ভোরের নরম আলোর মাঝে ডানা মেলে দিয়ে একটি গাঙচিল নিঃশব্দে উড়ে চলেছে অতলান্তিক মহাসাগরের ওপর দিয়ে। সামনেই পাহাড়ি উপকূলের ধূসররেখা। সাগরের বুকে কোথাও পাহাড় চূড়ো জেগে আছে। ক্রমাগতভাবে অশান্ত ঢেউ এসে আঁছড়ে পড়ছে চুড়োগুলোর কাছে। সাদা ফেনারাশি ছিটকে উঠছে। সূর্যের আলোয় চিকচিক করছে। বেশ নিচু দিয়ে উড়ছিল গাঙচিলটা। তার চোখে পানির নিচের ভেসে চলা মাছেদের ঝাঁকের দিকে।
গাঙচিলটার চোখে পড়ল পানির নিচে তরতরিয়ে এগিয়ে যাওয়া দুটি চলমান কাল রেখা। সতর্ক হয়ে ডানা ঝাপটে অন্য পাশে সরে যায়। কিছুক্ষণের মধ্যে পানির ওপরে ভেসে উঠল চওড়া দুটি পিঠ। পিঠের ওপরে শক্ত পাখনা। ছোট প্রাণিটা চিৎকার করে পানি থেকে লাফিয়ে উঠল। ঘন ঘন নিঃশ্বাস ফেলতে থাকে প্রাণিটা। এরকম নিঃশ্বাস নেয়ার ফলে তার চারপাশে একটি ফোয়ারা তৈরি হয়। সাগরের বুকে ছিটকে উঠছে পানির ধারা। ভোরের আলো তার ওপরে পড়ে রংধনুর মতো ছটা তৈরি করেছে।
প্রাণী দু’টো অবশ্য সেসব দৃশ্য দেখছিল না। তখন ছোট্ট একটি সাথী এসে তাদের মাঝে উপস্থিত হল। দু’টো প্রাণী তাকে নিয়ে অন্য দিকে চলে যায়। সেই ভোরবেলাতে সাগরের বুকে জন্ম হয়েছিল একটি তিমিশাবকের। সে ছিল খুনে প্রজাতির তিমি।
সদ্য জন্ম নেয়া শাবকটি চোখ মেলে প্রথমবারের মতো প্রকৃতিকে দেখল। তার চোখে অপার বিস্ময়। নতুন এক জীবনের মুখোমুখি হয়েছে সে। অতলান্তিকের শীতল পানি যেন ডানার মতো তাকে দুলিয়ে ভাসিয়ে রাখছে। বুঝি সাগর তার কোলে ঠাঁই দিয়েছে তিমিশাবকটিকে।
প্রথম দিকে অবশ্য শাবকটির বেশ কষ্ট হচ্ছিল। ঝোড়ো বাতাসের জন্য সে আবার ঠিকমতো নিঃশ্বাস নিতে পারছিল না। শাবকটির মা ব্যাপারটি বুঝতে পেরে চলে আসে সন্তানের পাশে। তাকে ধীরে ধীরে ঠেলে ভাসিয়ে রাখার চেষ্টা করে। নতুন পরিবেশে শাবকটি অভ্যস্ত হয়ে ওঠে। সে নিজেকে মানিয়ে নিতে চায়। তার প্রাথমিক জড়তা ধীরে ধীরে কেটে যায়। সে বুঝতে পারে তাকে চার পাশের পরিবেশের সাথে খাপ খাইয়ে চলতে হবে। তা না হলে বিপদ ঘটে যেতে পারে। ছোট পাখনা দিয়ে পরিস্থিতিকে সামলানোর চেষ্টা করে।
শাবকটির মা শাবকটির এসব তৎপরতা লক্ষ্য করে। বেশ চটপটে হয়ে উঠছে তার সন্তানটি। যেন সে তার বিরোধী পরিবেশের মোকাবেলা করতে শিখছে। খুশি হয় মা তিমি। সন্তানের পাশাপাশি সাঁতরে চলে।
মা তিমিটি চাইছে শাবকটি যাতে ঠিকমতো সাঁতরাতে পারে। যাতে সে ভালভাবে সামনের দিকে তরতরিয়ে এগিয়ে যেতে পারে। বেঁচে থাকার জন্য অনেক কিছু শিখতে হয়। অনেক ধরনের সমস্যা হবে। ঘাবড়ে গেলে চলবে না।
মা তিমি শরীর দুলিয়ে কাত হয়ে শাবকটাকে দুধ খাওয়াতে থাকে।
তিমিদের চোখ তাদের শরীরের অনেক পেছনে আর নিচে থাকে। চোখ এত ছোট যে তাদের কপালের ওপরটা আর পেছনের মোটা শরীরটা তারা দেখতে পায় না। কিছু দূর যাবার পর শাবকটি তার বাবার কণ্ঠ শুনতে পায়। পেছনে পেছনে আসছে তার বাবা। মা তার ছেলেকে পাহারা দিয়ে নিয়ে চলেছে। বাবা জানে, নবজাতক শিশুকে নিয়ে সমুদ্রে সফর করা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। অনেক ধরনের বিপদের আশঙ্কা থাকে। বাবা তিমি তাই চার পাশে একটা নিরাপদ আস্তানা খুঁজছে। শিশুটাকে পানিতে ভেসে থাকার সঠিক পদ্ধতি শেখাতে হবে। এ সময় বিশাল একটা দাঁড় বা সাঁতারের অঙ্গ খাঁড়াভাবে পানির ওপরে থাকবে। মাঝে মধ্যে সেই অঙ্গ দিয়ে পানিতে আঘাত করতে হবে।
দেহটাকে পানির ওপরে বাতাসে ভাসিয়ে দিতে হবে। শুধু এর আগের অংশটা জেগে থাকবে। পানিতে পড়লে প্রচুর শব্দ হয়। মনে হয় যেন বাজ পড়েছে। বিরতি দিয়ে এ রকম বার বার পানির ওপর ওঠানামা করবে।
উত্তর থেকে তীব্র বাতাসের ঝাপটা এসে উপকূলের পাহাড়চূড়োর ওপরে আছড়ে পড়বে। অসংখ্য যাযাবর পাখি সেখানে কলকাকলি করছে। শিকারের ঝুঁকি না নিয়ে তিমি পরিবারটি সাগরের এদিক-সেদিক ঘুরছে। তিমিদের বিশাল লম্বাটে দেহটি মোচার আকারের। দেহের দু’দিক ক্রমশ সরু হয়ে গেছে। লেজটা শরীরের সাথে সমান্তরালভাবে বিস্তৃত। মাথার মাঝখানে নাকের ছিদ্র।
সন্ধ্যে ঘনিয়ে এলে তিমি তিনটি সরে গেল ডাঙার দিকে। সেখানে পানি কম বলে সাঁতার দেয়া কোনোভাবেই সম্ভব নয়। তিমিগুলো গড়িয়ে পড়ল বালিয়াড়িতে। শাবকটি সারা রাত মায়ের তলপেট ঘেঁষে পড়ে থাকে। একটানা গর্জন করে চলেছে অশান্ত সমুদ্র। পাহাড়চূড়োতে প্রচণ্ড শব্দ করে বাতাস বইছে।
সেখানে তিন দিন তিন রাত কাটায় তিমি পরিবারটি। শাবকটির অভ্যেস কিছুটা পাল্টিয়েছে। সবসময় আর মায়ের শরীর ঘেঁষে থাকতে চায় না। বাবা-মায়ের কাছ থেকে দূরে যেতে চায়। ওদের ছেড়ে চলে যায় বিভিন্ন দিকে। যখন বিশাল ঢেউগুলকে এগিয়ে আসতে দেখে তখন তাড়াতড়ি বাবা-মায়ের কাছে চলে আসে।
বাবা তিমিটি ভাবে এভাবে এক জায়গায় থাকার কোনো অর্থ হয় না। সে দূরে যেতে চায়। অজানা অঞ্চল যেন তাকে হাতছানি দিয়ে ডাকছে। একদিন ছেলে আর তার মাকে নিয়ে গভীর সমুদ্রের দিকে ভেসে চলে বাবা তিমি। যেখানে প্রচণ্ড স্রোত প্রবাহিত হচ্ছে। জীবন সেখানে প্রাণময়। সজীব, চঞ্চলতায় ভরা।
তিমি পরিবারটি তাই অতলান্তিকের উত্তর-পূবে এগিয়ে চলতে থাকে। কিছু দিন ভেসে চলে তিমি পরিবারটি পৌঁছাল স্কটল্যান্ডের উত্তর-পশ্চিম সীমান্তে। উপকূলভাগের খানিক দূর দিয়ে যেতে যেতে বাবা তিমি জায়গাটাকে ভাল করে পর্যবেক্ষণ করে। সমুদ্রের নিচ থেকে মাথা উঁচু করে রয়েছে। বিশাল ঢেউগুলো প্রবল বেগে সেগুলোর মাথার ওপর দিয়ে যাচ্ছে। একটু অসাবধান হলেই মারাত্মক বিপদ ঘটতে পারে। বাবা তিমিটি খুব সতর্কতার সাথে তার পরিবারটিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে থাকে। পরিবারের নিরাপত্তা তাকেই তো দেখতে হবে। তারা যাতে কোনো দুর্ঘটনায় না পড়ে। সবসময় এ বিষয়টি নিয়ে ভাবছে বাবা তিমি।
পুব দিকে বাঁক নিয়ে ওরা এগিয়ে যায় ওকান দ্বীপের দিকে। পাশাপাশি ভেসে চলেছে তিমি তিনটি। হঠাৎ করে বাবা তিমি শিকারের খোঁজে সমুদ্রের গভীর অন্ধকারে ডুব দেয়। শাবকটি কোথায় গেল তার বাবা খুঁজতে থাকে। তার বাবাকে কোথাও দেখতে পায় না। সমুদ্রের ঘন অন্ধকারের মাঝে বুঝি হারিয়ে গেছে তার বাবা। অনেক নিচ থেকে উঠে আসা একটা বিচিত্র ধরনের শব্দ শুনতে পায়। সেই শব্দ শুনে শাবকটি উৎকণ্ঠিত হয়ে ওঠে। এমন শব্দ সে এর আগে শোনেনি। মায়ের দিকে তাকিয়ে দেখে তার মুখে কোনো চিন্তা নেই। মা কেমন নিশ্চিন্তে রয়েছে। আসলে মা তো ভাল করেই জানে যে তার স্বামীটি শিকারের খোঁজে সমুদ্রের তলদেশে চলে গেছে। সেখান থেকেই পরিচিত শব্দ আসছে। তিমিরা নিজেদের মধ্যে ভাব বিনিময় করে শব্দের তরঙ্গ দিয়ে। মুখ দিয়ে এই তরঙ্গ সৃষ্টি করে চার পাশে ছড়িয়ে দেয়।
অন্য তিমিরা এই সংকেত বুঝতে পারে। এই তরঙ্গের সাহায্যে তিমিরা শিকারের অবস্থান ঠিকমতো জানতে পারে। মা বুঝতে পেরেছে যে এখন তার স্বামী কোথায় রয়েছে। মা তিমি তখন সেখানে যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নেয়। ঠিক সে সময় গভীর নিচ থেকে অদ্ভুত শব্দ ভেসে এল। প্রচণ্ড ঝাপটা ঝাপটির শব্দ। কিছুক্ষণ পর একটা লম্বা প্রাণী ডুবো পাহাড়ের গায়ে সজোরে ধাক্কা খেয়ে আছড়ে পড়ে। বাবা তিমিটার দাঁতের পিছনে জলজ প্রাণীটির অনেক অংশ ছিঁড়েখুঁড়ে গেছে। প্রাণিটি প্রচণ্ড আক্রোশে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত লড়াই করে গেছে। তাকে পুরোপুরি ঘায়েল করতে বাবা তিমিকে যথেষ্ট বেগ পেতে হয়েছে। শিকারটিকে মুখের ভেতর নিয়ে তার পরিবারের দিকে এগিয়ে যেতে থাকে। শাবকটি তার বাবার সেই ভয়ঙ্কর চেহারা দেখে ভয় পেয়ে যায়। শিকার তিমিটার ধারাল লেজের ঝাপটায় ওর বাবার শরীরের অনেকটা অংশ চিরে গেছে। তিমি পরিবারটি খাবার খেতে থাকে।
ঋতু বদলে যায়। শরৎকাল চলে আসে। তখন অতলান্তিকের ওপরে কুয়াশার স্তর জমে ওঠে। সমুদ্র শান্ত হয়ে যায়। স্যামন মাছের ঝাঁক পাড়ি দেয় দক্ষিণ দিকে।
এই মাছদের রয়েছে এক রহস্যময় দীর্ঘ ভ্রমণযাত্রা। এদের জন্ম হয় নদীতে। তারপর আসে সাগরে। এই যাত্রার সময় সাগর পাখিরা তাদের অনেককে ঝাঁক থেকে তুলে নিয়ে খেয়ে ফেলে। এভাবে চলতে চলতে বড় হয় তারা। একসময় সাগরে গিয়ে পৌঁছায়। তখন তারা পূর্ণ মাছ। আবার শেষ বয়সে কী এক আশ্চর্য রহস্যময় নিয়মে স্যামন মাছেরা তাদের জন্মস্থান নদীতে ফিরে আসতে চায়। আবার শুরু হয় তাদের ফেরার পালা। শাবকটি দেখল স্যামন মাছের ঝাঁককে ফিরে যেতে। খুনে তিমিরা চলার পথে সামনে যা পায় তাই খায়। খাবারের ব্যাপারে কোনো বাছবিচার করে না। দরকারের চাইতেই অনেক বেশি পরিমাণে মাছ হত্যা করে থাকে।
বাবা তিমি তার ছোট পরিবারটিকে নিয়ে সেখানেই থেকে যায়। সে জানে মাছেরা ঝাঁক বেঁধে বিদায় নিলেও সেখানে খাবারের কোনো ঘাটতি হবে না। খুদে চিংড়ি ক্রিল সমুদ্র ফেনায় ঝাঁকে ঝাঁকে আসে। এগুলো তিমির এক প্রিয় খাবার। এগুলো খেতে তাদের আর দাঁতের প্রয়োজন হয় না। তিমিরা ক্রিল খায় বেলিনের সাহায্যে। বেলিনের রয়েছে শক্ত পাত। পাতের কিনারা পালকের মতো। শক্ত পাতগুলো মুখের তালু থেকে ঝুলে থাকে। দেখতে অনেকটা ছাঁকুনির মতো। তিমিরা অর্ধেক চোয়াল বন্ধ করে পানি নিষ্কাশন করে। পানির মধ্যে থাকে ক্রিল ও অন্যান্য খুদে প্রাণী। ছাঁকনিতে আটকা পড়ে ক্রিল। তখন আটকা পড়া খাবার গিলে ফেলে। যেখানে ক্রিলেরা ঝাঁকে ঝাঁকে থাকে। তিমিরা সেখানে ধীরে ধীরে যায়।
শাবকটি তার বাবাকে দেখেছে ডুব দিয়ে খুদে চিংড়ির ঝাঁকের নিচে গিয়ে পানিতে ঘূর্ণি তুলতে। তাকে শিখিয়েছে মুখ দিয়ে বুদবুদ ছুড়ে দিতে। এতে ক্রিলকে সহজেই ঘূর্ণির কেন্দ্রে জড়ো করা যায়। এরপর চোয়াল ওপরে রেখে ঘূর্ণির কেন্দ্রে ভেসে ওঠা পুরো ঝাঁকটাকেই গ্রাস করা যায়। শাবকটাকে এভাবে সংগ্রহ করতে শিখিয়েছে বাবা তিমি।
কিছু দিনের মধ্যে সিল মাছেরা আসবে দল বেঁধে। বছরের এ সময়টাতে এখানকার সমুদ্রতীরেই কাটায় সিলেরা। খুব লাজুক স্বভাবের প্রাণী এই সিলেরা। সমুদ্রতটে থাকতে পছন্দ করে। রুপালি লোমে ঢাকা গোলমুখের কুতকুতে চাউনি। চোখগুলো বোতামের মতো। নাকের নিচে গোঁফ। থলথলে শরীর নিয়ে সমুদ্রতটে চিৎ হয়ে রোদ পোহায়। কখনো বালির গর্তে মুখ ঢুকিয়ে শান্তভাবে শুয়ে থাকে। মাঝে মধ্যে বিশাল মাথা তুলে ঝাঁকুনি দেয়। তিমিদের ব্যাপারে সিলেরা মোটেও সচেতন না।
বাবা তিমিটি ছেলেকে নিয়ে এ বছরে কোথাও যেতে চাইছে না শীতকালে এখানে থাকা অসুবিধে হবে জেনেও। বসন্তকাল পর্যন্ত টিকে থাকতে হবে। এরপর আর তাদের খাবারের জন্য চিন্তা করতে হবে না। প্রচুরসংখ্যায় নতুন নতুন শিকার এসে পড়বে। অঢেল খাবারের ছড়াছড়ি। তিমিশাবকটাও তত দিনে শক্ত সামর্থ্য হয়ে উঠবে। খাদ্য সংগ্রহ করাটা তখন আরো সহজ হবে।
একদিন পশ্চিমের আকাশটা ছেয়ে গেল ঘন কালো মেঘে। চার দিকে কেমন থমথমে ভাব। গুমোট একটা পরিবেশ। মাঝ সমুদ্রে শিকারে যাওয়া পাখিরা তীরের দিকে ফিরে আসতে শুরু করে। তারা বোধ হয় একটা পরিবর্তনের আভাস পেয়েছে। বুঝতে পেরেছে অতলান্তিক সাগর ফুঁসে ওঠার জন্য তৈরি হচ্ছে। ঘন ঘন বিদ্যুৎ চমকাতে থাকে। আকাশ চিরে যায় আলোর ঝিলিক। ঝড়ের প্রচণ্ড তাণ্ডব শুরু হয়ে যায়। অতলান্তিকের বিশাল জলরাশি ফুলে ফেঁপে ওঠে। তারপর সেগুলো একসময় বিশাল ঢেউয়ের আকার নেয়। ঢেউগুলো পাক খেয়ে ছুটতে শুরু করে।
তখন গভীর সমুদ্রে ছিল বাবা তিমিটি। সে আবহাওয়া জগতের পরিবর্তনটাকে অনুভব করতে পেরেছিল। কিন্তু সেটা যে এত স্বল্পসময়ের মধ্যেই এতটা ভয়াবহ হয়ে উঠবে তা বুঝতে পারেনি। সমুদ্রের বুকে বিপর্যয়ের সৃষ্টি হয়েছে। বাবা তিমিটা বুঝতে পারছে ভীষণ বিপদ ঘনিয়ে আসছে মাথার ওপর। সাগর উত্তাল হয়ে দাপাদাপি করছে। তার প্রধান চিন্তা হল পরিবারটিকে রক্ষা করা। বউ ছেলেকে তাড়িয়ে নিয়ে ছুটল উপকূলের দিকে। এখন চাই নিরাপদ একটি স্থান।
শাবকটির বয়স হয়েছে মাত্র এক সপ্তাহ। তাকে এখন তীব্র স্রোত বাড়ি মারছে। পিঠের ওপর ঢেউ এসে আছড়ে পড়ছে। সে ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়ে। তাকে দু’পাশ থেকে আগলে রেখেছে তার বাবা-মা। শাবক-টির মনে হচ্ছে ঢেউগুলো তাকে আঘাত করছে। তার এমন অসহায় অবস্থা দেখে বাবা তিমিটা বুদ্ধি করে ছেলে তিমির শরীরের ওপরে সমান্তরাল ভেসে সাঁতরাতে লাগল। এতে ছেলেটির শরীরে ঢেউগুলো সরাসরি আঘাত করতে পারছে না। এভাবে বাবা আগলে রাখায় স্বস্তি পায় ছেলেটি। তিমি পরিবারটিকে আপ্রাণ লড়াই চালিয়ে যেতে হচ্ছে প্রতিকূল শক্তির বিরুদ্ধে। সমানে খুঁজে চলেছে বাবা তিমি। মাঝে মধ্যে পানির উপরে উঠতে হয় নিঃশ্বাস নেয়ার জন্য। প্রবলভাবে নিঃশ্বাস নেয় তিমি। একবারের নিঃশ্বাসে প্রায় পুরো বাতাস বেরিয়ে যায়। তাই এরা দীর্ঘ সময় বিরতি দিয়ে শ্বাস নেয়। শ্বাস নেয়ার পর ডুব দেয় অনেক গভীরে। শ্বাস না নিয়ে প্রায় চল্লিশ মিনিট পর্যন্ত সাঁতার কাটতে পারে। তাদের মতো আরো অনেকেই ভেসে চলছে অসহায়ের মতো। শুশুক, ডলফিন, সিলেরা ভেসে চলেছে। কয়েকটি তিমি পরিবারও আছে। একবার শ্বাস নেয়ার জন্য বাবা তিমিটা পানি থেকে মাথা তুলে দেখল ভাঙাডিঙি, নৌ-যান। অর্কান দ্বীপের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে সবাই। এক-সময় বদলে যায় সমুদ্র স্রোত। তিমি পরিবারটি অনুকূল স্রোতে গিয়ে পড়ল।
দিন কেটে যাচ্ছে। ছেলে তিমিটি ধীরে ধীরে বৈরী প্রকৃতির সাথে পরিচিত হচ্ছে। তার অল্পকালের অভিজ্ঞতাতেই বুঝতে পেরেছে সমুদ্রের জীবনযাত্রা কত নির্মম। বাবা-মা কিভাবে শিকারকে ধরে তা খুব মনোযোগের সাথে লক্ষ্য করে ছেলেটি। শিকার করার সময় ক্ষিপ্র গতি সম্পন্ন হতে হয়। কিভাবে কডমাছ, শুশুক আর সিলদের পেছনে ধাওয়া করতে হয়। কখনো কখনো এসব শিকারদের আর দেখা যায় না। তখন বাবা তিমি বাধ্য হয়ে চিংড়ি বা কাঁকড়া শিকার করে। সমুদ্রের গভীরতাকে ছেলে তিমিটা আর তত ভয় পায় না। এখন সে বাতাসের গতি-প্রকৃতিকে বুঝতে পারে। সাগরের ঢেউ কখন আছড়া-বিছড়া করবে তাও সে জানে। উত্তরাঞ্চলের তীব্র শীতে তারা বিপদে পড়ল। অতলান্তিকের ওপরে প্রচণ্ড শীত জাঁকিয়ে বসল। বাবা আর মা তিমিটা অনেক খোঁজাখুঁজি করেও শিকার পেল না। সব শিকার যেন সেখান থেকে পালিয়ে গেছে। খাবারের খোঁজে তখন চলে যায় অন্য দিকের সাগরে। প্রতিটি তিমি পরিবারেই রয়েছে এই সমস্যা। তাদের ঘুরে বেড়াতে হয় নানা অঞ্চলে। মহাসাগরের অবাধ পরিবেশে ঘুরে বেড়ায় তিমির দল। দেহের পেছনের দিকের মাংসের সংকোচন ও প্রসারণ করে লেজের সাহায্যে সাঁতার কাটে। আঁকাবাঁকা পথে সাঁতরে চলে। কিছুক্ষণ পরপর শ্বাস নেয়। ছেলে তিমিটা কখনো তার বাবাকে মাথা নিচের দিকে নিয়ে ডিগবাজি খেতে দেখে। অনেক সময় পানির ওপরের ভাসমান কোনো বস্তুর সাথে পাখনা স্পর্শ করে ভেসে চলে। ছেলেকে সাঁতার কাটার বিভিন্ন কৌশল শেখায়। নানা রকমের প্রাণিদের সাথে পথে দেখা হচ্ছে। ছেলে তিমিটির দিন দিন অভিজ্ঞতা বাড়ছে। আবার ভাল সময় ফিরে আসে। উত্তর দিকের যে স্রোতধারা পুরো শীতকাল ধরে বইছিল তার গতির পরিবর্তন ঘটে। দক্ষিণ দিক থেকে বইতে থাকে ফিরতি সমুদ্র স্রোত। সেই স্রোতধারায় প্রচুর কডমাছ ভেসে আছে। শিকার মেলে অতি সহজে। কিন্তু এই সুখের সময়টা অবশ্য বেশি দিন থাকে না। সমুদ্র স্রোতের ভেতরে পরিবর্তন ঘটে। সাথে সাথে আশ্চর্যভাবে বিপুল মাহু অদৃশ্য হয়ে যায়। তখন তিমি পরিবারটি বুঝতে পারে খাদ্যাভাবের সমস্যা।
বাবা তিমি প্রচণ্ড শব্দ করে চলে যায় একেবারে সমুদ্র তলদেশে। নানা প্রাকৃতিক কারণে মৃত প্রাণিদের অঙ্গ সেখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। সেগুলোই তখন খাবার হয়ে যায়। শীতের পর আসে বসন্তকাল। ছেলে তিমির এক নতুন অভিজ্ঞতা হল।
সে প্রথমবারের মতো দেখল মানুষ। দেখল বিশাল আকারের জাহাজ। বসন্তকালে খুব সহজেই শিকার মেলে। ম্যাকেরলা মাছেরা পিলপিল করে ঝাঁক বেঁধে আসে। তাদের পেছনে পেছনে আসে টোপমাছ। নীল রঙের হাঙর থাকে সবার পেছনে। বাবা তিমি ভীষণ অপছন্দ করত হাঙরদের। সারাক্ষণ ক্ষিপ্র গতিতে ছুটোছুটি করছে হাঙরেরা। খুব প্রখর এদের ঘ্রাণশক্তি। ছেলে তিমি দেখেছে হাঙরদের শিকারের কৌশল।
শিকারকে দেখতে পেলে প্রচণ্ড দ্রুতগতিতে সাঁতরে আসে। প্রথমে এসেই শিকারকে ঘিরে পাক খায়। প্রথম দিকে পাক খায় অনেকটা জায়গা জুড়ে। এরপর ছোট বৃত্তে পাক খেতে থাকে। শেষ দিকে একটু কাত হয়ে খুলে ফেলে তার ভয়ঙ্কর চোয়াল। তখন ঝলসে ওঠে তাদের দাঁতের সারি। শিকারকে খাবলা দিয়ে আক্রমণ করে হাঙর। পাথরের খাঁজে লুকিয়ে থাকা শিকারকে টেনে বের করে আনে। বসন্তকালের মাঝামাঝি সময়ে ছেলে তিমির চোখে পড়ল অজস্র পাখি। নানা ধরনের পাখিরা উড়ে এসে সারা আকাশ ছেয়ে ফেলে। তাদের ডাকাডাকিতে চার পাশ মুখরিত হয়ে যায়।
মধ্য অতলান্তিকে গরম বাড়ার আগেই ওরা সেখান থেকে চলে যায় নাতিশীতোষ্ণ উপকূলে। অনেক সময় কুঁজো তিমিদের গর্জন শুনতে পায়। কখনো ওরা গান গায়। এরা নানা ধরনের শব্দ করতে পারে। মেঘের গর্জনের মতো শোনায়। অনেক সময় তাদের গোঙানির গান এত উচ্চ হয় যে, জাহাজের কাঠামো পর্যন্ত কাঁপুনি আরম্ভ হয়ে যায়। ছেলে তিমিটি তার লেজের ওপর ভর করে মাথাটাকে উঁচু করে ওর বাবার সাথে হাঙরের লড়াই দেখে।
সরু দাঁতের হাঙরদের সাথে তার বাবার প্রায়ই বিরোধ হয়। আবার গ্রীষ্মকাল আসে। ছেলে তিমিটির এক বছর বয়স হয়েছে। এখন সে আর তার মায়ের দুধ খায় না। নিজেই শিকার করে। সবুজ ম্যাকেরলাদের দেখলেই তাড়া করে। মাছের ঝাঁককে তাড়িয়ে নিয়ে যায় একেবারে গভীর অন্ধকার এলাকা পর্যন্ত। পানির নিচে মাছের যখন এক পাশ থেকে অন্য পাশে যাওয়ার চেষ্টা করে। তখন তাদের শিকার করতে সুবিধা। চট করে শরীরটাকে সরিয়ে
নিয়ে যায়। তারপর সুযোগ বুঝে তাদের ধরে। এক বছর বয়সী তিমিটি এখন দৈর্ঘ্যে সাড়ে তিন মিটার। উত্তাল সমুদ্রকে সে আর ভয় পায় না। ঢেউ কেটে অনেক দূর পর্যন্ত এগিয়ে যায়। সমুদ্রের নীল পানি তার পিঠের ওপর দিয়ে গড়িয়ে যায়। সে মনের আনন্দে ঘুরে বেড়ায়।
(দুই)
সমুদ্রতীরের এক নির্জন দ্বীপে বাস করত এক বৃদ্ধ চাষী। ছাগল, ভেড়া, মেষ পালত। তার একটা পাহারাদার কুকুর ছিল। বৃদ্ধ চাষী প্রায় এসে সমুদ্রের ধারের একটি উঁচু টিলার ওপরে বসত। সে দেখত পানির ধারের সিলগুলোকে। তীরের কাছে ভেসে আসছে নানা ধরনের মাছ। সিলগুলো সেসব মাছ শিকার করত।
শরৎকালে সিলেরা দলে দলে দ্বীপটিতে আসে। ছাইরঙা প্রাণিগুলোর কলরবে চার পাশ মুখর হয়ে ওঠে। বৃদ্ধটি জানে তাদের বাচ্চা দেয়ার সময় হলেই এখানে চলে আসে। স্ত্রী সিলগুলো ডাঙায় উঠবে দলবেঁধে। বালিচরার গর্তে বাচ্চা দেবে। এমনি একসময়ে তিমি পরিবারটি সেখানে গিয়ে উপস্থিত হল। বৃদ্ধ চাষিটি বসেছিল টিলার ওপরে। সামনের বেলাভূমিতে আছড়ে পড়া সমুদ্রের ঢেউগুলোর দিকে তাকিয়ে ছিল।
শনশনিয়ে বাতাস বইছে। পাক খেয়ে উড়ছে গাঙচিলেরা। বৃদ্ধ হঠাৎ দেখতে পেল বাদামি রঙের কী যেন ভাসছে। ঢেউয়ের ফেনারাশির ভেতরে নড়ছে। ভাল করে দেখছে চাষী। ওটা ছিল একটা বড় পুরুষ সিলের মৃতদেহ। সেই দেহের পেছনে আরো অনেকগুলো পুরুষ সিলের মৃতদেহ ভাসছে। বেশির ভাগ সিলের পেট চেরা, মাথা নেই। বৃদ্ধের ভাবনা হল, এসব সিলের লোভে এখনই ছুটে আসবে চিল, শকুনের দল। ঝাঁপিয়ে পড়বে ভেসে আসা মৃত সিলের ওপর। জায়গাটাকে একেবারে আস্তাকুঁড়ে বানিয়ে ফেলবে। বৃদ্ধ চাষী টিলা থেকে নেমে তার কুটিরের দিকে চলে যায়। তার মনে কেমন অস্বস্তি বিরাজ করতে থাকে।
পরদিন ভোরে বৃদ্ধ চাষী টিলায় বসে দেখল আরেকটি পুরুষ সিলের ভাসমান দেহ। তবে সেটা মৃত নয়। কোনোরকমে থলথলে দেহটাকে ঘষতে ঘষতে এগিয়ে আসছে ডাঙার দিকে। মাঝে মধ্যে থেমে মুখটাকে উঁচু করে আকাশের দিকে তাকিয়ে দম নিচ্ছে। সিলটা হাঁচড়-পাঁচর করে ডাঙায় এসে পৌঁছাল। বৃদ্ধ দেখল সিলটা বেশ ঘায়েল হয়েছে। ধারাল অস্ত্র দিয়ে তার শরীরের পেছন দিকের বেশখানিকটা অংশ কেটে ফেলা হয়েছে। চাষিটি ভাবছে কে তার এমন দুর্দশা করেছে। কে এর জন্য দায়ী?
চাষী তাকাল দূর সমুদ্রের দিকে। তার চোখে পড়ল বাবা খুনে তিমিটাকে। লেজ আর পিঠের পাখনা দিয়ে পানি কেটে তীরের দিকে এগিয়ে আসছে। বৃদ্ধ ভাল করেই জানে সিলদের সবচেয়ে বড় শত্রু হচ্ছে ভয়ঙ্কর খুনে তিমি। চাষি পুরো তিমি পরিবারটিকে দেখতে পায়। বাবা, মা আর তাদের ছেলে তিনটি খুনে তিমি।
চাষী আতঙ্কিত হয়ে তার ডেরাতে ফিরে আসে। তার ভেতরে এক ধরণের চাপা অস্থিরতা দেখা দেয়। দ্বীপটি এখন অশান্ত হয়ে উঠবে। এখন সিলেরা এখানে দলবেঁধে আসবে বাচ্চা দেয়ার জন্য। এসময় খুনে তিমিদের আগমনে সিলেরা বিপন্ন হবে। বৃদ্ধটি অবশ্য সেখানে সিলদের দল বেঁধে থাকা পছন্দ করে না। কারণ সিলগুলো মাছের বংশ শেষ করে। মাছেরা সেখান থেকে পালিয়ে অন্য জায়গায় চলে যায়। আর সেখানে বিছিয়ে রাখা মাছ ধরার জালগুলোও ছিঁড়ে ফেলে। তবে খুনে তিমিদের এভাবে আসাতেও তিনি উৎকণ্ঠিত। এই ভয়ঙ্কর প্রাণীরা যত দিন পর্যন্ত এ তল্লাটে থাকবে তত দিনই এখানকার জেলেদের প্রাণ-সংশয়।
বৃদ্ধ চাষী তখন কায়মনোবাক্যে প্রার্থনা করলেন যেন খুনে তিমি তিনটি তাদের এলাকা ছেড়ে চলে যায়। সে রাতে বাতাসের বেগ প্রবল হয়ে উঠল। অঝোরে বৃষ্টি নামল। তুমুল বৃষ্টিপাতের দরুন জায়গাটা ভেসে গেল। খারাপ আবহাওয়াতে সিলগুলি পানি থেকে ডাঙাতে জড়ো হল। ভোর হলে বৃদ্ধ সমুদ্রতটে গিয়ে দেখল সিলদের বেশ কয়েকটি খণ্ড-বিখণ্ড শরীর চার পাশে ছড়িয়ে আছে। তখনই তার চেখে পড়ল খুনে তিমিদের পরিবারটিকে। তার মনে হল এরা ভয়াবহ ক্ষতিসাধন করতে পারে।
বৃদ্ধ ভাবছে, যে করেই হোক ওদের শেষ করে দেয়া উচিত। তা না হলে মারাত্মক বিপদ থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে না। বৃদ্ধ সমুদ্রতটে আসার সময় ঘর থেকে তার বন্দুকটাকে সাথে করে নিয়ে এসেছিল। এবার সে বন্দুকটাকে উঁচিয়ে ধরে সমুদ্রের দিকে তাক করল। তিমিটা ঢেউয়ের মাঝে ওঠানামা করছে। তাই তিমিটাকে লক্ষ্যবস্তুতে আনতে সমস্যা হচ্ছে। একসময় তিমিটাকে স্থির হয়ে থাকতে দেখা যায়। বিশাল পিঠের ওপরে গোলাকার পাখনা। রোদের আলতে পাখনাটা চিকচিক করছে।
বৃদ্ধ চাষী সেদিকে তাক করে বন্দুকের ট্রিগার চাপল। গর্জে ওঠার শব্দে গাঙচিলদের ঝাঁকে হুটোপুটি শুরু হয়ে গেল। গুলিটা বিদ্ধ করেছে তিমিকে। তিমিটার শরীর বার কয়েক কেঁপে উঠল। ঝাঁকুনি দিচ্ছে তিমিটা। বিশাল লেজটাকে তুলে আছড়াতে লাগল। পানি তোলপাড় হয়ে যায়। অসহ্য যন্ত্রণায় বাবা তিমিটা জ্বলছে। রক্ত ফিনকি দিয়ে ছুটছে তার শরীর থেকে। পানি লাল হয়ে যায়। তিমিটা অনেক কষ্টে নিজেকে তীরের দিক থেকে সরিয়ে গভীর পানিতে নেমে গেল। তখন মা আর ছেলে ঘুরছিল গভীর পানিতে। বন্দুকের গুড়ুম আওয়াজ শুনে তারা চমকে উঠেছিল। তাদের সাথে সাথেই মনে হল বাবা তিমিটার হয়তো কোনো বিপদ হয়েছে। অজানা আশঙ্কায় কেঁপে উঠল তারা। ছুটে চলল তীরভূমির দিকে। কিছুক্ষণ পরেই তারা বাবা তিমিটির আহত শরীরটাকে দেখতে পেল। বেসামাল হয়ে ঝাঁকুনি দিচ্ছে। যন্ত্রণায় ছটফট করছে। ছেলে আর বউ মিলে তিমিটাকে দু’পাশ থেকে ঠেলে নিয়ে গভীর পানিতে যেতে শুরু করল। আহত তিমির পিঠের পাখনাটা থরথর করে কাঁপছে। বৃদ্ধ চাষী ঠিক বুঝতে পেরেছিল যে তার বন্দুকের গুলিতে বড় তিমিটা সাংঘাতিকভাবে আহত হয়েছে। বাকি দুটো তিমির আচরণ তাকে বেশ অবাক করেছিল। তিনি হরিণ শিকারের সময় দেখেছেন একটার শরীরে গুলি বিধলে বাকিরা দৌড়ে পালিয়ে যায়। কিন্তু সেদিন তার অন্য রকম অভিজ্ঞতা হল। বাকি দুটো তিমি গুলিবিদ্ধ আহত তিমিটাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। নিজেদেরও যে বিপদ আসতে পারে সেটা তারা ভাবছে না। বৃদ্ধ চাষী এ রকম দৃশ্য দেখে অবাক হয়ে গেলেন।
ছেলে তিমিটা শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে তার বাবাকে ভাসিয়ে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করছে। কিন্তু ব্যর্থ হল। সূর্যপাটে বসার সময় বড় তিমিটা ঘোলাটে চোখ মেলে শেষবারের মতো আকাশের দিকে তাকাল। তার গলা দিয়ে ঘরঘর একটা শব্দ হল। বিশাল সমুদ্রকে যেন সে বিদায় জানাচ্ছে। এরপর তার শরীরটা ধীরে ধীরে উল্টে যেতে থাকে। পাখাসহ পিঠটা নিচের দিকে চলে যায়। পেটটা ওপরের দিকে। সমুদ্রতলে তার চির বিশ্রাম হবে।
মা আর ছেলে তিমি দেখল বড় তিমিটা কিভাবে পানির নিচে তলিয়ে যাচ্ছে। চিরদিনের জন্য হারিয়ে যাচ্ছে। বাবা মারা যাওয়াতে ছেলে তিমির মা একেবারে অসহায় হয়ে পড়ে। ছেলেটির জন্মের পর থেকে শিকারের সব ঝুঁকি নিয়েছিল বাবা তিমিটি। এ কারণে মাকে আর শিকার নিয়ে মাথা ঘামাতে হতো না। শিকার খুঁজে আনত। সেই সাথে তাদের নিরাপত্তার দিকটাও লক্ষ্য রাখত। কোনো বিপদ যেন না আসে। কোন পথে এগুতে হবে সেটাও ঠিক করে দিত। পুরুষ তিমিটা তার পরিবারের কাছে ছিল ভরসা। তাকে হারিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছে মা আর ছেলে। এতদিন ধরে বাবার সমস্ত আচরণ লক্ষ্য করে আসছিল ছেলেটি। তাকে খুব আগ্রহের সাথে অনেক কিছু শিখিয়েছে বাবা। সমুদ্রের নিচের স্রোতের ধারাগুলকে চিনিয়েছে।
কিভাবে শব্দ শুনে সতর্ক হতে হয় জানিয়েছে। কত যে রহস্য ছড়িয়ে রয়েছে চার পাশে। ছেলেটির কাছে মনে হয় রহস্যেও বুঝি শেষ নেই। বাবার কাছ থেকে জেনেছে কোনটা চোরা স্রোত যাতে মিশে আছে ভয়ানক বিপদ। খুনে তিমিদের এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে যাওয়ার প্রধান কারণ হল খাবারের অনুসন্ধান। মেরু প্রদেশ থেকে নিরক্ষীয় অঞ্চলে আসার পথে তিমিদের দীর্ঘ সময় উপবাসে থাকতে হয় তখন চামড়ার নিচের পুরু চর্বি স্তর থেকে তারা শক্তির জোগান পায়।
ছেলে তিমিটি কিছু দায়িত্ব নেয়া শুরু করল। ওর বাবা যেভাবে পানির ভেতরে কান রেখে প্রতিধ্বনি শুনে শিকারের অবস্থানকে খুঁজে বের করত সেই পদ্ধতিতে ছেলেটিও কাজ শুরু করে। লেজের ঝাপটা দিয়ে পানির ওপর শব্দ সৃষ্টি করে পানির পর্দা ভেদ করে অনেক গভীরে চলে যায় সেই শব্দ। তারপর সেই শব্দ চার পাশ থেকে প্রতিহত হয়ে ফিরে আসে। সেই প্রতিধ্বনি শুনে বুঝতে পারে যে শব্দটা আসছে কোনো মাছের ঝাঁক থেকে। সমুদ্র পাড়ি দেয়ার সময় মাছের ঝাঁক এই রকম শব্দ ছড়িয়ে দেয়। আবার অনেক সময় দেখা যায় বুদবুদ হয়ে উঠে আসছে। ছেলেটি ক্রমশ অভিজ্ঞ হয়ে উঠছে।
তার চোখ আর কান তৈরি হচ্ছে। এখন সে পানির নিচে কান পেতে অনেক কিছুর সন্ধান পেয়ে যায়। শুশুকদের আসার সংবাদ বুঝতে পারে। নিঃশব্দে ভেসে চলে যায় তাদের কাছে। তারপর সুযোগমতো ঝাঁপিয়ে পড়ে তবে স্বভাবে ছেলেটি এখনো তার বাবার মতো দুরন্ত হয়ে উঠতে পারেনি।
ছেলেটির পিঠ ক্রমশ শক্ত আর চওড়া হচ্ছে। পাখনাটাও সেই সাথে শক্ত হয়ে উঠছে। বেশ একটা জোরাল ভাব এসে যাচ্ছে কিন্তু সে তেমন স্বস্তি পায় না। নিজকে কেমন একাকি বলে মনে হয় যখন অতলান্তিক মন অন্ধকারে ডুবে যায় তখন কেমন চুপ হয়ে যায়। শীতল বাতাস হু হু করে এসে শরীরে কোমল পরশ বুলিয়ে দেয়। ছেলেটির তখন আগের দিনগুলোর কথা মনে পড়ে যায়। সেই বাবার সাথে পাশাপাশি ছুটে চলার দিনগুলো।
শীতকাল এগিয়ে আসছে, বাতাসে শীতের ছোয়া পাওয়া যায়। দক্ষিণের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে মা আর ছেলে। দু’জনে পাশাপাশি থাকে। এ অঞ্চলে শীতের সময় শিকারের অভাব দেখা দেবে। কয়েক দিন চলার পর ছেলে তিমিটি পেছনে একটা শব্দ শুনতে পায়। শব্দটা ছিল পাহাড়ে সমুদ্রের ঢেউয়ের আছড়ে পড়ার মতো। শব্দটা কিসের তা জানতে কৌতূহল জাগে ছেলেটির। পানির গভীরে নেমে যায়। মা তিমিটাও শুনতে পেয়েছে শব্দটা। শব্দটা তার কাছে পরিচিত। ছেলে তিমির বাবাও পাখনা দিয়ে সাঁতার দেয়ার সময় এই ধরনের শব্দ করত। ছেলের পেছনে সেও ডুব দিয়েছিল। কিন্তু তারা কিছুই খুঁজে পেল না। প্রবল দুশ্চিন্তার ভেতর দিয়ে রাত কাটে তাদের।
ভোর হতেই ছেলেটি দেখল সাদা কাল রঙয়ের কয়েকটি খুনে তিমি গোল হয়ে তাদেরকে ঘিরে রেখেছে। যেন তারা বন্দি। খুনে তিমিদের চোখে মুখে উল্লাসের চাপ। দলটিতে নানা বয়সের তিমি রয়েছে। ছেলেটি দেখল একটি বড় তিমি নিঃশব্দে তার দিকে এগিয়ে আসছে। কাছাকাছি আসার পর ছেলেটি দেখল তার সমস্ত পিঠে রয়েছে হার-পুন অন্তের দাগ। গভীর ক্ষতের মত চিহ্ন। তিমিটার ভাবসাব দেখে মনে হচ্ছে সে হল দল নেতা। ছেলেটি রেগে ফুসে ওঠে। দলনেতার চাহনিটাকে তার কাছে মোটেই সুবিধার মনে হচ্ছে না। ছেলেটি তাকে আক্রমণ করতে ছুটে যায়। বিচক্ষণ দলনেতা তখন চট করে নিজের চার পাশে পানি ছড়িয়ে একটা বলয় তৈরি করে ফেলে। দলনেতা চাইছে না মা আর ছেলেকে তাদের দলে নিতে। কিন্তু মা চাইছে। দলে থাকলে সুবিধে। ভয়ঙ্কর শত্রুদের হাত থেকে তাহলে বাঁচতে পারবে। দলের কাছ থেকে সাহায্য পাবে। তারা দলভুক্ত হয়ে যায়। খুনে তিমিদের দলটি তখন দক্ষিণের দিকে এগিয়ে যেতে থাকে। মাঝে মধ্যে তারা নাকের সাহায্যে পানির ফোয়ারা সৃষ্টি করছে। অতলান্তিকের ওপরে ঢেউ জাগে।
দলনেতা তিমিটির আদিবাস ছিল উত্তর মেরু এলাকাতে। যেখানে চার পাশ ঢেকে থাকে ধবধবে বরফের আস্তরণে। এক বিশাল বরফের চাঁই-এর নিচে তার জন্ম। সে কারণে সে প্রচণ্ড শীতের মাঝেও কাবু হয় না। শীতের তীব্রতাকে সালাম দিতে জানে। দলের মাঝে ছেলে তিমিটি বেশ ক’টি সমবয়সী সঙ্গীকে পেয়েছে। অনেক জায়গায় ঘুরেছে এ দলটি। সঙ্গীদের কাছ থেকে অনেক কৌশল শিখে নিয়েছে। কেমন করে শূন্যে লাফিয়ে উঠতে হয়। সবুজ ঢেউ ভেঙে পড়লে শরীরটাকে হালকা করে কিভাবে গভীর পানিতে তলিয়ে যেতে হয়। এভাবে দিন দিন শিখে নিয়ে সে অভিজ্ঞ হয়ে ওঠে। শিকারকে দলবেঁধে তাড়া করে।
তবু ছেলে তিমিটি তার সঙ্গীদের চেয়ে আলাদা। তার স্বভাব অন্য রকমের। কেমন অস্থির দেখায় তাকে। চাঁদের মায়াবী আলয় সে একাকী সাঁতার কেটে পানি তোলপাড় করে। তখন ঘুমিয়ে রয়েছে অন্য তিমিরা। প্রচণ্ড চঞ্চলতায় ছেলে তিমিটি এলেমেলভাবে ছুটোছুটি করে।
দলের সবাই দলনেতাকে মেনে চলে। অথচ সে দলনেতাকে মোটেই গুরুত্ব দেয় না। তার মাঝে অনেকটা বেপরোয়া ভাব আছে। এই ভাবটার কারণে দলনেতা তার প্রতি আকৃষ্ট। তার ওপরে রাগ করে না। ছেলেটির সাঁতার কাটার বিশেষ ভঙ্গিটি তার কাছে অপূর্ব লাগে। দলনেতা মুগ্ধ চোখে তা দেখে। দলনেতার মনে পড়ে ছেলেটির এই বয়সেই সে উত্তর মেরু অঞ্চলে হিমশৈলের মাঝে স্বজনহারা হয়েছিল সে তাই ভাল করেই জানে টিকে থাকার জন্য কেমন করে সংগ্রাম চালিয়ে যেতে হয়।
পরিবেশ কখনো নির্মম হয়ে ওঠে। দলনেতা আগ্রহ করে ছেলেটিকে বেঁচে থাকার পদ্ধতি শেখাতে চায়। কিভাবে তিমি শিকারিদের চোখকে ফাঁকি দিতে হয় তা শেখার। ছেলেটির বাবা কিন্তু কখনো এ রকম শিক্ষা দেয়নি। আসলে এ বিষয়ে যথেষ্ট অনভিজ্ঞ ছিল তার বাবা। তার মায়ের কাছে জেনেছিল একবার কিভাবে বাবা তিমি শিকারিদের পাল্লার মধ্যে পড়েছিল। সব দিকে দলনেতার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি। সাগর পাড়ি দেয়ার সময় সন্দেহজনক কোনো কিছু দেখলেই সবাইকে সতর্ক করে দেয়।
বেশি দিন একজায়গায় থাকলে শিকারের অভাব দেখা দেয়। দলনেতা তাই ওদের অন্য জায়গায় নিয়ে যায়। তখন পাশাপাশি সাঁতার কেটে ধনুকের আকার নিয়ে চলে। তাদের চলাকে দেখলে মনে হয় সাদা-কাল রঙের একটা ধনুক বুঝি পানির ওপরে ফোয়ারা কাটতে কাটতে ভেসে যাচ্ছে। এভাবে এগিয়ে যেতে অনেক সুবিধা।
পুরো মার্চ মাসজুড়ে দলটি এগিয়ে যেতে থকে। শীত ক্রমেই প্রবল হয়ে ওঠে অতলান্তিকের ওপর। হঠাৎ করে দলের সামনের ক’জন একটা বাধা পেরিয়ে থমকে যায়। সেটা ছিল একটা ধ্বংসপ্রাপ্ত জাহাজ। দলনেতা এগিয়ে গিয়ে জাহাজটিকে ভাল করে দেখতে থাকে। লোহা-লক্কড়ের বিশাল কাঠামো। ভাঙা জাহাজের ভেতর রয়েছে এক প্রকার খাদ্যভাণ্ডার। শামুক, কাঁকড়া আর প্রবাল কীটেরা ধ্বংস হয়ে যাওয়া জাহাজের ভেতরে সংসার পেতে রেখেছে। অক্টোপাস আর স্কুইডকেও দেখা গেল। অক্টোপাসের মাথায় থাকা আটটি শুঁড় হিলহিল করে দুলছে। উত্তেজিত হলে ঘনঘন দেহের রঙ পাল্টে ফেলে। বহুরূপী। এদের শরীরে রয়েছে বিষথলি। শত্রুকে কাবু করার জন্যে বিষথলি থেকে বিষ ছিটিয়ে দেয়। কালো রঙ ছিটিয়ে নিমেষের মাঝে ধোঁয়াশা তৈরি করে ফেলে। স্কুইডগুলোর আকার তো আরও মারাত্মক। দেখলেই আতঙ্ক জাগে। দশটা পা। ওদের প্রিয় খাবার হল তিমির বাচ্চা। খুব হিংস্র স্বভাব।
জাহাজের মাস্তুলগুলোতে তারা থাকছে। সাপের মতো লিকলিকে লম্বা হাত নিয়ে ঘুরছে। জাহাজের নিচের খোলে বান মাছেদের বাস ছিল। এরা যাযাবরের মতো এক সমুদ্র থেকে আরেক সমুদ্রে ছুটে যায়। লোনাপানির সাগর থেকে যায় মিষ্টি পানির নদীতে। অতলান্তিকের বারমুডায় এদের জন্ম। খুব রহস্যময় এই মাছগুলোর যাত্রা। বান মাছের পোনা মিষ্টি পানির দিকে যাত্রা শুরু করে। ঝাঁক বেঁধে চলে। তাদের রক্তে রয়েছে সাগর পাড়ি দেয়ার তীব্র নেশা। দলনেতা দেখল একটি বিরাট কালো মাছ তার দলবল নিয়ে বাস করছে জাহাজের খোলে।
দলনেতা তার দলের সমস্ত তিমিকে সতর্ক করে দেয়। জানিয়ে দেয় এখন তাদের লড়াই শুরু করতে হবে। দলনেতার নির্দেশ পেয়ে খুনে তিমিটা ঝাঁপিয়ে পড়ল ভাঙা জাহাজের ওপর। সাথে সাথে সেখানে এ ভয়াবহ লড়াই শুরু হলো। নিমেষের মধ্যেই যেন মহাবিপর্যয় ঘটে গেল। চার পাশে মৃত্যুর আর্তনাদ ছড়িয়ে পড়ে। নিচের খোল থেকে কিলবিলিয়ে ছুটে আসে বান মাছেরা। খুনে তিমিরা তখন তারা হত্যাকাণ্ড চালাচ্ছে। বান মাছেরা ভীষণ হিংস্র। তাদের গতি মারাত্মক। মুখে ধারাল করাত। বানমাছগুলো দেখল তাদের সঙ্গীরা ছিন্নভিন্ন হয়ে পড়ে আছে তখন তারা ভীষণ খেপে গেল। তারা তীরবেগে খুনে তিমিদের দিকে ছুটে গিয়ে তিমিদের মুখের ভেতরে তাদের করাত বিঁধিয়ে দিতে লাগল। তিমিদের গলা ভেদ করে চোখের পাশ কেটে ফেলে। বানমাছদের বিদ্যুৎগতির আক্রমণে খুনে তিমিদের দলটি দিশেহারা হয়ে পড়ে। তিমিরা হকচকিত হয়ে যায়। ছিপছিপে বানমাছদের আক্রমণে পর্যুদস্ত হয়ে পড়ে। বানমাছেরা দ্রুতগতিতে করাত টেনে বের করে নিতেই তিমিদের শরীর থেকে গলগলিয়ে রক্ত পড়তে থাকে। তিমিরা বুঝতেই পারেনি যে পরিস্থিতিতে এমন জোরাল হয়ে উঠবে। পানি রক্তের স্রোতে লাল বর্ণ ধারণ করে।
প্রবল বিক্রমে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে বানমাছেরা। তারা একেবারে মরিয়া হয়ে উঠেছে। বিশালদেহী তিমিগুলো কোনোমতেই তাদের সাথে এঁটে উঠতে পারছে না। তিমিগুলো কিছু বুঝে ওঠার আগেই বিদ্যুৎ গতিতে বানমাছের দ্বারা আক্রান্ত হচ্ছে। তিমিদের দলনেতা বুঝতে পারল তারা বান মাছদের সাথে লড়াই করে জিততে পারবে না। বাঁচতে হলে সেখান থেকে পালাতে হবে। ভাঙা জাহাজের খোলটাকে তাদের কাছে বিভীষিকার মতো মনে হচ্ছে। আহত তিমিদের গোঙানির শব্দে বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে।
তখন দলনেতার নির্দেশে জাহাজের খোলের ভেতর থেকে পালাল তিমিরা। নতুন আশ্রয়ের সন্ধানে ছুটে চলল তারা। ছেলেটির মনে হল তাদের একটা উচিত শিক্ষা হয়েছে। বিশালদেহী হলেই সবাই ভয় পেয়ে যাবে এটা ঠিক না। ছোট প্রাণীদেরও অনেক ক্ষমতা রয়েছে। বানমাছের আক্রমণে দারুণ অভিজ্ঞতা হয়েছে তাদের।
বেশ কিছু দূর যাওয়ার পর তারা একটি ডুবো পাহাড়ের সন্ধান পেল। সমুদ্রের নিচে আবছাভাবে জেগে রয়েছে। সেই পাহাড়ের সুড়ঙ্গগুহার ভেতর আশ্রয় নিল খুনে তিমিরা। মিকমিকে অন্ধকারের মাঝে বিশাল শরীরটা নিয়ে কোনোমতে সেঁধিয়ে গেল। খুনে তিমিদের অনেকেই মারাত্মকভাবে আহত হয়েছে।
গুহার একটিমাত্র মুখ। বেরুনোর অন্য কোনো পথ নেই। এটা জেনে দলনেতা খুব ভয় পেল। তার কাছে মনে হল জায়গাটা তেমন নিরাপদ না। সেখানে থাকাটা হবে ঝুঁকিপূর্ণ। একটি চলমান কাল ছায়াকে এগিয়ে আসতে দেখা যায়। বিরাট ঈল মাছ তরতরিয়ে আসছে। দলনেতা ভয় পেয়ে যায়। ঈলমাছ খুবই ভয়ঙ্কর। তাদের শরীর থেকে প্রচণ্ড এক শক্তি বেরিয়ে আসে। ঐ বিদ্যুৎ শক্তিতে তিমিরা অবশ হয়ে যাবে।
দলনেতার প্রধান চিন্তা হচ্ছে তার দলটিকে বিপদের হাত থেকে রক্ষা করা। সমুদ্রে বিপদের যেন শেষ নেই। সবচেয়ে বেশি ভয় বিষাক্ত মাছদের। আকারে ছোট হলে হবে কি স্বভাবে তারা অতি ভয়ঙ্কর। একেবারে বেপরোয়া ভঙ্গিতে এসে তীর বেগে এসে আঘাত করে।
দলনেতা ভাবল তার দলটাকে রক্ষা করতে হলে ঈলমাছটিকে অবশ্যই পরাস্ত করতে হবে। ভাঙা জাহাজের খোলের বানমাছেরা তাদের ভীষণ ক্ষতি করেছে। শরীর থেকে জ্বলুনি এখনো যায়নি। দলনেতা তখন তার শরীরের সমস্ত শক্তিকে এক করে। সে এবার তীব্র গতিতে ঝাঁপ দেবে ঈলের ওপরে। এমন সময় এক অদ্ভুত ঘটনা দেখে দলনেতা। তাদের দলে নতুন আসা সেই ছেলে তিমিটা সাঁৎ করে ছুটে এসে মস্ত হাঁ মুখ করে চেপে ধরেছে ঈলটাকে। দৃশ্যটা দেখে চমকে যায় দলনেতা। প্রচণ্ড সাহসের পরিচয় দিয়েছে ছেলেটি। ঈলমাছটাকে মুখের ভেতরে রেখে ক্রমাগত পাঁক খেতে থাকে। আশপাশে তোলপাড় সৃষ্টি হয়। ছেলে তিমিটা তার চোয়ালের চাপে ঈলটাকে পুরোপুরি থেঁতলে দেয়। ছেলে তিমিটিকে দেখে মনে হচ্ছে দুরস্ত রাগে সে যেন জ্বলছে। একলাই সে পরাস্ত করে ফেলল ঈলমাছটিকে। একবারের জন্যও সে দলনেতার কাছে কোনো সাহায্য চাইল না। দলনেতা অবাক হয়। সে ভাবতেই পারেনি তার দলের কেউ এমন সাহসিকতার পরিচয় দেবে। ছিন্নভিন্ন হয়ে যাওয়া ঈলটির শরীরের অংশগুল পানিতে ছড়িয়ে যায়।
বসন্ত এসে যাওয়াতে সমুদ্রের পানির শীতল ভাবটা অনেক কমে আসে। বিভিন্ন ধরনের মাছের ঝাঁক স্রোতের সাথে ভেসে আসে। ছেলে তিমিটি এখন যুবক হয়ে উঠেছে। তার খিদেও বেশি পায়। শিকারের নেশায় মেতে ওঠে। রাতের শান্ত সমুদ্রে অনেক সময় যুবক তিমিটি দল ছেড়ে অনেক দূরে চলে যায়। এক ধরনের অস্থিরতা তাকে যেন দাপিয়ে বেড়ায়। আকাশে তারারা মিটিমিটি স্কুলে। তারার নীলাভ আলো মেঘে সমুদ্রটা তখন কী রকম রহস্যময় হয়ে ওঠে।
যুবক তিমিটির এই দল ছেড়ে যাওয়ার অদ্ভুত স্বভাবের কথা জেনেছে দলনেতা। বিষয়টাকে সে পছন্দ করছে না। এভাবে দলছেড়ে যাওয়াটা ঠিক নয়।
এপ্রিল মাস। অতলান্তিকের বুক চিরে সূর্য উঠি উঠি করছে। এরকম এক ভোরবেলায় তিমিটির ঘুম ভেঙে যায় একটা শব্দে। দেখল দলনেতা ভয়ঙ্কর মুখ করে তার দিকে এগিয়ে আসছে। যেন তার ওপরে ঝাঁপিয়ে পড়বে। দলনেতার মুখের একপাশটা হারপুনের আঘাতে কাটা। দলনেতার চোখে ক্রোধের চাপ দেখল যুবক তিমিটি। গত ক’দিনের আচরণেই বুঝতে পারছিল যে দলনেতা তার প্রতি সন্তুষ্ট নয়। কিন্তু তাকে যে আক্রমণ করবে এটা ধারণা করেনি। যুবক তিমি বুঝতে পারল এবার তাকেও লড়াই শুরু করতে হবে। তা না হলে তার জীবন বিপন্ন হয়ে পড়বে। যুবক তিমিটি ফুঁসে উঠল। সমস্ত শক্তি দিয়ে ধাক্কা দিল দলনেতাকে। এই প্রথম নিজের দলের কারো কাছ থেকে প্রচণ্ড আঘাত পেল দলনেতা। চতুর লড়িয়ে সে। সহজেই যুবক তিমিটির আঘাত প্রতিহত করল। যুবক তিমিটি দল থেকে বেরিয়ে যেতে চায়। অনন্ত জলরাশি তার সামনে। বিশাল এক ভুবন ছড়িয়ে আছে। এই দলের মাঝে থাকাটা তার আর সম্ভব হচ্ছে না। সে দল ছেড়ে চলে যাচ্ছে। তার চোখে পড়ল মা এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছে তার দিকে। মা ভাবতেই পারেনি যে এমন একটা ঘটনা ঘটবে। তার ছেলেটা এমন করে রুখে উঠবে। ছেলেটা তার কাছে দিন দিন কেমন অচেনা হয়ে উঠছিল। বাবার মৃত্যুর পর আগলে রাখতে চেয়েছিল ছেলেটিকে। দলভুক্ত হয়ে খানিকটা স্বস্তিতে ছিল। কিন্তু ছেলেটা আজ দলনেতার সাথে লড়াই করল। তারপর থেকে তো তার দলে থাকা হবে না। সে দলনেতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছে। দলনেতার অবাধ্য হয়েছে। দলনেতা তখনো গজরাতে গজরাতে পাক খাচ্ছে। যুবক তিমিটি দূরে মিলিয়ে যায়।
মা দুঃখভরা মনে গভীর সমুদ্রে ডুব দেয়। তার কানে বাজে তরঙ্গের ভেতর প্রতিধ্বনি উঠছে তার ছেলের পাখনার শব্দের। মা আকুল হয়ে কান পেতে থাকে, যদি তার ছেলেটি আবার ফিরে আসে। যুবক তিমির পাখনার শব্দ ধীরে ধীরে মিলিয়ে যায়। অনেক দূরে চলে গেছে সে। যুবক তিনি মটি দল থেকে বেরিয়ে এসে একাই ভেসে চলেছে। ভাসতে ভাসতে একসময় সে চলে আসে সুমেরু বৃত্তের কাছে। সেখানে তখন মাঝরাতেও সূর্য দেখা যায়। আকাশজুড়ে অপরূপ আলোর বিশাল ঝালর ঝোলে। তখন উত্তর মেরুর আকাশে সূর্য ওঠে তখনই এই আলোই পৃথিবীর উত্তর অংশকে আলো দেয়। এই আলোর রঙ আর আবৃতি প্রায়ই বদলে যেতে থাকে। কখনো আলোর শিখাগুলো জ্বলতে থাকে। কখনো এই আলোকে দেখায় পাখার মতো।
এতে অবশ্য যুবক তিমিটির কিছু অসুবিধে হয়। সে তো রাতেই আকাশে নক্ষত্র দেখতে অভ্যস্ত। এমন তারাবিহীন আকাশ এর আগে দেখেনি। আকাশের রঙ হয়ে যায় কমলালেবুর রঙের মতো। এতে এসে খানিকটা বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে। দক্ষিণ পশ্চিম দিক থেকে বয়ে আসা মহাসাগরীয় স্রোতে গা ভাসিয়ে দেয়। এই এলাকাটি তার অজানা। ভেসে যেতে যেতে সে প্রথমবারের মতো হিমবাহ দেখল। বিশাল বরফের চাঁই ভাসছে। চার পাশে তাকিয়ে যুবক তিমিটি বুঝতে পারল যে এবার সে এক ভিন্ন জগতে চলে এসেছে। দৃশ্যরূপ পাল্টে গেছে। এখন সে বরফ রাজ্যের বাসিন্দা। একটা অদ্ভুত ধরনের রোমাঞ্চ জাগল তার। নিজেকে এখন বিজয়ী বলে মনে হচ্ছে। দলনেতা যেন তাকে সহ্য করতে পারছিল না। তার সাহসকে হিংসা করত। তার উদ্ধত স্বভাবকে অপছন্দ করত। ভাবত দলে বুঝি তার গুরুত্ব কমে আসছে। সে তো দলেই থাকতে চেয়েছিল। মা ছিল সেখানে। কিন্তু দলনেতা তাকে বাধ্য করল দল ছেড়ে যেতে। সেও দুরন্ত সাহসে অজানা অচেনা এক রাজ্যের দিকে এগিয়ে চলল। তার ভেতরে ছিল প্রবল জেদ। সে কারণেই এক বিচিত্র এক জগতে চলে এসেছে। মাথার উপর দিয়ে স্কুয়া পাখিরা তীক্ষ্ণ স্বরে ডেকে উড়ে যাচ্ছে। পানির ওপরে জমে আছে বরফের স্তর। সে গড়িয়ে চলে বরফ খণ্ডের ওপর দিয়ে।
গ্রীষ্মকাল এসে পড়ে। পাল্টে যায় আবহাওয়া। উষ্ণতা বাড়ে। যুবক তিমিটির মনে পড়ে তার বাবা-মার কথা। স্কটল্যান্ড উপকূলে শিকারের কথা। কত অনায়াসে সেখানে শিকার চাওয়া যেত। অঢেল খাবারের ছড়াছড়ি সেখানে। এখানে সহজে শিকার জোটে না। উত্তরের দিকে এগিয়ে যেতে থাকে যুবক তিমিটি। গ্রীষ্মকালে সুমেরুতে প্রচুর অতিথি পাখির আগমন ঘটে। বসন্তকালে যখন বরফ গলতে শুরু করে তখনই দূর-দূরান্ত থেকে উড়ে আসতে থাকে যাযাবর পাখিরা। ডানায় কালো সাদা নকশা করা প্রায়নর পাখিরা দলবেঁধে আসে। সমুদ্র থেকে মাছ ধরে খায়। দুধসাদা ভাল্লুকেরা আসে। এদের ঘ্রাণশক্তি অত্যন্ত প্রখর। তখনই কোনো সিন্ধুঘোটক বা তিমি মারা যায় তখন তার গন্ধ দূর-দূরান্ত থেকে মেরু ভাল্লুকেরা মৃতদেহের কাছে আসে। এদের প্রধান খাবার হচ্ছে সিলমাছ। বরফের গর্তের কাছে সিল শিকারের জন্য ওঁৎ পেতে থাকে। বড় থলথলে শরীর নিয়েও ডানার কৌশলে চমৎকারভাবে সাঁতার কাটতে পারে।
কালো হরিণের মতো পেট। শেওলা সবুজ বুক। বালির মধ্যে মুখ ঢুকিয়ে শান্তভাবে শুয়ে থাকে। কখনো বিশাল মাথা তুলে ঝাঁকুনি দেয়। মেরু ভল্লুকেরা বুঝতে পারে বরফের কোনো গর্ত দেখা মাত্রই থাবা মেরে সিল শিকার করে। সেখানে মসৃণ লম্বা কাঠের নৌকা কায়াকে চেপে তিমি শিকারিরা আসে। চর্বির লোভে তিমি শিকার করা হয়। বিষাক্ত হারপুনের সাহায্যে তিমি শিকার করে। জুন মাসের শেষের দিকে হাজার হাজার ছোট-বড় তিমি উপকূল থেকে এসে বরফঢাকা খাড়ির আশপাশে ঘোরাফেরা করে। তারা অপেক্ষা করতে থাকে কখন বরফ ভাঙবে। কারণ বরফ ভাঙতে আরম্ভ করলেই তারা খাঁড়ির ভেতরে খাবারের সন্ধানে যাবে। এ জন্য এস্কিমোরা তিমি শিকারের জন্য এ সময়টাকেই বেছে নেয়। তিমিকে দেখামাত্রই ছুড়ে মারে হারপুন। তিমির পেছনে গেঁথে যায় হারপুনের ধারাল ফলা। লম্বা শেকল বাঁধা থাকে হারপুনের সাথে। হারপুনের মাথার সাথে বাঁধা থাকে নাইলনের দড়ি। কায়াকের সামনের দিকে এই দড়ি গোল করে কুণ্ডুলি পাকিয়ে রাখা হয়। দড়ির সাথে বাঁধা থাকে বাতাস ফোলানো পাখনা শুদ্ধ একটা সিলমাছের চামড়া। হারপুন বিঁধে যাওয়ার পর মৃত তিমিটি যাতে পানিতে ডুবে না যায় সেজন্য দড়ির সাথে তা বাঁধা থাকে। প্রচুর তিমি হত্যা করা হয় এ সময়। মাঝে মাঝে তিমি শিকারিদের বন্দুকের শব্দ শোনা যায়। বরফের রাজ্যে ভেসে আসে তিমি শিকারিদের জাহাজ। মহা আতঙ্কের মতো জাহাজ এগিয়ে আসে। জাহাজের শব্দ শুনে তিমিরা লুকিয়ে পড়ে। গভীর পানির নিচে চলে যায়। সূর্যের তাপে বরফের চাঁইগুলতে ফাটল ধরে।
সম্পূর্ণ নতুন এক পরিবেশে এসে যুবক তিমিটি সবকিছুকে খুটিয়ে দেখে। খুব কৌতূহল তার। বরফের ওপরে একটা সাদা ভাল্লুকের একটা সদ্য মারা সিলমাছকে টেনে নিয়ে আসতে দেখা গেল। বিরাট ভল্লুকটাকে শাদা বরফের ওপর কমলা দেখাচ্ছে। সিলের রক্ত বরফের ওপর পড়ে বরফ লাল হয়ে উঠছে। সিলটি সাংঘাতিক রকম আহত। কারণ তার দেহ থেকে একটুকরো মাংস ভল্লুকটির মুখের মধ্যে এর মাঝেই চলে গেছে।
এই ভল্লুকগুলোর অসীম সহ্যক্ষমতা রয়েছে। পুরো শীতকালটাই এরা শিকার করে কাটিয়ে দেয়। তুষারঝড় এলে দুটি থাবা দিয়ে নাক ঢেকে রাখে। ফলে বরফ চলে যায় ভল্লুকের পাশ দিয়ে। শীতের বিকেলের কালচে নীলাকাশ মেরু জ্যোতির আলোয় উদ্ভাসিত। এক বার নীল এক বার সবুজ আবার আগের রঙে ফিরে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে বাজনার তালে তালে ঝলমল করছে। আকাশ নাচছে। প্রচণ্ড ঝড়ের মধ্যে পড়ল এক বার যুবক তিমিটি। নরম বরফের স্তর জমে উঠল তার শরীরে।
একসময় ঝড়ের তীব্রতা অনেক কমে এল। উত্তরে কিছু দূর এগিয়ে যাওয়ার পর যুবক তিমিটির কাছে মনে হল যেন বিশাল এলাকা নিয়ে বরফ নড়তে শুরু করেছে। বিশাল একটা বরফের শৃঙ্গ উত্তর থেকে দক্ষিণ দিকে চলে গেছে। ভাসমান তুষার স্তরে ফাটল দেখা দিল। বরফ ভাঙার প্রক্রিয়া তুমূলভাবে চলছে। প্রচণ্ড শব্দ করে ভেঙে পড়ছে বরফের চাঁইগুলো। দূরের বরফ ভাঙার শব্দ কাঁচ ভাঙার শব্দের মতো লাগছে। চার পাশে বরফের বিশাল সমুদ্র ভেঙে ভেঙে যাচ্ছে। একটি ভাসমান বরফের দ্বীপের ওপরে ছিল যুবক তিমিটি। কিছু দূরে প্রচণ্ড শব্দে বরফের দ্বীপে ফাটল ধরল। নিমেষে দ্বীপটির আয়তন তিন ভাগের এক ভাগ হয়ে গেল। যুবক তিমিটি যেন নিজেই বরফের চাঁই হয়ে ভাসতে থাকল বিশাল সাগরে। তীব্র স্রোতের টানে যুবক তিমির দ্বীপটা এসে ঠেকেছে আরেকটা বরফের চাঁইয়ের সাথে।
এপ্রিলের দিকে মেরু ভল্লুকের পরিবার তাদের শীতকালীন আস্তানা ছেড়ে উপকূলের দিকে বেরিয়ে পড়ে। কোনো কোনো পরিবার সাগরের ওপর ভাসমান বরফের ওপর বসে ভেসে যেতে থাকে। স্বল্পস্থায়ী গ্রীষ্মকালের অনেকটা সময় এই ভল্লুকেরা ভাসমান বরফখণ্ডের ওপর বসেই কাটিয়ে দেয়। মায়ের কাছ থেকে শিকার ধরার পদ্ধতি নিপুণভাবে শিখে নেয় বাচ্চারা। তারা শেখে সিন্ধুঘোটক বা সিল শিকারের বরফখণ্ডকে কিভাবে মুগুরের মতো ব্যবহার করবে। নিজের শিকার করা প্রাণীকে সাদা ভল্লুকেরা অনেক সময় নিজের পিঠের ওপর করে নিয়ে যায়। ক্ষুধার্ত ভল্লুক সন্তর্পণে সিলের পিছু নেয়। যুবক তিমিটি এসব দেখে দেখে ক্রমশ অভিজ্ঞ হয়ে ওঠে।
মেরুদেশে শরৎকাল থেকেই দিনের দৈর্ঘ্য ছোট হতে থাকে। বাতাসের বেগ বাড়তে থাকে। দ্রুত নেমে যায় তাপমাত্রা। আকাশের রঙ ধূসর হয়ে যায়। সূর্যের উজ্জ্বল রঙ ক্রমশ কমতে থাকে। পানি জমাট বেঁধে বরফ হতে থাকে। সাদা বরফে ঢেকে যায় নীল সমুদ্র। তখন মেরু ভল্লুকেরা মুক্ত অঞ্চলে ঘুরে বেড়ায়। শীতের আস্তানার সন্ধানে সাগর থেকে ভূখণ্ডের দিকে যাত্রা করে মেরু ভল্লুকেরা। মেরু ভল্লুকের শিকার করার পদ্ধতি দেখে যুবক তিমিটি যেন অনেক কৌশল শিখে নেয়। ভাসমান বরফের স্তুপের নিচ দিয়ে এগিয়ে যায় সিলের ঘাঁটির দিকে। প্রথমে গিয়ে আড়ালে লুকিয়ে থাকে। শেষ বিকেলের দিকে সে ঝাঁপিয়ে পড়ে সিলদের ওপর।
খুনে যুবক তিমিটি ক্রমশ মারাত্মক ধরনের হয়ে উঠছে। এখন তার দুটো পাখনাই যথেষ্ট সবল। আঘাতকে প্রতিহত করতে পারে। বিভিন্ন সময়ে সংঘর্ষের কারণে তার শরীরে বেশ কাটা দাগ।
যুবক খুনে তিমিটি একনাগাড়ে পৌনে এক ঘণ্টার মতো পানির নিচে ডুবে থাকতে পারে। তার নিঃশ্বাস বাইরের শীতল বাতাসের সংস্পর্শে এসে কুয়াশার মতো জমাট বাষ্পের সৃষ্টি করে। কখনো এই কুয়াশার স্তরটা প্রায় পনের ফুট পর্যন্ত পুরু হয়। অনেক দূর থেকে স্পষ্ট দেখা যায়। তখন মনে হয় পানির ওপরে এক টুকরো সাদা মেঘ ভেসে আছে।
তিমিটার নাকের ছিদ্র পাইপের মতো। উত্তেজিত অবস্থায় এই ছিদ্র দিয়েই অদ্ভুত শব্দ বেরিয়ে আসে। অনেক দূর থেকেও শোনা যায় শব্দ। বিশাল শরীর নিয়েও তিমি নিঃশব্দে সাঁতার কাটে। যুবক খুনে তিমিটি শ্রবণশক্তির সাহায্যে শিকার করে থাকে। এই শ্রবণশক্তি দিয়ে যেকোনো বস্তুর অবস্থান, দূরত্ব নির্ণয় করতে পারে। খুনে তিমিরা ক্ষিপ্রতার দিক থেকে সবচেয়ে ভয়ঙ্কর। যুবক তিমিটি একাকী থাকে বলে মনে বেশ দুঃখ। বেশির ভাগ খুনে তিমিরা দল বেঁধে চলাফেরা করে। নেকড়ে বাঘের মতো শিকারকে তাড়া করে।
কিন্তু যুবক তিমিটি ভেসে চলে একলা। মস্ত শূন্যস্থান চলে গেছে দিগন্ত পর্বতমালা পর্যন্ত। দূরে উত্তর-পূর্বকোণে আরো পর্বতশ্রেণী। সাদা জমাট সমতল মেঘের নিচে ঝাপসা। নীল আর নরম তামাটে। যুবক তিমিটার একটা সঙ্গীর অভাব। অচেনা সঙ্গীর উদ্দেশে মাঝে মধ্যে ডাক দেয়। কখনো গভীর পানিতে ডুবে কান পেতে অন্য জাতের তিমিদের অবস্থান টের পায়। নীল তিমি, মোম তিমি, বোতল নাক তিমি, কুঁজো তিমি। কিন্তু স্বজাতি ঘাতক তিমিদের সে কোথাও দেখে না। মেরু অঞ্চলের শীতল আবহাওয়ায় বাস করতে কোনো অসুবিধা হয় না খুনে তিমিদের। বরফের নিচে দিব্যি টিকে থাকতে পারে। সেখানকার ভীষণ বোকা স্বভাবের পাখি পেঙ্গুইনদের সবচেয়ে বড় শত্রু এরা। পেঙ্গুইন পাখি হলেও উড়তে পারে না। দু’পায়ে হেঁটে হেঁটে চলে। কখনো বরফের ওপর বুঝ দিয়ে পিছলে বেরিয়ে যায়। সম্রাট পেঙ্গুইনদের জীবন রহস্যময়। শীতকালে একটি করে ডিম পাড়ে। কুমেরুর দীর্ঘ ঘন অন্ধকার রাতে বাবা পেঙ্গুইন নিজের দুপায়ের ফাঁকে সেই ডিম রেখে তা দেয়। যতক্ষণ পর্যন্ত না ডিম ফুটে বাচ্চা বেরোয় ততক্ষণ বাবা পাখি অনাহারে কাটায়।
ঘাতক তিমিরা এই সুযোগে অসহায় পেঙ্গুইনদের শিকার করে। তাদের ছিন্নভিন্ন করে ফেলে। যুবক খুনে তিমিটি নির্বিচারে পেঙ্গুইনদের শিকার করে। সে আকাশে ঝাঁক বেঁধে স্কুয়া পাখিদের উড়ে আসতে দেখে। ওদেরও প্রধান খাবার হল এ ডিম আর পেঙ্গুইনছানা। তারা এসে ঝাঁপিয়ে পড়ে পেঙ্গুইনপল্লীতে। ধারাল ঠোঁট দিয়ে ছিঁড়ে ফেলে পেঙ্গুইনের তুলতুলে ছানাদের। অসংখ্য আধখাওয়া পেঙ্গুইন ছানাদের রক্তমাখা দেহ ছড়িয়ে থাকে। হাহাকারের মতো বাতাস বয়ে যায় সেই বিষন্ন প্রান্তরের ওপর দিয়ে।
সারাক্ষণ চেঁচামেচি করতে থাকা ঝগড়াটে স্বভাবের স্কুয়া পাখিরা পেঙ্গুইনছানাদের মাংসের টুকরো বহন করে নিয়ে যায় তাদের দূরের ডেরায়। এভাবে নিষ্ঠুর শিকার পর্ব চলতে থাকে ধু-ধু মেরু প্রান্তরে। সাদা বরফের আস্তরণে বরফের ছিটে পড়ে। নৃশংস পাখি কুয়াদের অবিরাম চিৎকার শুনে খুনে তিমিটি কখনো লেজ আছড়ায়। ক্ষুধার্ত স্কুয়া মা-বাবার পেটে চলে যায় তাদের সন্তান। ক্ষুধা তীব্র হলে ডিম ফুটে ছানা হওয়া পর্যন্ত আর অপেক্ষা করে না। নিজেদের ডিম নিজেরাই খেয়ে ফেলে। রহস্যঘেরা মেরুদেশে ভেসে যেতে যেতে খুনে যুবক তিমিটা তার স্বজাতিকে খোঁজে।
আচরণের দিক থেকে খুব ভয়ঙ্কর এই খুনে তিমিরা। সাগরের বুকে এরা ঘাতক বলে পরিচিত। যখন তখন আক্রমণ করে বসে যাকে তাকে। সাগরের কোনো প্রাণী তাই এদের ঘাঁটাতে সাহস পায় না। নমনীয় শরীরের খুনে যুবক তিমিটি তীরবেগে ছুটে শিকারকে ধরে চোয়ালে পুরে ফালাফালা করে ফেলে। ঝিলিক দিয়ে ওঠে তার ধারাল দাঁতের সারি। সিল, শুশুক বা অন্য তিমিদের গা থেকে মাংস খসিয়ে গিলে ফেলে। অনেক সময় তিমিদের রাজা নীল তিমিকেও আক্রমণ করে বসে এই হিংস্র ঘাতক তিমিরা। এস্কিমো তিমি শিকারিদের কাছে খুনে তিমিদের নাম ওরকা। তারা দেখেছে এই ওরকারা নীল তিমিদের ওপর হামলা চালিয়ে তাদেরকে মেরে ফেলতে। তারা খুনে তিমিদের ধারে কাছে সহজে যেতে চায় না। তাদের ধারণা খুনে তিমিদের মারলে ওদের আত্মা একদিন-না-একদিন প্রতিশোধ নিতে ফিরে আসবেই।
সূর্যতাপে বরফ গলতে শুরু করেছে। সিলের দলের মাঝে অন্য কোথাও চলে যাবার জন্য সাড়া পড়ে যায়। এক দিন যুবক তিমিটা একটা হিমবাহের ওপর শুয়ে ছিল। হঠাৎ দেখল সামনে বিশাল বরফের চাঁইটা তার দিকে দ্রুত এগিয়ে আসছে। ভয়ঙ্কর বিপদ বুঝতে পেরে তিমিটা পাশের বরফ চাঁইতে লাফিয়ে পড়তে গেল। কিন্তু সে সময়টুকু পেল না। তার আগেই বিশাল চাঁইটির প্রচণ্ড ধাক্কা পেল। আঘাতটা ছিল ভয়াবহ। তিমিটার পিঠ আর কোমর থেতলে যায়। মুখেও সাংঘাতিক আঘাত পায়। ফিনকি দিয়ে রক্ত বেরুতে থাকে। ধীরে ধীরে তিমিটার শরীর নিস্তেজ হয়ে আসতে থাকে। ক্ষিপ্রগতির প্রাণিটি কেমন দুমড়ে মুচড়ে গেছে। যুবক তিমিটার মা’র কথা মনে হচ্ছে। মাকে সে কতদিন দেখে না। মা’র পাখা থেকে সে শব্দধ্বনি শুনতে পেত। মা যেন আবুল হয়ে জানতে চাইতো কেমন আছিস আমার সন্তান। মা’র মুখটা ফুটে উঠে আবার ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে। সমস্ত শরীরে অসহ্য যন্ত্রণা। একসময় জ্ঞান হারিয়ে ফেলে যুবক তিমিটা। তার বিশাল দেহটা পানিতে ভাসতে থাকে। একটা উলভেরিন ভল্লুক জ্ঞানহারা খুনে তিমিটার ঘ্রাণ পেয়ে দ্রুতগতিতে এগিয়ে আসে বরফের চাঁইয়ের ওপর দিয়ে। এস্কিমোরা মনে করে উলভেরিনদের ভেতরে কোনো বড় শিকারির আত্মা লুকিয়ে রয়েছে। বরফ চাঁইতে বসে থাকা সিলগুলও দেখে জ্ঞানহীন তিমিটাকে।
তীব্র বাতাসের ঝাপটা বয়ে যায়। চারদিকে শুধু বরফ। সাগরের বুকে ভাসছে বরফের বিশাল চাঙর। নীল দিগন্ত ছুঁয়ে বরফের ফরাশ পাতা রয়েছে। রহস্যের কুয়াশায় ঢাকা মেরু সাগরে এলোমেলো ভেসে যেতে থাকে যুবক তিমিটির মূর্ছিত শরীর। বরফের নির্জন প্রান্তরে তীব্র স্বরে ডাকছে অক পাখি। কিছুক্ষণ পর তিমিটা জ্ঞান ফিরে পায়। তার সারা শরীর চিনচিন করছে। ব্যথায় কাতরাতে থাকে। তার আর্তনাদ শুনে সিলের দল চমকে যায়। গোঙানির শব্দে ভয় পেয়ে পালিয়ে যায়। যুবক খুনে তিমির ডাক বাতাসে কাঁপন তুলে ছড়িয়ে যেতে থাকে। গ্রিনল্যান্ডের স্থানীয় তিমিরা সে ডাক শুনেও কোনো সাড়া দেয় না। খুনে তিমিদের তারা এড়িয়ে চলে। খুনে তিমিটা কোনোমতে পাশ ফেরে।
চাঁইটাকে আঁকড়ে ধরে। হঠাৎ একটা প্রবল ঢেউ এসে তার উপর আছড়ে পড়ে। ঝাপটা দিয়ে পানি ঢোকে তার নাকের ভেতরে। তাকে একেবারে অসাড় করে দেয়। আবার সে জ্ঞান হারিয়ে ফেলে।
কিছুটা দক্ষিণে খুনে তিমিদের একটি দল শিকারের আশায় ঘুরছিল। তবে দলটিতে কোনো শৃঙ্খলা ছিল না। তারা এলমেলভাবে দাপিয়ে বেড়াচ্ছিল। কিছু দিন আগে তাদের দলপতি মারা গেছে। একটি নবীন তিমি দলটিকে চালানোর চেষ্টা করছে। তার ভীরু স্বভাবের জন্য কেউ আবার তাকে মানতে চায় না। তার নির্দেশকে গুরুত্ব দেয় না। ওই দলের একটি মেয়ে তিমির পাখায় ছিল সাদা ছিট দাগ। যে কারণে তাকে সুন্দর দেখাত। সে তার দলের মাঝে ছিল বেমানান। সে জানতো অন্যদের চেয়ে সে আলাদা। মেয়ে তিমিটি দলের সাথে না থেকে দলছুট অবস্থায় থাকত। দলের বাকি তিমিরা ভাবত সে বোধহয় খুব দেমাগি। অথচ তার ইচ্ছাগুলোকে কেউ জানতে চাইত না। কী তার ভাল লাগে। কী তার ভাল লাগে না। খুনে তিমি দলের মেয়ে তিমিটি তাই অভিমান করে দূরে দূরেই থাকত। প্রচণ্ড শীতের জন্য ওই জায়গাটিকে তার ভাল লাগত না। সে তার জন্মস্থান প্রেলাসন-এ ফিরে যেতে চায়। তার জন্মস্থানের স্মৃতি সবসময় তাকে অনুরণিত করে। সেই জায়গাটি ছিল নরওয়ের ধারে। এক উষ্ণ, শান্ত সমুদ্র। যেখানে শিকার পাওয়া যেত প্রচুর। সোনালি রোদের তাপে শরীর উষ্ণ হয়ে উঠত। এখানে মেরুর তীব্র শীতে শরীর যেন মাঝে মধ্যে জমাট বেঁধে যেতে চায়। প্রচণ্ড শীতকে সহ্য করার ক্ষমতা রয়েছে। দলের সাথে ঘুরতে মেয়ে তিমিটির একদম ইচ্ছা করে না। এখন যে নবীন তিমিটি দল চালাচ্ছে তার তো বুদ্ধি-বিবেচনায় ঠিকমতো নেই বলে মনে হয় মেয়ে তিমিটির। ভুল সিদ্ধান্ত নেয়। শিকার জোটাতে পারে না। মেয়ে তিমিটি তাই সুযোগ পেলেই দল থেকে ছিটকে গিয়ে একাকী ঘুরতে থাকে। এমনি ঘোরার সময় তার কানে গিয়ে পৌঁছল সেই আহত যুবকটির করুণ আর্তনাদ। বেঁচে থাকার জন্য আকুল মিনতি। স্বজাতির ডাকের ভাষা সে সহজেই বুঝতে পারে। শব্দতরঙ্গের অস্থির ধ্বনি তাকে অস্থির করে তোলে। মারাত্মক বিপদে পড়ে কেউ সাহায্য চাইছে। মেয়ে খুনে তিমিটির মাঝে ভীষণ মমতার সৃষ্টি হয়। এখানে কে এমন করে বিপদে পড়েছে। তাদের দলের বাইরের কেউ হবে। সে পানির ওপরে মুখ তুলে বুক ভরে নিঃশ্বাস টেনে নিয়ে গভীরে ডুব দিল। প্রতিধ্বনি সংকেত থেকে সে বিপদগ্রস্ত তিমিটির অবস্থান ধারণা করতে পারে। সে অনুভব করে ‘আমাকে বাঁচাও, আমাকে বাঁচাও’ আকুতিকে। মেয়ে তিমিটি দ্রুতগতিতে সাঁতরে সেদিক পানে এগিয়ে যেতে থাকে। ডাকটা ক্রমশ করুণ হচ্ছে। সে চিৎকার করে প্রতি উত্তরে সাড়া দেয়। যুবক তিমিটি আচ্ছন্নের মতো অবস্থায় থাকার জন্য সে ডাক শুনতে পায় না। বরফস্তর পড়ে সে ধুঁকছে।
আহত তিমির অবস্থানটি চিহ্নিত করতে পেরেছে মেয়ে তিমিটি।
কিছুক্ষণের মধ্যেই সেখানে পৌঁছে যায়।
এলিয়ে পড়ে আছে যুবক তিমিটি। তার থেঁতলানো শরীর দেখেই সঙ্গিন অবস্থা বুঝতে পারে মেয়ে তিমিটি। আলতোভাবে আহত তিমিটাকে তার ওপরে শুইয়ে দেয়। কোনোরকমের সাড়াশব্দ নেই আহত তিমিটার। মুর্ছিত অবস্থায় রয়েছে। মেয়ে তিমিটির সেবায় আহত তিমিটি সুস্থ হয়ে ওঠে।
মেয়ে তিমিটি তাকে ডাকতে থাকে। একসময় আচ্ছন্ন ভাবটা কেটে যায় আহত তিমির। ঘোলাটে চোখ মেলে তাকায়। শরীরে থরোথরো কাঁপুনি সৃষ্টি হচ্ছে। মেয়ে তিমিটি আগ্রহভরে তাকিয়ে আছে। তার পাখার সাদা ছিটগুলো চিকচিক করে। মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসেছে যুবক তিমিটা। মেয়ে তিমিটির এ রকম সেবা না পেলে হয়তো তার বাবার মতোই গহিন সাগরতলের অন্ধকারে নিঃশব্দে হারিয়ে যেত। যুবক তিমিটি আবার চোখ মুদে ঝিমুতে থাকে। সে একেবারেই নিস্তেজ অবস্থায় রয়েছে। মেয়ে তিমিটি তাকে বাঁচিয়ে তোলার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করছে।
অনেকক্ষণ পর যুবক তিমিটির জ্ঞান ফিরে আসে। ঝাপসা দৃষ্টিতে আকাশের দিকে তাকায়। তার নিঃশ্বাস যেন ধীরে ধীরে সহজ হচ্ছে। শরীরে ফিরে আসছে সহজ ভাবটা। কিন্তু আচ্ছন্ন ভাবটা পুরোপুরিভাবে কাটছে না। অচেতন হয়ে পড়ে থাকে। মেয়ে তিমিটির মনে পড়ছে পুরনো দিনের কথা। নরওয়ের উপকূলে কাটানো সেই দিনগুলো। সেখানে বেঁচে থাকার জন্য এত সংগ্রাম করতে হতো না। মেয়ে তিমিটি সিদ্ধান্ত নিল যদি এই আহত তিমিটি সুস্থ হয়ে ওঠে তবে তাকে জীবনসাথী করে নেবে। তাকে নিয়ে এখান থেকে চলে যাবে সেই নরওয়ের উপকূলে। জীবনের বাকি দিনগুলো সুখে কাটাবে।
প্রায় কুড়ি দিন পর যুবক তিমিটি সুস্থ হয়ে ওঠে। এখন সে সাঁতার কাটে। সে মেয়ে তিমিটির ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল। তাকে নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে উদ্ধার করেছে। নতুন জীবনকে ফিরে পেয়েছে সে। এত দিন তো জমাট বাঁধা অন্ধকারের বাসিন্দা হয়েছিল। এখন আলোর ঝিলিক দেখতে পায়। মেয়ে তিমিটিকে সে জীবনসাথী করে নিয়েছে। মেয়ে তিমিটির দল চলে গেছে। তাদেরও এখন দক্ষিণে যেতে হবে। দূরে যাওয়ার ডাক শুনতে পেয়েছে ওরা। সাদা ছিট দাগের পাখনায় কাঁপন অনুভব করে মেয়ে তিমিটি। যুবক তিমিটি রাজি। এখানে খাবারের অভাব। মেয়ে দক্ষিণে যাওয়ার পথ দেখিয়ে নিয়ে চলেছে।
খুনে তিমি ওরকারা অন্য জাতের তিমিদের কাছে আতঙ্ক। আকারে দ্বিগুণ তিমিকেও এরা অবলীলায় কুপোকাত করে ফেলতে পারে। তারপর ঝট করে জিহ্বা ছিঁড়ে নেয়। ওরকাকে তাই যমের মতো ভয় পায়। অথচ অন্য বড় তিমিরা ইচ্ছা করলে এক আঘাতে খুনে তিমিদের ছিঁড়ে ফেলতে পারে। ভয়ে তা করে না। ওরকার সাড়া পেলে আতঙ্কে অন্য তিমিরা দিশেহারা হয়ে পড়ে। এলোপাতাড়ি ছোটাছুটি করে। এভাবে ছুটতে গিয়ে কোনো তিমি চড়ায় গিয়ে আটকা পড়ে। যুবক তিমি আর মেয়ে তিমি ওরকা বলে তাদেরকে এড়িয়ে চলতে চায় অন্য তিমিরা।
একটা কুঁজো তিমি তখন খাড়ি অঞ্চল দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছিল। খুনে তিমি ওরকাদের কাছে এক প্রিয় শিকার হচ্ছে এই কুঁজো তিমিরা। কারণ কুঁজো তিমিদের জিভ হচ্ছে তাদের এক প্রিয় খাবার। কুঁজো তিমিটাকে দেখতে পেয়েছে যুবক খুনে তিমিটা। চোখের সামনে এমন চমৎকার এক শিকার দেখতে পেয়ে তার শরীরটা কেমন চনমন করে ওঠে। পানির ভেতরে সাঁতরে চলেছে লোভনীয় শিকারটা। কুঁজো তিমির হাঁ করা মুখের ভেতরের মস্ত জিভটার কথা ভাবল হিংস্র আরেকটি।
খুনে তিমিটা এখন তার ওপরে ঝাঁপিয়ে পড়ে সেই স্বাদু জিভটাকে ওপরে নিতে চাইছে। সঙ্গী মেয়ে তিমিটাকেও তাহলে তার বীরত্বের সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়া যাবে। মেয়ে তিমিটা ভালো করে দেখুক তার কতটা সাহস। তার চেয়েও বিশাল আকারের কোনো প্রাণিকে আক্রমণ করতে সে মোটেও ভয় পায় না। কুঁজো তিমিটা ততক্ষণে মূর্তমান আতঙ্কে ওরকাকে দেখে ফেলেছে। তার সর্বাঙ্গে শিহরণ বয়ে যায়। তড়িৎ ছুটে পালাতে চায়। এগিয়ে আসছে ওরকা। ছুটে পালানোর সময় দিক-বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে একটা চড়ায় আটকা পড়ে যায়। মুখটাকে বন্ধ করে রাখে। অসহায়ের মতো সেখানেই চিত হয়ে পড়ে থাকে। খুনে তিমিদের প্রধান লক্ষ্যই হচ্ছে অন্য তিমিদের জিভকে ছিঁড়ে নেয়া। যুবক খুনে তিমিটা ধীরে ধীরে এগিয়ে যায় কুঁজো তিমিটার দিকে। মেয়ে তিমিটা দেখছে খুনে তিমিটা তার শক্ত নাক দিয়ে পড়ে থাকা কুঁজো তিমিটার মুখে প্রচন্ড জোরে আঘাত করে। ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেছে ওরকা। ক্রমাগত আঘাতের পর আঘাত করতে থাকে। এ রকম আঘাত আর সহ্য করতে পারে না কুঁজো তিমিটা। বাধ্য হয়ে একসময় মুখ খোলে। অমনি ওরকা সে হাঁ করা মুখের ভেতরে তার মুখটিকে ঢুকিয়ে দেয়। তারপর কুঁজো তিমির জিভটাকে ছিঁড়ে ফেলে।
সুমেরু অঞ্চলটা পেরিয়ে যেতে তাদের দিন পনের লাগে। সামনে দক্ষিণ নরুওয়ের খাঁড়ি অঞ্চল। মেয়ে তিমিটি যুবক ভিমিটাকে পথ দেখিয়ে নিয়ে চলেছে। সারা দিন ধরে তারা নিজস্ব গন্ত্যব্যের দিকে এগিয়ে চলে। বসন্তকালের আগমনে ঝলমলিয়ে উঠল পুরো উপত্যকা। সূর্যতাপে কিভাবে বরফের স্তূপ গলে যায়। এ সময় স্যামন মাছেরা দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে চলে আসে খাঁড়ি এলাকায়। গ্রিজলি ভল্লুকেরা আসে স্যামন মাছ ধরতে। সিলেরাও আসে তাদের পেছনে। দুটি খুনে তিমি এত শিকার পেয়ে খুশি হয়। তারা অনেক দিন উপবাস করে থাকতে বাধ্য হয়েছিল। স্যামন আর সিলের মতো খাদ্য পেয়ে তারা তৎপর হয়ে ওঠে।
দিনের সীমা একটু একটু করে বাড়তে থাকে। এই খাঁড়ি পথটি যেন প্রাণের সম্ভারে উথলে উঠেছে। মাছ ধরার জাহাজগুলো আসে। জাল ছুড়ে দেয় জাহাজের ডেক থেকে। প্রচুর মাছ জালে আটকা পড়ে। খুনে তিমি দু’টি বিপদ বুঝে ঘাপটি মেরে থাকে। জাহাজগুলো চলে যাওয়ার পর স্বস্তি ফিরে পায়। বুঝতে পারে খাঁড়িটা তাদের জন্য নিরাপদ না। বিশাল সমুদ্র হচ্ছে তাদের জন্য একমাত্র নিরাপদ আশ্রয়। তারা অবিরাম ভাসতে থাকে। নরওয়ের উপকূলভাগ যেন তাদের নতুন করে জায়গা দিয়েছে। যুবক তিমিটি এগিয়ে যায় পশ্চিমের দিকে। ছোটবেলায় মা-বাবার সাথে সেখানে ঘুরত। সেই স্মৃতিগুল তার মনে পড়ে যায়।
একদিন মেয়ে তিমিটি প্রচন্ডভাবে ছটফটিয়ে উঠল। তার বাচ্চা দেয়ার সময় উপস্থিত হয়েছে। চার পাশের পানি তোলপাড় করল। একটি মেয়ে তিমি শিশুর জন্ম দিল। সাগরের বুকে ঘাতক তিমি দলের আরেকটি সদস্য বৃদ্ধি পেল। সদ্য জন্ম নেয়া তিমি শিশুটি তার খুদে ডানা আর লেজ নিয়ে সাগরে ঘুরপাক খায়। মা’র বুক থেকে দুধ খায়। খুনে তিমিদের ছোট পরিবারটি এগিয়ে যেতে থাকে উপকূলের দিকে। শিশু তিমিরা তখনই বড় হয়ে ওঠে যখন তারা নিজেরাই খুদে চিংড়ি মাছের মতো প্রাণী ক্রিল হত্যা করতে শেখে। বছর ফুরিয়ে আবার শীতকাল আসে।
তিমি পরিবারটি আরো দক্ষিণে চলে এসেছে। একপাশে অগাধ জলরাশি। অন্যদিকে লম্বা তটভূমি। উষ্ণ পানির ধারা তাদের পিঠের ওপর দিয়ে বয়ে যায়। তারা ঘুরে ঘুরে শিকার করে। কখনো চলে যায় গভীরে। বালুময় চড়ার কাছাকাছি শিশুতিমিটিকে তাড়া করে ফেলে মাছেদের ঝাঁক। তখনো তার শিকার করতে পারার ক্ষমতা হয়নি।
একটা বিশাল তিমি শিকারির জাহাজ আসে সেখানে। অতলান্তিকের এ অঞ্চলটায় বছরের এ সময়ে তিমি শিকারে আনাগোনা শুরু হয়ে যায়। হাজার হাজার বছর ধরে আর্কটিক অঞ্চলের এস্কিমোরা তিমি শিকার করে আসছে। তিমির চামড়া তাদের কাছে একটি মূল্যবান বস্তু। তারা একে স্থানীয় ভাষায় বলে মুকটুক। এস্কিমোদের কাছে তিমি অনেকটা ধর্মীয় হিসেবে পরিচিত। তিমিকে হত্যা করে মাংস কেটে নেয়ার পরে এস্কিমোরা তিমির হাড়গোড় আবার সাগরে ডুবিয়ে দেয়। তারা তখন বিশ্বাস করে যে মৃত তিমির আত্মাটা শেষ পর্যন্ত মুক্তি পেল। যখন তারা তিমি শিকার করে মৃত তিমিটির মুখে বিশুদ্ধ পানি ঢেলে দেয়।
এস্কিমোরা বিশ্বাস করে, এর ফলে তিমি-টির আত্মা নিঃশেষিত হবে না। পৃথিবীতে আবার ফিরে আসবে। তিমি শিকারিদের কাছে তিমির শরীর হল এক বিরাট চর্বির পাহাড়। তিমির মাথাতে জমা আছে মানুষের ব্যবহারের মোম।
জাহাজগুল প্রচুরসংখ্যক তিমি হত্যা করে। একটা মাঝারি আকারের তিমি থেকেও চার/পাঁচশো মণ মাংস পাওয়া যায়। এভাবে তিমি মেরে টন টন তিমির মাংস দিয়ে জাহাজগুল বোঝাই করে। তিমির মতো অতিকায় প্রাণিকে শিকার করতে শিকারিদের দীর্ঘ দিনের অভিজ্ঞতার প্রয়োজন হয়। শিকারিদের ধারণা হচ্ছে তিমি শিকার করতে যাওয়া আর মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়া প্রায় একই ব্যাপার। আহত তিমি মৃত্যুর আগে অনেক সময় শিকারদের নৌকাকে লেজের ঝাপটা মেরে ডুবিয়ে দেয়ার চেষ্টা করে। হারপুন নিয়ে তিমি শিকারিরা তাকিয়ে থাকে সমুদ্রের দিকে। উত্তর অতলান্তিকের সবখানে এরা যায়। নরওয়ের পাশ থেকে আফ্রিকা পর্যন্ত এরা তিমি শিকার করে থাকে। তিমিকে লক্ষ্য করে এখন কামানের। সাহায্যে হারপুন ছুড়ে মারে। হারপুনের মাথায় এক ধরনের বিস্ফোরক পদার্থ থাকে। এতে তিমি নিস্তেজ হয়ে পড়ে। খুনে তিমিদের ছোট পরিবারটি শিকারিদের জাহাজ দেখে সাবধান হয়ে অন্য দিকে চলে গেল। শিকারিরা দূরবীন দিয়ে জাহাজের ডেকে দাঁড়িয়ে সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে ছিল। তাদের দূরবীনে ধরা পড়ল তিমি পরিবারটি। তিনটি তিমিকে দেখতে পেয়ে শিকারিরা উৎফুল্ল হয়। তিনটি তিমির ডুব দেয়ার দৃশ্য দেখতে পেয়েছে শিকারিরা। তারা তখন জাহাজের গতিবেগ বাড়িয়ে দেয়। তিমি-গুলর সাথে জাহাজের দূরত্ব কমে আসতে থাকে। যুবক তিমিটা একবার ভেসে ওঠে। জাহাজের ডেকে দাঁড়ানো শিকারিরা তার পিঠের পাখনাকে দেখে। চিকচিক করছে। শিকারিরা বুঝতে পারল যে ওটা হচ্ছে পুরুষ তিমি। শিকারিদের নিয়ম হচ্ছে তারা আগে পুরুষ তিমিদের আঘাত করবে না। স্ত্রী তিমিকে প্রথমে আঘাত করবে। আর স্ত্রী তিমিকে ঘায়েল করলে সহজেই পুরুষ তিমিটা নাগালের মাঝে চলে আসবে। পুরষ তিমিটাকে ধরার জন্য আর বেগ পেতে হবে না। জাহাজটা তখন স্ত্রী তিমি আর শিশু তিমিকে লক্ষ্য করে এগিয়ে চলেছে।
হঠাৎ শিকারিরা দেখল একটা ঘন কাল ছায়া তীরবেগে জাহাজের দিকে এগিয়ে আসছে। যুবক খুনে তিমিটা জাহাজের কাছে এসে ভেসে ওঠে। প্রচণ্ড জোরে জাহাজটি ধাক্কা দেয়। সেই ধাক্কার চোটে প্রবলভাবে নড়ে ওঠে জাহাজটি। সাগরবক্ষে টলটলায়মান হয়ে ওঠে। এদিকে-সেদিকে আন্দোলিত হতে থাকে। ডেকের লোকগুল কোনোমতে রেলিং ধরে নিজেদের সামলে নেয়। ইস্পাতের তৈরি জাহাজকে তো তিমিটা সহজে ক্ষতি করতে পারে না। তিমিটাকে লক্ষ্য করে জাহাজ থেকে হারপুন ছোড়া হয়। ছুটছে যুবক তিমি। হারপুনটা সাঁ করে এসে গেঁথে যায়। ফিনকি দিয়ে রক্ত ছোটে। হারপুনটা তিমির শরীরের ওপর থেকে কিছুটা মাংস ছিঁড়ে পানিতে ছিটকে পড়ে। তিমিটার দিকে দ্বিতীয়বারের মতো হারপুন ছুড়তে উদ্যত হয় শিকারিরা। তার আগেই তিমিটা চড়ার কাছাকাছি জায়গায় গিয়ে পৌঁছায়। সে জায়গাটি ছিল অগভীর। বিশাল জাহাজটির পক্ষে সে জায়গায় যাওয়া সম্ভবপর না। সমস্ত দিন ধরে শিকারিরা অপেক্ষা করে। যদি তিমিটা স্থান পরিবর্তন করে। কিন্তু তিমিটা সেখান
থেকে আর নড়ে না।
সন্ধ্যের দিকে জাহাজটি মাঝ সমুদ্রে সরে যায়। রাত গভীর হতে থাকে। ডাঙার দিক থেকে ঝিরঝিরে বাতাস বইছে। পুরুষ তিমিটা ভাবছিল সেখান থেকে চলে যাবে। বউ-বাচ্চাকে নিয়ে অন্য দিকে বেরিয়ে পড়ল। ভয়াবহ বিপদের হাত থেকে সে মুক্তি পেতে চায়।
তাদের দুঃস্বপ্নের যেন অব-সান ঘটেছে। উত্তর সমুদ্রের প্রচ্ছন্ন আবহাওয়ায় ওরা এগিয়ে যেতে থাকে। দিন কয়েক পরে স্কটল্যান্ডের আশপাশের দ্বীপগুলর কাছে পৌঁছায়। সেখানকার পাহাড়। শ্রেণীতে প্রবল বেগে আছড়ে পড়ে ঢেউ। অদ্ভুত একটা গন্ধ ভাসছে বাতাসে। খুনে তিমি তিনটি সেখানে থামে। পানির নিচে বিভিন্ন ধরনের শব্দ। তীরের কাছে শ্যাওলা আর বুনো ঝোপঝাড়। অন্য জাতের কয়েকটি তিমি সেখানে উপস্থিত হয়েছে। সারা রাত ধরে জেগে থাকে পুরুষ খুনে তিমিটা। ওই জায়গাটিকে অনেক চেনা বলে মনে হচ্ছে। এত দিন সে ভবঘুরের মতো সমুদ্র চষে বেড়িয়েছে। তার বউ তাকে নতুন জীবন দিয়েছে। বিশাল বরফ চাঁইয়ের আঘাতে আহত হয়েছিল সে। মৃত্যুর মুখে পড়েছিল। সে নিশ্চিত মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসেছে। এখানেই তার বাবার জন্ম হয়েছিল। তার জীবনের সূচনাও হয়েছিল এখানে। সেই পরিবেশের সাথে যেন অদ্ভুত ধরনের এক মায়াবী রহস্য মিশে আছে।
পুরুষ তিমিটা ভাবল যত দিন ভাল লাগবে তত দিন থাকবে সেখানে
থাকবে তারা। জায়গাটি তাদের জন্য অনেক নিরাপদ ভাবল পরিবারটি। কিন্তু কিছুদিন পর পুরুষ তিমিটির মনে হল চার পাশে যেন খাদ্যসম্ভার তেমন নেই। ক্রিল, ডলফিন মাছের বিশাল ঘন ঝাঁক সব উধাও হয়ে গেছে।
খুনে তিমিগুলর উপস্থিতি তারা টের পেয়েছে। যেন তাদের মৃত্যুদূতেরা এসেছে ওখানে। খাবারের ঘাটতি হওয়ায় বিপুল সমস্যায় পড়ে পুরুষ তিমিটা। এক দিন তাই বউ আর বাচ্চাকে নিয়ে অন্য দিকে পাড়ি জমাল। মেয়ে তিমিটি কিন্তু সেখান থেকে সরতে চাইছিল না। কত সহজেই
সেখানে শিকার পাওয়া যেত। আবার নতুন করে সমুদ্র স্রোত ঠেলে যেতে তার ইচ্ছে করছিল না। এছাড়া তার বাচ্চা হওয়ারও সময় হয়ে আসছে। এক ঝড়ো বিকেলে একটি ছেলে তিমির জন্ম দিল মা তিমিটি। খুনে তিমিদের পরিবারটি পশ্চিমের দিকে যাত্রা করছে। শিশু তিমিটিও বড় হয়েছে। ছোট ভাইটাকে সামাল দেয়। কিন্তু সে ভারি অস্থির স্বভাবের। সমুদ্রতল তার কাছে ভাল লাগে না। একবার বাবা-মার সাথে অনেক শিকার করল সে। তারপর কী যে হল তার। সে সোজা অকূলে সাঁতার দিতে শুরু করল। বাবা-মার ডাক অগ্রাহ্য করে ছুটল।
অনেক দূরে চলে গেল সে। তাদের আর দেখা হয়নি। এখন তিমি পরিবারটি আবার তিনজন হয়ে যায়। এই পরিবারটি বেঁচে থাকার তাগিদে ঘুরে বেড়ায় অতলান্তিকের বুকে। এক স্থানে শিকারের অভাব দেখা দিলে চলে যায় অন্য দিকে। এভাবে ভেসে যেতে যেতে তারা দেখা পেল সেই পুরনো খুনে তিমিদের বিশাল দলটির। সেখানে রয়েছে হারপুনের আঘাতে ক্ষত-বিক্ষত মুখের ভয়ঙ্কর দেখতে দলপতিটা। কিন্তু পুরুষ তিমিটির চোখে কী রকম বিপর্যস্ত চেহারার বলে মনে হল। সেই দুরন্ত স্বভাবের চিহ্ন নেই। বয়সের ভারে শরীরের চামড়া গেছে কুঁচকে। লেজ ঝুলে গেছে। শক্ত পাখনাটি গেছে নেতিয়ে।
পুরুষ তিমিটির মনে পড়ল এই দলপতির সাথে তার একদিন তীব্র লড়াই হয়েছিল। তাকে তখন যথেষ্ট আঁচড়ে-কামড়ে দিয়েছিল। এখন দলপতির তীক্ষ্ণ দাঁতের সারি নেই। তবে ঐ দলপতির কাছ থেকে অনেক কিছু শিখতে পেরেছিল পুরুষ তিমিটি। কিভাবে সমুদ্রের মাঝে একটি দলকে পরিচালনা করতে হয়।
ক্লান্ত দলপতির চলাফেরার ভাব দেখে বোঝা যাচ্ছে তার জীবনীশক্তি ক্রমশ নিঃশেষ হয়ে আসছে। ক্লান্ত, অবসন্ন দলপতি পুরুষ তিমিটিকে দেখে কেমন যেন আশ্বস্ত হয়। যেন নতুন আলর এক ঝিলিক দেখতে পাচ্ছে। তার নিভে আসা চোখে দ্যুতি ছড়িয়ে পড়ে। সে পুরুষ তিমিটির দুরন্ত সাহসের সাথে পরিচিত। তার শক্তি আর কৌশলের কথা জানে।
দলপতি ভালভাবেই বুঝতে পারছে তার পক্ষে আর দলটিকে পরিচালনা করা কোনোমতেই সম্ভবপর হয়ে উঠছে না। জোরে ছুটতে পারে না। ক্ষিপ্র গতিতে শরীরটাকে বাঁকাতে পারে না। ঠিকমতো দলের অন্য সদস্যদের কাছে সতর্ক সংকেত পাঠাতে সক্ষম হয় না। শরীর অজানা আশঙ্কায় থরথর করে কাঁপে। তার ইচ্ছে খুনে তিমিদের এই দলটির নেতৃত্বের ভার ঐ লড়াকুস্বভাবের পুরুষ তিমিটির হাতে তুলে দিতে। হঠাৎ করেই দলছুট হয়ে গিয়েছিল সে। কত খুঁজেছে তাকে। আবার ফিরে পাওয়া গেছে। বৃদ্ধ দলপতি পুরুষ তিমিটির দিকে নিস্তেজ শরীরটাকে নিয়ে এগিয়ে আসে। তারপর কিছুক্ষণ ক্লান্ত চোখে তাকিয়ে থাকে।
পুরুষ তিমিটি বৃদ্ধের চোখের ভাষা বুঝতে পারে। সেই চোখে আকুতি। যেন বলতে চাইছে ‘এখন থেকে এই দলের ভার আমি তোমার হাতে তুলে দিতে চাই। তুমি তা গ্রহণ করো। আমার সময় একেবারেই ফুরিয়ে এসেছে। আমরা সবাই তোমার নেতৃত্ব কামনা করছি।
পুরুষ খুনে তিমিটি তীক্ষ্ণচোখে তাকিয়ে রয়েছে বৃদ্ধ দলপতির আকুতিভরা চোখের দিকে। কতো সাগর পাড়ি দিয়েছে অভিজ্ঞ এই চোখ। কত মারাত্মক বিপদের সম্মুখীন হয়েছে। পুরুষ তিমিটি আশ্বস্ত করে বৃদ্ধ দলপতিকে। ‘ভয় নেই আমি এখন থেকে এ দলের নেতৃত্ব গ্রহণ করলাম। আপনি নিশ্চিন্ত হতে পারেন। বৃদ্ধ দলপতির চোখ কৃতজ্ঞতায় চকচক করে ওঠে। বৃদ্ধ দলপতিটা একটা গভীর দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। এরপর তার শরীরটা কাত হয়ে পড়ে। পেটের দিকটা ওপরের দিকে উঠে যায়। বিশাল দেহটি এলমেলভাবে ভঙ্গিতে ডুবে যেতে থাকে।
পুরুষ তিমিটি দেখল খুনে তিমিদের পুরো দলটি তাকে ঘিরে আছে। সবাই তার দিকে কেমন সমীহভরা দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছে। তাদের চাহনি দেখেই বুঝা গেল তাকে দলপতি হিসেবে মেনে নিয়েছে তারা।
তবে সেই দলে ছিল দুটি তিমি তার ঘোরবিরোধী। তারা ছিল হিংসুটে। নতুন দলনেতাকে মেনে নিতে চাইছিল না।
পুরুষ তিমিটি যখন একটু ফাঁকায় গেছে অমনি তারা ঝাঁপিয়ে পড়ল তার ওপরে। পুরুষ তিমিটা বুঝল তাকে এখন দুটো তিমির সাথে লড়াই করতে হবে। জাতে তারাও প্রচণ্ড হিংস্র। পুরুষ তিমিটা লেজের ঝাপটা দিয়ে প্রাথমিক আঘাতটা সামাল দিতে চাইল। পানিতে তীব্র আলড়ন সৃষ্টি হল। কিছুক্ষণের মধ্যে পুরুষ তিমিটা ঘায়েল করে ফেলল বাকি তিমি দুটিকে। খুনে তিমির দলের বাকিরা এ লড়াই দেখছিল। তারা বুঝতে পারছে এ লড়াইটা তাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তাদের নতুন নির্বাচিত দলনেতার সম্মানের বিষয়। বিদ্রোহী তিমি দুটো আহত হয়ে ফিরে গেছে। এই দলে থাকার তারা অধিকার হারিয়েছে। পুরুষ তিমিটি গর্বিত সাথে ঘুরছে। সমুদ্রের বহু বিষয়ে অভিজ্ঞ সে। তার ওপর এখন বড় একটি দলের নেতৃত্ব। সে জানে ভয়ঙ্কর সব বিপদ অপেক্ষা করে আছে সামনে। লোভী তিমি শিকারিরা ঘুরছে জাহাজ নিয়ে। জাহাজের ডেকের কামান থেকে তাদের লক্ষ্য করে ধারাল অস্ত্র ছোড়া হবে। সেই তীক্ষ্ণ অস্ত্র তীরবেগে এসে বিধবে তাদের শরীরে। তাদের আগের দলপতির মুখটা ক্ষত-বিক্ষত হয়ে গিয়েছিল সে অস্ত্রের আঘাতে।
অক্টোপাস, হাঙর আর স্কুইডরাও তাদের অনেক বড় শত্রু। সুযোগমতো তাদের টেনে নিয়ে যাবে অন্ধকার অতলে। এদের গতিবিধির ওপর তাই তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখতে হবে। নিজের দলকে নিরাপদে নিয়ে যেতে হবে। তার মাও ছিল ঐ দলে। মা মুগ্ধ চোখে ছেলেকে দেখে। কত সাহসী হয়েছে। তাদের দলের সকল ভালমন্দের ভার এখন তার ছেলের। খুনে তিমিদের দলটি সাগরের বুকে ছুটে চলার সময় নতুন একটি নেতা পেয়ে খুশি। নতুন দলপতি দলের সকলকে তাকে অনুসরণ করার জন্য নির্দেশ দিল। খুনে তিমিদের বিশাল দলটি এগিয়ে চলল দক্ষিণের কেপরনের দিকে। জায়গাটি নিরাপদ তাদের সবার জন্য। পুরুষ তিমিটি তো ওখানেই জন্মেছিল।
সমাপ্ত
প্রকাশকাল : জুলাই ২০১৬



