আমার মামাতো ভাইয়ের নাম অপু। বয়স, উচ্চতা আর গায়ের রং দুজনার প্রায় একই রকম। পড়িও আমরা একই ক্লাসে— ক্লাস এইটে। বন্ধু বলতে যা বোঝায় অপু তার চেয়েও আপন। অপুদের বাড়িও আমাদের বাড়ির দেয়াল ছোঁয়া। তাই ঘুমানোর সময়টা বাদ দিয়ে দিনের প্রায় সারা সময় আমাদের একসঙ্গে কাটে। একই স্কুলে পড়ি বলে যাওয়া-আসাও হয় একই সঙ্গে। আর দুষ্টুমি? দুষ্টুমি তো একা একা করা যায় না— মিলেমিশেই তা করতে হয়। তাই আমরা মিলেমিশে দুষ্টুমি করি।
অপুর পছন্দ-অপছন্দ একেবারেই আমার মতো। তাই বলে সবকিছু যে হুবহু একই রকম, অমনও নয়। যেমন নিজেকে খুব জ্ঞানী ভাবার ব্যাপারটা— অপু নিজেকে খুব জ্ঞানী ভাবে। মানে, অন্যদের চেয়ে সে বেশি জানে, বেশি বোঝে— এমন একটা উঁঁচু মানের ভাব দেখায় সারাটা ক্ষণ। তাই প্রতিটি বিষয়ে নাক গলিয়ে যেচে যেচে মন্তব্য করে আর মনগড়া একটা সমাধান বাতলে দেয় সবাইকে। এ পৃথিবীর অতীত-বর্তমান আর ভবিষ্যৎ সম্পর্কে অপুর মতো অন্য কারো জানা নেই— এমন ধারণা পোষণ করে সে।
আমি একেবারেই অমন নই। বরং আমার ধারণা অপুর ধারণার একেবারে উল্টো। আমি বিশ্বাস করি আমার এই পনেরো বছরের জীবনে আমি যতোটুকু শিখেছি, যতোটুকু জানা রয়েছে— অজানা রয়েছে তার চেয়ে কোটি কোটি গুণ বেশি। যেমন নবাব সিরাজ-উদ্-দৌলা কবে লর্ড ক্লাইভের সঙ্গে পলাশীর যুদ্ধে পরাজিত হয়েছিলেন, আমি তা জানি। কিন্তু মোহাম্মদ আলী বেগ নামের সেই বিশ্বাসঘাতক কবে তাঁকে হত্যা করেছিল, সেই দিন-তারিখটা আমার জানা নেই। গ্যাগারিন প্রথম মানুষ, যিনি মহাশূন্যে ভ্রমণ করে এসেছেন, সে কথা জানি। কিন্তু তাঁর উচ্চতা কতো ছিল, কী কী খেতে ভালোবাসতেন— আমি তা জানি না। এভাবে না জানার সংখ্যাটাই বেশি আমার জীবনে। আর তা মেনে নিতে কোনো সঙ্কোচও হয় না আমার। না জানা থাকার জন্য মন খারাপ হয়। জেনে নেবো বলে সিদ্ধান্ত নিই। কিন্তু এ নিয়ে কখনো হীনম্মন্যতায় ভুগি না।
অপু কিন্তু ঠিক আমার উল্টো। অপুর ধারণা, সে একজন সবজান্তা। যেনো এক জীবন্ত অভিধান! এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটেনিকা বলতে যা বোঝায় অপু হলো তাই!
অপু বলে, এমন কিছু নেই যা আমার জানা নেই। কিন্তু সমস্যা হলো, আমি যা জানি তোরা তা জানিস না। তাই ভাবিস আমি ভুল বলছি। আমার জবাব শুনে তোরা মুখ টিপে হাসিস।
একদিন আমি আব্বার সেলফ থেকে একটা বই পড়ে অজানা একটা বিষয়ে জানতে পারলাম। শুধুু জানতেই পারলাম না, অনেক দিনের ভুল জানা একটি বিষয় শুধরে নেয়ার সুযোগও পেলাম। সে বিষয়টি ছিল নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু আর আজাদ হিন্দ ফৌজের প্রতিষ্ঠা সম্পর্কে।
আমি নিশ্চিত ছিলাম অপুরও এ বিষয়ে ভুল জানা আছে। শুধু অপু কেনো, আমাদের মতো বেশির ভাগ মানুষেরই আসল সত্যটি জানা নেই। তাই অপুকে জিজ্ঞেস করলাম, আজাদ হিন্দ ফৌজ সম্পর্কে তোর কি জানা আছে?
আমার প্রশ্ন শুনে অপু বরাবরের মতোই একটা সবজান্তা ভাব দেখিয়ে বলল, কি জানতে চাস? এ টু জেড— মানে চুলের ডগা থেকে পায়ের নখ পর্যন্ত জানা আছে। কেনো, হঠাৎ আজাদ হিন্দ ফৌজের কথা জানতে চাইছিস কেনো?
বললাম, হঠাৎ একটা প্রশ্ন মনে এলো, তাই। আচ্ছা, তুই কি জানিস আজাদ হিন্দ ফৌজ কে গঠন করেছেন?
আমার প্রশ্ন শুনে অপু বলল, আমার মতো ট্যালেন্ট ছেলেকে এটা আবার একটা জিজ্ঞেস করার মতো প্রশ্ন হলো? নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু আজাদ হিন্দ ফৌজ গঠন করেছেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপানিদের হাতে যে সব ভারতীয় সৈন্য বন্দি হয়েছিল, তাদের নিয়ে তিনি আজাদ হিন্দ ফৌজ গঠন করেন। পেয়েছিস তোর প্রশ্নে জবাব?
বললাম, পেয়েছি। তবে নির্ভুল জবাব পাইনি।
: নির্ভুল জবাব পাসনি মানে? ভুল হয়েছে কোথায়?
: ভুল হয়েছে আসল জায়গায়। অনেক সময়ই একটা ভুল কথা সত্য বলে প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়। তুই পড়েছিস সেই ভুলের ধাঁধায়।
: যেমন?
অপু আমার দিকে বাঁকা চোখে তাকাল। আমি বললাম, যেমন, আজাদ হিন্দ ফৌজ সুভাষচন্দ্র বসু গঠন করেননি, গঠন করেছেন রাসবিহারী বসু। পরে সুভাষচন্দ্র বসু দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। এটাই ঐতিহাসিক সত্য।
আমার কথা শুনে রেগে গিয়ে অপু বলল, তুই ঘোড়ার ডিম জানিস। ইতিহাস-টিতিহাস কিচ্ছু জানা নেই তোর। মাঝখান থেকে একটা জবাব দিয়ে বসিস।
এই এক সমস্যা। কেউ যদি অপুর ভুল ধরিয়ে দেয়, তাহলে অপু রেগে গিয়ে তাকে যা ইচ্ছে তা বলে। এ ব্যাপারটা আমার ভালো লাগে না। কিন্তু তারপরও বলবো, অপু আমার প্রিয় বন্ধু। অপু খুব ভালো ছেলে।
শেষমেশ একটা কথা জানিয়ে দিই— অপু কিন্তু সাঁতার জানে না। আর এই একটি মাত্র কথা নদী নয়তো পুকুরের সামনে গেলে স্বীকারও করে সে। তখন বলে, আমি কিন্তু সাঁতার জানি না। আমাকে আবার পানিতে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিস না।
অপু যে সাঁতার জানে না, এ কথাটা আমার জানা ছিল না। জেনেছি মাত্র কয়েক দিন আগে এক ঘটনার মধ্য দিয়ে।
স্বাধীনতা দিবসে আমাদের স্কুল বন্ধ ছিল। সেদিন আমরা পিকনিকে গিয়েছিলাম। সেখানে একটা ছোট নদী ছিল। আমরা নদীতে নেমে সাঁতার কাটার সিদ্ধান্ত নিই। সে কথা শুনে অপু বলে, সবাই সাঁতার কাটতে চলে গেলে নদীর পাড় থেকে কাপড়গুলো চুরি হয়ে যাবে। আমি কাপড় পাহারা দেবো।
আমার তো সব কাজে অপুকে না হলে চলে না। তাই বলি, তোকে কাপড় পাহারা দিতে হবে না। নেমে আয়, আমরা একসঙ্গে সাঁতার কাটবো।
আমার কথা শুনে অপু ফ্যাকাসে হয়ে যায়। শুধু তাই নয়, ঝট করে আমার একটি হাত জড়িয়ে ধরে বলে, আমাকে বিপদে ফেলিস না ভাই। আমি সাঁতার জানি না।
: কি বলিস, এতো বড়ো হয়েছিস অথচ সাঁতার জানিস না?
অপুর কথা শুনে অবাক হই আমি। অপু বলে, কী বলবো ভাই, সাঁতার শেখা হয়ে ওঠেনি। তবে এ কথা কাউকে বলিস না। তাহলে আমার মান-সম্মান বলতে কিছু থাকবে না।
অপুর কথা শুনে সে সময় আমার সুকুমার রায়ের লেখা একটা ছড়ার কথা মনে পড়ে যায়। জীবনের হিসাব নাম ছিল সেই ছড়াটার। তাতে বলা হয়েছিল, একজন মানুষের যতো কিছুই জানা থাক, সাঁতার জানা না থাকলে তার অন্য জানার কোনো মূল্য নেই। পানিতে পড়ে গেলে জীবন ষোল আনাই মিছে হয়ে যায়।
ব্যাপারটা মজার না? আমি সাঁতার কেটে অনেক দূরে চলে যেতে পারি, আর অপু সাঁতারই কাটতে পারে না। আর এতে অবাক হবারও কিছু নেই। কারণ, সবার সব কিছু জানা থাকে না।
প্রকাশকাল: ফেব্রুয়ারি ২০২৫



