প্রতি বছর অক্টোবর মাসের প্রথম সোমবার বিশ্ব শিশু দিবস পালিত হয়। শিশু দিবসে বাবা মায়ের উচিত হবে শিশুদের বিষয়টি একটু ভাবা। সেই ভাবনা থেকে শিশুদের একটি বিশেষ দিক নিয়ে আজকের লেখা। শিশুরা কী খাবার খাচ্ছে বাবা মায়ের সেটা দেখা উচিত। শিশুর খাদ্য তালিকায় লাল, হলুদ, সবুজ, কমলা, বেগুনি এবং সাদা বিভিন্ন রঙের ফল ও শাকসবজি রাখা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বিভিন্ন ধরনের রঙিন ফল ও শাকসবজিতে যেমন ভিন্ন ভিন্ন রঙ প্রদান করে তেমনি বিভিন্ন ধরনের ভিটামিন, খনিজ পদার্থ ও ফাইটোকেমিক্যাল থাকে যা সুস্বাস্থ্য নিশ্চিতে ও বিভিন্ন রোগ প্রতিরোধে ভূমিকা রাখে।
শিশুরা সবসময় প্রাপ্তবয়স্কদের মতো পর্যাপ্ত শাকসবজি খেতে চায় না। অথচ শিশুদের বয়স বাড়ার সাথে সাথে তাদের খাবারের পরিমাণ বাড়াতে হবে, বিশেষ করে রঙিন শাকসবজি ও ফল। এজন্য শিশুদের মধ্যে স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস তৈরি করতে পিতা মাতার একটি বড় ভূমিকা রয়েছে। কেননা ছোটবেলা থেকে এটি অভ্যাস না করলে বড় হয়ে সেটি কঠিন হতে পারে। বাচ্চার সাথে বাবা মায়েদেরও গ্রহণ করতে হবে খাবার। এতে বাচ্চা খাবার গ্রহণে উৎসাহিত হবে। এছাড়া শিশুরা বড়দের অনুকরণ করে। তাই বাবা মায়েরা বিভিন্ন খাবার গ্রহণ করলে শিশুরাও খাবার গ্রহণ করবে।
শিশুরা বিভিন্ন রঙের খাবার খেলে বিভিন্ন পুষ্টি পাওয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন খাবারের স্বাদ ও গন্ধের পরিচয় সম্পর্কে জানতে পারবে। শিশুরা অনেক সময় একই খাবার বার বার খেতে চায় না। এতে একঘেয়েমি যাতে না লাগে সেজন্য খাবারের সৃজনশীলতা বাড়াতে বিভিন্ন ধরনের রঙিন খাবার গ্রহণ করাতে হবে।
শিশুদের প্রথম কয়েকবার নতুন খাবার দেবার চেষ্টা করুন। এতে খেতে না চাইলে মন খারাপ না করে পিতামাতাকে অবিচল থাকতে হবে। বারে বারে বিভিন্ন উপায়ে মিশ্র খাবারে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। শিশুকে অপরিচিত ফল ও সবজি দেখতে ও স্পর্শ করতে দিন ।
শিশুদের ঋতুগত প্রভাব সম্পর্কে সচেতন করুন যেন মৌসুমি ফল ও শাকসবজি খেতে উৎসাহিত হয়। কোন মৌসুমে কোন ফল ও শাকসবজি হয় সে সম্পর্কে পরিচিত করুন এবং এগুলোর পুষ্টি সম্পর্কে বাচ্চাকে জানান।
আসুন জেনে নেয়া যাক কোন রঙের খাবার খেলে কী ধরনের পুষ্টি উপকারিতা পাবেন :
বিভিন্ন রঙের ফল ও শাকসবজি শুধু রংধনু বানায় না, বরং এটি খাবারের প্লেটকে দৃষ্টিনন্দনও করে। প্রতিদিন অন্তত আপনার শিশুকে একটি ভিটামিন এ ও একটি ভিটামিন সি সমৃদ্ধ ফল ও শাকসবজি খাওয়ানোর চেষ্টা করুন। উদাহরণস্বরূপ, ভিটামিন এ সমৃদ্ধ খাবারগুলো হলো আম, মিষ্টি আলু, গাজর ইত্যাদি এবং ভিটামিন সি সমৃদ্ধ খাবার হলো কমলালেবু, মাল্টা, লেবু, জাম্বুরা, মরিচ, আমলকি, আমড়া ইত্যাদি।
লাল বা গোলাপি : লাল বা গোলাপি রংয়ের ফল ও সবজিতে লাইকোপেন, এলাজিক অ্যাসিড, কোয়েরসেটিন এবং হেস্পেরিডিনসের মতো একটি শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট আছে যা হৃদরোগ ও ক্যান্সারের সাথে লড়াই করতে সাহায্য করে। এছাড়া লাল এবং গোলাপি ফল ও শাকসবজি রক্তচাপের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখে, টিউমারের বৃদ্ধি কমাতে এবং খারাপ কোলেস্টেরলের মাত্রা কমাতে সাহায্য করে। এজন্য যেসব খাবার শিশুর খাদ্যতালিকায় রাখতে পারেন তা হলো লাল আপেল, লাল বাঁধাকপি, লালমরিচ, চেরি, ডালিম, টমেটো, তরমুজ, লাল আঙ্গুর, গোলাপি জাম্বুরা, স্ট্রবেরি ইত্যাদি।
কমলা এবং হলুদ : অনেক কমলা ও হলুদ ফল ও শাকসবজি আবার ভিটামিন এ সমৃদ্ধ। যেমন গাজর, মিষ্টি আলু, কুমড়া। বিজ্ঞানীরা বলছেন যে ভিটামিন এ সমৃদ্ধ খাবার ক্যান্সার, হৃদরোগের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে থাকে। এছাড়া ভিটামিন এ চোখ ও ত্বককে সুস্থ রাখে। কমলালেবুর মতো হলুদ সাইট্রাস ফলে ভিটামিন সি এবং ভিটামিন বি থাকে যা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে। কমলা ও হলুদ রংয়ের কিছু শাকসবজি ও ফল হলো, লেবু, আম, ভুট্টা, পেঁপে, পিচ, নাশপাতি, এপ্রিকটস, গাজর ইত্যাদি।
সবুজ : সবুজ শাকসবজি ও ফলে ক্লোরোফিল থাকে। এছাড়া ক্যালসিয়াম, আয়রন, ভিটামিন সি এবং কে এর উৎস। এগুলো শরীরের রোগ প্রতিরোধে অনেক উপকার করে থাকে। এছাড়া সবুজ শাকসবজি ও ফল ফাইবারসমৃদ্ধ যা পরিপাকতন্ত্রে উপকার করে। শরীরের দূষিত রক্ত পরিষ্কার করে শরীরকে বিভিন্ন রোগের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে। সবুজ শাকসবজি ও ফলে লুটেইন সমৃদ্ধ ফাইটোক্যামিকেল রয়েছে যা চোখকে সুস্থ রাখতে সাহায্য করার জন্য জেক্সানথিন নামক রাসায়নিকের সাথে কাজ করে। এগুলি ছোখের ছানি ও অন্ধত্বের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে। সবুজ শাকসবজি এবং ফলগুলি হলো পালংশাক, পাটশাক, পটুইশাক, শশা, ব্রুকলি, লেটুস, ধনেপাতা, অ্যাভোকাডো ইত্যাদি।
বেগুনি ও নীল : গাঢ় বেগুনি ও নীল রঙের শাকসবজি ও ফলে বিভিন্ন ধরনের ফ্ল্যাভোনয়েড, ফাইটোক্যামিকেল ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট রয়েছে যা স্ট্রোক ও মস্তিস্কের জন্য উপকারী। এছাড়া ক্যান্সার, হৃদরোগসহ নানা উপকার করে থাকে। যেমন জাম, বেগুনি বাঁধাকপি, ব্লুবেরি, বেগুনি আঙুর, কিশমিশ, ডুমুর, বেগুন ইত্যাদি। গবেষণায় দেখা গেছে, বেশি ব্লুবেরি খেলে স্মৃতিশক্তি ভালো থাকে এবং মস্তিষ্ককে তীক্ষ্ম রাখে।
সাদা : ফুলকপি, পেঁয়াজ, আলু, রসুন, কলার মতো সাদা ফল রয়েছে। এগুলো রক্তচাপ, কোলেস্টেরল, পাকস্থলির ক্যান্সারের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে।
টিপস:
১. বিভিন্ন রঙের সবজি ও ফল খাওয়া শিশুদের জন্য কঠিন হলেও বুদ্ধি ও কৌশল প্রয়োগ করে চেষ্টা করালে রঙিন খাবার খাওয়াতে পারবেন।
২. শিশুরা অনেক খাবার একসাথে গ্রহণ করতে চায় না। এজন্য বিভিন্ন খাবার সংমিশ্রণ করে খাওয়ালে সহজে পুষ্টি পাবে। যেমন খিচুড়ি, পাঁচমিশালি ডাল, সবজি মিক্সড সবজি, মিক্সড সালাদ, মিক্সড ফল ইত্যাদি।
৩. শিশুদের খাবারের স্বাদ ও আকর্ষণ বাড়ানোর জন্য বিভিন্ন রংয়ের খাবারের সাথে ভেষজ মশলা সংমিশ্রণ করতে পারেন।
৪.শিশুদের খাবারের প্লেট রংধনু বা বিভিন্ন খাবারের সংমিশ্রণ করলে খাবারের প্রতি আগ্রহ কতটুকু তা বুঝতে পারাটাও সহজ হবে।
৫.সবসময় ঘরের তৈরি খাবার তৈরি করতে ও খাবারের পুষ্টিগুণ সম্পর্কে শিশুদের আগ্রহ বাড়াতে হবে।



