একটি নিষ্পাপ ভোর

0
7

জুলাইয়ের সেই উত্তাল দিনগুলোতে চারপাশের বাতাস যেনো ভারী হয়ে উঠেছিলো এক অদ্ভুত অনিশ্চয়তায়। সকাল থেকেই আকাশ মেঘলা, কিন্তু বৃষ্টি নামে না। রোদ আর মেঘের লুকোচুরিতে গরমটা কেমন স্যাঁতসেঁতে হয়ে লেগে থাকে সারা শরীরে। দূর থেকে ভেসে আসে মাইকের শব্দ, গলা ফাটানো স্লোগান, মাঝে মাঝে পুলিশ ভ্যানের সাইরেন, আর রাত হলে ইট-পাটকেল পড়ার দুমদাম শব্দ।
দুপুরের কড়া রোদ মাড়িয়ে যখন ঝাঁকে ঝাঁকে তরুণ-তরুণী রাজপথে নেমে আসে, তখন ১০ বছর বয়সী ফারহানের মনে হয়— ওরা বুঝি কোনো এক রূপকথার রাজ্য জয়ের লড়াইয়ে নেমেছে। ফারহান তখন জানালার গ্রিল ধরে দাঁড়িয়ে থাকে। নিচে ড্রেনের পানি গরমে ফুটে ওঠে, পাশের চায়ের দোকানের কেটলি সারাদিন হিসহিস করে বাষ্প ছড়ায়। গলির মোড়ে রফিক চাচার চা-পানের দোকান। রফিক চাচা সারাদিন রেডিওটা খুলে রাখেন। খবরের ভয়ানক শব্দগুলো ফারহানের কানে বাজে, কিন্তু মানে বোঝে না কিছুই।
ফারহান রাজনীতি বোঝে না, ‘অধিকার’ শব্দটার গভীরতা মাপার বয়সও ওর হয়নি। কিন্তু ওর ছোট্ট বুকের ভেতর একটা তীব্র অনুভূতি ছিলো— এই বড় ভাইয়া আর আপুরা খুব ভালো মানুষ, ওরা দেশের জন্য লড়ছে। প্রতিদিন বিকেলে ও যখন জানালার গ্রিল ধরে রাস্তার দিকে তাকিয়ে থাকে, তখন ওর চোখ দুটো চকচক করে ওঠে। মাঝে মাঝে নিজেই বিড়বিড় করে, আমিও বড় হলে যাবো ওরকম মিছিলে। মনে মনে ভাবে, বড় হলে ও দেশের পতাকা হাতে নিয়ে মিছিলে দৌড়াবে। ক্লান্ত মানুষকে পানি খাওয়াবে।

রাবেয়া খাতুন। ফারহানের মা। ছেলেকে সবসময় আগলে রাখেন। দেশের পরিস্থিতি যত খারাপ হচ্ছিলো, মায়ের বুকের ভেতর এক অজানা আতঙ্ক ততই দানা বেঁধে উঠছিলো। রান্না করতে গেলে তাঁর হাত কাঁপে, তরকারিতে নুন বেশি পড়ে যায়। রাতে ঘুমাতে পারেন না। ছেলের নিঃশ্বাসের শব্দ শুনে শুনে রাত পার করেন।
তিনি ফারহানকে বারবার বলতেন, বাবা, তুই এ সময় কখনো বাইরে যাবি না। চারদিকে খুব ঝামেলা চলছে।
ফারহান মায়ের আঁচল ধরে হেসে বলতো, মা, আমি তো মারামারি করি না। আমি শুধু দেখবো।
এরপর মা আর কিছু বলতেন না।
সেদিন ছিলো ১৮ই জুলাই।
দুপুরের পর থেকেই ঢাকার আকাশ মেঘলা, কিন্তু বাতাস ছিল তপ্ত। গরম বাতাসে রাস্তার ধুলো উড়ে এসে চোখে-মুখে লাগছিলো। দূরে কোথাও আগুন জ্বলছিল, পোড়া রাবারের গন্ধ নাকে আসছিলো। পাখিগুলোও চুপচাপ গাছের ডালে। গরমে ওরাও হাঁপাচ্ছিল।
হঠাৎ করেই ফারহানদের গলির মুখে শুরু হলো তুমুল হট্টগোল। স্লোগানের শব্দ ছাপিয়ে কানে এলো কান ফাটানো গুলির আওয়াজ— একটা, দুইটা… তারপর বিরতিহীন। তার পরপরই চারদিকের বাতাস টিয়ারগ্যাসের ঝাঁঝালো গন্ধে ভারী হয়ে উঠলো। চোখ-মুখ জ্বলে পুড়ে যাচ্ছিল সবার। গলির কুকুরগুলো ভয়ে ডেকে উঠলো, পাশের বাড়ির টিনের চাল বেয়ে উঠে কে যেনো ছুটে পালালো। ফারহান বারান্দা থেকে দেখলো, রাজপথ থেকে তাড়া খাওয়া কয়েকজন বড় ভাইয়া আর আপু তীব্র গরমে, আর গ্যাসের যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে ওদের গলির ভেতর এসে দেয়ালে পিঠ দিয়ে বসে পড়েছে। কারো শার্ট ছিঁড়ে গেছে, কারো হাঁটু ছিঁড়ে রক্ত পড়ছে। কেউ কেউ চোখ মুছছে, কেউ বা একটুখানি ঠান্ডা বাতাসের জন্য হাঁসফাঁস করছে। রাস্তায় পড়ে আছে ভাঙা চশমা, একটা ছেঁড়া জুতা, কারো ব্যাগ থেকে বের হয়ে পড়ে যাওয়া নোটবুক।
আর সবচেয়ে বেশি যা ফারহানের বুকে লাগলো, তা হলো ওদের তৃষ্ণার্ত গলা— একটু পানি হবে? দয়া করে কেউ একটু পানি দেবেন!
গলাটা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গিয়েছিলো ওদের। কথা বলতেও কষ্ট হচ্ছিলো। মায়ের অলক্ষ্যে ফারহানের ছোট্ট মনটা কেঁদে উঠলো। আর স্থির থাকতে পারলো না। একছুটে রান্নাঘরে গিয়ে ফ্রিজ থেকে ঠান্ডা পানির দুটো বড় বোতল আর কয়েকটা প্লাস্টিকের গ্লাস হাতে নিলো। ফ্রিজ খুলতেই ঠান্ডা বাতাস মুখে লাগলো ওর, কিন্তু বাইরের গরমে সেটা নিমিষেই উবে গেল।
মা যখন অন্য ঘর থেকে ছেলের এই কাণ্ড দেখে চিৎকার করে উঠলেন, ফারহান! যাস না বাবা! বাইরে গুলি চলছে!

ততক্ষণে ফারহান এক ঝটকায় সদর দরজা খুলে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে গেছে। সিঁড়ির রেলিং গরম হয়ে ছিলো, হাতে টের পেলেও থামলো না সে। মায়ের আকুল কণ্ঠের ডাক ওর কান পর্যন্ত পৌঁছালেও, তৃষ্ণার্ত মানুষের হাহাকার ওকে থামতে দিলো না। গলির মুখে এসে ফারহান পরম মমতায় পানির বোতলটা বাড়িয়ে ধরলো তৃষ্ণার্ত কজন ভাইয়া-আপুর সামনে।
এক বড় ভাইকে গ্লাসে পানি ঢেলে দিতে দিতে ওর চেনা সেই নিষ্পাপ হাসিটা দিয়ে বললো, ভাইয়া, এই নাও ঠান্ডা পানি। অনেক কষ্ট হচ্ছে, না? আর কান্দো না, সব ঠিক হয়ে যাবে!
ওর কণ্ঠে তখন কোনো ভয় ছিলো না। শুধু ছিলো একটুখানি শান্তি দেওয়ার আকুতিভরা শব্দমালা।
বড় ভাইটা কাঁপা হাতে গ্লাসটা নিলো। চোখে অশ্রু। বললো, তুমি ভালো থেকো ছোট ভাই।
পানিটুকু তখনো সেই তৃষ্ণার্ত তরুণের গলা বেয়ে নামেনি। ঠিক সেই মুহূর্তে বাতাস চিরে সাঁ করে ধেয়ে এলো একটা বুলেট। শব্দটা এত তীক্ষ্ম যে, এক সেকেন্ডের জন্য পুরো গলি স্তব্ধ হয়ে গেল। কুকুরটাও তার ডাক থামিয়ে দিলো। কোনো সতর্কসংকেত নেই, কোনো দয়ামায়া নেই— নিষ্ঠুর সেই সীসার টুকরোটি এসে বিঁধল ফারহানের ছোট্ট পাখির মতো কোমল বুকটাতে। হাতের পানির গ্লাসটা ছিটকে পড়ে গেল গলির রাস্তায়। ঠান্ডা পানি আর ফারহানের বুকের তাজা লাল রক্ত এক হয়ে মিশে গেল গরম ধুলোয়। সেটা থেকে একটা কেমন মিষ্টি-নোনতা গন্ধ ছড়িয়ে পড়লো বাতাসে। ফারহান যখন মাটিতে লুটিয়ে পড়লো, তখনো ওর এক হাত পানির বোতলটা শক্ত করে আঁকড়ে ধরা ছিলো। ওর আধবোজা চোখের কোণ দিয়ে গড়িয়ে পড়লো এক ফোঁটা অশ্রু, আর ঠোঁটে লেগে রইলো তৃষ্ণার্ত মানুষকে পানি খাওয়াতে পারার সেই স্বর্গীয় তৃপ্তির হাসি।
চারপাশে তখন শুধু গুলির শব্দ, মানুষের দৌড়াদৌড়ি, আর দূরে কোথাও মায়ের কান্নার মতো একটা গোঙানি।
রফিক চাচা দোকান ফেলে দৌড়ে এলেন। বৃদ্ধ মানুষ, হাঁপাতে হাঁপাতে বললেন, এইটা কী করলা তোমরা! বাচ্চা পোলাডা!
কিন্তু কেউ শুনলো না তার কথা। সবাই নিজেকে বাঁচাতে ব্যস্ত।
মা রাবেয়া খাতুন যখন পাগলের মতো চিৎকার করতে করতে গলিতে ছুটে এলেন, তখন সব শেষ। তিনি ছেলের রক্তাক্ত দেহটা বুকে জড়িয়ে ধরে আকাশ-পাতাল কাঁপিয়ে আর্তনাদ করে উঠলেন, ও তো মিছিলে যায়নি! ও তো শুধু পানি দিতে এসেছিলো! আমার সোনামণিকে কেনো মারলে তোমরা?
কিন্তু সেই আর্তনাদের উত্তর দেওয়ার মতো কেউ ছিলো না। ফারহানের নিথর শরীরটা মায়ের কোলে ঝুলে রইলো। ও আর কোনোদিন মায়ের আঁচল ধরে বায়না করবে না, কোনোদিন আর রূপকথার গল্প শুনতে চাইবে না। মায়ের শাড়ির আঁচল রক্তে ভিজে গেল কখন, তিনি তা বুঝতেই পারলেন না। যখন ফারহানের নিথর শরীর ঘরে আনা হলো, ঘরটা যেনো হঠাৎ খুব বড় বড় লেগেছিলো রাবেয়া খাতুনের। ফারহানের খেলনার বলটা এক কোণে পড়ে ছিলো। মা সেটা হাতে নিয়ে সারাটা দিন বসে থাকলেন।
প্রতিদিন ভোরে এখনো তিনি জানালার গ্রিল ধরে দাঁড়িয়ে থাকেন। যদি ছেলে আবার এসে বলে, মা, আমি তো শুধু দেখবো।
কিন্তু ফারহান আসে না। আজ বাংলাদেশ স্বাধীন। রাজপথের দেয়ালে দেয়ালে এখন নতুন ভোরের রঙিন গ্রাফিতি। রাতে আলো জ্বলে, মানুষ হাঁটাচলা করে, বাচ্চারা খেলে। বাচ্চারা এখনো দল বেঁধে স্কুলে যায়। কিন্তু এই স্বাধীন বাতাসে কান পাতলে এখনো ফারহানের মতো শত শত নিষ্পাপ শিশুর হাসির শব্দ শোনা যায়। ওরা হয়তো দেশ সংস্কার বা সংবিধান বুঝতো না, কিন্তু নিজেদের বুকের রক্ত দিয়ে ওরা এই দেশকে এমন এক শিক্ষা দিয়ে গেছে, যা কোনো বইয়ে লেখা থাকবে না।
গরম পিচের গন্ধে, টিয়ারগ্যাসের ঝাঁঝে আর তৃষ্ণার্ত গলার কাঁপা আওয়াজে ওরা এখনো জেগে আছে। আজকের এই নতুন বাংলাদেশের প্রতিটা ধূলিকণায়, মুক্ত বাতাসে আর তৃষ্ণার্ত মানুষের জন্য বাড়িয়ে দেওয়া প্রতিটি পানির ফোঁটায় ফারহানের মতো ছোট ছোট শিশুরা চিরকাল বেঁচে থাকবে।
ওদের আত্মত্যাগের ওপর দাঁড়িয়েই হাসছে আজকের স্বাধীন সকাল।

প্রকাশকাল: জুলাই ২০২৬