আশ্চর্য প্রদীপ

আবু নেসার শাহীন

0
46

বিপুদের টিনশেড বাড়ি ভেঙ্গে সেখানে দু’তলা বিল্ডিং করা হবে। তাই বিপুর মা পাশের ছয় তলা বিল্ডিং-এর একটা ফ্ল্যাট ভাড়া নেয়। আজ সকাল থেকেই বিপু, তার মা এবং দু’জন ঠিকাদার মিলে মালপত্র ঐ ফ্ল্যাটে তুলতে শুরু করে। দুপুরের আগে স্টোর রুম ছাড়া বাকি সব মালপত্র তোলা শেষ হয়। বিপুর মা বিপুর হাতে এক গোছা চাবি দিয়ে বললেন, যাতো বিপু, ষ্টোর রুমে কী কী আছে একটু দেখে আয়।

বিপু চাবির গোছা হাতে নিয়ে এসে স্টোর রুমের তালা খুলল। স্টোর রুমে কেমন যেন একটা উদ্ভট গন্ধ। সারা ঘরে ধুলো আর মাকড়শার জালে ভর্তি। মাকড়শার জালে অসংখ্য মশা আটকে আছে। মালপত্রও অনেক। দু’টো ভাঙ্গা খাট, একটা ঘুণেধরা আলনা, দু’টো বড় বড় টিনের ট্রাংক। আরও কত কী। মেঝেতে প্রচুর ময়লা। ঘরের এক কোণে লাল পিঁপড়ার লম্বা একটা লাইন। একটা বাচ্চা ইঁদুর ভাঙ্গা খাটের নিচ থেকে বেরিয়ে এসে আবার লুকিয়ে গেল। বিপু সবকিছু দেখে মায়ের কাছে এসে বলল, আম্মু, স্টোর রুমেতো অনেক কিছু আছে। বিপুর মা তাদের ছোট বাগানটাতে দাঁড়িয়ে গাছ দেখছিলেন। যত্ন করার কেউ না থাকাতে পুরো বাগান আগাছায় ভরে গেছে। তিনি বিপুর কথা শুনে বললেন, অনেক কিছু। মানে, কী কী আছে?

: এই ধরো দু’টো ভাঙ্গা খাট, একটা ঘুনে ধরা আলনা, দু’টো ট্রাংক। আরো কত কী!
: আচ্ছা ঠিক আছে বুঝলাম। ঠিকাদার দু’টো খেতে গেছে। ওরা আসলে কাজ দেখিয়ে দিস। কী পারবি না?
বিপু হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়ল। বিপুর মা ফ্ল্যাটে চলে গেলেন। বিপু আবারও স্টোররুমে ফিরে এল। বিপু রাজধানী হাইস্কুলে ক্লাস সেভেনে পড়ে। বার বছর বয়স ওর। বার বছর বয়স হলেও তাকে পনের-ষোল বছর বয়সী ছেলেদের মত দেখায়। তার শরীরও বেশ শক্তপোক্ত। ঠিকাদার আসতে দেরি হওয়াতে সে নিজেই ভারী ভারী জিনিস টেনে হিঁচড়ে বাইরে নিয়ে রাখতে লাগল। হঠাৎ তার পায়ের সঙ্গে লেগে ইদুরের জমানো একটা ময়লার স্তূপ এলোমেলো হয়ে যায়। বিপু পায়েও একটু ব্যথা পায়। কিসের সাথে পা লেগে ব্যথা পায়, সে মাথা নিচু করে তাকাতেই দেখে একটা প্রদীপ। সে কাজ ফেলে প্রদীপটা হাতে নিয়ে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখে প্রদীপটা দেখতে ঠিক যেন আলাদীনের আশ্চর্য প্রদীপের মত। তারপর একটা ট্রাংকের উপর প্রদীপটা রেখে আবার কাজে মনোযোগ দেয় বিপু।

সারাদিন অনেক খাটুনির পর বড্ড ক্লান্ত হয়ে পড়ে বিপু। রাতের খাওয়া সেরে বিছানায় শুয়ে এ কথা সে কথা ভাবতে ভাবতে ঘুমে যখন দু’চোখ বুঁজে আসছিলো ঠিক তখন তার চোখ পড়ে ওয়্যারড্রপের উপর রাখা প্রদীপটার উপর। প্রদীপটা সোনালী রঙের ডিম লাইটের লাল আলোয় জ্বলজ্বল করছিল। সে বিছানা থেকে নেমে হাই তুলল। তারপর প্রদীপটা নিয়ে বিছানায় পা গুটিয়ে বসে। সত্যি প্রদীপটা দেখতে সিনেমায় দেখা আলাদীনের সেই আশ্চর্য প্রদীপের মত। বিপু বেশ ক’বার প্রদীপের গায়ে হাত ঘষে। কয়েকবার হাত ঘষার পর প্রদীপটা একটু নড়ে উঠে বিপু ভাবল প্রদীপের ভেতর টিকটিকি বা কোন বড় পোকা ঢুকেছে তাই সে ব্যাপারটা তেমন পাত্তা দিল না। সে প্রদীপের গায়ে আলতোভাবে আরো ক’বার হাত ঘষে। আর তখনি একটা অদ্ভুত ব্যাপার ঘটে। প্রদীপের মুখে ধীরে ধীরে একটা ধোঁয়ার কুন্ডলী বের হয়। সেই কুন্ডলী বেশ ক’বার পাক খাবার পর হুংকার দিয়ে একটা মস্ত দৈত্যে পরিণত হয়।

বিপু হাঁ করে চেয়ে থাকে। সে ভয়ে জড়সড় হয়ে পড়ে। শরীরে প্রচন্ড একটা ঝাঁকুনি মারে তার। চোখের পাতা ভারী হয়ে আসে। মনে হয় এই বুঝি ধপাস করে পড়ে যাবে সে। সেই মুহূর্তে দৈত্য মুচকি হেসে বলল, ভয় পেয়েছেন মালিক?
বিপু কাঁপা কাঁপা গলায় বলল, ভয় পাবো না, তুমি কী সত্যি দৈত্য? নাকি আমি ভুল দেখছি?
দৈত্য হাত নেড়ে নেড়ে বলল, আমি সত্যি দৈত্য। আলাদীনের দৈত্য।
বিপু কথা বলতে পারছে না। কথা বলতে গেলে তার গলা জড়িয়ে যায়। দৈত্য বলল, আমার আসল মালিক আলাদীন মারা যাবার পর অনেক হাত হয়ে আমি আপনাদের স্টোর রুমে এসে পড়ি। বিপু একটু সহজ হতে চেষ্টা করে। সে ঢোক গিলে বলল, কিন্তু কিভাবে এলে?
: বেশীর ভাগ সময়ই আমাকে প্রদীপের ভেতর থাকতে হয়। তাই পুরোপুরি বলতে পারবো না। যতদূর মনে পড়ে আমার শেষ মালিক ছিলেন একজন নাবিক
বিপু একটু ভেবে নিয়ে সহজ গলায় বলল, আমার দাদা জাহাজ ভাঙ্গার কাজ করতেন। কিন্তু তিনি তো নাবিক ছিলেন না।
দৈত্য উদাস গলায় বলল, সে যাই হোক, এখন আপনি আমার মালিক। বহুদিন যাবৎ কোন কাজ করিনি। দয়া করে আমাকে একটা কাজ দিন।
: কী কাজ দেবো?
: যে কোন কাজ। তবে আপনি আমার কাছে যা চাইবেন তাই পাবেন।।
: সত্যি। বিপুর মুখে অবিশ্বাসের ছায়া।
: হুঁ, সত্যি।
বিপু কিছুক্ষণ চিন্তা করে তারপর এক আছে বুক আশা নিয়ে বলল, তুমি আমার বাবাকে ফিরিয়ে এনে দাও।
: দৈত্য ভ্রু কুঁচকে বলল, আপনার বাবা কোথায় গেছেন মালিক?
: বিপু নরম গলায় বলল, ক’মাস আগে বাবা মারা গেছেন।
: না মালিক, আপনি অন্য কিছু চান। আমি এই কাজ করতে পারবো না। দৈত্য দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
বিপু জানতো দৈত্য এ কাজ করতে পারবে না। কিন্তু এছাড়া দৈত্যের কাছে আর কী চাওয়া যায়? টাকা? নাঃ টাকাতো আমাদের অনেক আছে। এলিফ্যান্ট রোডে দু’টো কাপড়ের দোকান, টঙ্গীতে একটা টিনশেড মার্কেট। প্রতিমাসে অনেক টাকা ভাড়া পায় তার মা। তাছাড়া আর ক’মাস পর তাদের দু’তলা বাড়ি হয়ে যাবে। নিজের মনে অনেক কথা ভাবে বিপু।

দৈত্য হাত কচলে বলল, কিছু একটা চান মালিক। দৈত্যকে এভাবে দাঁড়িয়ে রাখা ঠিক না।
বিপু মুচকি হেসে বলল, কেন ঘাড় মটকাবে নাকি?
দৈত্য দাঁতে জিহবা কেটে বলল, ছিঃ ছিঃ এসব কী বলছেন আপনি। বহুবছর প্রদীপে বন্দী ছিলামতো, তাই বড্ড কাজ করতে ইচ্ছে করছে।
বিপু দৈত্যের দিকে ভাল করে তাকালো। দৈতা কুঁজো হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। অনেক লম্বা আর স্বাস্থ্যবান সে। তার মাথায় কোন চুল নেই। সে খালি গায়, পরণে একটা ছাই রঙের লুঙ্গি। দু’হাতে মোটা দু’টো সোনার বাল্য। দু’কানে সাইকেলের চাকার মত বড় বড় সোনার দুল। তার এক একটা হাত বিপুর কোমরের চেয়েও মোটা। তবে দৈত্যের পায়ে কোন স্যান্ডেল বা জুতো নেই। বিপু খুশি খুশি গলায় বলল, তোমাকে একটা কৌতুক বলি। খুব মন দিয়ে শুনবে।

বিপু কেশে গলা পরিষ্কার করে নিল। তারপর মুখে একটা প্রশস্ত হাসি ফুটিয়ে বলতে লাগল, একবার একটা লোক এক নির্জন রাস্তা দিয়ে হাঁটছিল। হাঁটতে হাঁটতে এক সময় রাস্তার মাথায় এসে দেখে একটা বড়সড় ডাস্টবিন। ডাস্টবিনের ভেতর চমৎকার একটা বোতল পড়ে আছে। লোকটা চারদিক দেখে নিয়ে বোতলটা হাতে নিল। বোতলে একটু ময়লা ছিল। তাই সে ঘষে ঘষে বোতলের ময়লা পরিষ্কার করছিল। হঠাৎ বোতলের মুখ দিয়ে একটা দৈত্য বের হয়। লোকটাতো অবাক। নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিল না সে। দৈত্য বলল, কী চান মালিক?
লোকটা ছিল খুব গরীব। সর সময় তার সংসারে অভাব অনটন লেগে থাকতো। তাই সে ভাবল, বড়লোক হওয়ার এটাই সুযোগ। সে বলল, ঢাকার গুলশানে একটা বাড়ি চাই।
লোকটার কথা শুনে দৈত্যের মন খারাপ হয়ে গেল। দৈত্য লোকটার গালে ঠাস করে একটা চড় বসিয়ে দিল। লোকটা ক্ষ্যাপে গিয়ে বলল, শুনেছি তুমি মানুষেরে হিরা, জহরত, মনি, মুক্তা, স্বর্ণ কত কিছু দাও। আর গুলশানে একটা বাড়ি চেয়েছি বলে তুমি আমাকে চড় মারলা।
দৈত্য বলল, আরে বেকুব আমি নিজেই থাকি ছোট্ট একটা বোতলের মইধ্যে। আর তোরে দিমু গুলশানে বাড়ি, এটা তুই ক্যামনে ভাবলি।

বিপু হাসি চেপে রাখতে পারলো না। তার পেট ফেটে হাসি এল। দৈত্য কপালে ভাঁজ ফেলে বলল, আমারতো মনে হয় লোকটার চেয়ে দৈত্যটাই ছিল বেশী বেকুব।
: কী জানি। বিপু হাসতে হাসতে জবাব দিল।
বিপু হাসি বন্ধ করে বেশ কিছুক্ষণ ধরে ভেবে দৈত্যের জন্য মনে মনে একটা কাজ ঠিক করল। সে শুকনো গলায় বলল, শোন দৈত্য। আমাদের পাড়ার পাশে একটা বড় বস্তি আছে। সেই বস্তির অধিকাংশ মানুষ তিন বেলা খেতে পায় না। ঈদের দিনেও তারা ময়লা ছেঁড়া ময়লা কাপড় পরে থাকে। তুমি তাদের প্রত্যেকের জন্য এক বেলা বিরিয়ানি আর একটা করে নতুন কাপড়ের ব্যবস্থা করে দিবে। কী পারবে না?
দৈত্য খুব জোরে হেসে উঠল। দৈত্যের হাসির শব্দে বিপুর ঘর কেঁপে উঠল। হাসি থামিয়ে দৈত্য বলল, এটা কোন কাজ হল মালিক। আপনি একটু অপেক্ষা করুন। দেখবেন কিছুক্ষণের মধ্যেই সব ব্যবস্থা হয়ে গেছে।
বিপুকে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই দৈত্য হাওয়া হয়ে গেল এবং দু’তিন মিনিট পর আবার ফিরে এল। দৈত্য বলল, সব ব্যবস্থা করে ফেলেছি মালিক।
বিপু অবাক হয়ে বলল, এতো তাড়াতাড়ি।
: আপনার বিশ্বাস হচ্ছে না আসুন আপনাকে দেখাই।
দৈত্য বিপুকে তার হাতের তালুতে বসিয়ে বস্তির উপর উড়িয়ে নিয়ে এল। বিপু দৈত্যের হাতের তালুতে বসে নিচে তাকাতেই দেখে, বস্তির মানুষ মজা করে বিরিয়ানি খাচ্ছে এক পাশে একটা বড় নতুন কাপড়ের স্তুপ। যার খাওয়া শেষ হচ্ছে সে ঐ স্তুপ থেকে একটা নতুন কাপড় নিয়ে হাসি মুখে চলে যাচ্ছে। এসব দেখে বিপুর মন খুশিতে ভরে গেল। সে বলল, সত্যি তুমি আলাদীনের দৈত্য। চল এবার ঘরে ফিরে যাই।
ঘরে ফিরে আসার পরও অনেকক্ষণ গল্প করে তারা। তারপর একসময় দৈত্য প্রদীপে ঢুকে যায়। বিপুও ঘুমিয়ে পড়ে।

সকাল বেলা দেরি করে ঘুম ভাঙ্গল বিপুর। স্কুল বন্ধ থাকাতে মাও ডাকেনি আজ। ঘুম ভাঙ্গতেই সে দেখে খুশি তার ঘর ঝাড় দিচ্ছে। খুশির বয়স আট নয় বছর হবে। সে বিপুদের পাড়ার পাশের বস্তিতেই থাকে। খুশির মাও বিপুদের বাসায় কাজ করে। গতকাল তারা কেউ কাজে আসেনি। বিপু হাই তুলতে তুলতে বলল, খুশি, কাল রাতে তোদের বস্তিতে কি কিছু ঘটেছে?
খুশি ঝাড় বাদ দিয়ে বলল, কী ঘটবো?
বিপু ধমক দিয়ে বলল, প্রশ্ন শুনে প্রশ্ন করবি না। বল, কিছু ঘটেছে?
খুশি নরম গলায় বলল, না কিছু ঘটে নাই।
বিপু চোখ কপালে তুলে বলল, ঘটেনি মানে কাল রাতে তোদের কেউ নতুন জামা কাপড় আর বিরিয়ানি খেতে দেয়নি?
বিপুর কথা শুনে খুশি ফিক করে হেসে ফেলল। খুশি বলল, কাইল রাইতে আমরা পানি ভাতের লগে হুকনা মরিচ পুইড়া খাইছি।
: সত্যি করে বল। বিপুকে খুব অস্থির দেখায়।
: মা পাক ঘরে কাম করতাছে বিশ্বাস না অইলে মারে জিগাইতে পারেন।

খুশি আবার ঝাড়ু দেয়া শুরু করে। বিপু আর কথা বাড়ালো না। সে খাট থেকে নেমে ওয়্যারড্রবের উপর থেকে প্রদীপটা নিয়ে তার এক পাশে ঘষ-ঘষ করে হাত ঘষে। কিন্তু দৈত্য বের হয় না। বিপুর রাগ হয়। সে প্রদীপের গায়ে আরো অনেকক্ষণ হাত ঘষল। দৈত্য বের হওয়ার নাম নেই। খুশি তখন বিপুর খাটের নিচে ঝাড়ু দিচ্ছিল। খুশি বলল, বিপু ভাইজান
বিপু নিচু গলায় বলল, কী।
: রাইতে স্বপ্ন দেখছিলেননি?
বিপু কোন জবাব দেয় না। চুপচাপ দাঁড়িয়ে ভাবতে থাকে রাতে কী সত্যি দৈত্য এসেছিল? রাতে যদি সত্যি দৈতা এসে থাকে, তাহলেতো এখন দু’ঘষাতেই দৈতা এসে যেতো নাকি খুশির কথাই ঠিক? আশ্চর্য! প্রদীপটার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে থেকে অনেক কথাই ভাবে বিপু।

প্রকাশকাল : অক্টোবর ২০০০