বিশ্বকাপ তো গতমাসেই শেষ। তবু যেন কাটছে না এর রেশ! কী? তোমাদেরও কি এমনই অবস্থা?
যাই হোক। এবারের গল্পগুলো কিন্তু একটু অন্যরকম। বিশ্বকাপের মন্দ ঘটনাগুলো নিয়েই হবে এবারের আয়োজন।
তোমরা তো জানোই যে, বিশ্বকাপ জয়ী দেশের সংখ্যা মাত্র ৮টি : ব্রাজিল, জার্মানি, ইতালি, আর্জেন্টিনা, ফ্রান্স, স্পেন, ইংল্যান্ড ও উরুগুয়ে। এদের প্রত্যেকেরই কোনো না কোনো বিতর্কিত ঘটনা বা কেলেঙ্কারি রয়েছে। যদিও সব অভিযোগ সমানভাবে প্রমাণিত নয়। কিছু ঘটনা রেফারিং বিতর্ক, কিছু খেলোয়াড়ের আচরণ, আবার কিছু রাজনৈতিক বা ম্যাচ-ফিক্সিংয়ের অভিযোগ, যার সবগুলোর চূড়ান্ত প্রমাণ পাওয়া যায়নি। কিন্তু, এ ঘটনাগুলো জেনে আনন্দ পেলে কার কী ক্ষতি!
উরুগুয়ে : কথিত আছে যে, বিশ্বকাপের প্রথম আসরে ফাইনালে স্বাগতিক উরুগুয়ের প্রতিপক্ষ ছিল আর্জেন্টিনা।
প্রথম আসর হওয়াতে কিছু মজার মজার ঘটনা ঘটেছিলো। এই ধরো, আর্জেন্টিনা ও উরুগুয়ে দুই দলই নিজেদের বল নিয়ে এসেছে। এখন ঝামেলা বেঁধেছে যে কাদের বল দিয়ে খেলা হবে! বোঝো ব্যাপারটা!
তো প্রথমার্ধে আর্জেন্টিনার বল দিয়ে খেলা হয়। যেখানে আর্জেন্টিনা ২-১ গোলে এগিয়ে থাকে।
আর দ্বিতীয়ার্ধে উরুগুয়ের বল দিয়ে খেলা হয়। উরুগুয়ে ৪-২ গোলে ফাইনাল জিতে চ্যাম্পিয়ন হয়ে যায়।
কিন্তু আর্জেন্টিনা পরে অভিযোগ করে যে, ফাইনাল ম্যাচের আগে তাদের দলের খেলোয়াড়দের মৃত্যু হুমকি দেয়া হয়েছিলো! পাশাপাশি মাঠে নিরাপত্তার জন্য নিয়োজিত ছিল ৩০০ জন বেয়নেট সজ্জিত পুলিশ! যা তাদের স্বাভাবিক ম্যাচ খেলতে প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করেছিলো!
কিন্তু, বিশ্বকাপ যার নেয়ার সে তো নিয়েই গেছে!
জার্মানি : জার্মানির ইতিহাসে অন্যতম কেলেঙ্কারির মধ্যে একটি ছিল ১৯৫৪ সালের ডোপিং।
ফাইনালে অপরাজেয় হাঙ্গেরিকে হারিয়ে জার্মানির প্রথম শিরোপা জয়ের পেছনে পরবর্তীতে ডোপিংয়ের মারাত্মক অভিযোগ ওঠে।
ম্যাচের পর জার্মানির ড্রেসিংরুমের নিচে ব্যবহৃত সিরিঞ্জ পাওয়া যায়, যা খেলোয়াড়দের ইনজেকশন দেওয়ার প্রমাণ হিসেবে চিহ্নিত হয়।
১৯৮২ বিশ্বকাপে জার্মানি-অস্ট্রিয়া ম্যাচ ছিল তাদের কেলেঙ্কারি ইতিহাসের অন্যতম ঘটনা। যা Disgrace of Gijón নামে বিখ্যাত হয়ে আছে।
ম্যাচের আগেও সমীকরণ এমন ছিল যে পশ্চিম জার্মানি ১-০ গোলে জিতলে দুই দলই পরের রাউন্ডে যাবে। তাই গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে পশ্চিম জার্মানি ও অস্ট্রিয়া উভয় দলই ইচ্ছাকৃতভাবে ফলাফল ঠিক রাখে, বলতে পারো ম্যাচ ফিক্স করে নেয় আরকি। যেখানে প্রথম ১০ মিনিটে জার্মানি ১-০ গোলে এগিয়ে যাওয়ার পর দুই দলই আর গোল বা আক্রমণের চেষ্টাই করেনি, যাতে উত্তর আফ্রিকা থেকে আসা আলজেরিয়া টুর্নামেন্ট থেকে ছিটকে যায়।
এই ঘটনার পরই FIFA নিয়ম পরিবর্তন করে ১৯৮৬ সাল থেকে গ্রুপের শেষ দুই ম্যাচ একই সময়ে শুরু করার নিয়ম চালু হয়।
ব্রাজিল : ২০০২ বিশ্বকাপে কিংবদন্তি রিভালদোর অভিনয়ের জন্য জরিমানা দেয়া ছিল ব্রাজিল দলের অন্যতম একটি ঘটনা।
তুরস্কের বিপক্ষে গ্রুপ পর্বের ম্যাচে রিভালদোর গায়ে বল লাগলেও তিনি মুখে আঘাত পাওয়ার ভান করে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন, ফলে তুর্কি খেলোয়াড় অন্যায়ভাবে লাল কার্ড পান।
কিন্তু পরবর্তীতে দেখা যায় যে, রিভালদোর পুরোটাই ছিলো অভিনয়। এজন্য তাকে জরিমানা দিতে হয়।
অভিনয় অবশ্য পরবর্তীতে আরও অনেকেই করেছে, কিন্তু জরিমানা দেয়ার প্রয়োজন পড়েনি!
ফ্রান্স : ফ্রান্সের ইতিহাসে অন্যতম বিতর্কিত ঘটনা ছিলো ২০০৬ সালে ফ্রান্স-ইতালি ফাইনাল ম্যাচে জিনেদিন জিদানের হেডবাট।
ম্যাচের ৭ মিনিটেই পেনাল্টি পেয়েছিলো ফ্রান্স। জিদানও তার বিখ্যাত পেনাল্টি গোল করে।
ওদিকে মার্কো মাতেরাজ্জিও ১৯ মিনিটে গোল করে ইতালিকে সমতায় ফেরায়।
নির্ধারিত সময়ে খেলা ড্র হলে অতিরিক্ত সময়ে যায়। ১১০ মিনিটে জিনেদিন জিদানের বোনকে নিয়ে বাজে মন্তব্যের কারণে জিদান মার্কো মাতেরাজ্জির বুকে মাথা দিয়ে গুতা দেয়। ফলে রেফারির লাল কার্ডে মাঠ ছাড়তে হয় জিদানকে।
পরবর্তীতে টাইব্রেকারে ৫-৩ গোলের পরাজয় বরণ করতে হয় ফ্রান্সকে।
আর্জেন্টিনা : শেষটা আর্জেন্টিনাকে দিয়েই হোক!
সময়টা ১৯৭৮। ফাইনালে উঠতে পেরুকে হারাতে হবে আর্জেন্টিনার। সমীকরণটাও জটিল ছিল, মানে ৪-০ গোলে জিততে হবে। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে আর্জেন্টিনা ম্যাচটি জিতে যায় ৬-০ গোলে।
এতেই বাঁধে যত বিপত্তি। শুরু হয় নানা অভিযোগ, অপবাদ।
তৎকালীন স্বৈরাচারী সামরিক শাসক জেনারেল হোর্হে ভিদেলার অধীনেই আর্জেন্টিনাতে বিশ্বকাপ আয়োজন করা হয়েছিলো। তাই স্বাভাবিকভাবেই অভিযোগ রয়েছে আর্জেন্টিনা পেরুর সরকারকে শস্য ও অর্থনৈতিক সহায়তা দিয়ে ম্যাচটি নাকি কিনে নিয়েছিল!
এরপরে ১৯৮৬ বিশ্বকাপ – কোয়ার্টার ফাইনালে আর্জেন্টিনা মুখোমুখি হয় ইংল্যান্ডের। সে ম্যাচে কিংবদন্তি দিয়েগো ম্যারাডোনা হাতের ছোঁয়াতে গোল করে। রেফারির চোখ এড়িয়ে হাত দিয়ে দেয়া গোলের মাধ্যমে ঘুরে যায় ম্যাচের ফলাফল। আর্জেন্টিনা ২-১ গোলে জয় পায়।
আর্জেন্টিনা সমর্থকেরা হাত দিয়ে করা সেই বিখ্যাত গোলটিকে ‘Hand of God’ বলে এখনও সেলিব্রেশন করেন!
তারপরের ঘটনা ১৯৯০ বিশ্বকাপ – ফর্মের বিচারে সেবার ব্রাজিল এগিয়েই ছিলো। গ্রুপ পর্বের ম্যাচগুলো জিতে এসেছে। অন্যদিকে আর্জেন্টিনা কোনোমতে গ্রুপ পর্ব শেষ করে এসেছিলো।
মিডফিল্ডে দুই ব্রাজিলিয়ান দুঙ্গা ও অ্যালেমাওর দাপটে বলই পাচ্ছিলো না আর্জেন্টিনা। অবশ্য ব্রাজিলও গোলের দেখা পাচ্ছিলো না বাজে ফিনিশিংয়ের জন্য।
এদিকে ম্যারাডোনা ব্রাজিলিয়ান লেফট ব্যাক ব্রাংকোকে এড়িয়ে যেতে পারছে না। দ্বিতীয়ার্ধে আর্জেন্টাইন মিডফিল্ডার পেদ্রো ত্রগলিও আহত হলে বেশ কিছুক্ষণ খেলা বন্ধ থাকে। তারপরে আবার শুরু হলে হঠাৎ খেলার দৃশ্যপট বদলে যায়। ব্রাংকোকে দেখে আর স্বাভাবিক মনে হচ্ছে না। কেমন যেন এলোমেলো হয়ে গেছে। যেখানে ম্যারাডোনা পুরো ম্যাচে স্পেস পায়নি, সেখানে এখন খুব সহজেই ব্রাংকোকে ক্রস করতে পারছে। ম্যারাডোনার এসিস্টে ক্লদিও ক্যানিজিয়া গোল আদায় করে ফেলে। ব্রাজিল ম্যাচটি হেরে যায় ১-০ গোলে।
মূল বিতর্কটা শুরু হয় ম্যাচ শেষ হওয়ার পরে। ব্রাংকো ম্যাচ শেষে দাবি করেন, দ্বিতীয়ার্ধে খেলা যখন কিছুক্ষণের জন্য বন্ধ ছিলো, তখন তিনি নাকি আর্জেন্টিনার ফিজিও মিগুয়েল ডি লরেঞ্জোর কাছ থেকে এক বোতল পানি নিয়ে পান করেছিলেন আর সেটার পরেই নাকি তার মাথা ঝিমঝিম করছিলো এবং তিনি অসুস্থতা বোধ করছিলেন!
সেই ঘটনার পনেরো বছর পর ২০০৫ সালে ম্যারাডোনা আর্জেন্টিনার এক টিভি চ্যানেলকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে স্বীকার করেন যে, সেদিন ব্রাংকোকে দেওয়া পানিতে আসলেই তারা ঘুমের ওষুধ মিশিয়ে দিয়েছিলেন! এরপরে সাংবাদিকরা ছুটে যান ১৯৯০ বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার কোচ হিসেবে দায়িত্ব পালন করা কার্লোস বিলার্দোর কাছে। এই প্রশ্নের উত্তরে বিলার্দো বলেন, ‘আমি কিছু জানি না এ ব্যাপারে, তবে আমি এটাও বলছি না যে এরকম কোনো ঘটনা ঘটেনি!’
এটাই সেই বহুল সমালোচিত Holy Water Scandal হিসেবে পরিচিত!
তাহলে, আজ এ পর্যন্তই। দেখা হবে, কথা হবে, অন্য কোনো পর্বে! টা টা।
প্রকাশকাল: সেপ্টেম্বর ২০২৬



