ঘুরে এলাম এডিনবার্গ

0
9

বাংলাদেশ থেকে বেড়াতে এসেছি ইউরোপে। ঘুরবো কয়েকটি দেশ। এরই এক ফাঁকে গেলাম স্কটল্যান্ডের এডিনবার্গ শহরে। সেই স্মৃতি ফুলকুঁড়িদের জন্য তুলে ধরছি। বাংলাদেশ থেকে অনেকেই ইংল্যান্ড আয়ারল্যান্ড স্কটল্যান্ডে পড়তে যায়। দেশটা সম্পর্কে জানার আগ্রহ থেকে এই ভ্রমণ। কিছু তোমাদের জানাই।
শুরুতে স্কটল্যান্ড নিয়ে কিছু তথ্য দেই। এটি যুক্তরাজ্যের অন্তর্গত একটি রাজ্য। এর দক্ষিণ-পূর্বে ইংল্যান্ডের সঙ্গে ১৫৪ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত, উত্তর ও পশ্চিমে আটলান্টিক মহাসাগর, উত্তর-পূর্বে উত্তর সাগর এবং দক্ষিণে আইরিশ সাগর অবস্থিত। মূল ভূখণ্ড ছাড়াও দেশটির ৭৯০টি দ্বীপ রয়েছে। এডিনবরা স্কটল্যান্ডের রাজধানী ও দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর। ১৮শতকে স্কটিশ নবজাগরণের কেন্দ্রবিন্দু ছিল, যা স্কটল্যান্ডকে ইউরোপে বাণিজ্যিক, বুদ্ধিবৃত্তিক এবং শিল্প শক্তিকেন্দ্রগুলোর একটিতে রূপান্তরিত করে। গ্লাসগো স্কটল্যান্ডের বৃহত্তম শহর। একসময়কার বিশ্বের নেতৃস্থানীয় শিল্প শহর ছিল। স্কটিশ পানিসীমা উত্তর আটলান্টিক এবং উত্তর সাগরের একটি বড় অংশ নিয়ে গঠিত। ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে বৃহত্তম তেল মজুদ রয়েছে স্কটল্যান্ডে। এজন্যই অ্যাবরদিনকে (অ্যাবরদিন স্কটল্যান্ডের তৃতীয় বৃহত্তম শহর) ইউরোপের তেলের রাজধানী বলা হয়। যুক্তরাজ্য বা ইউনাইটেড কিংডম সংক্ষেপে UK ইউরোপের মূল ভূখণ্ডের উত্তরপশ্চিম উপকূলের সন্নিকটে অবস্থিত একটি স্বাধীন দ্বীপরাষ্ট্র। এটাকে গ্রেট বৃটেনও বলা হয়। এটি ইংল্যান্ড, স্কটল্যান্ড, ওয়েলস ও উত্তর আয়ারল্যান্ড নিয়ে গঠিত।
সেদিন ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৩। হোটেল থেকে সকাল ছয়টায় বের হয়ে সাউথ হ্যারো মেট্রো স্টেশন থেকে মেট্রোযোগে কিং ক্রস রেল স্টেশন পৌঁছি। মজার বিষয় যে পুরো ইউরোপ জুড়ে নগদ টাকার ব্যবহার খুব বেশি নেই। মানে ঘুরতে গেলে পাউন্ড শিলিং লাগছে না তেমন। এটা আধুনিক যুগের ব্যবস্থা। লন্ডনে সামান্য কিছু চললেও ইউরোপের অন্যান্য দেশে খুবই কম, সবকিছুতে পেমেন্ট করতে হয় কার্ডে। সুতরাং মেট্রোতে উঠার জন্যও কার্ড ব্যবহার করতে হয়েছে।
মোটামুটি সব জায়গায় আমার কার্ড কাজ করলেও কী কারণে জানি সাঊথ হ্যারো মেট্রো স্টেশনে আমার ক্রেডিট কার্ড কাজ করছে না। তবে সজল ভাইয়ের কাছে একাধিক কার্ড থাকায় কোনো সমস্যায় পড়তে হয়নি। যাক, কিং ক্রস রেলস্টেশনে পৌঁছে আমরা নাশতা সেরে নিলাম। টিকেট ঢাকা থেকে আগেই অনলাইনে কেটেছিলাম। ট্রেন ছাড়ার নির্ধারিত সময় ছিল সকাল ৮:৪০, প্লাটফর্মে ট্রেন আসলো ঠিক পাঁচ মিনিট আগে। এ সময়ের মধ্যেই সকল যাত্রী ট্রেনে উঠে গেলেন। যাত্রী খুব বেশি না। আমাদের কামরায় প্রায় অর্ধেক সিট খালি ছিলো।
যাক, এডিনবার্গের উদ্দেশ্যে যাত্রা করলাম। এই শহরটির নাম এডিনবরাহও লেখা হয়ে থাকে। ট্রেন চলছে প্রায় ১৫০ কি.মি./ঘণ্টা গতিতে। কোনো শব্দ নেই, ঝাঁকি নেই। বাইরে কী নয়নাভিরাম দৃশ্য! দু’পাশ দিয়ে ফসলের মাঠ। লন্ডন থেকে এডিনবার্গ যেতে মাঝে নর্দাম্পটন, লিচেস্টার, নটিংহাম, ইয়র্কসহ মাত্র পাঁচ স্থানে থেমেছে। খুবই আরামদায়ক ছিল এ ট্রেন ভ্রমণ। দেখতে দেখতে প্রায় ৫ ঘণ্টা পর এডিনবার্গ পৌঁছালাম।

এডিনবার্গ ওয়েভার্লি স্টেশন থেকে বের হয়ে উবার নিয়ে চলে গেলাম আমাদের বুকিংকৃত হোটেলে। স্টেশন থেকে হোটেলের দূরত্ব ছিল প্রায় ৩০কি.মি.। ঢাকা থেকে বুকিং করায় স্টেশন থেকে হোটেলের দূরত্ব আমাদের ধারণাতেই ছিল না। (The Stair Arms Hotel, Midlothian, Edinburgh, Scotland) হোটেলটি দোতলা ভবন, রিসিপশনে মাত্র একজন মহিলা সবকিছু কন্ট্রোল করেন, আলাদা কোনো বয় বা সহকারী কর্মী নেই। রিসিপশন থেকে চাবি নিয়ে নিজের লাগেজ নিজেই বহন করে রুমে যেতে হয়। আমরাও তাই করলাম। খুবই সুন্দর, মনোরম পরিবেশ, সামনের দিকে রাস্তা আর তিনদিকে শুধু নানান ধরনের ফুলের বাগান।
আমরা গোসল সেরে দুপুরের খাবার খেয়ে সিটি সেন্টারে চলে গেলাম। দুপুরের খাবার মানে আমরা লন্ডন থেকে যেসব ফার্স্টফুড সাথে নিয়ে এসেছিলাম সেগুলো। পুরো ইউরোপ জুড়ে যদি কোনো বাঙালি পরিচিতজনের বাসায় না যাওয়া হয় তাহলে খাবার বলতে সাধারণত ম্যাকডোনাল্ডস, কেএফসি ইত্যাদি ফার্স্টফুড জাতীয় খাবারই ভরসা। অবশ্য কিছু বাংলাদেশি হোটেলে ভাতের ব্যবস্থা আছে। যেমন লন্ডন বাংলা টাউনের হোটেলগুলোতে ভাত পাওয়া যায়। যাক, সিটি সেন্টারে যাওয়ার জন্য হোটেল থেকে বের হয়ে আমরা বেশ কিছুদূর হেঁটে টাউন সার্ভিসের বাসস্টপে আসলাম, এসে দেখলাম বাসস্টপেজে ইলেক্ট্রিক সাইনবোর্ডে বাস আসার সময় লেখা আছে। এই স্টপেজে বাস আসবে এক ঘণ্টা পর। আমাদের হাতে খুব বেশি সময় নেই, এখন কী করা যায় ভাবতেছি, আশেপাশে কোনো জনমানব নেই যে কাউকে জিজ্ঞাসা করবো, এমন সময় দেখলাম সামান্য দূরে ৪০/৪৫ বছর বয়সের একজন লোক প্রাইভেট কারের ভিতরে বসে আছেন। তার কাছ গিয়ে আমাদের পরিচয় দিলাম এবং তাকে আমাদের সমস্য বুঝিয়ে বললাম। সে একজন কবি আর আমরা বাংলাদেশের দু’জন প্রকাশক শুনে সে খুবই খুশি হলো এবং বললো আমার গাড়িতে উঠো আমি সিটি সেন্টারের কাছাকাছি যাবো, সেখান থেকে খুব কাছেই সিটি সেন্টার।
যেহেতু তিনি একজন কবি আমরাও সাহস করে তার গাড়িতে উঠে পড়লাম। স্কটিশ কবি নিজে গাড়ি ড্রাইভ করে আমাদের সিটি সেন্টারের দিকে নিয়ে যাচ্ছেন আর এডিনবার্গ তথা স্কটল্যান্ড সম্পর্কে অনেক তথ্য দিলেন। সাথে বাংলাদেশের সাহিত্য সম্পর্কেও জানতে চাইলেন। শহরের একটি জায়গায় এসে তিনি আমাদের কাছাকাছি একটি দ্বিতল বাস দেখিয়ে বললেন, ‘তোমরা ঐ বাসে সিটি স্টেশনে চলে যেতে পারো।’ এরপর আমাদের নামিয়ে দিয়ে বিদায় নিয়ে চলে গেলেন। আমরা দ্বিতল বাসে উঠে সিটি সেন্টারে আসলাম।
বাসে এবং পায়ে হেঁটে যথাসম্ভব এডিনবার্গ সিটি ঘুরে দেখলাম। রাজার বাড়ি, টিউলিপ ফুলসহ নানা ধরনের ফুলবাগান, সাগর তীর, বিভিন্ন মার্কেট, শহরের আধুনিক ও ঐতিহ্যবাহী পুরাতন স্থাপনা ইত্যাদি। রাতের খাবার সিটি সেন্টার থেকেই সেরে হোটেলে ফেরার সিদ্ধান্ত নিলাম। এখানে পানির খুব দাম। আধা লিটার পানির বোতল ২ পাউন্ড যা বাংলা টাকায় ৩০০ টাকা। একবার ওয়াশরুম ব্যবহার করলেও ২ পাউন্ড। এ অবস্থা পুরো ইউরোপ জুড়ে, শুধুমাত্র এয়ারপোর্টে ওয়াশরুম ব্যবহার ফ্রি, আর কোথাও নয়।

প্রকাশকাল: মার্চ ২০২৫