ক্রমাগত সাফল্যের পথ

0
6

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপান পরাজিত হয়। হিরোশিমা নাগাসাকি দুটো শহর ধ্বংস হয়ে যায় পারমাণবিক বোমার আঘাতে। যুদ্ধ-পর্যদুস্ত জাপান ঘুরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয়। জাপানকে কারিগরি সহযোগিতা দেয়ার জন্য এডওয়ার্ড ডেমিং নামের যুক্তরাষ্ট্রের একজন বিশেষজ্ঞ জাপানে যান। জাপানীরা তাদের যন্ত্রপাতি তৈরির শিল্পকারখানাগুলোকে লাভবান অবস্থায় নিয়ে যাবার জন্য চেষ্টা করছিল। এডওয়ার্ড ডেমিং কারখানার সাথে সংশ্লিষ্টদের বলেন- প্রতিদিন নিজেকে জিজ্ঞেস করবে যে -এমন কোনো একটা ছোট্ট কাজ আমি করতে পারি যেটা কারখানার উন্নতি করতে পারে? অর্থাৎ প্রতিদিনের ছোট ছোট পদক্ষেপ বড় সাফল্য আনতে পারে। তার এই পদ্ধতিকে জাপানীরা নাম দিয়েছে কাইজেন। সাফল্য লাভের এই সূত্র অনুসরণ করে জাপানীরা আজ শিল্প সমৃদ্ধ জাতিতে পরিণত হয়েছে। জাপানী শব্দ ‘কাইজেন’ এর দুটি অংশ। ‘কাই’ অর্থ হলো ‘পরিবর্তন’, ‘জেন’ অর্থ ‘ভালোর জন্য’। কথা হলো কাইজেনে এমন কী জাদুকরি রহস্য আছে যা টেকসই উন্নয়নের জন্য ভূমিকা রাখতে পারে? কাইজেন সূত্রের মূলনীতিগুলো প্রথমে লিপিবদ্ধ করেন মাসাকি ইমাই, যিনি কাইজেন ইন্সটিটিউট এর প্রতিষ্ঠাতা। তার মতে- উন্নতি হতে হবে-

প্রতিদিন, প্রত্যেকের এবং সর্বক্ষেত্রে।

ছোট ছোট পরিবর্তন কীভাবে বৃহৎ সাফল্য আনতে পারে তা আমাদের একটি কবিতায় আছে –

ছোট ছোট বালুকণা, বিন্দু বিন্দু জল
গড়ে তোলে মহাদেশ, সাগর অতল।
মুহূর্ত নিমেষকাল তুচ্ছ পরিমাণ
গড়ে যুগ যুগান্তর- অনন্ত মহান।

এবার এসো ভেবে দেখি যে আসলেই ছোট ছোট কাজে বিরাট সাফল্য আসে কিনা? ধরো, তোমাকে একটা ৩০০ পৃষ্ঠার বই পড়তে দেয়া হলো। তুমি হাতে নিয়েই ভাবলে- ওরে বাবা এত মোটা বই কি পড়ে শেষ করা যাবে! এবার চিন্তাটাকে ভিন্নভাবে করো- আচ্ছা এত বড় বই একবারে পড়তে পারবো না, থাক, ১০পৃষ্ঠা বই পড়বো প্রতিদিন। পড়া শুরু করলে দেখবে যে কোনোদিন ২০ পৃষ্ঠা, কোনোদিন ৪০ পৃষ্ঠা পর্যন্ত পড়ে ফেলেছো। বইটা পড়তে তখন ১ মাসও লাগবে না।
অথবা ধরা যাক, তোমার হাতের লেখা খুব খারাপ। হাতের লেখা চেঞ্জ করা কি তোমার দ্বারা সম্ভব? মন বলছে-নাহ! অসম্ভব! ঠিক আছে, তুমি ঠিক করে ফেলো যে প্রতিদিন ১টা করে বর্ণ সুন্দর করে লিখবে। দুই থেকে তিন মাসের মধ্যে তোমার হাতের লেখা পুরো বদলে যাবে। কিংবা যদি হাতের লেখা খুব স্লো হয়, তাহলে ঘড়ি ধরে লিখতে বসো। হতে পারে তুমি মিনিটে ১৫ শব্দ লিখতে পারো। সিদ্ধান্ত নাও যে তুমি সপ্তাহের চেষ্টায় ১মিনিটে ১টি করে বেশি শব্দ লেখার চেষ্টা করবে। তাহলে দেখবে ৩ মাসের মধ্যে তোমার হাতের লেখা দ্রুত হয়ে যাবে।
কাইজেন কাঠামোতে ৫ টি ধাপ রয়েছে। এদেরকে ৫ঝ বলা হয়। যেমন-

১. Sorting বা বাছাই করা:
তোমাকে খুুঁজে বের করতে হবে তোমার কী কী সমস্যা আছে। কোন কোন প্রতিবন্ধকতা তোমাকে সামনে এগুতে দিচ্ছে না। কোন সিস্টেমে কাজ করার কারণে তোমার প্রত্যাশিত ফলাফল আসছে না। কিংবা সিস্টেমের কী কী দুর্বল দিক আছে। তোমার কোন অভ্যাস ক্ষতিকর? কোন অভ্যাস আয়ত্ব করতে না পারায় তুমি উন্নতি করতে পারছো না, ইত্যাদি।

২. Set Up an Order বা ক্রমবিন্যাস করা:
এবার সমস্যাগুলোকে সাজাতে হবে গুরুত্ব অনুযায়ী। কোন কাজটা এক্ষুণি শুরু করতে হবে আর কোন কাজটা পরে করলে হবে সে অনুযায়ী সাজিয়ে নিতে হবে। সব কাজ একসাথে মাথায় নেয়া কিংবা একসাথেই শুরু করতে যাওয়াটা বিরাট বোঝা মনে হয়। সেক্ষেত্রে একটি একটি করে করা ,সেটি যতই ছোট হোক।

৩. Shine বা ঝকঝকে করা:
কাইজেনে পরিবেশকে পরিষ্কার রাখার খুব গুরুত্ব দেয়া হয়। তুমি যেখানে থাকো কিংবা কাজ করো, সেই জায়গাটাকে ঝকঝকে তকতকে রাখতে হবে। সুন্দরভাবে গোছানো রাখতে হবে। শুধুমাত্র এই পরিচ্ছন্ন পরিবেশ কাজের মনোযোগ এবং সাফল্য বাড়িয়ে দিতে পারে অনেক গুণ।

৪. Standardize বা মান নির্ধারণ করা:
তোমার কাজের প্রক্রিয়ার মধ্যে যে প্রক্রিয়াটি সবচেয়ে কার্যকর বিবেচিত হয়েছে সেটিকে আদর্শ ধরে নিতে হবে। অথবা যদি তোমার কোনো বন্ধুবান্ধব কোনো প্রক্রিয়ায় সাফল্য পেয়ে থাকে তার সেই প্রক্রিয়াটি প্র্যাকটিস করে দেখতে হবে যে সেটি তোমার ক্ষেত্রেও সাফল্য আনে কি না, তাহলে সেটিকেই মান হিসেবে ধরতে হবে।

৫. Sustain বা ধরে রাখা:
একবার সফলতা আসলে সেটিকে ধরে রাখা খুব জরুরি। কাইজেনের মূলনীতি হলো ধারাবাহিকতা। কাইজেনে সাফল্যকে সিঁড়ি বিবেচনা করা হয়। এই সিঁড়ির ধাপ চলতেই থাকে। ক্রমাগত সিঁড়ি বেয়ে বেয়ে আমরা সাফল্যের পাহাড় চূড়ায় পৌঁছে যেতে পারি।
কাইজেন সাফল্যের পেছনে নিয়মিত মূল্যায়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অর্থাৎ তুমি যে প্রতিদিনের লক্ষ্য ঠিক করেছ, তা প্রতিদিন অর্জন করতে পারছো কি না, সেটি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হবে। এক্ষেত্রে ডেইলি রুটিন কার্যকরী ভূমিকা রাখতে পারে। প্রতিদিনের কাজগুলোর একটা চেকলিস্ট থাকলে কোনো আইটেম মিস হবে না। রাতে চেকলিস্ট দেখলে কোনো কাজ বাদ পড়ে গেলো কি না সেটা নির্ণয় করা সহজ হবে। কাইজেনে ছোট ছোট কাজ বাছাই করার পেছনে একটা মনস্তাত্ত্বিক কৌশল আছে। মনে আছে ? ছোটবেলায় আম্মু খেতে বসিয়ে কিভাবে কৌশলে খাওয়াতো? ভাতগুলোকে ছোট ছোট লোকমায় ভাগ করে বলতো এটা দাদার ভাগ, এটা চাচার ভাগ, এটা ফুপুর ভাগ ইত্যাদি।

তখন প্লেটের খাবার অনেক মনে হতো না, মনে হতো যে এই যে একটা ছোট লোকমা, এটা তো খেয়েই ফেলা যায়! একটা একটা করে খেতে খেতে দেখা যেত, প্লেটের খাবার শেষ। বাস্তব জীবনেও আমাদের মন বড় কাজ দেখলে প্রতিবাদ শুরু করে। কারণ সে তার নিজস্ব কমফোর্ট জোন বা আরাম বলয়ে থাকতে চায়। যখন আমরা ছোট ছোট করে কাজকে ভাগ করে প্রতিদিন করতে থাকি, তখন কমফোর্ট জোন খুব একটা ক্ষতিগ্রস্ত হয় না, বলে মন সেরকম প্রতিবাদী হয় না। কাজ করতে আগ্রহী হয়। ফলে মনোযোগ আসে কাজে, সাফল্য আসে ধীরে ধীরে।
রাতারাতি বদলে যাওয়া বা সাফল্যের আশা করা একটি দিবাস্বপ্ন। দীর্ঘমেয়াদে সাফল্যের পথে হাঁটার জন্য হাঁটি হাঁটি পা পা করে ছোট ছোট সাফল্য আনতে হবে। তাহলেই সাফল্য ধরে রাখা যায়, বৃহৎ সাফল্য পাওয়া যায়।

প্রকাশকাল: অক্টোবর ২০২৪