শীতের আগমনী বার্তা নিয়ে ধীর পায়ে প্রকৃতিতে আসে হেমন্ত। তাই হেমন্তের বিশেষ কদর আছে। হেমন্তের একটি প্রধান দিক হচ্ছে নবান্ন উৎসব। গ্রামে গ্রামে ক্ষেতে ক্ষেতে চলে ধান কাটা ও মাড়াইয়ের উৎসব। নতুন ধানের মম গন্ধ। হেমন্তে বাংলার প্রকৃতি ও জীবন নতুন সাজে হাজির হয়। ঋতু বদলের সঙ্গে সঙ্গে বদলায় বাংলার প্রকৃতি ও জীবন।
কার্তিক ও অগ্রহায়ণ এই দুই মাস নিয়ে হেমন্তকাল। ১৭ অক্টোবর পহেলা কার্তিক। যদিও এখন অনেকেই বাংলা মাসের খোঁজ রাখে না। এক অপরূপ রূপের ঋতু হেমন্ত। যে ঋতুর সঙ্গে এ সব মানুষের হাসি-কান্না জড়িয়ে আছে। হেমন্ত হলো ষড়ঋতুর চতুর্থ ঋতু, কার্তিক ও অগ্রহায়ণ মাস নিয়ে গঠিত। কীভাবে নাম দুটি এলো জেনে নেয়া যাক। কৃত্তিকা ও আর্দ্রা এ দুটি তারার নাম অনুসারে নাম রাখা হয়েছে কার্তিক ও অগ্রহায়ণ মাসের। ‘মরা’ কার্তিকের পর আসে সর্বজনীন লৌকিক উৎসব নবান্ন। বাংলা ক্যালেন্ডারে অগ্রহায়ণ মাস এক সময়ে বছরের প্রথম মাস ছিল। এর অর্থ বছরের শুরু। ‘অগ্র’ মানে শুরু আর ‘হায়ু’ মানে বছর। মোগল বাদশাহ আকবর প্রচলিত বাংলা সাল সংস্কার করে সৌর বাংলা সন চালু করলে বৈশাখ এই সনের শুরুর মাস হয়। যা এখন চালু আছে। এর আগে বাদশাহ আকবরই অগ্রহায়ণ মাসকে বছরের প্রথম মাস বা খাজনা তোলার মাস ঘোষণা করেছিলেন। সে সময় বাংলায় বছর শুরু হতো হেমন্ত দিয়ে। কারণ, ধান উৎপাদনের ঋতু হলো এই হেমন্ত। বর্ষার শেষ দিকে বোনা আমন-আউশ শরতে বেড়ে ওঠে। আর হেমন্তের প্রথম মাস কার্তিকে ধান পরিপক্ক হয়। অগ্রহায়ণে কাটা হয়।
এ ঋতুর রয়েছে অনন্য কিছু বৈশিষ্ট্য। সকালের শিশির ভেজা ঘাস আর হালকা কুয়াশায় প্রকৃতিতে বেজে ওঠে শীতের আগমনী বার্তা। মাঠের পাকা সোনালি ধান, কৃষকের ধান ঘরে তোলার দৃশ্য, কৃষক-কৃষাণির আনন্দ সবই হেমন্তের রূপের অনুষঙ্গ। হেমন্ত ঋতুতে চলে শীত-গরমের খেলা। হেমন্তের শুরুর দিকে এক অনুভূতি আর শেষ হেমন্তে অন্য অনুভূতি। ভোরের আকাশে হালকা কুয়াশা, শিশিরে ভেজা মাঠ-ঘাট তারপর ক্রমেই ধরণি উত্তপ্ত হতে থাকে। সৌন্দর্য এবং বৈশিষ্ট্য লালিমায় বাংলার ঋতুর রানী হেমন্ত।
কৃষিপ্রধান বাংলাদেশে এ ঋতুতেই প্রধান ফসল ধান ঘরে ওঠে। সারা বছরের মহাজনের কাছ থেকে ধার নেওয়া পাওনা পরিশোধের সুযোগ হয় ফসল ঘরে ওঠার পরেই। সারা বছরের মুখের অন্নের জোগানও আসে এ সময়। হেমন্ত তাই সুখ-সমৃদ্ধির কাল। হেমন্ত এলে পাল্টে যায় প্রকৃতি ও মানুষ। গ্রামের পরিবেশে আনন্দ বিরাজ করে। গ্রাম্য মেলা, ঘরে ঘরে পিঠা-পায়েস বানানোর আয়োজন, ঢেঁকির শব্দ সব মিলিয়ে এক অন্যরকম প্রকৃতিকে বরণ করে নেয় হেমন্তে।
হেমন্তের ফসল কাটাকে কেন্দ্র করেই নবান্ন উৎসবের সূচনা হয়। নবান্ন অর্থ নতুন অন্ন। বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী শস্যোৎসব এটি। নবান্ন হলো নতুন আমন ধান কাটার পর সেই ধান থেকে প্রস্তুত চালের প্রথম রান্না উপলক্ষে আয়োজিত উৎসব, যা সাধারণত অগ্রহায়ণ মাসে আমন ধান পাকার পর এই উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশের কোনো কোনো অঞ্চলে ফসল তোলার পরদিনই নতুন ধানের নতুন চালে ফিরনি-পায়েশ অথবা ক্ষীর তৈরি করে আত্মীয়স্বজন ও পাড়া-প্রতিবেশীর ঘরে ঘরে বিতরণ করা হয়। নবান্নে জামাইকে নিমন্ত্রণ করা হয়, মেয়েকেও বাপের বাড়িতে ‘নাইওর’ আনা হয়। ঘরে নতুন ধান আসাকে উপলক্ষ করে গ্রামে গ্রামে হয় এই নবান্ন উৎসব। নতুন চাল দিয়ে বানানো হয় চিতই পিঠা, কুলি পিঠা, পাটিসাপটাসহ আরো অনেক পিঠা। ফলে পথ-ঘাট গন্ধরাজের সুঘ্রাণের সাথে পিঠা-পুলির মৌ মৌ গন্ধে মোহিত হয়। প্রত্যেক ঋতুর মতো হেমন্তেরও আছে এক আলাদা রূপ, আলাদা বৈশিষ্ট্য। হেমন্তের সকালে ঝিরঝিরে হিমেল হাওয়ায় ধান ক্ষেতের আইল ধরে হাঁটতেই মন ফুরফুরে হয়ে ওঠে। ধানপাতার ওপর পড়া শিশির যেন মুক্তাদানা। শহুরে জীবনে অবশ্য হেমন্ত কী, বোঝাটা দুষ্কর। তবুও হেমন্ত আসে। আসে অনেক উৎসবের উপলক্ষ হয়ে।
নবান্নে নানা ধরনের দেশীয় নৃত্য, গান, বাজনাসহ আবহমান বাংলার সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পালিত হয়। লাঠিখেলা, বাউলগান, নাগরদোলা, বাঁশি, শখের চুড়ি, খই, মোয়ার পসরা বসে গ্রাম্য মেলায়। ইউরোপে ১লা সেপ্টেম্বর থেকে অটাম বা হেমন্তের শুরু। সেখানে একে বলা হয় বৈচিত্র্যময় রঙ ও পাতা ঝরার ঋতু। ঝাউ গাছগুলো ছাড়া সব গাছেরই পাতা এ সময় ঝরে যেতে শুরু করে এবং শীতের আগমনের আগেই সব বৃক্ষই ন্যাড়া হয়ে যায়।
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ‘অঘ্রাণের সওগাত’ কবিতায় নবান্নের চিত্রটি বেশ উপভোগ্য। যেমন-
মাঠের সাগরে জোয়ারের পরে লেগেছে ভাটির টান।
রাখাল ছেলের বিদায়-বাঁশিতে ঝুরিছে আমন ধান!
কৃষক-কণ্ঠে ভাটিয়ালি সুর
রোয়ে রোয়ে মরে বিদায়-বিধুর!
হেমন্তের কবি হিসেবে খ্যাত কবি জীবনানন্দের কবিতা এ রকম –
সেদিনো এমনি গেছে ঘরে
প্রথম ফসল;
মাঠে-মাঠে ঝরে এই শিশিরের সুর,
কার্তিক কি অঘ্রাণের রাত্রির দুপুর!
হলুদ পাতার ভিড়ে ব’সে,
শিশিরে পালক ঘ’ষে-ঘ’ষে,
পাখার ছায়ায় শাখা ঢেকে,
ঘুম আর ঘুমন্তের ছবি দেখে-দেখে,
মেঠো চাঁদ আর মেঠো তারাদের সাথে
জেগেছিল অঘ্রাণের রাতে
যা পল্লীকবি জসীমউদ্দীন তাঁর ‘ধানের কাব্য’ কবিতায় সুন্দর করে উল্লেখ করেছেন—
সারা মাঠে ধান
পথে ঘাটে ধান
উঠানেতে ছড়াছড়ি
সারা গাঁও ভরি
চলেছে যে কবি ধানের কাব্য পড়ি।
এ ঋতুতে ফোটে অনেক ফুল। তার মধ্যে আছে গন্ধরাজ, মল্লিকা, শিউলি, কামিনী, হিমঝুরি, দেব কাঞ্চন, রাজ অশোক, ছাতিম, বকফুল। গন্ধরাজ ফুলের কথা একটু বলা যাক। এই সময়ে গন্ধরাজ ফুলগাছ সাদা সাদা ফুলে ছেয়ে যায়। এর সুগন্ধ সবারই মন কাড়ে। কিশোরীরা খোপায় গোঁজে এই গন্ধরাজ ফুল। এই গাছ বাংলাদেশ ও ভারতে প্রচুর পরিমাণে দেখা যায়। শহরে এবং গ্রামে সবখানেই মেলে এই গন্ধরাজ ফুলগাছ। সবুজ পাতা বিশিষ্ট এই গাছ ১৫ মিটার পর্যন্ত উঁচু হয়ে থাকে। ফুলের সুগন্ধের কারণে এর নাম দেয়া হয়েছে গন্ধরাজ। গন্ধরাজের বৈজ্ঞানিক নাম গার্ডেনিয়া জ্যাসমিনোডেস (Gardenia jasminoides). এই ফুলটির ইংরেজি নাম গার্ডেনিয়া ও কেপ জ্যাসমিন। এটি জেন্টিয়ানালেস বর্গ বা অর্ডারের (Gentianales) , রুবিয়াসি (Rubiaceae) পরিবারের অন্তর্ভুক্ত। এর জেনাস বা গণ হচ্ছে গার্ডেনিয়া। আর স্পেসিজ বা প্রজাতি হলো জি. জ্যাসমিনোডেস। এগুলো বোটানি বা উদ্ভিদবিদ্যায় বর্ণিত টার্ম বা শব্দাবলি। যারা এসব বিষয়ে উচ্চতর পড়াশোনা করবে তারা আরো বেশি করে জানতে পারবে।
হেমন্তে সকালের শিশির ভেজা ঘাস আর হালকা কুয়াশায় প্রস্তুত হয় প্রকৃতি, খেজুরের রস সংগ্রহে প্রস্তুত হতে দেখা যায় গাছিদের। তোলা শুরু হয় নতুন আলু। শিউলি প্রধানত শরতের ফুল। তবে হেমন্তেও এই ফুল ফোটে, ঝরে। কার্তিকের প্রথম দিকে ফুল কিছুটা কম হয়, তবে মাসের শেষদিকে ফুলের সংখ্যা বাড়ে।
প্রতিকূলতাকে জয় করে টিকে থাকা মানুষ একটু সুযোগ পেলেই বন-পাহাড়ে, নদী-সাগরে আনন্দ ভ্রমণে বেরিয়ে পড়েন। বৃষ্টিমুখর দিনগুলো বিদায় নেয়ার পর বেড়ানোটা সহজ হয়ে যায়। বর্ষায় ডুবে যাওয়া মাঠঘাট পানির নিচ থেকে জেগে ওঠে এই সময়ে। সেন্টমার্টিন , পাহাড়ি এলাকা ও সুন্দরবনে ভ্রমণ মওসুমও শুরু হয় এই সময়। ফলে বলতে গেলে এই হেমন্ত বেড়ানোরই মৌসুম। ছোট্ট বন্ধুরা, তোমরাও বেরিয়ে পড়তে পারো ভ্রমণে।
প্রকাশকাল: অক্টোবর ২০২৪



