বন্ধুরা, তোমরা নিশ্চয় জানো, নেহারি আমাদের দেশের খুবই জনপ্রিয় একটি খাবার। খাবারটি অষ্টাদশ শতাব্দীতে ভারতীয় উপমহাদেশে মুঘল সাম্রাজ্যের মাধ্যমে বিস্তার লাভ করে। নেহারি শব্দটি আরবি ‘নাহার’ শব্দ থেকে এসেছে, যার অর্থ হলো ‘ভোর’। মুঘল আমলে মুসলিম নওয়াবরা ফজরের নামাজ পড়ার পর ভোরবেলা নেহারি দিয়ে নাশতা করতেন। মূলত গরু, ভেড়া কিংবা ছাগলের পা প্রক্রিয়াজাত করে বিভিন্ন ধরনের মসলার সমন্বয়ে খাবারটি রান্না করা হয়। কারণ বহু আগে থেকে আমাদের দেশের মানুষ বিশ্বাস করে যে, নেহারি খেলে দেহে ক্যালসিয়ামের মাত্রা বৃদ্ধি পায়। বস্তুত এ ধরনের বিশ্বাসের জন্যই নেহারি এত বেশি জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।
নেহারি কি আসলেই ক্যালসিয়ামের উৎস? আমাদের দেশে নেহারি তৈরির অন্যতম উপকরণ গরুর পা। গরুর পায়ের যে হাড় তার মাঝখানে নরম তুলতুলে স্পঞ্জের মতো যে অংশ বিদ্যমান থাকে সেটাকে বোনম্যারো বা অস্থিমজ্জা বলা হয়। মূলত গরুর অস্থিমজ্জা খাওয়ার জন্যই নেহারি রান্না করা হয়। গরুর অস্থিমজ্জা সাধারণত দুই ধরনের হয়ে থাকে একটি লাল অস্থিমজ্জা (রেড বোনম্যারো) আরেকটি হলুদ অস্থিমজ্জা (ইয়োলো বোনম্যারো)। আমাদের দেশে যেসব গরুর পায়ের হাড় সংগ্রহ করে নেহারি তৈরি করা হয় সেগুলো সাধারণত পূর্ণবয়স্ক হয়ে থাকে। আর পূর্ণবয়স্ক গরুর পায়ের হাড়ে সাধারণত হলুদ অস্থিমজ্জা থাকে এবং লাল অস্থিমজ্জার পরিমাণ খুবই কম থাকে।
হলুদ অস্থিমজ্জার মোট ওজনের অন্তত ৮০ শতাংশ অ্যাডিপোজ টিস্যু বা কোষকলা দিয়ে পরিপূর্ণ থাকে। এই টিস্যুতে রয়েছে ফ্যাট সেল বা অ্যাডিপোসাইটস যা সাধারণত ট্রাইগ্লিসারাইড হিসেবে শক্তি সঞ্চয় করে। মূলত এই কোষগুলোই অস্থিমজ্জাকে হলুদ রঙে রঞ্জিত করে। এছাড়া এই টিস্যুতে রয়েছে ওমেগা-৬ ফ্যাটি অ্যাসিড (যেমন কনজুগেটেড লিনোলেয়িক অ্যাসিড) ও মনোআনসেচুরেটেড ফ্যাটি অ্যাসিড (যেমন অলেয়িক অ্যাসিড)। স্নেহে দ্রবণীয় ভিটামিন যেমন এ, ডি, ই, কে ইত্যাদি সঞ্চিত থাকে ও শোষিত হয় এই কোষের মাধ্যমে।
গরুর অস্থিমজ্জার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো কোলাজেন। কোলাজেন হলো এক ধরনের প্রোটিন বা আমিষ। গরুর অস্থিমজ্জায় সাধারণত টাইপ-১ এবং টাইপ-২ কোলাজেন পাওয়া যায়। রান্না করার পর সাধারণত কোলাজেন জিলাটিনে রূপান্তরিত হয়। জিলাটিনের মধ্যে বিভিন্ন ধরনের গুরুত্বপূর্ণ অ্যামাইনো অ্যাসিড থাকে যেমন গ্লাইসিন, প্রোলিন, হাইড্রোক্সিপ্রোলিন ও গ্লুটামিক এসিড ইত্যাদি।
গরুর অস্থিমজ্জার মধ্যে আরো রয়েছে আয়রন, ম্যাগনেসিয়াম, ক্যালসিয়াম, জিংক, গ্লুকোসামিন ও কনড্রয়টিন সালফেট। মজার ব্যাপার হলো গরুর অস্থিমজ্জায় ক্যালসিয়ামের মাত্রা খুবই কম। প্রতি ১০০ গ্রাম গরুর অস্থিমজ্জায় মাত্র ১৭ মিলিগ্রাম ক্যালসিয়াম পাওয়া যায় যা অন্যান্য ক্যালসিয়াম সমৃদ্ধ খাবারের তুলনায় খুবই কম। সুতরাং এটি থেকে স্পষ্ট প্রমাণিত হয় যে নেহারি খেলে দেহে ক্যালসিয়ামের মাত্রা বৃদ্ধি পায় না বরং কিছু উপকারী স্নেহ (লিপিড) ও কোলাজেন এর মাত্রা বৃদ্ধি পায় যা আমাদের সুস্থ থাকতে সহায়তা করে।
তাই আমাদের দেশে প্রচলিত যে কুসংস্কারটি রয়েছে তা ভুল। সুতরাং নেহারি খাওয়ার ক্ষেত্রে আমাদের উচিত প্রয়োজনীয় পরিমাণে গ্রহণ করা।
বন্ধুরা, নেহারি খাওয়ায় রয়েছে অনেক উপকারিতা। যেমন এতে শরীরের ক্যালসিয়াম বৃদ্ধি হয়। শরীরে শক্তি সঞ্চার হয়। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি পায় এবং শরীরের হাড় মজবুত হয়। এ ছাড়াও নেহারি খাওয়ায় আরো অনেক উপকারিতা রয়েছে। নেহারি আমাদের অন্ত্রের সমস্যা নিরসনে সাহায্য করে। অন্ত্রের ছিদ্রগুলো মেরামতে সাহায্য করে নেহারি স্যুপের জেলাটিন। নেহারি ক্যান্সারের মতো ভয়াবহ রোগ প্রতিহত করে। জয়েন্টের ব্যথা দূর করতেও সাহায্য করে নেহারি। নেহারি খেলে ঘুমের সমস্যায় উন্নতি ঘটে। নেহারিতে গ্লাইসিন নামক যে উপাদান থাকে তা ঘুমের জন্য উপকারী। তাই শান্তিতে ঘুমাতে চাইলে সপ্তাহে দুই/তিন দিন নেহারি খাওয়া যেতে পারে।
নেহারি সেবনে কিছু অপকারিতাও রয়েছে। কেননা গরু, ছাগল বা ভেড়ার অস্থিমজ্জায় অতিশয় উচ্চ পরিমাণে খারাপ কোলেস্টেরল (উচ্চ ঘনত্বের লিপোপ্রোটিন বা এলডিএল) থাকে। যা গোশতের চাইতে অনেক বেশি। মজ্জা খেলে অবশ্যই বিপুল পরিমাণে বেড়ে যায় দেহের ট্রাইগ্লিসারাইড। সেই কোলেস্টেরল আর ট্রাইগ্লিসারাইড দ্রুত জমা হতে থাকে রক্তনালীতে, বন্ধ হয়ে যেতে থাকে হৃৎপিণ্ডে রক্ত সঞ্চালনের পথ। রক্তের অভাবে নেতিয়ে পড়ে হৃৎযন্ত্র, শরীরের কোথাও যথেষ্ট রক্ত পাম্প করে পাঠাতে পারে না। অল্পেই হাঁপ ধরে যায়, বুক ধড়ফড় করে। নেহারি অতি উচ্চ ক্যালোরির খাবার। তাই, হৃদরোগী, হাই কোলেস্টেরলের রোগী, উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিসের রোগী এবং পাশাপাশি কিডনি রোগীদের নেহারি না খাওয়ায় ভালো।
আমেরিকায় যেসব খাবারকে জাংক ফুড বা খাদ্য আবর্জনা বলে নেহারি সেগুলোরই গোত্রভুক্ত। এই উচ্চ ক্যালোরি আসে মজ্জায় লুকিয়ে থাকা বিপুল পরিমাণ আনস্যাচুরেটেড চর্বি থেকে।
প্রকাশকাল: অক্টোবর ২০২৪


