চিড়িয়াখানায় হাতি দেখেছো নিশ্চয়ই। অনেকে চিড়িয়াখানার বাইরেও কখনো কখনো হাতি দেখে থাকতে পারো। আচ্ছা, আচমকা কোনো বিশাল হাতি যদি তোমার সামনে এসে পড়ে, তোমার কেমন ভয় লাগবে বলো তো চিন্তা করো তাহলে, এই হাতির সামনে পড়েই যদি এত ভয় পাও, তাহলে হাতির চাইতে আরও অনেক অনেক বড় ডাইনোসরের সামনে পড়লে কী অবস্থাই না হতো। কিন্তু ডাইনোসর তো অনেক আগের সময়ের ব্যাপার। পৃথিবীর কোনো মানুষই আসলে ডাইনোসর সরাসরি দেখেনি। কারণ পৃথিবীতে মানুষ সৃষ্টি হওয়ার বেশ আগেই সব ডাইনোসর মারা গিয়েছিলো। এখন তোমার মনে প্রশ্ন জাগছে না, ডাইনোসর যদি কেউ না-ই দেখে থাকে, তাহলে তাকে নিয়ে এত গল্প আসলো কীভাবে? আজ আমরা এই ডাইনোসর নিয়েই বিভিন্ন কিছু জানার চেষ্টা করবো। ডাইনোসর শব্দের মানে জানো? এটি গ্রিক শব্দ থেকে এসেছে, যার সহজ বাংলায় অর্থ হচ্ছে ভয়ঙ্কর গিরগিটি। ডাইনোসর দেখতে কিন্তু তেমন ভয়ঙ্কর ছিল না বলেই মনে করা হয়। তবে যে কোনো প্রাণী আকারে অনেক বড় হলে যত কিউট, নাদুস নুদুসই হোক, দেখতে একটু ভয়ভয়ই লাগে। আর গিরগিটি বলা হলেও এগুলো আসলে গিরগিটি না, বরং একই ধরনের প্রাণী, যাদের সরিসৃপ বলা হয়। আমাদের পরিচিত কুমির, সাপ, কচ্ছপ, গিরগিটি ইত্যাদি সরিসৃপ প্রজাতির অন্তর্ভুক্ত। এরা বেশিরভাগ ডিম দেয় এবং তাদের শরীর সাধারণত আঁশে ঢাকা থাকে। ডাইনোসর অন্যান্য সরিসৃপগুলো থেকে একটু আলাদা ছিল। এদের পা ছিল বুকের সোজা নিচের দিকে, এর ফলে এগুলো বেশি ওজন বহন ও দক্ষভাবে দৌড়াতে পারতো।
ডাইনোসরদের নিয়ে আলাপ শুরু করার আগে একটা বিষয় মনে রাখা জরুরি। ডাইনোসর নিয়ে আমরা যত আলাপই করবো, সবটাই কিন্তু কোটি কোটি বছর আগের কথা। তখনকার কোনো ছবি, ভিডিও তো দূরে থাক, কোনো কাগজে লেখা বা পাথরে খোদাই করা কোনো কিছুই কিন্তু আমরা পাইনি। আমাদের ডাইনো মহাশয়দের নিয়ে জ্ঞানের প্রায় পুরোটায় দাঁড়িয়ে আছে পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গায় পাওয়া ডাইনোসরদের ফসিল থেকে। ফসিল মানে জানো? এই যে আমরা কোটি কোটি বছর আগের কোনো প্রাণীর কথা বলছি, তার মৃত্যুর পর তার মৃতদেহ তো পৃথিবীর বুকেই ছিলো। এরপর ধীরে ধীরে তা মাটি বা বালির নিচে চাপা পড়ে যায়। আর ধীরে ধীরে সেই প্রাণীর হাড়সহ বিভিন্ন অংশ মাটির নিচেই পাথরের মতো শক্ত হয়ে যায়। এগুলোকেই ইংরেজিতে ফসিল বা বাংলায় জীবাশ্ম বলা হয়। এভাবে মাটির নিচে চাপা পড়া অবস্থায় শুধু যে হাড় পাওয়া যায়, এমন কিন্তু না। সেখানে ডিম, দাঁত, পায়ের ছাপ, শরীরের ছাপ ইত্যাদি থাকতে পারে। আর এগুলো সবকিছুই বিজ্ঞানীদের গবেষণার কাজে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
ফসিলের বয়স অধিকাংশ ক্ষেত্রে একেবারে সুনির্দিষ্ট করে বলা যায় না। তাই বিজ্ঞানীরা এর আনুমানিক কত লক্ষ বা কোটি বছর হিসেবে বলে থাকেন। এ নিয়ে একটা মজার জোকস শোনা যাক এবার। জাদুঘরে একজন ঘুরতে গিয়ে একটা ফসিল দেখে ওখানকার স্টাফকে জিজ্ঞেস করলো, এই ফসিলের বয়স কত? তখন ঐ স্টাফ বললো, ২৫ লক্ষ ২ বছর ৩ মাস। দর্শনার্থী, মানে যিনি ঘুরতে গেছেন, উনি একটু অবাক হলেন। এত স্পেসিফিক কীভাবে বলা সম্ভব? তখন ঐ স্টাফ বললো, আমি যখন এখানে জয়েন করেছিলাম তখন আমাদের স্যার বলেছিলেন এর বয়স ২৫ লক্ষ বছর। আমি জয়েন করেছি তো ২ বছর ৩ মাস হলো। তাই এর বয়স ২৫ লক্ষ ২
বছর ৩ মাস।
কি একটা অবস্থা! যাইহোক, চলো, শুরু থেকেই শুরু করা যাক। অর্থাৎ, ডাইনোসরের শুরু থেকে। ধারণা করা হয়, প্রায় ২৩-২৪ কোটি বছর আগে ডাইনোসরের আবির্ভাব ঘটেছিলো। তখন পৃথিবীতে অনেকগুলো বিশাল বিশাল প্রাণীর বসবাস ছিলো। তারা নিজেরা নিজেরা মারামারি সংঘাতে লেগে ছিলো। এরপর প্রায় ২০ কোটি বছর আগে সংগঠিত হয় এক প্রাকৃতিক পরিবর্তন। এর ফলে পৃথিবীর বড় বড় প্রাণীদের অধিকাংশ প্রজাতি ধ্বংস হয়ে যায়। কিন্তু ডাইনোসর এই ধ্বংসযজ্ঞ থেকে বেঁচে যায়। ধারণা করা হয়, তাদের সোজা পায়ের গঠন আর উন্নত ফুসফুসের কারণে তারা বেঁচে গিয়েছিলো। আর এ সময়ের পর থেকেই ধীরে ধীরে ডাইনোসর হয়ে উঠে
পৃথিবীর বুকে সবচেয়ে শক্তিশালী আর প্রভাবশালী প্রাণী। ঐ সময় পৃথিবীর সবগুলো মহাদেশ সংযুক্ত ছিলো, যাকে একত্র প্যানজিয়া বলা হয়। তো এ কারণে সারা পৃথিবীতে ডাইনোসর ছড়িয়ে পড়তে পেরেছিলো এবং পৃথিবীর সব মহাদেশে, এমনকি এন্টার্কটিকাতেও ডাইনোসরের ফসিল পাওয়া গেছে।
শুরুর দিকে অবশ্য ডাইনোসরের সাইজ এত বড় ছিল না। তখন ডাইনোসর ছিল মাত্র ৯-১০ কেজির মতো ওজনের, ধরো একটি বিড়ালের সাইজের মতো। ধীরে ধীরে অনুকূল পরিবেশের ফলে ডাইনোসরের আকার আর প্রজাতি বাড়তে থাকে। ডাইনোসরের আকার ধীরে এত বড় হয় যে, এরা ভূপৃষ্ঠের সবচেয়ে বড় প্রাণীতে পরিণত হয়। আর প্রজাতি? আমরা তো সাধারণত শুধু ডাইনোসর নামেই চিনি। কিন্তু বিজ্ঞানীরা তাদের অন্তত ১ হাজারের বেশি প্রজাতি ছিলো বলে ধারণা করেন। এরমধ্যে দেখে সহজে আলাদা করা যায়, এমন প্রজাতি যেমন ছিলো, আবার সহজে আলাদা করা যায় না, এমনও ছিলো।
ডাইনোসরের এই সবগুলো প্রজাতি কিন্তু আকার, খাদ্যাভাস ইত্যাদিতে একরকম ছিল না। কিছু ডাইনোসর ছিল যারা তৃণভোজী, এরা মাংস খেত না। আর মাংসাশী বা মাংস খেয়ে জীবনধারণ করতো, এমন ডাইনোসর তো ছিলই। ডাইনোসরদের মধ্যে কিছু ছিল আকারে বেশ ছোট, এমনকি মুরগির চেয়েও ছোট। যেমন- মাইক্রোর্যাপটর, এগুলো ছিল ওজনে ১ কেজিরও কম, আর লম্বায় ছিল ২.৫ ফুটের মতো। আর যেগুলো বিশাল বড় ছিল? এখন পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্যমতে ডাইনোসরদের মধ্যে সবচেয়ে বড় প্রজাতিটির নাম হলো আর্জেন্টিনোসরাস, আর্জেন্টিনায় এদের ফসিল প্রথম পাওয়া যায় বলেই এই নাম। এদের আকার ছিল সত্যি সত্যি দানবীয়, লম্বায় প্রায় ১৩০ ফুট। এটা কতটুকু লম্বা সেটা বুঝার জন্য একটু ধারণা দেই। রাস্তায় বাস দেখো না? এরকম ৪-৫টা বাস একের পর এক রাখলে এমন দৈর্ঘ্য হয়। আর ওজন? এই ডাইনোসরগুলোর ওজন হতো প্রায় ১০০ টন, যা প্রায় ১০টা হাতির ওজনের চেয়েও বেশি। এদিক থেকে এটা বলে দেয়া যায় যে, স্থলভাগে এ পর্যন্ত যত প্রাণীর জন্ম হয়েছে বলে তথ্য পাওয়া গেছে, তার মধ্যে ডাইনোসর সবচেয়ে বড়। তবে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় প্রাণী একে মনে করিও না। এই তকমা নীলতিমির জন্যই বরাদ্দ।
ডাইনোসরের ব্যাপারে আমরা আগেই জেনেছি এগুলো এক ধরনের সরিসৃপ, যারা ডিম দেয় এবং তা থেকে বাচ্চা ফুটায়। সবগুলো ডাইনোসরের জন্মই এভাবে। এই ডিম নিয়ে একটা মজার তথ্য আছে। ডাইনোসর একসাথে অনেকগুলো ডিম পাড়তো। কারণ ছিল, শিকারীদের হাতে পড়ে কিছু ডিম নষ্ট হলেও যেন তার কোনো বাচ্চা বেঁচে থাকে। ইয়া বড় ডাইনোসরদের ডিমগুলো কিন্তু ইয়া বড় ছিল না। অবশ্য সর্বোচ্চ ২ ফুট ব্যাসের এই ডিমগুলোকে একেবারে ছোটও বলা যায় না। এক্ষেত্রে টাইপভেদে ডিমগুলোও অন্তত ২ রকম হতো। কিছু ডিম হতো লম্বাটে, আর বাকিগুলো হতো গোল গোল।
আর যেকোনো প্রাণীর বাচ্চারা সাধারণভাবে যেমন দেখতে কিউট হয়, ডাইনোসরের বাচ্চারাও নাকি এরকম কিউট ছিল। ডাইনোসরদের সুখে শান্তিতে দিন কাটানোর মাঝেই একদিন ঘটে গেলো এক মহাদুর্যোগ। প্রায় ৬ কোটি ৬০ লক্ষ বছর আগের কথা। মহাকাশ থেকে ছুটে আসা প্রায় ১৫ কিলোমিটার ব্যাসের এক বিশাল গ্রহাণু এসে আঘাত হানে পৃথিবীর বুকে। গতির ঝড়ে প্রায় অগ্নিগোলকে রূপান্তরিত হয়ে এটি যখন মেক্সিকোয় আঘাত করলো, তখন পুরো পৃথিবী জুড়ে এমন প্রতিক্রিয়া হলো, যেন হাজার হাজার পারমাণবিক বোমা একসাথে পৃথিবীতে হামলা করেছে। এরই কারণে পৃথিবীতে যে ব্যাপক পরিবর্তন হয়, তাতে একটি প্রজাতি ছাড়া অন্য ডাইনোসরগুলো পৃথিবী থেকে বিলুপ্ত হয়ে যায়।
বন্ধুরা, ডাইনোসর কিন্তু এখনো আছে। এমনকি নিয়মিত এদের সাথে আমাদের দেখাও হয়। কী, অবাক হলে? অবাক করা ব্যাপার হলেও এটা সত্য। বিজ্ঞানীরা মনে করেন, আমাদের পৃথিবীতে যে অজস্র প্রজাতির পাখি আছে, তারা আসলে ডাইনোসরেরই উত্তরসূরী। আরও স্পেসিফিক করে বললে তারা মাংসাশী ডাইনোসরদের উত্তরসূরি। মহাদুর্যোগের সময় যেসব ডাইনোসর বেঁচে গিয়েছিল, সেগুলোই পরিবেশের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে গিয়ে আকার, খাদ্যাভ্যাস ইত্যাদির পরিবর্তন ঘটায় এবং পৃথিবীর বুকে বেঁচে থাকে।
বন্ধুরা, এই সুন্দর পৃথিবীটা একেবারে ক্ষণস্থায়ী একটা জায়গা। বিশাল ডাইনোসর বলি, কিংবা ছোট যে কোনো প্রাণী, এখানে কেউই স্থায়ী থাকতে পারে না। আমরা মানুষদের বেলাতেও একই কথা, আমরাও এখানকার স্বল্পকালীন অধিবাসী। এখানে অহংকার করা, মানুষের ক্ষতি করা, মিথ্যা বলে বিভ্রান্ত করা ইত্যাদি কি উচিৎ? মোটেও না। আমরা যেন এখানে সবার জন্য উপকারী, ভালো কাজের সহযোগী হতে পারি, এ চেষ্টাই যেন করি।
তোমাদের সবার জন্য অনেক দোয়া ও শুভেচ্ছা।
প্রকাশকাল: সেপ্টেম্বর ২০২৬



