সকাল থেকেই রাফিয়াদের বাগানে হইচই চলছে। কাদের হইচই? মানুষের বুঝি? একদমই না। ফুলেদের হইচই চলছে। বাবারে বাবা! সকাল থেকেই সে কী হইচই ফুলেদের!
বেলি ফুলের মেয়ে শিউলি খালাকে বলে- দেখো না শিউলি খালা। সকাল থেকেই গোলাপ রানি কেমন চুপ করে আছে। একটিবারও মুখ খোলেনি।
শিউলি খালা বলে- কেন? কেন গোলাপ রানি আজ অমন চুপটি করে আছে? কেউ কি কিছু বলেছিস নাকি?
বেলি ফুলের ফুটফুটে মেয়েটা বলে- না গো শিউলি খালা। কেউ কিচ্ছুটি বলেনি।
তাহলে গোলাপ রানি অমন চুপটি করে কেন? কিছু তো একটা হয়েছে। জুঁই, চাঁপা, গাঁদা তোরা একটু সর দেখি। আমি একটু বলে দেখি। কথাগুলো বলতে বলতে শিউলি খালা একটু গা ঝাড়া দিয়ে উঠলো। একটু হেলে গোলাপ রানিকে লম্বা গলায় ডাকা শুরু করলো। কী গো গোলাপ রানি! অমন মুখ ভার করে চুপটি করে মুখ লুকিয়ে আছো কেন? কী হয়েছে খুলে বল দেখি বাপু?
গোলাপ রানি নিশ্চুপ। কারো দিকে মুখ তুলে তাকায়ও না।
ও পাড়া থেকে ঘাসফুলের বুড়ি রুক্ষ গলায় বলে ওঠে- কী গো গোলাপ রানি, আজকে অমন চুপটি করে আছো কেন?
এ পাড়া থেকে গোলাপ রানি কোনো উত্তর দেয় না।
ও পাড়া হলো বাগানের আরেক অংশ। রাফিয়াদের বাগানের দুইটা অংশ। একদিকে শিউলি, বেলি, গাঁদা, গোলাপরা থাকে। আর অন্যদিকে ঘাসফুল, চাঁপা, ডালিয়া, গন্ধরাজ, রজনীগন্ধারা থাকে। আর মাঝখানে ইট বাঁধানো ছোট্ট একটা রাস্তা।
এ পাড়া থেকে চাঁপা ফুলের বুড়ি বলে- আজকের বারে মনে হয় আর গোলাপ রানির মুখ কেউ দেখতে পাবো না। তোমার শরীরের কী অবস্থা গো সই?
ঘাসফুলের বুড়ি বলে- আগের মতো আর ভালো নেই গো সই। ঘাসফুলের বুড়ি আর চাঁপা ফুলের বুড়ির কথাবার্তা চলতেই থাকে।
হঠাৎ সেখানে গুনগুন করে গান গাইতে গাইতে ভ্রমর হাজির। ভ্রমর এসেই শিউলি খালাকে জিজ্ঞেস করে- কী গো খালা। সেই সাতসকাল থেকেই নাকি তোমাদের এখানে চেঁচামেচি? তা কীসের এতো চেঁচামেচি শুনি?
শিউলি খালা বলে- আর বলিও না বাপু। সেই সকাল থেকে গোলাপ রানি মুখ লুকিয়ে আছে। একটিবারের জন্যও মুখ খুলছে না। কারো কথার জবাবও দিচ্ছে না। এবার তুমিই দেখো বাপু।
ভ্রমর বলে- ও এই কথা। আচ্ছা, আমি গোলাপ রানির সাথে কথা বলি আগে।
এই বলে গুনগুন করে ভ্রমর গোলাপ রানির কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করল- কী গো গোলাপ রানি। তুমি নাকি সকাল থেকে মুখ লুকিয়ে আছো? মুখ লুকিয়ে থাকলে তো হবে না। সমস্যা হলে তো সমাধান করতে হবে। সেজন্য তোমাকে মুখ তুলে তাকাতে হবে। একটিবার শুধু মুখ তুলে তাকাও দেখো তোমার জন্য কতজন চিন্তায় আছে।
এবার গোলাপ রানি মুখ তুলে তাকাল। এ-পাড়া ও-পাড়ার সবাই গোলাপ রানির লাল টুকটুক মুখের দিকে তাকালো। কিন্তু মুখটা ফ্যাকাসে হয়ে আছে। গোলাপ রানির অমন মুখটা দেখতে ভালো না লাগলেও আগের চেয়ে তাদের একটু হলেও ভালো লাগছে।
ভ্রমর বলে- গোলাপ রানি, কী হয়েছে তোমার? সকাল থেকে অমন চুপটি করে আছো কেন?
গোলাপ রানি বিষণ্ন মনে বলে- আর বলিও না ভ্রমর দাদা। ওই যে রাফিয়াদের বাসার কাজের বুয়াটা আছে না? কী যে ফাজিল মহিলা!
ভ্রমর বলে- কাজের বুয়া আবার কী করলো গোলাপ রানি?
গোলাপ রানি বলে- দেখো না ভ্রমর দাদা আমার নিচে কতগুলো ময়লা-আবর্জনা। এগুলো বেশ ক’দিন ধরেই এখানে আছে। উফ্! কী দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। ওয়াক! এই দুর্গন্ধ আমার ভালো লাগছে না ভ্রমর দাদা। এগুলো তো পরিবেশ দূষণ করছে। তবুও বুয়াটা এগুলো সরায় না। এই তো সেদিন কাজের বুয়াটা আমার দুটো কচি কচি ডাল ভেঙে দিলো। সেদিন হলো কী, কাজের বুয়াটা সব গাছে পানি দিচ্ছিল। সব গাছে পানি দেওয়া শেষ করে আমার কাছে আসলো। অল্প একটু পানিও দিলো। চলে যাওয়ার সময় আমার একটা কাঁটা বুয়ার হাতে বিঁধল। ব্যস, অমনি মড়াৎ করে আমার দুটো কচি ডাল ভেঙে দিলো। এবার তুমিই বল, এত কিছু সহ্য করার পরও যদি ডাল ভাঙে তাহলে কেমন করে মুখ তুলে তাকাই?
ভ্রমর বলে- সত্যিই তোমার সাথে কাজের বুয়া অনেক অন্যায় করেছে। কাজের বুয়াকে একটা শিক্ষা দিতে হবে। হুল ফুটিয়ে দিয়ে আসবো নাকি?
গোলাপ রানি বলে- অযথা কাউকে কষ্ট দিয়ে লাভ নেই। ওদের মতো মানুষদের যেদিন হুঁশ হবে সেদিন ওরা ঠিকই বুঝতে পারবে।
ভ্রমর বলে- সত্যি তুমি খুব ভালো গোলাপ রানি। আমাকে এবার যেতে হবে। তোমরা সবাই ভালো থেকো। এই বলে ভ্রমর গুনগুন করে গান গাইতে গাইতে নিমিষেই মিলিয়ে গেল। এ পাড়া ও পাড়ার ফুলেরা আবারও গল্পে মেতে উঠলো…।
প্রকাশকাল: ফেব্রুয়ারি ২০২৫



