বিশ্বকাপ ও সংখ্যাতত্ত্ব

দেখতে দেখতে তো বিশ্বকাপের ২৩তম আসর শেষ। ফুটবল বিশ্বকাপের ইতিহাসে সর্বোচ্চ ৪৮ দল ও ১০৪টি ম্যাচের আয়োজন ছিলো এবারের আসরে। যাই হোক। কাজের কথাতে আসি, নাকি?

আচ্ছা, তোমরা কি সংখ্যাতত্ত্বে একটু আধটু বিশ্বাস করো? মনের মধ্যে কি একটু উড়াউড়ি করে? হুম…?
করো না, করো না। নাহলে একটু আধটু করলেও কিন্তু রবার্তো মার্তিনেজের মতো ধরা খেতে হবে! কী? চিনছো না উনাকে?
আচ্ছা, চলো তাইলে আজকে এবারের বিশ্বকাপের অদ্ভুত কিছু সংখ্যা নিয়ে গল্প করি।

৮৬
এবারের বিশ্বকাপের অন্যতম আলোচিত বিষয় ছিলো The 86th Minutes Curse! আমরা তো এর আগে Champions Curse নিয়ে জেনেছি। তো সেই কার্স এবারও ফিরতে দেয়নি আর্জেন্টিনা। কিন্তু ৮৬ মিনিটের অভিশাপে বিদায় নিতে হয়েছে কয়েকটি ছোট দলকে। চলো ম্যাচের ঘটনাগুলো স্মরণ করি!
গ্রুপ পর্ব শেষ করে রাউন্ড অব ৩২ শুরু হয়েছে। ৩০ জুনে ৫ নম্বর ম্যাচ খেলতে নেমেছে আইভরি কোস্ট এবং নরওয়ে।
ম্যাচের ৩৯তম মিনিটেই নরওয়ের ২০ নম্বর জার্সিধারী আন্তোনিও নুসার গোলে লিড নেয় নরওয়ে। তবে আইভরি কোস্ট খুব একটা আরাম দেয়নি। তারা ৭৪ মিনিটে আমাদ দিয়ালোর গোলে ম্যাচে সমতা ফেরায়। কিন্তু নরওয়েজিয়ান দানব আর্লিং হাল্যান্ড ৮৬তম মিনিটে গোল করে জয় তুলে নেন।

এবারে পরেরদিন মানে ১ জুলাইয়ে রাউন্ড অব ৩২ এর ৮ম ম্যাচ খেলতে নামে ইংল্যান্ড ও কঙ্গো প্রজাতন্ত্র।ম্যাচের ৭ মিনিটেই ব্রায়ান চিপেঙ্গার গোলে ইংল্যান্ডকে চমকে দিয়ে এগিয়ে যায় কঙ্গো। এদিকে ইংল্যান্ড কোনোভাবেই ম্যাচে ফিরতে পাচ্ছে না। তাদের মুহুর্মুহু আক্রমণ আটকে দিচ্ছে কঙ্গো। দ্বিতীয়ার্ধে ইংল্যান্ড আক্রমণ আরও বাড়িয়ে দেয়। হ্যারি কেনের দুর্দান্ত গোলে ম্যাচের ৭৫ মিনিটে সমতায় ফেরে ইংল্যান্ড। ম্যাচের ৮৬ তম মিনিটে হ্যারি কেইন কফিনের শেষ পেরেক ঠুকে দিয়ে কঙ্গোকে বিদায় করে দেয়।

The 86th Minutes Curse এর আরেকটা ম্যাচ হয় ১ জুলাইতেই। রাউন্ড অব ৩২ এর ৯ম ম্যাচ। যেটা হয় বেলজিয়াম বনাম সেনেগালের।
ম্যাচের ২৪ মিনিটেই হাবিব দিয়ারার গোলে লিড নেয় সেনেগাল। এতেই থেমে থাকেনি। ৫১তম মিনিটে ইসমাইলা সারের গোলে লিড দ্বিগুণ করে সেনেগাল।
কিন্তু এবারে ৮৬ মিনিটের অভিশাপটি শেষ হিসেবে আসেনি। বরং শেষের শুরু হিসেবে এসেছিলো। বুঝলে না?
মানে হলো বেলজিয়াম ৮৬ তম মিনিটে নিজেদের প্রথম গোল পায় রোমেলো লুকাকুর মাধ্যমে। এতেই শুরু হয় সেনেগালের শেষের শুরু।
মাত্র ৩ মিনিট পরেই অর্থাৎ ৮৯ তম মিনিটে তিয়েলেম্যানের গোলে ম্যাচে সমতা নিয়ে আসে বেলজিয়াম।
৯০ মিনিটের মধ্যে আর কোনো গোল না হওয়াতে ম্যাচ গড়ায় এক্সট্রা সময়ে। এখানেও সবাই সবার সেরাটা দিয়েই খেলতে থাকে।
কিন্তু কপাল খারাপ হলে যা হয়! অতিরিক্ত সময়ের পরেও ১২০+৫ মিনিটে তিয়েলেম্যান আবারও গোল করে ফেলে। তাতেই বিদায় ঘণ্টা বেজে যায় সাদিও মানের সেনেগালের।
৮৬ মিনিটের অভিশাপ যদিও আলোচনায় এসেছে। তবে ৮৬ বা তার পরের মাত্র কয়েক মিনিট সময়ের মধ্যে অনেকগুলো দলই এবার বিদায় নিয়েছে। তাতে বলাই যায় যে, ছোট দলগুলোর ভাগ্য আসলেই খারাপ ছিলো।

০৬
পর্তুগালের ডাগ আউটে ম্যানেজার হিসেবে ছিলেন রবার্তো মার্তিনেজ। দলেও ছিলো বিশ্বের সেরা মিডফিল্ডারদের সমারোহ। কিন্তু রবার্তো মার্তিনেজের ট্যাকটিক্যাল চিন্তা, প্লেয়ারদের মধ্যে বন্ডিং তৈরির চেয়ে সংখ্যাতত্ত্বের উপরে একটু বেশি বিশ্বাসই হয়তো পর্তুগালের জন্য কাল হয়ে গিয়েছিলো।
তো চলো আগে জেনে নিই যে রবার্তো মার্তিনেজের এমন সংখ্যাতত্ত্বে বিশ্বাসের কিছু কারণ।
তিনি নিজেই পর্তুগিজ টিভি চ্যানেলকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেলেন, ‘আমি সংখ্যাতত্ত্বে বিশ্বাস করি। ৬ সংখ্যাটি আমাদের সৌভাগ্য বয়ে আনতে পারে। ২০১৬ সালে পর্তুগাল ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ জেতে। ১৯৬৬ সালে বিশ্বকাপে নিজেদের সেরা সাফল্য পায়। ২০০৬ সালেও সেমিফাইনালে ওঠে। পর্তুগাল যা পাওয়ার যোগ্য, এখন তা অর্জনের সময় এসেছে।’ অর্থাৎ ২০২৬ সালের শেষের সংখ্যাটি ৬ হওয়াতে তার মনেও সাফল্য মানে বিশ্বকাপ জেতার আশা মনের মধ্যে লাড্ডু ফুটাতে থাকে!
এদিকে এ বিশ্বকাপে কিন্তু পর্তুগালের দুয়েকটা ঘটনা ৬ সংখ্যাকে লাকি বানানোর জন্য একটু উস্কানি দিয়েছিলো মনে হয়!
যেমন গ্রুপ পর্বে কঙ্গোর বিপক্ষে ১-১ গোলে ড্র করার ম্যাচে পর্তুগালের হয়ে প্রথম গোলটি আসে ৬ মিনিটে। গোলদাতা জোয়াও নেভেসের জার্সি নম্বর ১৫, যার অংকদ্বয় যোগ করলে (৫+১) যোগফল হয় ৬।
আবার উজবেকিস্তানের বিপক্ষে ৫-০ গোলের দাপুটে জয়ে ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোও জালের দেখা পান ম্যাচের ঠিক ৬ মিনিটে। উল্লেখ্য, রোনালদো এবার নিজের ক্যারিয়ারের ৬ নম্বর বিশ্বকাপ খেলতে মাঠে নেমেছিলেন।
বুঝতেই পারছো যে, ঘটনা কেমন জটিল ও হাস্যকর!
কিন্তু সংখ্যাতত্ত্বে ধরাটা যে রাউন্ড অব ১৬-তেই খেতে হবে সেটা হয়তো ভাবেনি রবার্তো মার্তিনেজ।
রাউন্ড অফ ১৬ তে টিকিটাকা ফুটবলের কারিগর স্পেনের মুখোমুখি হয় পর্তুগাল। পুরো ম্যাচ গোলশূন্যভাবে চলছিলো। কিন্তু ম্যাচের ৯০+১ মিনিটে যখন মিকেল মেরিনো গোল করে পর্তুগালকে বিদায় করে দেন, তখনও হয়তো রবার্তো মার্তিনেজ ভাবেননি যে ৬ সংখ্যা তাকে কী ধরাটা খাইয়েছে!
পরে অবশ্য তোমাদের মতো ফুটবল ফ্যানেরাই বের করেছে এই ম্যাচে ৬ সংখ্যা কোথায় কোথায় আনলাকি হয়েছে! চলো আমরাও একটু খুঁজে দেখি কতভাবে আনলাকি করা যায় –
রাউন্ড অফ ১৬ এর শেষে ৬ সংখ্যা আছে!
ম্যাচটি খেলা হয়েছে Dallas স্টেডিয়ামে। ডালাসের অ্যালফাবেট সংখ্যাও ৬!
ম্যাচটি স্থানীয় তারিখ ৬ জুলাইয়ে হয়েছে!
গোলদাতা মেরিনোর জার্সি নাম্বার ৬!
মেরিনো গোল করেন বদলি হয়ে আসার ৬ মিনিটের মাথাতেই!
তাহলে আজকে এ পর্যন্তই। কথা হবে সামনের কোনো পর্বে। ভালো থেকো সবাই।

প্রকাশকাল: আগস্ট ২০২৬