সাফল্যের কাউন্টডাউন

0
4

তোমার কাছে অত্যন্ত বিরক্তিকর শব্দ বা মিউজিক কোনটি? অনেকের কাছেই এটা নিঃসন্দেহে- অ্যালার্মের শব্দ। সকালে যখন ঘুমের তেপান্তরে থাকো, তখন অ্যালার্ম বাজতে থাকে! উফ! কী বিরক্তিকর! আর শীতের দিনে তো আরও বেশি বিরক্তিকর। লেপ/কম্বলের ভেতর থেকে হাত বের করে অ্যালার্ম বন্ধ করতে হয়! অ্যালার্ম বন্ধ করে আবার ঘুমানোর অভ্যাস আছে অনেকেরই। তাই না!

সকালে ঘুম থেকে সময়মতো উঠতে না পারার কারণে নামাজ মিস, ক্লাস মিস, পড়া মিস আরও অনেক কিছু মিস হয়ে যায়। প্রতি রাতে ঘুমানোর সময় মনে হয় আগামীকাল সময়মতো উঠবো, কিন্তু আবার মিস হয়। আবার ঘুম। এই ঘুমচক্রে বন্দি হয়ে আমরা ব্যর্থতার দিকে ধাবিত হই। অনেক মেধাবী মানুষও এই দেরির চক্রে আবদ্ধ হয়ে পড়ে।

মার্কিন লেখিকা মেল রবিন্সও এই সমস্যায় ভুগতেন। জীবনের এক পর্যায়ে তিনি চাকরি হারান, পারিবারিক সমস্যায় ভোগেন, শারীরিক অসুস্থতায় ভোগেন। তখন তিনি শুধু ভাবতেন ‘আগামীকাল সকাল থেকে আমার জীবন বদলে নিবো।’ সকালে ঘুম থেকে সময়মতো উঠবো, জিমে যাবো, পরিবারে সময় দিবো, স্বাস্থ্যসম্মত খাবার খাবো, ইত্যাদি। কিন্তু কোনোটাই করা হয়ে উঠছিল না। শুরু করতে গিয়েই- ‘আচ্ছা, আরেকটু পরে করি’, ‘না হয় এখন থাকুক’ এমন দ্বিধা-দ্বন্দে তার সময় কেটে যাচ্ছিল।

একরাতে তিনি টিভিতে দেখলেন একটি রকেট উৎক্ষেপণের দৃশ্য। ৫-৪-৩-২-১ গুনে রকেটটি উপরের দিকে উঠা শুরু করলো। তিনি পেয়ে গেলেন তার সাফল্যের সূত্র। ভাবলেন পরের দিন থেকে তার যে কাজগুলো করতে আলসেমি কাজ করে সেগুলো শুরুর আগে তিনি এই কাউন্টডাউন বা ‘উল্টো গোনা’ পদ্ধতি কাজে লাগাবেন। সকালে ঘুম থেকে উঠতে আলসেমি লাগছে তার; গোনা
শুরু করলেন ৫-৪-৩-২-১, ব্যাস, শূন্যে পৌঁছতেই তিনি বিছানায় উঠে বসে পড়লেন। জাদুর মতো কাজ করলো কাউন্টডাউন। অন্য কাজগুলোর ক্ষেত্রেও একইভাবে তিনি সাফল্য পাওয়া শুরু করলেন।

কাউন্টডাউন যেকোনো উৎক্ষেপণেই চর্চা করা হয়। সামরিক বাহিনীতে টি মাইনাস হিসেবে অভিযান, আক্রমণ বা মিসাইল উৎক্ষেপণের সময় নির্ধারণ করা হয়। টি মাইনাস মানে হলো সময়কে মাইনাস হিসেবে দেখানো। যেমন -মাইনাস ২০ সেকেন্ড মানে ২০ সেকেন্ড পরে উৎক্ষেপণ করা হবে। কাউন্টডাউন বা ২০ থেকে ১৯, ১৮, ১৭ এভাবে ০ তে পৌঁছালে সেটা হয় জিরো আওয়ার। জিরো আওয়ারে আক্রমণ বা উৎক্ষেপণ করা হয়। একই রকমভাবে যেমন মুভি শুটিংএ-ও কাউন্টডাউন চর্চা আছে। ডিরেক্টর বলে- ৫-৪-৩-২-১, অ্যাকশন! তখন অভিনেতা অভিনেত্রীরা শটের জন্য অভিনয়/ডায়লগ দেয়া শুরু করে। খেলাধুলাতেও আছে কাউন্টডাউন ব্যবহার। নিউ ইয়ার সেলিব্রেশন করার জন্যও কাউন্টডাউন করা হয়।

মেল রবিন্স কাউন্টডাউন ব্যবহার করে কীভাবে সফল হলেন তা নিয়ে ২০১৭ সালে লিখেছেন- ‘ঞযব ঋরাব ঝবপড়হফ জঁষব’ নামে একটি বেস্ট সেলার বই। বইটি এ পর্যন্ত বিশ লাখের বেশি কপি বিক্রি হয়েছে। তার ব্যর্থতাকে কীভাবে সাফল্যে রূপ দিয়েছেন তা নিয়ে টেড টকে যে লেকচার দিয়েছেন তা ইউটিউবে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। তিনি এখন সফল মোটিভেশন বক্তা, টিভি উপস্থাপক এবং আত্মউন্নয়ন বিশেষজ্ঞ।

কীভাবে কাজ করে এই ৫ সেকেন্ডের নীতি? মেল রবিন্স ব্যাখ্যা করেছেন যে- এই কাউন্টডাউন মস্তিষ্কের প্রি ফ্রন্টাল কর্টেক্সকে সক্রিয় করে, মনোসংযোগ চালু করে। প্রি ফ্রন্টাল কর্টেক্স সিদ্ধান্ত নিতে এবং সকল অনুভূতিকে একসঙ্গে কাজ করতে নির্দেশনা দেয়। মস্তিষ্কের এই অংশের কাছে অনেক অপশন দেয়া থাকে। এর মধ্যে সবচেয়ে সহজটা সে বেছে নিতে চায়। মস্তিষ্কের এটা সহজাত বৈশিষ্ট্য যে সে তোমাকে দিয়ে অল্প পরিশ্রমে অথবা বিনা পরিশ্রমে কাজটি করিয়ে নিতে চায়। একারণে দেখা যায় যারা যত বেশি বুদ্ধিমান, তারা তত অল্প পরিশ্রমে কাজ করে নিতে বা করিয়ে নিতে পারে। এখন সমস্যা হলো মস্তিষ্কের এই ‘আরামপ্রিয়তা’ তোমাকেও আরামপ্রিয় বা অলস করে তোলে। কারণ ক্রমাগত উন্নতির পথ কখনোই পরিশ্রম ছাড়া সম্ভব নয়। আর শুধু মস্তিষ্কের কর্মচাঞ্চল্য থাকলেই হবে না, দেহের বাকি অঙ্গপ্রত্যঙ্গকেও কর্মক্ষম/ফিট না রাখলে দেহ অসুস্থ এবং অক্ষম হয়ে পড়বে। সেজন্য মস্তিষ্ককে কিছু ‘ডিসিশন’ দিয়ে রাখতে হয়- যে আমি প্রতিদিন সকালে দৌড়াতে যাবো, সকালে অবশ্যই সাড়ে ৫ টায় ঘুম থেকে উঠবো। তখন মস্তিষ্ক সেই সিদ্ধান্তগুলোকে তার মেমোরিতে রেখে দেয় এবং পরবর্তীতে সে অনুযায়ী সিদ্ধান্ত দেয়।
যেমন ধরো- সকালে ঘুম থেকে ওঠার ক্ষেত্রে মস্তিষ্কের কাছে দুটো অপশন থাকে- ১. জেগে ওঠা, ২. আরও কিছুক্ষণ ঘুমানো। এক্ষেত্রে মস্তিষ্ক আরো কিছুক্ষণ ঘুমানোটাকেই সহজ হিসেবে বেছে নিয়ে তোমাকে অ্যালার্ম বন্ধ করে ঘুমাতে প্রলুব্ধ করে। কিন্তু তুমি যদি মস্তিষ্ককে প্রোগ্রাম দিয়ে রাখো যে ৫-৪-৩-২-১ এর পরের অপশন একটাই- সেটা হলো জেগে ওঠা, তখন মস্তিষ্কের প্রি ফ্রন্টাল কর্টেক্সের কাজ হয়ে দাঁড়ায়- তোমাকে জাগিয়ে তোলার জন্য পুরো শরীরকে সক্রিয় করা। তাই ঘুম থেকে ওঠার জন্য জোরে জোরে গুনতে পারো- ৫-৪-৩-২-১, দেখবে শরীর তোমার মনের কথা শুনছে, জেগে উঠছে। বিছানা আর তোমাকে পেছনে টেনে রাখতে পারছে না।
প্রশ্ন হতে পারে- কাউন্টডাউন বা উল্টো গণনা না করে ধারাবাহিক গুনলে কী হতো? অর্থাৎ ৫-৪-৩-২-১ না গুনে ১-২-৩-৪-৫ গুনলে সমস্যা কী? এর সাইকোলজিক্যাল দিকটি হলো- যখন ১-২-৩-৪-৫ গোনা হয়, তখন ৫ এর পর ৬, ৭ ইত্যাদি থাকে। এর কোন শেষ থাকে না। কিন্তু উল্টো গুনলে ৫-৪-৩-২-১ এর পর আসে শূন্য। অর্থাৎ মস্তিষ্ককে এই সিগন্যাল দেয়া হয় যে এর পরে আর বসে থাকার কোনো অপশন নেই।

এই উল্টো গণনা আর কোথায় কাজ দিতে পারে? যেমন- তুমি টিভি দেখছো। দেখতে দেখতে মনে হলো এখন উঠে পড়তে বসা দরকার। কিন্তু আরও দেখতে ইচ্ছে করছে। তখন গুনতে শুরু করো- ৫-৪-৩-২-১, ব্যস দেখবে শরীর একটা ঝাড়া দিয়ে উঠে পড়বে।

গোসল করতে আলসেমি লাগছে? এখন করবে নাকি পরে করবে এমন দ্বিধায় ভুগছো? গুনতে শুরু করো- ৫-৪-৩-২-১, দেখবে শরীরে গতি চলে এসেছে, দ্বিধা দূর হয়ে গেছে।

গেমে মত্ত হয়ে গেছো? ভাবছো, এখন বন্ধ করা দরকার, কিন্তু মনের সাথে পেরে উঠছো না? ব্যস, কাউন্টডাউন শুরু করো। বন্ধ করার জন্য সাহস পাবে, মনের শক্তি পাবে।

ব্যায়াম করতে বা জিমে যেতে আলসেমি লাগছে? কষ্টকর কাজ! আজকে না করি! এমন লাগছে? গুনতে শুরু করো- ৫-৪-৩-২-১, দেখবে পজিটিভ অ্যানার্জি কাজ করছে! ব্যায়াম করার উপকারিতাগুলো চোখের সামনে ভাসছে। নিজের কাছে উৎসাহ লাগবে তখন।

নতুন বছরে সাফল্যের রকেট উৎক্ষেপণ করতে চাও? তাহলে শুরু করো তোমার কাউন্টডাউন। ক্ষতিকর অভ্যাস দূর করতে, সময় অপচয় দূর করতে ব্যবহার করো ৫ সেকেন্ডের জাদুমন্ত্র। ভালো অভ্যাস গড়ে তুলতে, কল্যাণকর কাজ শুরু করতে বলো- ৫-৪-৩-২-১.. অ্যাকশন!!! দুর্দশার আঁধার কেটে সফলতার আলো ছড়িয়ে পড়ুক তোমার জীবনে।

প্রকাশকাল: জানুয়ারি ২০২৫