ছোট-বড় সবার প্রিয় কবি ভাইসাব চলে গিয়েছেন। তোমাদের মনে হয়তো প্রশ্ন জাগতে পারে এ ভাইসাব আবার কে?
হ্যাঁ তিনি হলেন প্রিয় কবি শামসুল ইসলাম। শামসুল ইসলাম ছোট-বড় সবাইকে আদর করতেন। দেখলে একগাল হাসি দিয়ে জিজ্ঞেস করতেন, ভাইসাব ভালা আছেননি? সব সময়ই হাসিখুশি এই মানুষটি নোয়াখালীর আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলতেন। ২০০৮ সালে তিনি ইন্তেকাল করেন। তিনি হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লে হাসপাতালে নেয়ার পথেই মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর বয়স হয়েছিল ৬৬বছর।
কবি শামসুল ইসলাম ১৯৪২ সালের ১৭ মার্চ ফেনী জেলার আমজাদ হাটের ধর্মপুর গ্রামের মুন্সিবাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। কবি শামসুল ইসলামের ছেলেবেলা কাটে অন্য দশজন গ্রামের ছেলের মতোই। গ্রামের বাড়িতেই তিনি মানুষ হয়েছিলেন প্রকৃতির খোলামেলা কোলে। হেসে খেলে হেলায় খেলায় কিছুটা মুক্ত স্বাধীনতার মধ্যেই। কবি যখন তাঁর ছেলেবেলার স্মৃতিচারণ করতেন, গ্রামের মুহুরি নদী, নদীতীরের অজস্র রক্তচূড়া গাছ এবং সবুজ-শ্যামল প্রকৃতির অকৃপণ মায়া মধুর কথা গল্পের মতো বর্ণনা করতেন।
তাঁর এসব স্মৃতিচারণ শুনতে শুনতে আমরাও কল্পনায় গাঁয়ের শ্যামল সবুজ বনে হারিয়ে যেতাম। কবি শামসুল ইসলামের প্রধান শখ ছিলো লেখালেখি, বইপড়া। একাকী অকারণে ঘুরে বেড়ানো। একসময় বন্ধুদের সঙ্গে প্রচুর আড্ডাও দিতেন। তিনি যখনই সাহিত্য আড্ডায় আলোচনা করতেন, তাঁর প্রিয় কবিদের নাম বলতেন। তাঁর প্রিয় কবি কে জানো? কবি ফররুখ আহমদ, সুধীন দত্ত, কবি আবুল হোসেন প্রমুখ ছিলেন তাঁর প্রিয় কবি।
কবি শামসুল ইসলাম কবিতা লেখার ফাঁকে ফাঁকে গল্পও লিখতেন। তাঁর প্রথম প্রকাশিত ছড়ার বই হলো- ‘বাকবাকুম ও ইস্টিমিষ্টি’। বড়দের জন্যও তিনি বেশ কয়েকটি বই রচনা করেন।
কবির লেখা একটি ছড়া-
তালুক-মালুক শালুক ফুল
শালুক ফুলের মিষ্টি মূল।
মিষ্টি মূলের বসত কই?
নেই যেখানে জলের থৈ।
জল থৈ থৈ ইষ্টিপুর
ইষ্টিপুর আর কতদূর
ভেসে যেতে বর্ষ সাল
ডুব সাঁতারে ঘণ্টাকাল।
কবি শামসুল ইসলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা সাহিত্যে এম.এ. করেন। পশ্চিম জার্মানির কেলনে বেতার সাংবাদিকতায় তিনি ডিপ্লোমা করেন। তিনি প্রথমে বাংলা কলেজে অধ্যাপনা করেন। এরপর ১৯৬৮ সালে বাংলা একাডেমিতে সংকলন কর্মকর্তা হিসেবে চাকরিতে যোগদান করেন। একই বছর তিনি চট্টগ্রাম বেতার কেন্দ্রে অনুষ্ঠান বিভাগে যোগদান করেন। কবি বাংলাদেশ বেতারের উপপরিচালক পদে অধিষ্ঠিত হয়ে অবসরে যান।
কবি শামসুল ইসলাম মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত সাংবাদিকতায় জড়িত ছিলেন। তিনি দৈনিক নবজাত, অবজারভার, বাংলার বাণীর সাহিত্য সম্পাদক ছিলেন। তার সর্বশেষ কর্মস্থল ছিল দৈনিক দেশ বাংলা। বার্ণিক নামে তিনি একটি সাহিত্য পত্রিকাও বের করতেন।
কবির প্রথম কবিতা প্রকাশিত হয় স্কুলজীবনে। এ কবিতাটি প্রকাশিত হয় ‘সাপ্তাহিক তালিমে’। তিনি ধর্মপুর গ্রামে ‘কবিতা বিতান’ নামে একটি কবিতা চর্চা কেন্দ্রও প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর কবিতা, ছড়া, শিশুসাহিত্য, গল্প, উপন্যাস, নাটক, রূপকথা, অনুবাদগ্রন্থসহ প্রায় অর্ধশত গ্রন্থ প্রকাশিত হয়। তিনি একজন গীতিকারও ছিলেন।
কবি শামসুল ইসলাম কবিতায় অবদানের জন্য বাংলা একাডেমি পুরস্কার লাভ করেন। এছাড়াও জীবনে তিনি অনেক সম্মাননা ও পদক লাভ করেন। এর মধ্যে পারাপার সাহিত্য পুরস্কার, ত্রয়ী সাহিত্য পুরস্কার, পদ্মপদক, কবি আহসান হাবীব সাহিত্য পুরস্কার, বাংলাদেশ রাইটার্স ফাউন্ডেশন পুরস্কার, সাদত আলী আকন্দ পুরস্কার উল্লেখযোগ্য।
আত্মগৌরব বোধ ও আত্মবিশ্বাস জাগানোই ছিল কবি শামসুল ইসলামের উদ্দেশ্য। তার রচনার গুরুত্ব অসাধারণ। তিনি চিরদিন সংস্কৃতির সেবা করে গেছেন। লাভ করেন নানা মনীষীর সাহচর্য। বাংলা সাহিত্যের নীরব সাধক এই মনীষী এখন আর আমাদের মাঝে নেই। তিনি তাঁর সাহিত্য কীর্তির জন্য নিশ্চয়ই অমর হয়ে থাকবেন।
প্রকাশকাল: ফেব্রুয়ারি ২০২৫


