ভাষার মাস ফেব্রুয়ারি, ভাষার মাস ফাল্গুন। ১৯৫২ সালে ঢাকার রাজপথে রক্ত দিয়ে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলার স্বীকৃতি এনেছিল সালাম, রফিক, বরকত, জব্বার ও শফিউরেরা। তাদের স্মৃতির প্রতি আমাদের বিনম্র শ্রদ্ধা। তবে ভাষা শহিদদের আত্মত্যাগকে অমর করে রাখতে হলে বাংলা ভাষার জন্য আমাদের অবদান রাখতে হবে। তাঁরা বাংলাকে যে সম্মানের জায়গায় দেখতে চেয়েছিলেন, সেখানে বাংলাকে পৌঁছাতে সাধনা করে যেতে হবে আমাদের। রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলার বহুল ব্যবহার থাকার কথা ছিল উচ্চ আদালতে এবং দেশে উচ্চ শিক্ষায়। কিন্তু দুটো জায়গাতেই বাংলা এখনও অনেকটাই অবহেলিত। বিজ্ঞান গবেষণায় বাংলা এখনো পিছিয়ে আছে। তাছাড়া এখন ইন্টারনেটের যুগে বিশ্বের তথ্যভাণ্ডারে যে ভাষায় নির্মিত কনটেন্ট বেশি জমা আছে সে ভাষাই আগামীতে আরো এগিয়ে যাবে-এটাই স্বাভাবিক। অর্থাৎ গুগল সার্চ করলে বাংলা ভাষায় এখনো পর্যাপ্ত কনটেন্ট পাওয়া যায় না। সেক্ষেত্রে তোমাদের অবদান রাখতে হবে। কনটেন্ট মানে শুধু বিনোদনের ভিডিও না। কনটেন্ট হতে পারে লিখিত বা টেক্সট ফরম্যাটে, ডিজাইন/ক্যালিগ্রাফি, অডিও, ভিডিও এবং অ্যানিমেশনও। বাংলা ভাষায় প্রয়োজনীয় কনটেন্ট নির্মাণে তোমরা ভূমিকা রাখতে পারো, উইকিপিডিয়ায় বাংলা পেইজকে সমৃদ্ধ করতেও ভূমিকা রাখতে পারো।
বাংলা ভাষার জন্য এ অবদান চাইলে যেকোনো স্তর থেকে, যেকোনো স্থান থেকেই করা যায়। এর উদাহরণ হলো ফরিদ উদ্দিন এবং রাজুব ভৌমিক। কিশোরগঞ্জে জন্ম নেয়া এস এম ফরিদ উদ্দিন দরিদ্র পরিবারের সন্তান ছিলেন। এসএসসি পরীক্ষার পর কিশোরগঞ্জ গুরুদয়াল কলেজে উচ্চ মাধ্যমিকে ভর্তি হলেও পড়াশুনা শেষ করতে পারেননি। পরবর্তীতে ২০০৭ সালে তিনি বুয়েটের একটি হলের সিকিউরিটি গার্ড হিসেবে চাকুরি নেন। হলের ছাত্রদের সংস্পর্শে এসে তিনি আবার জ্ঞানচর্চায় আগ্রহ বোধ করেন। তিনি বাংলা সাহিত্য নিয়ে কাজ শুরু করেন। তার স্বপ্ন ছিল বাংলা ভাষায় নতুন কিছু করা। তিনি বাংলা অভিধান ও পত্রিকা নিয়মিত পড়তে থাকেন। এক পর্যায়ে তিনি নতুন এক ধরনের কবিতা লেখেন। বুয়েটের ছাত্ররা সেটি দেখে তাকে জানান এই ধারার কবিতাকে বলা হয় প্যালিনড্রোম কবিতা।
প্যালিনড্রোম হলো তেমন সংখ্যা, শব্দ বা বাক্য যা ডানদিক থেকে এবং বাম দিক থেকে পড়লে একই হয়। যেমন: ১২৩৪৩২১ এটিকে উভয় দিক থেকে পড়লে একই হয়। আবার বহুল পরিচিত শব্দ আছে- রমা কান্ত কামার। এটি উভয় দিক থেকে পড়লে একই হয়। বাংলা ভাষায় প্যালিনড্রোম চর্চার সূচনা করেছিলেন দাদা ঠাকুর নামে খ্যাত শরৎচন্দ্র পণ্ডিত, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় না কিন্তু। শরৎচন্দ্র পণ্ডিত বেশ কিছু প্যালিনড্রোম বাক্য রচনা করেছিলেন। যেমন- রমা তো মামা তোমার, কাক কাঁদে কাক কা, তাল বনে নেব লতা ইত্যাদি। তবে তিনি কবিতা লেখেননি। প্রথম বাংলা প্যালিনড্রোম কবিতা লিখেছিলেন সৌমিত্র চক্রবর্তী।
ফরিদ উদ্দিন প্যালিনড্রোম নিয়ে আট বছর চর্চা করে ২০১৯ সালে বাংলা ভাষায় প্রথম প্যালিনড্রোম কবিতার বই প্রকাশ করেন। ‘কথা থাক’ শিরোনামে এই বই প্রকাশনীর বেস্ট সেলার হয়। বইয়ের প্রথম কবিতাটি ছিল এমন-
মালিনী নীলিমা
থাক বসন্তে তেন সব কথা
তেমনি মতে
সেবা লভা লিলি? ভালবাসে
দিগন্তের তেন গদি
পরবর্তীতে ২০২০ সালে তিনি আরো দুটি প্যালিনড্রোম কবিতার বই সম্পাদনা করেন-‘নব প্লাবন’ এবং ‘নব যৌবন’ নামে। তার সাথে সম্পাদনায় যুক্ত ছিলেন গণিতবিদ চমক হাসান, যিনি ২০১৯ সালে বাংলা ভাষায় প্রথম প্যালিনড্রোম গান রচনা করেছিলেন। তারা ফেসবুকে গ্রুপ খোলেন- প্যালিনড্রোম চর্চা পর্ষদ নামে। এই গ্রুপের সদস্যরা নানা ফরম্যাটে প্যালিনড্রোম চর্চা করে। একজন অল্প শিক্ষিত সিকিউরিটি গার্ড ফরিদ উদ্দিন বাংলা ভাষার প্রতি ভালোবাসা থেকে বাংলা প্যালিনড্রোমের এ জাগরণ ছড়িয়ে দেন দেশজুড়ে।
দেশের বাইরে থাকলেও যে বাংলা ভাষার প্রতি ভিন্নমাত্রিক অবদান রাখা যায়, তার উদাহরণ হলেন যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী রাজুব ভৌমিক রাজু। রাজুব ভৌমিকের জন্ম নোয়াখালীতে। এসএসসি পাশ করলেও এইচএসসিতে ফেল করে বসেন প্রথমবার। দ্বিতীয় প্রচেষ্টায় পাশ করেন। এরপর পরিবারের সাথে পাড়ি জমান যুক্তরাষ্ট্রে। সেখানে তিনি ধারাবাহিকভাবে তার মেধার বিকাশ ঘটাতে থাকেন। বাংলা ভাষার প্রতি অনুরাগের কারণে তিনি সাহিত্য চর্চা করতে থাকেন। তিনি বাংলা কবিতায় ভিন্ন মাত্রার সূচনা করেন। তার ভাষায় এ ধারার নাম- ‘আয়না সনেট’।
তোমরা জানো, সনেট হলো চতুর্দশপদী কবিতা, যেখানে কবিতাটি হয় ১৪ পদ বা বাক্যের; প্রতিটি বাক্যে থাকে ১৪টি অক্ষর। বাংলায় সনেটের প্রবর্তক ছিলেন মাইকেল মধূসুদন দত্ত। রাজুব ভৌমিক যে সনেট লেখেন সেটি প্যালিনড্রোমের মতো দু’দিক থেকে পড়া যায় তবে দু’দিক থেকে পড়লে একই রকম বাক্য হয় না। বরং নতুন আরেকটি কবিতা হয়ে যায়। যেমন তার প্রথম আয়না সনেট এর প্রথম অংশ হলো এমন –
‘পেতে শুধু অবহেলা জন্মায় গরিব
ক্ষেতে করে শ্রম বন্ধ্য, ফসলে মুনীব
নিষ্ফল কপাল তার, শোষিত জীবন
বলহীন বুকে সর্ব, লাথিতে মরণ।’
এবার ডান দিকে থেকে শব্দগুলো পড়তে থাকো- কী দাঁড়ায়?
‘গরিব জন্মায় অবহেলা শুধু পেতে
মুনীব ফসলে বন্ধ্য শ্রম করে ক্ষেতে
জীবন শোষিত তার কপাল নি®ফল
মরণ লাথিতে সর্ব বুকে হীন বল।’
কি অদ্ভুত তাই না? একই কবিতার ভেতরে আরেকটি কবিতা। রাজুব ভৌমিক আয়না সংগীতও রচনা করেছেন। তার প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা পঁচিশের অধিক।
রাজুব ভৌমিকের একাডেমিক যোগ্যতা ও ক্যারিয়ার শুনলে অবাক হবে। রাজুব নিউইয়র্কে গিয়ে পুলিশে যোগ দেন ২০১২ সালে। সম্প্রতি তিনি লেফটেন্যান্ট পদে উন্নীত হয়েছে। নিউইয়র্ক পুলিশে তার সাহসিকতার ঘটনা নিয়ে অনেক সংবাদ হয়েছে। কর্তব্যরত অবস্থায় একবার শীতের গভীর রাতে পানিতে ঝাঁপিয়ে পড়ে ডুবন্ত ব্যক্তিকে উদ্ধার করা এবং আরেকবার রেললাইনে ঝাঁপ দেয়া ব্যক্তিকে উদ্ধার করে তিনি সংবাদ শিরোনাম হয়েছিলেন।
একজন পুলিশ আর পড়াশুনা কী করবে! এমন ভাবনা অনেকের থাকে। কিন্তু শুনলে অবাক হবে- পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি শিক্ষাগত যোগ্যতাসম্পন্ন পুলিশ হিসেবে অফিসিয়াল ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসে নাম তুলেছেন রাজুব। সেই যে বলেছিলাম প্রথমবার এইচএসসিতে ফেল করেছিল ছেলেটি। নিউইয়র্কে গিয়ে প্রথমে শেফার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কম্পিউটার সায়েন্সে গ্রাজুয়েশন করেন। তারপর পুলিশে চাকুরির প্রয়োজনে আমেরিকান পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ‘ক্রিমিনাল ইন্টেলিজেন্স’ বিষয়ে আরেকটি ডিগ্রি নেন। এরপর সাইকোলজিতে মাস্টার্স করেন ওয়াল্ডেন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। ক্লিনিকাল সাইকোলজিতে ডক্টরেট করেন ক্যালিফোর্নিয়া সাউদার্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। এখানেই থেমে যাননি রাজুব। আমেরিকান পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে হোমল্যান্ড সিকিউরিটিতে আরেকটি মাস্টার্স করেন। পরে ওয়াল্ডেন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সাইকোলজিতে আরেকটি পিএইচডি করেন। আরেকটি ডক্টরেট করেন ‘ব্যবসায় প্রশাসনে’, ক্যালিফোর্নিয়া সাউদার্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। নিউইয়র্ক স্টেট বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ‘কারিকুলাম ও ইন্সট্রাকশনাল টেকনোলজি’ বিষয়ে আরেকটি মাস্টার্স করেন। সবশেষে ‘ডক্টর অব এডুকেশন’ অর্জন করেন আমেরিকান কলেজ অব এডুকেশন থেকে। অর্থাৎ ৪টি মাস্টার্স এবং ৪ টি ডক্টরেট ডিগ্রি এবং দুটি ব্যাচেলর, মিলে ১০টি কলেজ ডিগ্রি আছে তার। আর এসব তিনি অর্জন করেছেন ৩৫ বছর বয়সের মধ্যেই। ভাবতে পারো! বর্তমানে তিনি পুলিশে চাকুরির পাশাপাশি একাধিক কলেজে শিক্ষকতা করেন। তিনটি বিশ্ববিদ্যালয়ে তার লেখা বই পড়ানো হয়। শিক্ষার প্রতি তার অনুরাগ সত্যিই প্রশংসনীয় এবং অনুসরণীয়।
ফরিদ উদ্দিন আর রাজুব ভৌমিকের মতো তুমিও কি পারো না বাংলা ভাষার জন্য অবদান রাখতে?
সূত্র : Roar Media, risingbd, jagonews24, official world records এবং অন্যান্য।
প্রকাশকাল: ফেব্রুয়ারি ২০২৫



