ছোট গোয়েন্দাদের অভিযান

আসিফ, সিয়াম ও মিঠুন তারা তিন বন্ধু। তিনজনই গোয়েন্দা গল্প পড়তে পছন্দ করে। যদিও এসবের জন্য অনেকবার পরিবার থেকে বকা খেয়েছে তারা। তবু গোয়েন্দা কাহিনি পড়ার ভূত তাদের মাথা থেকে যায় না, তিন বন্ধু সুযোগ পেলেই গোয়েন্দাগিরি করে। এমনকি কারও কলম হারালেও তারা গোয়েন্দাদের মতো তদন্ত করে। তো আজ ওদের স্কুলে গ্রীষ্মকালীন অবকাশের জন্য ছুটি দিয়েছে। তাই ওরা খেলাধুলা করে একটু দেরিতে বাড়ি যাওয়ার প্ল্যান করেছে।
যেই ভাবা সেই কাজ। ওরা দেরি করলো, তবে একটু বেশিই দেরি হয়ে গেল। তখন প্রায় সন্ধ্যা হয়ে গেছে। ছুটি হয়েছে সেই বিকেল ৪.০০ টায়, সেহেতু অনেক দেরি হয়ে গেছে। তাই ওরা ভাবলো আজ স্কুলের পেছনের শর্টকার্ট রাস্তা দিয়ে বাড়ি যাবে। তো সেই পথ ধরে যেতে হলে একটা ভয়ানক জমিদার বাড়ি পার হতে হয়। এটি বেশ পুরানো বাড়ি, চারপাশে স্যাঁতস্যাঁতে পরিবেশ। লোকমুখে এ বাড়ি নিয়ে অনেক ভয়ঙ্কর গল্প শুনেছে তারা, তাই এ বাড়ি পার করার সময় তাদের ভয় লাগছিল। আর তখনই ঘটল এক চমকপ্রদ ঘটনা। সেই বাড়ি থেকে কয়েকজনের কথা বলার আওয়াজ ভেসে আসছিল। এতে ৩ জনের মনে একসাথে ধক্ করে উঠলো।
আসিফ : তোদের আমি আগেই বললাম এ রাস্তা দিয়ে যাওয়া ঠিক হবে না। কে শোনে কার কথা। তোরা তো আমার কথার কোনো দামই দিলি না। এখন আমাদের কী হবে?
মিঠুন : আমরা তো ভুল করে ফেললাম। এখন তো ভূতেরা আমাদের কাবাব বানিয়ে খাবে রে হায়! হায়! হায়! আজকে আমার মা বিরিয়ানি রান্না করেছে কে খাবে এগুলো? কাঁদো কাঁদো গলায় কথাগুলো বললো।
সিয়াম : চুপ করবি তোরা। এমনিতেই খেয়ে হাতি হয়েছিস, আবার এখানেও তোর খাবারের চিন্তা। শোন তোরা আমার মনে হচ্ছে যে ভেতরে কিছু মানুষ আছে। তারাই কথা বলছে। গোয়েন্দা হিসেবে এখন আমাদের দায়িত্ব বিষয়টা পর্যবেক্ষণ করা।
আসিফ : তো এখন কী করবি?
সিয়াম : চল কাছে গিয়ে কেসটা দেখি।
মিঠুন : না আমি যাব না ওরা নিশ্চয়ই ভূত।
সিয়াম : ধ্যাত্, তোর যাওয়া লাগবে না তুই এখানে থেকেই ভূতের ভয়ে মর। এই আসিফ চল। লিডারের মতো কথাগুলো বললো সিয়াম।
মিঠুন : এই দাঁড়া আমি আসছি।
সাহস করে ওদের সাথে গেল মিঠুন। তারা বিনা শব্দে বাড়ির উত্তর পাশের ভাঙা জানালার পাশে হানা দিলো।
সিয়াম : একদম চুপ, শুনি এরা কী নিয়ে কথা বলছে। এতক্ষণে মনে হয় কেসটা জটিল হচ্ছে।
তিন জন নিঃশব্দে শুনতে লাগলো। তারপর তারা যা শুনলো তাতে তাদের আত্মা কেঁপে উঠলো।
‘শোন ফরিদ আজ এই এক ঘণ্টার মধ্যে যদি তুই এই বিলটা আমাদের নামে না করিস তাহলে এই মেশিনগান দিয়ে তোকে সাইজ করে দিবো বুঝেছিস। বাঁচতে চাইলে বিলটা আমাদের নামে করে দে। আর তা না হলে খেল খতম। ভেবে দেখ।’ এ কথাগুলো বললো এক গুণ্ডা টাইপের মোটা লোক।
‘না এ বিল আমি কিছুতেই তোদের দিবো না, তোরা দেশের ক্ষতি করবি।’ চেয়ারে বসে থাকা এক ভদ্রলোক কথাগুলো বললো।
এগুলো শুনে তিন গোয়েন্দারই ভয়ে অবস্থা খারাপ।
‘যা করতে হবে এক ঘণ্টার মধ্যেই করতে হবে। তা না হলে প্রাণ যাবে এক নির্দোষ মানুষের। গোয়েন্দারা চলো।’ প্রবল উত্তেজনায় বললো সিয়াম।
আসিফ : কোথায়?
সিয়াম : থানায়।
মিঠুন : এই না, থানায় পুলিশ থাকে আমার ভয় লাগে।
সিয়াম : ধুর ছাতা। তুই তাহলে এখানেই থাক, বিরক্তিকর। এই চল আসিফ।
মিঠুন : আরে আরে দাঁড়া যাচ্ছি চল।
তিন গোয়েন্দা হাঁটা দিলো প্রধান সড়কের দিকে। কিন্তু সমস্যা হলো ওরা কেউই থানা চেনে না। তাই ভাবলো কাউকে জিজ্ঞাসা করবে। একজনকে জিজ্ঞাসা করতেই তিনি উল্টো জিজ্ঞেস করলেন, ‘তোমরা তা জেনে কী করবে?’
এ কথা শুনে রেগে গেল তিন জনেই। এত গুরুত্বপূর্ণ একটা মিশনে আছি, আর সে কি না অহেতুক প্রশ্ন করে আমাদের সময় নষ্ট করছে। মিশন সফল হলে আগামীকাল পত্রিকায় আমাদের নাম ছাপাবে, সময় নষ্ট না করে কোনোভাবে তারা থানায় পৌঁছালো। তারপর সিয়াম হাঁপাতে হাঁপাতে বললো, ‘স্যার এক ঘণ্টার মধ্যেই কিছু করুন, তা না হলে একজন নির্দোষ মানুষ মারা পড়বে।’
ইন্সপেক্টর ওর কথার কিছুই বুঝলো না। তাই আসিফ সব খুলে বললো পুলিশকে। সব শুনে ইন্সপেক্টর এক লাফে দাঁড়িয়ে গেল। তাড়াতাড়ি ভ্যান বের করে ঘটনাস্থলে পৌঁছালো এক ভ্যান পুলিশসহ, তাদের ভ্যানে করে গোয়েন্দারাও ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। গিয়েই দরজা খুলে ভেতরে ঢুকলো পুলিশ।
এরপর সবাইকে অবাক করে দিয়ে ইন্সপেক্টর সেই গুণ্ডা টাইপের লোকটাকে বললো, ‘আরে মজিদ সাহেব আপনারা এখানে যে? শুটিং করছিলেন বুঝি। আচ্ছা থাক, আপনাদের আর বিরক্ত না করি এই সবাই চলো।’
ঘটনার আগা-গোড়া কিছুই বুঝলো না ৩ গোয়েন্দার কেউই। ইন্সপেক্টর বাহিরে এসে তাদের উদ্দেশ্যে বললেন, ‘কয়টা গোয়েন্দা সিরিজ পড়েছ?’
ওরা একসাথে বললো, ‘মানে?’
ইন্সপেক্টর স্যার কথা না বাড়িয়ে ওদের বাড়ি পৌঁছে দিলেন। পরে জানা যায়, সেই বাড়িতে নাকি থ্রিলার নাটকের শুটিং করছিলেন বিখ্যাত অভিনেতা তমাল সাহেব ও তার দল। আর ওরা ৩ জন যেটা দেখেছিল সেটাও ছিল তাদের অভিনয়েরই একটি অংশ। এটা দেখে তিলকে তাল বুঝে ফেলে ওরা, আর তারপরের ঘটনাতো তোমরা জানোই।
পরদিন ওদের নাম পত্রিকায় ছাপানো হলো। তবে ওদের সাহসিকতার গল্প নয়, বোকামির গল্প। এ ঘটনা থেকে তারা বুঝতে পারে, কোনো বিষয়েই সীমাহীন ঝোঁক বা নেশা কারও জন্য শুভফল বয়ে আনে না। এটি হতে পারে বিপদের কারণ।

প্রকাশকাল: আগস্ট ২০২৬