলে তার পরিবারকে জানাবে, যেন তাকে উদ্ধার করা যায়। কারণ সরকারী নতুন আইন অনুযায়ী অনলাইন জুয়ার শাস্তি হিসেবে পাঁচ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড এবং এক কোটি টাকা জরিমানার বিধান করা হয়েছে। আর কেউ যদি বেটিং সাইট পরিচালনা করে তাহলে তার সাত বছর এবং পাঁচ কোটি টাকা পর্যন্ত জরিমানা হতে পারে। সুতরাং সাবধান। নিজে জুয়া থেকে বাঁচতে হবে, বন্ধুবান্ধবকেও বাঁচাতে হবে।
শুরুতেই বলেছি, জুয়ার ফাঁদ খুব আকর্ষণীয় এবং প্রথম ধাপটি অতি সামান্য। খেলাচ্ছলে কিংবা মজা করে হলেও যদি কখনো জড়িয়ে যাও তাহলে বের হয়ে আসা কঠিন। তাই সদা সতর্ক থাকতে হবে। কোনো বন্ধু তোমাকে প্ররোচিত করতে চাইলে দৃঢ়ভাবে ‘না’ বলবে। জুয়ায় আসক্ত সহপাঠী বা বন্ধুদের সাথে মিশবে না। যেখানে বন্ধুরা বসে একসাথে এ ধরনের গেমিং খেলে সেখানে সময় দিবে না।

বিনা পরিশ্রমে অর্থ উপার্জনের ধান্দা বা শর্টকাটে বড়লোক হওয়ার লোভে টাকার ফাঁদে পা দেয়া থেকে সচেতনভাবে বেঁচে থাকতে হবে।

প্রকাশকাল: আগস্ট ২০২৬