পদ্মাদীঘিতে রানি যাবেন স্নানে

0
1

১.
সেই এক কাল-মহাকালের ভেতরেই কোনো এক সময়কালে। এই ভূ-জগতে এই যুগেও সেই দেশটা আছে কি না তা যায় না বলা কিছুই।
দেশ বলি কিংবা রাজ্য, কিংবা সাম্রাজ্য, তারও ছিলেন এক রানি । ছিলেন এক রাজাও। কিন্তু সারা দিনমান রাজার নেইকো কোনো কাজ-কাম। সিংহ-খচিত পালঙ্কে পরিপাটি করে পাতা রাজ-বিছানা। রাজা এরই উপর গ্যাঁট মেরে বসেন সক্কাল বেলা। বসে বসে আধশোয়া হয়ে, কখনো গড়াগড়ি খেয়ে খেয়ে যায় বেলা, যায়রে রাত-অবধি। সুন্দরী রূপসী দাসী বাঁদিরা সুঠামদেহী সুস্বাস্থ্যবান চাকর-বাকর দাস-গোলামরা সার সার বেঁধে ধামা ধামা গাজর ভাজা, সুরাহি ভর্তি সুপেয় পানি সুমিষ্ট শরবত নিয়ে আসে। ভাজা গাজরে মাখানো বিট লবণ। সবটাই খান রাজা কটর মটর সটর।
কখনো-সখনো রানি এসে রাজাকে হাই-হ্যালো করে যান। মুখে মুখে বলেন : আজ কেমন আছো?
রাজা ওতেই খুশি। আহ্লাদে মুখে হাসি ফুটে ওঠে। তৃপ্তির হাই তুলে রাজা বলেন : আজকের গাজর প্রিপারেশনটা জব্বর হয়েছে।
রানি মুখ ফিরিয়ে চলে যেতে যেতে বলেন : বেশ! দাঁতের এক্সারসাইজ চালিয়ে যাও।
বেরুনোর দরজার পাশে দাঁড়কাকের খাঁচা। দাঁড়কাক রাজার অতি প্রিয় পোষা পাখি।
রানি বেরিয়ে যাওয়ার সময় খাঁচায় লাগে তাঁর হাতের ঝাপটা। ওদিকে দরজার দুপাশে দাঁড়ানো দুই সিকিউরিটি গার্ড। দরজার ওপাশেই রানির জন্য অপেক্ষা করছে তাঁরই বডিগার্ডরা। রানি দরজা দিয়ে বেরিয়ে আসার সময় তারা তাদের পায়ের বুটজুতোয় খটাস আওয়াজ তুলে জোরসে স্যালুট ঠোকে। সেই খটাস আওয়াজে পিলে চমকায় দাঁড়কাকের। হাউমাউ পড়িমড়ি করে খাঁচা থেকে পালিয়ে উড়াল দিয়ে এসে বসে রানির কাঁধে।
রানি মহাবিরক্ত। নাক-চোখমুখ তাঁর যায় কুঁচকে। কাঁধে বসা দাঁড়কাকটাকে ঝটকা দিয়ে বলেন: আমার কাছে কী? যা ভাগ! তোর রাজার কাছে যা।
ভয় পেয়ে দাঁড়কাক আবার উড়াল দেয়। তাই বলে রাজার কাছেও যায় না সে। ফিরে এসে ঢোকে খাঁচাতেই। দুই পাখনার ঝাপটায় বন্ধ করে দেয় খাঁচার আগল।
আর রানি গটর-মটর-চটর করে হাঁটা দেন। তাঁর কত-শত কাজ! কত্তো কাজ!
রানি দাপিয়ে বেড়ান পুরো রাজ্যে। আশে পাশে পেছনে পেছনে উজির-নাজির, সিপাহসালার কোতোয়াল, পাইক, বরকন্দাজ।
রানি বলেন : হা।
চারপাশে আওয়াজ ওঠে : হা।
রানি বলেন : হু।
শুরু হয়ে যায় দম-না-ফেলা : হু।
আর ওদিকে দুষ্ট ঘুঘু রাজ্য জুড়ে ভিটে চষে ধান খেয়ে যায়। সেদিকে নজর নাইকো কারো।
রানি রাজদরবারে বসেন নিত্যদিন। রাজপ্রাসাদের কাছেই বিশাল দরবার মহল। সকাল-বিকাল রানি সেই মহলে আসেন। দরবারে বসেন। কত্তো কাজ তাঁর কত্তো কাজ!
কাজ-কম্মের ফাঁক-ফোকরেই কখনো কখনো সময় বের করে নিয়ে রাজ্য পরিভ্রমণে বের হন। নিজ চোখে প্রজা দর্শন করেন।
কখনো ভিনদেশের যুবরাজের বেশ। কখনো সওদাগর। কখনো ইরান-তুরান দেশের কন্যা। নানান ধরনের ছদ্মবেশ।
সেসময় বেশ-বাস ভোল পাল্টে সাথে থাকেন উজিরে আলা আর চিফ সিকিউরিটি।
রানি বছরে এক-আধবার শিকারেও যান। পাশের জঙ্গলে। যান হরিণ শিকার করতে। সাথে নিয়ে ফিরেন ছাগল, না হয় বনমোরগ। শিকার যেটাই হোক না কেন, রানির শিকার তো! রাজপ্রাসাদে রানির জয়জয়কার চলে।
রানি সপ্তাহে একবার যান দীঘিতে। প্রতি সোমবার। টলটলে পানিতে বড় বড় পদ্মপাতা আর পদ্মফুল ভাসে। ভাসে লাল গোলাপের পাপড়ি। পাপড়ি এতো এতো পরিমাণ যে টলটলে পানি দেখাই যায় না। গোলাপের সুবাস মৌ-মৌ করে চারপাশ চারদিক। দীঘির দশ দিকে দশটি নহর। বিশুদ্ধ জলস্রোত খলবল খলবল করতে করতে স্রোতের টানে ভেসে আসছে; পানিতে পানিতে ভরিয়ে দিচ্ছে দীঘি।
রানি তাঁর সখীদল নিয়ে এই দীঘিতে আসেন। পানিতে তরঙ্গ ওঠে। তরঙ্গ উত্তাল হয়।
দীঘির পাশে রয়েছে আরো এক মহল। রানি স্নান শেষে এই মহলে আয়েশ করেন। দীঘি আর মহল ঘিরে রয়েছে বিশাল প্রাচীর আর প্রাচীর ঘেঁষে বিশাল বিশাল গাছ।
এই মহলে কোনো পুরুষের ঢোকার অধিকার নাই। এমনকি পুরুষ প্রহরীদেরও। রানির খাস বাঁদিরা খঞ্জর হাতে রানির নিরাপত্তার জন্য পাহারায় থাকে।
রাজপ্রাসাদ থেকে রানির দীঘি অনেক অনেক দূর। রাজপ্রাসাদ হলো রাজধানী শহরের এই মাথায়। আর দীঘি হলো পুরো শহর পেরিয়ে একেবারে ঐ মাথায়। এই মাথা থেকে ওই মাথায় পাড়ি দিতে হয় রাজধানীর প্রধান রাজপথ ধরে রানির স্পেশাল ষোলোঘোড়ায়-টানা টমটম গাড়িতে। প্রতি সোমবার সকালে রাজপথে সাজ-সাজ রব ওঠে।

২.
এবারের সোমবারও একই ঘটনা।
সেনা ছাউনির গর্ত থেকে পিলপিল করে বেরিয়ে এলো রানির স্পেশাল সিকিউরিটি ফোর্স। গায়ে বর্ম। মাথায় শিরস্ত্রাণ। এক হাতে বল্লম। আরেক হাতে ঢাল। কুচকাওয়াজ করতে করতে তারা রাজপ্রাসাদ থেকে রানির দীঘিতে যাওয়ার প্রধান রাজপথে ছড়িয়ে পড়ল। পথের দুই পাশে যুদ্ধ-প্রস্তুতির টান টান ভঙ্গিমায় তারা সার সার দাঁড়িয়ে পড়ল। এই সিপাইগুলো কিন্তু পুরুষ নয়। মহিলাও নয়। খোজা। জোয়ান-তাগড়া লোকগুলোকে বিশেষ প্রশিক্ষণ দিয়ে গড়ে তোলা হয়েছে। এরা শুধু বোঝে ও মানে ওপরওয়ালার কমান্ড। এদের মগজে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে- রানিই সর্বেসর্বা।
ওরা রাজপথের দুই পাশেই সারিবদ্ধভাবে দাঁড়ায়। কিন্তু এদের কারোর মুখই রাজপথের দিকে নয়। ওরা তাদের মুখ উল্টোদিকে ঘুরিয়ে রেখেছে। এর কারণ অনেক। রানির সাথে সাথে চলে সামনে আর পিছনে বিশাল বিশাল সিকিউরিটি ফোর্স। রাজপথের ঝুট-ঝামেলা বিপদ-আপদ তারাই সামলাবে। রাজপথের দুই পাশের ফৌজরা সামলাবে যার যার মুখের দিককার হামলা। আবার কোনো ফৌজও শত্রুপক্ষের কাছ থেকে টাকা-পয়সা খেয়ে বা নিজেই কোনো কারণে ক্ষেপে-টেপে গিয়ে রানির বহরে হামলা না চালায়; সেটাও সামাল দেওয়া হয় এভাবে। কারো যদি হামলা করার ইচ্ছা করেও, তাহলে সে পিছন দিকে ঘুরতে ঘুরতেই অন্যরা তার মতলব টের পেয়ে যাবে এবং তাকে সাথে সাথে দমন করতে পারবে। রানি নিজেও এদেরকে তাঁর নিজের চেহারা দেখাতে চান না।
রাজপথে ফৌজ দাঁড়িয়ে পড়ার সাথে সাথে রাজপথ আর সাধারণ প্রজাকূলের থাকে না। রাজপথে চলাচল তাদের জন্য নিষিদ্ধ হয়ে যায়। পথ ধরে যে যতটুকু এসেছে, তাকে সেখানেই থমকে যেতে হয়। তার আর এগুনো হয় না, পিছনেও যেতে পারে না। যেখানে তাকে থামিয়ে দেয়া হয়, সেখানেই তাকে থমকে থাকতে হয়- যে পর্যন্ত না রানি তাঁর দীঘি মহলে পৌঁছাচ্ছেন। তিনি দীঘিতে নামলেই সেই খবরটা ধাপে ধাপে পৌঁছে যায়। তখন ফৌজরা নিজেদেরকে গুটিয়ে নেয়। পাবলিকের চলাচলের জন্য রাজপথ খুলে দেয়। রাজপথ আবার ব্যস্ত। লোক চলাচলে সরগরম হয়ে ওঠে।
এই সোমবারেও একই দৃশ্য। রাজপথের দুই পাশে ধপাধপ দাঁড়িয়ে গেল ফৌজিরা। আর থমকে গেল প্রজাসাধারণ। পুরো পথটাতেই লোকজন যানবাহন গিজগিজ করছে। এতোক্ষণ ধরে হল্লা চলছিল। রানির স্পেশাল ফৌজ দেখেই তারা ঘটনাটা বুঝতে পারল। মুহূর্তে সবাই দাঁড়িয়ে পড়ল। থেমে গেল সব কোলাহল।
কে কথা বলবে? এমনকি ফিসফিসিয়েও? জনতার মাঝে ছড়িয়ে আছে রানির গুপ্তচররা। একটু এদিক-ওদিক বলা-কওয়া হলে কিংবা বেতাল কিছু ঘটার সম্ভাবনা দেখলে সাথে সাথে খবর চলে যায় যথাস্থানে। অমনি লোকটাকে বা লোকগুলোকে ধর-পাকড় করা হয়। সাথে সাথে পাঠিয়ে দেয়া হয় বন্দিশালায়। না হয় গুম করে দেয়া হয়।
কোতোয়াল এলো ঘোড়ায় চেপে। সারা রাস্তায় ঘোড়ার চারটে পায়ের খটাখট আওয়াজ। দুলকি চালে ঘোড়া যাচ্ছে রাজপথের এমাথা-ওমাথা। কোতোয়াল নিজ চোখে দেখতে এসেছে রানির নিরাপত্তার ব্যবস্থা। সুপার হাই সিকিউরিটি বলে কথা। গাফিলতিতে গর্দানটা মুফতে হারাতে চায় কে!
পাহারাদার ফৌজিদের একজন ঘাড় ঘুরিয়ে রাজপথের দিকে তাকিয়েছিল। ঘোড়ার খুরের শব্দে বোধহয় কৌতূহল হয়েছিল রাজপথ ধরে কে যাচ্ছে তাই দেখতে। অমনি কোতোয়াল ঘোড়ায় চেপে বসেই তার চাবুক চালিয়ে সপাং বসিয়ে দিলো। ধুরুম আওয়াজ তুলে রাজপথের ফুটপাতে পড়ে গেল সিপাই। অন্য দুই সিপাই তাকে ধরাধরি করে তুলে নিয়ে আটকে রাখল বন্দিশালায়। তার জায়গায় পাহারায় দাঁড়িয়ে গেল আরেক সিপাই।
কোতোয়ালের ঘোড়া এগিয়ে চলল সামনে। এগুতে এগুতে রানির দীঘির ফটকের সামনে। সেখান থেকেই আবার অ্যাবাউট টার্ন।
রাজপ্রাসাদের কাছে এসে ঘোড়া থামল। প্রাসাদের প্রধান তোরণের পাশে ঘোড়াটাকে দাঁড় করিয়ে রাখল।
অপেক্ষার পালা- রানি কখন বেরুবেন!
রাজপ্রাসাদ থেকে বেরিয়ে এলো রানির খাস চিফ সিকিউরিটি। সিংহদরজার পাশে অপেক্ষায় থাকা ঘোড়সওয়ার কোতোয়ালকে দেখে তার চোখ-মুখ কটমটে হয়ে উঠল। কোতোয়ালের আপাদমস্তকে চোখ বুলিয়ে তাকে যেন ভস্মীভূত করে দিতে চাইল। গম্ভীর কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল: সব ঠিকঠাক তো?
কোতোয়াল আহ্লাদে যেন গলে গেল। গদগদ গলায় বলল: জি স্যার! আমি নিজে সব দেখে নিয়েছি।
চিফ সিকিউরিটির কণ্ঠস্বরে কোনো তারতম্য নেই। একইভাবে বলল: বেশ। আবার চলো, ব্যবস্থাপনাটা আবার দেখে চেক করে আসি। আমার পিছনে পিছনে এসো।

৩.
সামনে চিফ সিকিউরিটির ঘোড়া। পিছনে কোতোয়াল। আবার এই মাথা ঐ মাথা। রাজপ্রাসাদ থেকে রানির দীঘি। আবার রানির দীঘি থেকে রাজপ্রাসাদ।
কোতোয়ালের দিনকাল ভালো যাচ্ছে না। বেশ চাপে রয়েছে। কানাঘুষোয় শুনেছে, রাজপ্রাসাদে তার বিরুদ্ধে অনেক ফরিয়াদ উঠেছে। ফরিয়াদগুলো এখনো রানির কানে তোলা হয় নাই, সব এসে জমেছে রানির খাস চিফ সিকিউরিটির কাছে। আজকেই একটা সুযোগ মিলেছে চিফ সিকিউরিটিকে খুশি করার।
রাজপথের ঠিক মধ্যিখান দিয়ে চলতে চলতে কোতোয়াল বরফ গলানোর জন্য অনেক কথাই পাকাচ্ছে। চিফ সিকিউরিটির মুখমণ্ডল থমথমে। কোতোয়ালের কথা শুনতে পাচ্ছে কি পাচ্ছে না, বোঝা যাচ্ছে না।
ওদিকে চড়চড় করে রোদ বাড়ছে। রাজপথের দুই পাশে ভিড়ও বাড়ছে। কর্মব্যস্ত মানুষজন থমকে গিয়েছে রানির চলাচলের রাজপথের দুই পাশেই। হাল্কা হল্লারও আওয়াজ উঠছে বুঝিবা। কোতোয়ালের ইচ্ছা করছে ধমকে লাঠিচার্জ করে সবকিছু চুপ করিয়ে দেয়। কিন্তু বসের সামনে এসব কোনো কিছুই করার সাহস পাচ্ছে না।
রাজপথের মাঝখান দিয়ে দুলকি চালে ঘোড়া ছুটিয়ে যাচ্ছে রানির খাস চিফ সিকিউরিটি আর রাজধানী নগরীর কোতোয়াল।
আচমকাই এক বিপত্তি। চার-পাঁচ বছরের এক বাচ্চা রাজপথের এপাশ থেকে ওপাশে যাওয়ার জন্য লাগিয়েছে ছুট। রাজপথের ঠিক মাঝখানে এসেই ধপাস। ধুলোয় লুটোপুটি। আর পড়বি তো পড় ঠিক দুটি চলন্ত ঘোড়ার সামনে। চিফ সিকিউরিটির ঘোড়া পা তুলেছিল, অল্পের জন্য লাথি পড়েনি বাচ্চার গায়ে।
দুটো ঘোড়ারই লাগাম টেনে ধরা হয়েছে। হঠাৎ থেমে যেতে হলো বলে দুটি ঘোড়াই তারস্বরে চিঁহিঁ রবে চিৎকার করে উঠল। রাজপথের দুই পাশ থেকে দুই সিপাই দুই বল্লম বাগিয়ে রে-রে করতে করতে ছুটে এলো। যেন এখনই তারা বাচ্চাটিকে এফোঁড়-ওফোঁড় করে দেবে। তার আগেই এক মহিলা ছুটে এসে ছোঁ দিয়ে বাচ্চাটাকে কোলে তুলে নিল। সিপাই দুটো এসে দাঁড়াল মহিলা ও বাচ্চার দুই পাশে।
কোতোয়াল খেঁকিয়ে উঠল: কার বাচ্চা এটা?
চিফ সিকিউরিটি মহিলার দিকে তাকিয়ে ধীর কণ্ঠে বলল: এই বাচ্চা তোমার?
মহিলা আমতা আমতা করে বলল: জি… আমার… মানে ঠিক আমার নয়… এখন আমার কাছেই… মানে আমি মা হয়ে আছি… আসলে বাচ্চাটাকে আমার পড়শির কাছ থেকে ভাড়ায় নিয়ে এসেছি।
মহিলার কথার আগা-মাথা কিছুই বুঝতে পারল না কোতোয়াল। আরো জোরে খেঁকিয়ে উঠল: মানে?
মহিলা বাচ্চাটিকে বুকে জড়িয়ে নিল। সিপাই-সান্ত্রী দেখে বাচ্চাও ভয়ে সিঁটিয়ে রয়েছে। দুই হাতে জড়িয়ে রেখেছে মহিলার গলা।
মহিলা কাঁপা গলায় বলল: ভিক্ষে করি তো। মানুষজন মা আর বাচ্চা দেখলে খুউব দয়ালু হয়ে ওঠে। পয়সাপাতি দেয়। তাই পড়শির বাচ্চাটাকে ভাড়া করে এনেছি। খুব দুষ্টু বাচ্চা। কী সাহস! রানির রাস্তায় দৌড়ায়!
কোতোয়াল হেঁকে উঠল: ভাগ এখান থেকে। তোদেরকে যেন এই তল্লাটে আর না দেখতে পাই।
মহিলা বাচ্চাটিকে নিয়ে পড়ি-মরি কাটতে চাইছিল। আটকে দিল চিফ সিকিউরিটি। ভুরু কুঁচকে বলল: এই, দাঁড়া। উঁহু! তুই তো মহিলা নোস। মেয়েদের মতো করে রং মেখেছিস। শাড়ি পরেছিস। কিন্ত মহিলা তো মনে হচ্ছে না তোকে।
মহিলাকে থমকে দাঁড়াতেই হলো। ধরা পড়ে চোখে-মুখে তার আতঙ্ক। কাঁপা কাঁপা গলায় বলল: না না স্যার, তাই বলে আমি পুরুষ মানুষ নই।
ধন্দটা বুঝতে পারছে না কোতোয়াল। সন্দিগ্ধ কণ্ঠে বলল: তাহলে তুই কে?
মহিলা মাথা নত করে বলল: বলতে পারেন স্যার, আমিও এক ধরনের খঞ্জ।
চিফ সিকিউরিটি পাশে দাঁড়ানো সিপাই দুজনের দিকে তাকিয়ে হুকুম দিল- এটাকে আর বাচ্চাটাকে ধরে নিয়ে যাও। পরে ওদের ব্যবস্থা করছি।
এই কথা শুনতে পেয়ে মহিলা চোখ তুলে চিফ সিকিউরিটির দিকে তাকাল। চোখ দুটি বুঝিবা চিকচিক করে উঠছে। বলল- বেশ হয় স্যার, আমাদেরকে ধরেই নিয়ে যান। তাহলে খাওয়া-পরার চিন্তা আর থাকে না। রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে ঘুরে হাতও আর পাততে হয় না। ঐ সিপাইগুলো তো এখন আমারই মতোন। ওদের সাথেই এমন একটা চাকরি আমাকেও দেন না স্যার।
সিপাই দুটির খুব অপমান বোধ হলো। মহিলাকে আর বেশি কথা বলার সুযোগ না দিয়ে হিড়হিড় করে টেনে রাস্তার একপাশে নিয়ে গেল।

চিফ সিকিউরিটি ঘোড়ার মুখ ফিরিয়ে নিল রাজপ্রাসাদের দিকে। তার আগে কটমট তাকাল কোতোয়ালের দিকে। কাঁচুমাচু কোতোয়ালও তার ঘোড়া নিয়ে অনুসরণ করল চিফ সিকিউরিটিকে।
৪.
রাজপথের দুই পাশেই গিজগিজ লোক। বেলা যতো বাড়ছে, লোকজনও বাড়ছে। সাথে সাথে বাড়ছে চলাচলের বাহনও। ঘোড়ার গাড়ি, টমটম, এক্কা, আরোহী নিয়ে শুধুই ঘোড়া, গাধা, হাতি, গরুর গাড়ি, টাঙ্গা, ঠ্যালা, এমনকি সারি সারি উট, পাল্কি পর্যন্ত। মানুষজন পশু-প্রাণী যানবাহনে একাকার। সব ভিড় দুই পাশে। রাজপথের মাঝপথ ফাঁকা। চড়চড় করে রোদ বাড়ে। রোদের তালে তালে জনতার মেজাজও সপ্তমে চড়তে থাকে।
সবাই তাকিয়ে রয়েছে খোলা রাজপথের দিকে: কখন রানি আসবেন! হাতি-ঘোড়া দাসী বাঁদি সখি সঙ্গিনী প্রহরী দারোয়ান। রানি এমন হুলুস্থুলের মধ্যে হুলুস্থুল করেই পাড়ি দিবেন রাজপথ। বাজবে কাড়া-নাকাড়া ঢোলক-বাদ্য। এর মাঝেই রানিকে এক ঝলক দেখা যাবে কি যাবে না!
তারপর শান্তি সিপাইদের। টান-টান উত্তেজনার ডিউটি ফুরোবে। ফিরে যেতে পারবে ছাউনিতে। শান্তি হবে প্রজাদের ঘোড়া, গরু, মোষ, উটের। তখন রাজপথ থাকবে তাদের দখলে।
উটের পিঠে কবিরাজ দাদু। এখান থেকে চার মাইল দূরে শহরের মাঝখানে তাঁর দাওয়াখানা। ইমারজেন্সি রুগী ভর্তি হয়েছে গতকাল বিকেলে। পাকস্থলিতে কর্কট রোগ। রুগী তাঁর হাত জড়িয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলেছে: আপনিই আমার মা-বাবা। আমাকে বাঁচান। এই সুন্দর ধরাধামে আমি আরো কটা দিন কাটিয়ে যেতে চাই।
রুগী বয়সে তরুণ। বেঁচে থাকার আকাঙ্ক্ষা তার স্বাভাবিক। সৃষ্টিকর্তা কেন যে এদেরকে অসময়ে উঠিয়ে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করেন, এ রহস্য বোঝা দায়!
কিন্তু রুগীর অবস্থা সঙ্গীন। কবিরাজ দাদু সারারাত ছটফট করেছেন। শাস্ত্র ঘেঁটেছেন। ঘরে ফিরে বিশ্রামের বিছানায় না গিয়ে প্রদীপ জ্বালিয়ে পুস্তকের পর পুস্তকের পাতা উল্টিয়েছেন। অনেক ঘাটাঘাটি খাটাখাটুনির পর আবিষ্কার করেছেন এক নতুন বিধান।
বাড়ির পিছনেই তাঁর এক বিশাল ওষধি বাগান। কাউকে ত্যক্ত না করে লণ্ঠন জ্বালিয়ে নিজেই সেই বাগানে ঐ অতো রাতে ঢুকে প্রয়োজনীয় গাছ-গাছড়ার শিকড়-বাকড়-পাতা সংগ্রহ করেছেন। ছেঁচে-বেটে মধু মিশিয়ে তৈরি করেছেন মহার্ঘ ওষুধ। ওষুধটা যদি কাজ করে তাহলে শুধু রুগীই নয়, মানব জাতির জন্য এক বিশাল কল্যাণ হবে।
সকাল-সকালই গোছল-টোছল সেরে ঝোলায় সদ্য বানানো ওষুধ নিয়ে উটের পিঠে চেপেছেন। উত্তেজনায় টগবগ করছে সারাটা শরীর। রুগীর কান্নাভেজা মুখটায় বাঁচার আনন্দে হাসির দৃশ্যপট দেখতে মনটা আরো ছটফট করছে।
উটটাকে জোর কদমে তাড়িয়েই নিয়ে এসেছেন। কিন্তু এই তেমাথায় এসে যতো বিপত্তি। রানির জন্য রাজপথ বন্ধ। দাওয়াখানায় পৌঁছার জন্য ভিন্ন কোনো পথও নেই। রুগীর জন্য কবিরাজ দাদুর মনটা অস্থির হয়ে ওঠে। সকালেই অবশ্য নিজের পত্রবাহক পায়রাকে দাওয়াখানায় পাঠিয়েছেন। পায়রার পায়ে চিঠি বেঁধে দিয়েছেন। জানিয়েছেন কর্কট রোগের মোক্ষম দাওয়াই আবিষ্কারের কথা। জানতে চেয়েছেন রুগীর অবস্থা। খবর পেয়ে আশার আলোয় রুগীর মুখে নিশ্চয়ই হাসি ফুটেছে। বাবা, রাজপথে এই ঝামেলাটুকু কাটুক, আমি আসছি। প্রভু তোমার কল্যাণ করুন।
কিন্তু মনের অস্থিরতা তো কাটে না। পায়রাটা তো কোনো জবাব নিয়ে এখনো ফিরে এলো না। পায়রার কানে কানে বলে দিয়েছেন চটজলদি ফিরে আসতে। দাওয়াখানা আর রুগীর খবর জানাতে। এটাও জানিয়ে দিয়েছেন, তিনি রাজপথেই থাকবেন, তাঁকে যেন খুঁজে-পেতে নেয়।
এই পায়রাটি সুখের পায়রা নয়। খুব বিশ্বস্ত। বেশ বুদ্ধিমান। সুখ-দুঃখের সাথী। পালিয়ে বা হারিয়ে যাওয়ার কোনো সম্ভাবনা নাই। কারণও নাই।
অস্থিরতা যখন চরমে, মনটা আর কোনোক্রমেই মানছে না, তখনই পায়রাটিকে দেখা গেল। উড়তে উড়তে হয়রান হয়ে এসে বসেছে রাজপথের পাশে এক অট্টালিকার কার্ণিশে। ইতি-উতি তাকাচ্ছে। বোধহয় কবিরাজকেই খুঁজছে।
আচমকাই আবার উড়াল। আসমানে গোটা দুয়েক ডিগবাজি দিয়ে বসল কবিরাজের বাহুতে। পায়রাকে দেখেই কবিরাজের অস্থিরতা থেমে গেল। আমসি মুখটায় হাসি হাসি ভাব ফুটল। পায়রার পায়ের বাঁধা কাগজের টুকরোটা খুলতে খুলতে বলল: কিরে? খবর সব ভালো তো?
পায়রার চেহারা আর ভাব-সাব দেখে খবরের ভালো-মন্দ কিছুই বোঝা গেল না। কবিরাজ দাদু চিঠিটা খুলে নিয়ে পায়রার পিঠে হাল্কা হাত বুলিয়ে আদর করলেন। তারপর খুললেন চিঠি। দাওয়াখানার ব্যবস্থাপক লিখেছে-
“মাননীয় ওস্তাদজী, আসসালামু আলাইকুম। বা সমাচার এই যে দাওয়াখানার সকল অবস্থা ভালো। এখন যেই সকল রুগী ভিড় জমাইতেছে, সামলাইয়া লওয়ার জন্য আমরাই যথেষ্ট। আপনি দুপুরের ভোজনের পর দিবানিদ্রা সাঙ্গ করিয়া বৈকালবেলায় আসিলেও চলিবে। কর্কট-আক্রান্ত রুগীটি কয়েক মিনিট পূর্বে ইহলীলা সাঙ্গ করিয়াছে। তাহাকে লইয়া আপনার দুশ্চিন্তা করিবার কিছুই নাই। সে অবশ্য মারা যাইবার পূর্বে বারংবার আপনার নাম জপিতেছিল: কবিরাজ! যমরাজ!”

মুহূর্তে কালো হয়ে গেল কবিরাজ দাদুর মুখ। তাঁর ইচ্ছা করল উট থেকে লাফিয়ে নেমে পড়তে। এক ছুটে দৌড়ে নিজের বাড়িতে চলে যেতে মন চাইল।
চোখদুটো থেকে অবিরল পানি গড়াচ্ছে। আহারে! আর একটুখানি সময় পেলেই এই দাওয়াই বেচারাকে খাওয়ানো যেত। হয়তো সে বেঁচেও যেত।
কবিরাজ দাদুর থুতনিটা নেতিয়ে নেমে এলো বুকের উপর।

৫.
ওদিকে হাতিটা শুঁড় বারবার ওঠানামা করছে। একই স্থানে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকতে তার পোষাচ্ছে না। এই শহরটায় দাপট দেখিয়ে ছুটে বেড়াতে না পারলে কি কোনো মজা আছে? বোধহয় সে নিজেও টের পাচ্ছে, পিঠের আরোহী তার মালিকও উসখুস করছে। মালিকের অস্থিরতাই কি তাকে আরো তাড়া দিচ্ছে?
হাতির মালিক মানে শহরের সবচাইতে বড় মার্চেন্ট। সারা দেশে হাজারটা ব্যবসা তার। শুয়ে থাকে টাকার উপর। সে কি না এখন হাতির হাওদায় বসে রোদে পুড়তে পুড়তে সূর্যের তাপে মাথার চাঁদি ফুটাচ্ছে। তাও আবার এক-আধক্ষণের জন্য নয়, ঘণ্টার পর ঘণ্টা।
রানি তাকে বিশেষ আমন্ত্রণ জানিয়ে রাজপ্রাসাদে মোগলাই খানা আর ফলের রস খাওয়ান। রাজকোষে তারই খাজনা আর নজরানা বেশি। রাজা আর রানির বিয়েতে সবচাইতে বড় আর দামি তোফাটি সেই দিয়েছে। সাত রাজ্যের হিরা-মানিক জড়ো করলেও এমন তোফা হবে না। এইতো সেদিন জমকালো দরবার বসিয়ে রাজ্যের শ্রেষ্ঠ পদকটা রানি নিজ হাতে তাকেই দিলেন।
আর এখন সে-ই রানির স্নানের জন্য সব ব্যবসা-বাণিজ্য কাজ-কম্মো মুলতবি রেখে রাজপথের পাশে হাতির পিঠে বসে অপেক্ষা করতে হচ্ছে।
আর এদিকে সব্বোনাশ। তুর্কিস্তান থেকে একদল সওদাগর এসেছে। এখন তার দফতরে নিশ্চয়ই অপেক্ষা করছে। আর বিরক্ত হচ্ছে।
সারা জগতের মশহুর সওদাগর ওরা। চরকির মতো সারা দুনিয়ায় ঘোরাঘুরি করে। নিজেরা ব্যবসা-বাণিজ্য করে। আবার এক দেশের সাথে আরেক দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যের যোগাযোগ ঘটিয়ে দেয়, সেতুবন্ধন তৈরি করে দেয়। সেখান থেকেও ফায়দা তোলে তারা।

বেশ কয়েকটি জরুরি বিষয় আর ব্যবসা নিয়ে এই দলের সাথে বাতচিত হবে আজ। এখন ওরা যদি অপেক্ষা করতে করতে বিরক্ত হয়ে ওঠে, তাহলে তো এই রাজ্য থেকে পাততাড়ি গুটিয়ে চলে যাবে। এতে তার বা ব্যবসায়ীদের শুধু ক্ষতি নয়, পুরো রাজ্যের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ঘটবে।
ভাবতে গিয়ে দেশি মার্চেন্ট আরো অস্থির হয়ে ওঠে। হাতিও শুঁড় উঁচিয়ে গর্জে ওঠে। তার ভারী এক পা দিয়ে মাটি থাবড়ায়।

৬.
ওদিকে পাল্কিতে বসে আছেন কাজী সাহেব। চরম বিরক্ত। পাল্কি কাঁধে বহন করে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে তাঁরও চাইতে বেশি বিরক্ত আট বেহারা। আর কোনো কিছুই বহন না করেও শুধুমাত্র পাল্কি ঘিরে বল্লম হাতে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে চার প্রহরী সবার উপরই সবচাইতে বেশি বিরক্ত।
কাজী সাহেব পাল্কি থেকে মুখ বের করে সামনের প্রহরীকে জিজ্ঞেস করে: কিহে! তোমাদের রানি কদ্দূর এলেন?
প্রহরী এই প্রশ্নতেও বিরক্ত। কিন্তু কাজী সাহেবের সওয়াল বলে কথা। জবাব না দিলে বা এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে সেটা কাজীর দরবারের অবমাননা বলে গণ্য হবে। এর চরম শাস্তি। প্রহরী নাক-মুখ ভুরু-কপাল কুঁচকে রাজপথের উপর এক ঝলক নজর বুলিয়ে দেখে নিল। নিচু কণ্ঠে যেন কাজী সাহেব শুনতে পান এমনভাবে বলল- রানি হুজুরানি এই এলেন বলে!
কাজী সাহেব মুখ ঢুকিয়ে নিলেন পাল্কির ভেতর। আপন মনে গজগজ করতে করতে বললেন: আর এসেছেন! অকম্মার ধাড়ি একটা। কাজ নেই কম্মো নেই, সেজেগুঁজে এদিক-ওদিক ইতি-উতি ঘুরে বেড়ানো! রাজাটাও হয়েছে তেমনি অকম্মা অপদার্থ বৌয়ের ভেড়া। আর এদিকে আমরা কর্মব্যস্ত দায়িত্ববান লোকজন ধেড়ে রানিকে পথ দেয়ার জন্য রাস্তার একপাশে ঠায় আটকে থাকি!
রানিকে নিয়ে কাজী সাহেব বিরক্তির একশেষ। আসলে একধরনের ঈর্ষাও। ঐটুকু মেয়ে; বোমা মারলেও পেট থেকে এক ফোঁটা এলেম বেরুবে না। রাজপরিবারে জন্মেছে বলেই রানি । তা হোক, কিন্তু কাজীর কাজে বা তার ব্যাপারে নাক গলানো কেন?
কাজী সাহেব বিদ্বান ব্যক্তি। সাত রাজ্যের বিদ্যা তিনি ভেজে খেয়েছেন। রাজ্যের লোকজন তাঁকে বেজায় সম্মান সমাদর করে। সমীহ করে। তিনি যে ফয়সালা দেন, সেটাই মান্য করতে তারা বাধ্য। এমনকি রানি নিজেও উপরে উপরে তাঁকে সম্মান দেখান। কিন্তু রানিকে শাসন করার ক্ষমতা কি কাজী সাহেবের আছে?
এইতো গত সপ্তাহেই রানির দোষ কাজী সাহেবকে এড়িয়ে যেতে হলো। শাস্তি গিয়ে বর্তালো অন্যজনের কাঁধে।
রানি রাজ্যের পাশের জঙ্গলে গিয়েছিলেন হরিণ শিকার করতে। সাথে সাঙ্গ-পাঙ্গ ইয়ার-সখীদের বিশাল দল। সাজ-সাজ রই-রই কাণ্ড। হৈ-হৈ ব্যাপার। পাশের জঙ্গলে হরিণ যে দু-চারটে ছিল, মানুষজনের পায়ের ধুপধাপ, শুকনো পাতার মরমর-খরখর শব্দে হরিণ সবকটাই পগারপার।
পাশের গাঁয়ের এক বালিকা পোষা ছাগলটা নিয়ে এসেছিল বনে। ছাগলকে ঘাস আর গাছের পাতা খাওয়াবে বলে।
বালিকার হাত ফসকে ছাগলটি বনের ভেতর ইতল-বিতল দৌড়াতে থাকে। ছাগলের পিছনে পিছনে মেয়েটি।
এদিকে হরিণ বা হরিণ শাবক খুঁজতে খুঁজতে রানি আর তাঁর দলবল হয়রান। রানির এক সখী গাছের ফাঁক দিয়ে বাদামি রঙ্গের ছাগল দেখতে পেয়ে মনে করল ওটাই হরিণ। অমনি রানির কানে ফিসফিস। রানি তড়িঘড়ি করে আরেক সখীর কাছ থেকে ধনুক চাইলেন। রানির হাতে এসে গেল ধনুক। অন্য আরেক সখীর কাছে চাইলেন তীর। সে-সখী আবার তূণীর খুঁজে পায় না। অবশেষে তূণীর পাওয়া গেলে তার কাছ থেকে নিয়ে একটা তীর ধরিয়ে দেওয়া হলো রানির হাতে।
এরই মধ্যে ছাগল চলে গিয়েছে আরেক দিকে। ছাগলের জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে গাঁয়ের মেয়েটি। রানি অতশত দেখতে পাননি। টেরও পাননি। তাঁর পেয়েছে শিকারের ঝোঁক। হাতের কাছেই হরিণ। ছুঁড়ে দিলেন তীর।
সাথে সাথেই আর্তনাদ।
আরে! আরে! এটা তো মানুষের আর্তনাদ! বিষাক্ত তীরের ঘায়ে মাটিতে পড়ে তড়পাচ্ছে বালিকা।
সাথে সাথে হেকিমের তলব। কিন্তু বাঁচানো গেল না বালিকাকে।
বালিকার বাবা কাজীর দরবারে নালিশ ঠুকে দিল। আরজি জানালো হক ও ন্যায্য বিচারের জন্য।
কাজী সাহেব বললেন: বিচার হবে। ন্যায়বিচার। তিনি যিনিই হোন না কেন, বিচারে অপরাধী প্রমাণ হলে তাকে শাস্তি পেতেই হবে।
চাইলেই কি সব করা যায়? সবসময় কি সব করা যায়? ঘটনার বিবরণ, সাক্ষী-সাবুদ, আলামত, প্রমাণ সব যাচাই করে কাজী সাহেব দীর্ঘশ্বাস ফেলে রায় দিলেন: রানি নন, দোষ করেছে রানির সখী; যে রানিকে তীর দিতে দেরি করেছে। রানি তো আর দেখেননি যে ছাগল সরে গিয়েছে, ছাগলের জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে বালিকা। তীর সরবরাহে বিলম্বের কারণে বালিকা তীরবিদ্ধ। আর এই বিলম্বের জন্য দায়ী সখী। সেই দোষী। যেহেতু দোষী অভিযুক্তা সখী এখন অসুস্থ, তাই তার হাসপাতাল সাজা ডিম-কলা, দুধ-মাখন, মুরগীর স্যুপ সেবন সহযোগে। আর ঐ জঙ্গলটি সংরক্ষিত। সাধারণ প্রজার প্রবেশ নিষেধ। গাঁয়ের লোকটি এই নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে তার মেয়েকে ছাগলসহ সংরক্ষিত বনে পাঠিয়েছে। এইভাবে সে আইনভঙ্গ করেছে। অতএব ছাগলের মালিক বালিকার বাবা গেঁয়ো লোকটির বিরুদ্ধে পৃথক মামলা চলবে।
এই রায় ঘোষণা করে কাজী সাহেব মনে মনে নিজেই নিজেকে ধিক্কার দিয়েছেন।
রাস্তায় আটকা পড়ে গরমে আধা-সেদ্ধ হতে হতে তিনি ভাবছেন: আহা! কোনো একদিন রাজ্যের বিধি-বিধান পাল্টে কাজীর দরবারের ক্ষমতা আর কাজীর মর্যাদা যদি আরো বাড়িয়ে দেয়া হতো!
আজ কাজীর দরবারে অনেক মামলা। আরজিও অনেক। দিনে দিনে কোনো মামলা শেষ করতে না পারলে নিরপরাধ লোকজন হয়তো খামোকা বিনাবিচারে আরো একদিন বেশি কারাবন্দি থাকবে! রানির কাঁচা মাথায় এসব কি কখনো কাজ করে!

৭.
ধৈর্যের সাথে অপেক্ষা করছে অগুণতি লোক। ব্যবসায়ী, চাকুরে, ছাত্র-ছাত্রী, বৈদ্য, রোগী, পথচারীসহ সব পেশার সবধরনের লোক। এখনো অনেক দোকানপাট খোলা যায়নি। দোকানী তো এখনো দোকানে গিয়ে পৌঁছাতেই পারে নাই। দাওয়াখানা বন্ধ। বৈদ্য-হেকিম-কবিরাজ অনেকেই রাস্তায় আটকা। পাঠশালায় ছাত্র-ছাত্রীর হাজিরা পাতলা। অনেক শিক্ষক-ওস্তাদও এখনো পাঠশালায় গিয়ে পৌঁছাতে পারেন নাই। আপিশ-কাছারিও হাল্কা-পাতলা।

আর এজন্যই আটকে জমে থাকা মানুষগুলোর মধ্যে অস্থিরতা। ধীরে ধীরে গরম বাড়ছে। মানুষজনের ভিড়ও বাড়ছে। পরিবেশ উত্তপ্ত হয়ে উঠছে। গুনগুন ফিসফিসও শুরু হয়ে গিয়েছে।
পাঠশালার ছাত্র-ছাত্রীরা একপাশে। সময় কাটাতে ডাংগুলি খেলায় মনোযোগ দিলো। ফৌজিরা এসে তাতেও বাধ সাধল। ডাং এর গুটিও নাকি সময়ে সময়ে গোলাগুলির চাইতেও মারাত্মক হয়ে উঠতে পারে। রানির নিরাপত্তার বিষয় বিবেচনা এখন ডাংগুলি খেলাও বন্ধ।
ছাত্র-ছাত্রীরা আর কী করে! নিজেদের মধ্যে গাল-গল্প শুরু করে দিলো।
একটা ছেলে একা একপাশে দাঁড়িয়ে। কারো সাথে কথা বলতে ইচ্ছা করছে না। খুব টেনশন হচ্ছে। আজ তার পরীক্ষা শুরু। এরমধ্যেই পরীক্ষার আধা ঘণ্টা পেরিয়ে গিয়েছে। ওস্তাদের বেত তার পিঠে নিশ্চয়ই ভাঙবে। ভাবতে গিয়েই তার সর্বাঙ্গ কেঁপে উঠল। চোখ বেয়ে পানি গড়াতে লাগল। একটুপরেই চিৎকার দিয়ে কান্না। তার কান্নায় ছাত্র-ছাত্রীরা সবাই থমকে গেল। থেমে গেল তাদের হৈ-হুল্লোড়। ছুটে এলো ছেলেটার কাছে। তাই তো! সবারই তো একই সমস্যা! তারা সদলবলে হল্লা দিয়ে উঠল। এবার রানির নামে মুর্দাবাদ চলল।

৮.
সন্তানসম্ভবা এক তরুণী মাও যাচ্ছিল শাড়ির ঘের দেওয়া ডুলিতে চেপে। ব্যথায় সে কোঁকাচ্ছে। বিশেষ শল্য চিকিৎসায় তাকে প্রসব করানো হবে, তাই তাকে যেতে হচ্ছে হেকিমের চিকিৎসালয়ে। আর এদিকে রাজপথে চলাচল বন্ধ। এদিকে মানুষজনের ভিড়ে আটকে পড়েছে। ঐদিকে ব্যথা বাড়ছে তীব্র হয়ে। তার পাশেই আত্মীয়-স্বজনরাও অস্থির হয়ে উঠল। রুগিনীর অবস্থা সঙ্গীন। পেটের ভেতর বাচ্চাটা বুঝিবা হামাগুড়ি দিচ্ছে।
হঠাৎ নবজাতকের চিৎকার শোনা গেল। সাথে সাথে প্রসূতির আর্তনাদ।
বাচ্চা হাতপা ছুঁড়ছে। প্রসূতি মা নিস্তেজ।
নবজাতকের আওয়াজে হুর-রে রব উঠল ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে। কোরাসে ধ্বনি উঠল: রানি মা কী জয়!
কে একজন ফিসফিস করে বলল: রানি শুনতে বা জানতে পেলে খবর আছে। রানি এখনো তরুণী। মা হতে যাবেন কার! তিনি তরুণী নক্ষত্র হয়ে থাকতে চান প্রজাদের মনে অন্তরে।
ছাত্র-ছাত্রীরা আবারও জিগির তুলল: রানিজী কী জয়!

৯.
ওদিকে রাজপ্রাসাদে রানি। দুধের ফেনার মতো তুলতুলে বিছানায় ঠিক শিশুটির মতো ঘুমিয়ে আছেন। বেলা বয়ে যায়। ঘুম আর তার ভাঙে না।
বাঁদিরা একবার গোলাপ জল সাবান নিয়ে এসে ঘুরে যায়। রানি কি এবার হাত-মুখ ধোবেন?
বাঁদিরা আরেকবার নাশতাপানি ফলমূল ডিম দুধ নিয়ে আসে। নরম বিছানায় রানির হাল্কা পাতলা নিঃশ্বাস পড়ে। রানি বিভোর ঘুমে।
ওদিকে সখীরা সাজ-সাজ হয়ে তৈরি। রানির সাথে দল বেঁধে রানি দীঘিতে স্নানে যাবে। তারা রানি মহলের বাইরে অপেক্ষা করছে। সাথে যাওয়ার জন্য গায়িকারাও এসেছে। আর এসেছে নাচের দলও।
রানি ঘুমোচ্ছেন। তাদেরও অপেক্ষার পালা যেন শেষ হয় না। কী করা! কী করা! এমনি এমনি বসে থাকলে তো হাতে-পায়ে খিল ধরে যাবে!
ওরা প্রথমে লঘু চালে গান ধরে। তারপর নাচ। গানে আর নাচে রানি মহলের সামনে আসর গুলজার।
রানির হাই ওঠে। স্বপ্নের ভেতর গান-বাজনার কেমন যেন একধরনের গোলযোগ চলছে। রানির চোখের পলক নড়ে। রানি পাশ ফিরে শোন।
একটা চোখ পটাস করে খুলে যায়। পরপরই আরেকটা চোখও। হ্যাঁ তাইতো, তাঁর মহলের সামনে মিষ্টি গান।
রানি উঠে বসেন।
ছুটে আসে বাঁদিরা। রাজপ্রাসাদে সাড়া পড়ে যায়: রানির ঘুম ভেঙেছে। রানি উঠেছেন। রানি উঠেছেন।
রানি মিষ্টি করে হাসেন।
খাস বাঁদি এসে জানাল: মহারানি ! আজ রানিদীঘিতে স্নানে যাওয়ার দিন। সব তৈরি। সবাই তৈরি।
রানি আড়মোড়া ভেঙে বলেন: আজ শরীরটা ম্যাজ-ম্যাজ করছে। কোত্থাও যাবো না।

প্রকাশকাল: মার্চ ২০২৫