ভূতের ছানা, ভূতের ডিম

0
0

শুরুতেই বলে রাখি এই গল্পটি অন্যরকম! আর এর কাহিনি দুষ্টু-মিষ্টি দুই ভাইবোনের। একজন তাওসিফ অন্যজন তাসফিয়া। তারা আপন ভাইবোন। তাওসিফ বড়ো তাসফিয়া ছোটো। তারা থাকে শহর থেকে অনেক দূরে। সবুজ সুন্দর এক গ্রামে। নাম রাণীগাঁও। একদিন এক ভোরে ঘটলো এক মজার কাণ্ড! চারদিকে তখন রক্তিম লাল ঝলমলে আলো। গাছে গাছে পাখিরা ডাকছে। মৃদু বাতাসে দুলছে পাতারা। তাওসিফের ঘুম ভাঙলো চড়ুইদের ডাকে। তাদের ঘরের ঘুলঘুলিতে এতো এতো চড়ুই যে, সপ্তাহ দিন হলো সে গুণে আজও তার হিসাব মেলাতে পারেনি! দুষ্টু ছেলেটা এক পা, দু পা ফেলে চুপিচুপি দরজা খুলল। ধীর পায়ে হেঁটে বাইরে এলো। বাড়ির অনেকে তখনো ঘুমে। কেউ জাগেনি। মা রান্না ঘরে। বাবার সাথে বোনও ঘুমে। দাদু নামাজ পড়ে মাত্রই ঘুমালেন। আর দাদা মসজিদ থেকে ফিরবেন আরও পড়ে। সকালে। তাওসিফ যাবে হিজলতলী। বাড়ির সামনের নদীতে শান্ত ঢেউ। ছোটো ছোটো। হঠাৎ পা বাড়াতেই ওর ছোটো বোন তাসফিয়া ডাকল, বলল, ‘ভাই, কই যাবি? ফুল কুড়াতে, আমায় নিবি না? বোনের ডাকে তাওসিফ থমকে দাঁড়ায়। ঠোঁটে আঙুল রেখে বোনকে সর্তক করে। তার কাছে আসে আর ফিসফিস করে বলে, ‘চুপ, চুপ! আস্তে কথা বল, মা শুনতে পাবেন। তুই ঘরে যা!’ এই বলে তাওসিফ হাঁটা শুরু করল। তাসফিয়া উঠোনের দিকে পা বাড়ালো। দৌড়ে এসে দাঁড়াল ভাইয়ের সামনে। খুব কাছে। হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, ‘মা রান্নাঘরে। কাজে ব্যস্ত। আমাকেও তোমার সাথে না-ও।’ তার কণ্ঠে ছিল অনুরোধ আর কথায় ছিল মায়া। ছেলেটা বোনের দিকে তাকাল আর হাসল, কী জানি ভেবে বলল, ‘ইশ! তোকে নিয়ে আর পারি না। শুভ কাজে যাচ্ছি, এই যাব আর ফিরবো। একটা অদ্ভুত জিনিস আনবো আজ! তুই ঘরে যা।’ ভাইয়ের কথায় বোন ভারি আশ্চর্য হলো, বলল, ‘অদ্ভুত জিনিস! সেই জিনিসটা কী, ভাই?’

‘আহ! আছে, আছে। এখন এতো কথার সময় নেই! দেরি হলে গিয়ে জিনিসটা পাবো না। তুই ঘরে যা, আমি যাই। মাকে বলিস না কিন্তু, কেমন?’ ভাইয়ের কথাতে বোন দুপাশে মাথা ঘুরাল, বলল, ‘ঠিক আছে, যাও।’ তাওসিফ তড়িঘড়ি করে চলে গেলো। দ্রুত পায়ে হেঁটে। বড়দের মতো। তার যেন ভীষণ তাড়া! পিছন থেকে তাসফিয়া ডাক দেয়, হাত উঁচিয়ে বলে, ‘ভাই, তাড়াতাড়ি ফিরবে কিন্তু, আমি অপেক্ষায় আছি।’ তাওসিফ পিছনে ফিরে তাকায়, চলতে চলতে হাত নেড়ে বুঝালো- ঠিক আছে, আমি দ্রুতই ফিরছি। বোনের জন্য তাওসিফের মায়া হয়। বোনও ভাইয়ের অপেক্ষায় উঠোনের এক কোণে বসে থাকে। তালগাছের নিচে। তার দৃষ্টি মেঠোপথের দিকে। কিছুক্ষণ পর মেয়েটি দেখলো, তার ভাই ফিরে আসছে। মেয়েটি দৌড়ে এগিয়ে গেলো। দেখলো, ভাইয়ের খালি হাত। তার হাতে কিছুই নেই। বোন ভাইকে জিজ্ঞেস করল, ‘ভাই, অদ্ভুত জিনিসটা কই? দেখাবি না?’ ভাইটি চুপ, মুখে কিছুই বলল না। একটু পর বোনকে হাত পাততে বলল, নিজের পকেট হাতড়ে তার হাতে দিলে একগাদা ফুল। ফুলগুলো দেখে বোন কী যে খুশি! শিউলি ফুল সাথে কী সুন্দর গোলাপি রঙের অনেকগুলি ফুল। বোন অবাক হয়, উদগ্রীব হয়ে জিজ্ঞেস করে বলে, ‘ভাই, এই ফুলের নাম কী? কোথা থেকে এনেছিস?’ মন খারাপের সুরে ভাইটি তার কথার উত্তরে বলল, ‘এইগুলি হিজল ফুল, মিতুদের বাড়ির খালপাড় থেকে এনেছি।’ ভাইয়ের মন খারাপে বোনের খুশি হারিয়ে গেলো। বোন তাকে জিজ্ঞেস করে ভাই, ‘তোর মন খারাপ?’ তাওসিফ কথা বলছে না, বোন তাকে ধাক্কা দিল, বলল, ‘ভাই, কী হলো, মন খারাপ?’ তাওসিফ বড় করে নিঃস্বাস ফেলল, বলল, ‘জ্বীন কিনতে গিয়েছিলাম। কিন্তু পাইনি। যাবার আগেই বিক্রি হয়ে গেছে!’ ওর কথায় মেয়েটা ভয় পেলো, ভীষণ ভয়ে আঁতকে উঠল। সাথে সাথে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে হাতে থাকা ফুলগুলো। ইশ! ভয়ে মেয়েটির মুখ সাদা হয়ে গেছে। ভয়ে কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে ভাইকে বলল, ‘একি কাণ্ড! বলিস কি ভাই, তুই জ্বীন কিনবি? তোর কি ভয়-ডর নেই? আর জ্বীন দিয়ে তুই কী করবি?’
বোনের কথায় বিরক্ত হয়ে ভাই তাকে বলল, ‘কেন, আমি জ্বীন পুষবো! আচারের মতো বয়ামে ভরে রাখবো!’ ভাইয়ের কথায় বোনটি মনে মনে বিড়বিড় করে বলল, ‘হায় কপাল, জ্বীন কি কেউ পোষে নাকি?’ পাগলটা বলে কী! এই বলে বোন নিজের মাথায় হাত রাখল, বলল, ‘কিন্তু ভাই, দাদু বলেছেন জ্বীন নাকি দেখতে অনেক বড়ো। তালগাছের থেকেও লম্বা। আর তাদের দৈত্যের মতো বিশাল বড়ো দেহ হয়। তুই দাদুর বলা বুড়ো জ্বীন আর পরির গল্পটি কি ভুলে গেলি?’ বোনের কথায় ভাইটি গালে হাত রেখে কী যেন ভাবছে। বোন তার শরীর ছুঁইয়ে বলল, ‘এ ভাই, কথা বল।’ ভাবনা থামিয়ে সে বোনের কথার উত্তর দেয়, বলে, ‘ধুর, আমি বুড়ো জ্বীন কেন কিনবো? এই এত্তোটুকুন একটা জ্বীন কিনবো। বাচ্চা জ্বীন!’ ভাইয়ের কথায় বোনের ভয় দ্বিগুণ হয়। কাঁপতে থাকে ঠকঠক করে। কাঁপতে কাঁপতে ফিসফিস করে বলে, ‘ছোটো জ্বীন কিনবি? তা জ্বীনের বয়স কত? দেখতে কেমন?’ বোনের কথায় ভাইটি ভাবনায় পড়ে। নিজের থুতনিতে আর ঠোঁটে হাতের একটা আঙুল উঠায়-নামায়, পরে ভাবতে ভাবতে বলল, ‘কত আর হবে? আমার বয়স সাত, তুই আমার দেড় বছরের ছোটো। ধরা যায় জ্বীনটার বয়স তিন-চার বছর, আর দেখতে জ্বীনটা দৈত্যদানো কিছুই না। অনেকটা মানুষের মতো। কিন্তু আমি ছাড়া কেউ তাকে দেখবে না!’ অবাক চাহনিতে বিস্ময় কাটাতে বোন তাকে জিজ্ঞেস করে, ‘ওমা! আর কেউ দেখবে না কেন?’ কথাটি শুনে ভাইটি হাসলো, বলল, ‘বারে, দেখলে তো জ্বীন পোষার মজাই থাকবে না! আমি জ্বীনকে দিয়ে হোমওয়ার্ক করাবো, নিতুদের গাছ থেকে জামের সময় জাম আর আমের সময় আম আনতে পাঠাবো, মিতুদের পুকুর থেকে শাপলা তুলতে বলবো। আর…
– ‘আর! আর কী?’ জিজ্ঞেস করে মেয়েটা।
ছেলেটা হাসতে হাসতে নাচতে নাচতে বলল, ‘আর ইশকুলে যাবার এবং আসার সময় ভারী ব্যাগটা তার কাঁধে তুলে দেবো। সে হাঁটবে, আর বই-খাতা ভরা ব্যাগটা ঝুলে থাকবে শূন্যে। রাস্তার লোকজন, ইশকুলে টিচারেরা আর আমার বন্ধুরা দেখলে ভয় পাবে! ইশ! কী মজাটাই হবে! কি হবে না বল?’ ভাই তাকে পাল্টা প্রশ্ন করে। বোন ভীষণ ভাবনায় পড়ে। উত্তর পায় না! দৌড়ে চলে যায় ঘরে। ফুলগুলো পড়ে থাকে উঠোনে। বাবার পাশে শুয়ে শুয়ে বোনটা ভাবতে থাকে, ‘ভাই, জ্বীন কার কাছ থেকে কিনবে? রাখবে কই?’ ইশ! ভাবতে ভাবতে মেয়েটা ভয়ে কেমন চুপসে যায়। নিজের কাছে সে কোনো কথারই উত্তর খুঁজে পায় না! বাবাকে কী জিজ্ঞেস করবো? মাকে? না, দাদাকে ব্যাপারখানা জানাতে হয়! দাদুকেও বলতে হবে। এসব কথা ভাবতে ভাবতে হঠাৎ মায়ের ডাকে তার ঘুম ভাঙলো! মেয়েটা বুঝতে পারে না এসব কি কেবল স্বপ্ন ছিল, নাকি সত্যি সত্যি সত্যি ছিল!… মেয়েটা নাকের কাছে নিজের দুইহাত রাখলো, গভীর নিঃশ্বাস টেনে শুকলো, একি! তার হাতে শিউলি এবং হিজল ফুলের মিষ্টি গন্ধ। মেয়েটা দৌড়ে গেলো উঠোনে। গিয়ে দেখলো, তালগাছের নিচে এখনো পড়ে আছে ফুলগুলো। কী যেন ভাবলো আর তাকালো পথের দিকে। তার ভাই নাচতে নাচতে মক্তবে যাচ্ছে। বন্ধুদের সাথে। সকালের আলো ফুটতে শুরু করেছে। বাড়ির সামনের নদীতে বড়ো বড়ো ঢেউ তুললো হাওয়ারা। দস্যি হাওয়ার নাচুনি খেয়ে আকাশ পাড়ে জমতে থাকে মেঘের পাহাড়। নদী পেরিয়ে মেয়েটা তখন স্কুলে চলল দাদার সাথে। ভাইয়ের সাথে তার দেখা হয় দুপুরে। ভাইটি তখন নদীর পাড়ে বসে বসে ছড়া কাটছে,

কমলা রঙের দারুণ মিষ্টি দুপুর;
ধানের ক্ষেতে বাজতে থাকে নুপুর!
নাচছে কারা পান-সুপারি খেয়ে?
মেঘের ছেলে, ফুল-পরিদের মেয়ে…

ছড়াটি পড়ে শেষ হলে, বোনটি বলল, ‘বাহ! বাহ! কী সুন্দর ছড়া! নতুন লিখলি বুঝি?’ ভাইটি দুপাশে মাথা ঘুরাল, বলল, ‘হুম, নতুন ছড়া, মাত্রই লিখে শেষ করলাম।’ সারা দুপুর ভাইবোন খেললো। নদীর কাদা মাটি দিয়ে পুতুল বানালো। বিকেলের আগে ঘরে ফিরলো। খাবার খেয়ে ঘুমালো। সন্ধ্যায় উঠে নাশতা খেয়ে একসাথে পড়তে বসলো। পড়ার টেবিলে হঠাৎ বোন ফিসফিস করে বলল, ‘ভাই, কালকেও কি জ্বীন কিনতে যাবি? বাচ্চা জ্বীন?’
– ‘জ্বীন! কীসের জ্বীন? তাও আবার বাচ্চা জ্বীন?’ অবাক হয়ে ভাই তার কাছে পাল্টা জবাব চাইল। ছেলেটার কথায় মেয়েটি কেমন বোকা বনে যায়! ইতস্তত হয়ে থেমে থেমে বলল, ‘না, কিছু না, এমনি মজা করেছি!’ ছেলেটা দুপাশে মাথা ঝাঁকিয়ে বলল, ‘মজা! তবে শোন একটা মজার কথা, আমি জ্বীন-টিন কিছু কিনবো না। তবে কাল-পরশু গুটিকয়েক ডিম কিনবো। ভূতের ডিম!’ মেয়েটা ভীষণ অবাক হয়। চোখ দুটো কপালে তুলে বলল, ‘ও মা! বলিস কি? ভূতের ডিম! ভূতের ডিম কিনে করবি কী? খাবি?’ বোনের কথায় ছেলেটা হাসল, জোরে শব্দ করে। মা রান্নাঘর থেকে ধমক দিলেন, বললেন, ‘কিরে, পড়তে বসে তোদের এতো গল্প কীসের? মন দিয়ে পড়া পড়ো!’ মায়ের ধমকে দুজনের গল্প বলা থেমে যায়। শব্দ করে ভাইবোন পড়তে থাকে। বইয়ের পড়া। হঠাৎ পড়তে পড়তে কৌতূহল মেটাতে না পেরে বোন তাকে ফিসফিস করে বলল, ‘ভাই, ভূতের ডিম দেখতে কেমন? আর ডিম দিয়ে করবি কী? বল, বল না, ভাই- প্লি­জ!’ ছেলেটা বলে, ‘ভূতের ডিম দেখতে অনেক ছোটো। এই ধর, তাসবি দানার মতো। আর ডিম খাবো কেন বোকা! ডিমে তাপ দিবো। তাপে ডিম ফুটে বাচ্চা বেরোবে। ধীরে ধীরে বাচ্চা বড়ো হবে। তোর সমান। তখন ভূতগুলোকে বেচে দিবো। শহরে।’ ভাইয়ের কথায় বোনটির চোখ কপালে ওঠার অবস্থা। নিজেকে যেন তার বোকাসোকা মনে হচ্ছে। সবকিছু কেমন স্বপ্ন স্বপ্ন লাগছে। জানার অধীর আগ্রহ জমতে থাকে মনের ভেতর। বলে, ‘ভাই, তুই ভূতের বাচ্চা শহরে বেচাকেনা করবি? কিন্তু কিনবে কারা?’
বোনের কথায় ভাইটি তাকে ঠাট্টার ছলে বলল, ‘ধুর বোকা, তুই দেখি কিছুই জানিস না! শহরের ছেলেমেয়েরা সারাদিন বাসায় থাকে। একা একা। তাদের খেলা করার বন্ধু নেই। ভূতের বাচ্চা কিনে তারা খেলা করবে। গল্প করবে। ছাদে ঘুড়ি উড়াবে, ভূতের কাছে অংক শিখবে। পড়বে!’ আজগুবি সব বলতে বলতে ভাইটি থামে। একটু জিরিয়ে নেয়। পড়া পড়ে। বোনটি তখন আনমনে বইয়ের পাতা উল্টাতে থাকে। আর ভাবতে থাকে কত কী কথা! ভাইটি তখন বোনকে বলল, ‘জানিস, ভূতেরা অনেক কিছু জানে। অনেক কিছু পারে। তুই তো দেখি ভূত নিয়ে কিছুই জানিস না!’ ভাইটির কথায় বোনের কান্না পায়। সত্যি সে ভূতদের নিয়ে কিছুই জানে না। বোনটি তখন ভাইয়ের কাছে একটি ভূতের ছানার জন্য বায়না ধরে। বলে, ‘ভাই, আমাকেও একটি ভূত দিবি তো, হলুদ রঙের। জানিস তো, হলুদ আমার প্রিয় রঙ।’ ভাই বোনকে সান্ত্বত্মনা দেয়, বলে, ‘আচ্ছা দেবো দেবো। কিন্তু টাকা লাগবে।’

– ‘টাকা! টাকা আমি কই পাবো? আমার তো টাকা নেই!’ ভাই হাসলো, মাথায় দুষ্টু বুদ্ধির ফন্দি এঁটে বলল, ‘কেন টাকা জমানো তোর মাটির হলুদ ব্যাংকটা আমায় দিয়ে দিবি। তার বদলে আমি তোকে একটা সুন্দর ভূতের ছানা দেবো হলুদ রঙের। রাজি?’ বোন আনন্দে উৎফুল্ল হয়ে হাসলো, খুশিতে হাততালি দিতে দিতে বলল, ‘হুম, আমি রাজি।’ ভূতের ছানার অপেক্ষায় কাটতে থাকে বোনের দিন। একেকটি দিন যেন অপেক্ষায় কাটতেই চায় না! বোনটি না-দেখা হলুদ ভূতের ছানাকে ঘিরে কত যে স্বপ্ন বুনতে থাকে, মনে মনে। আর সেই স্বপ্নের ডানাগুলি রঙধনুর মতো রঙিন। মেয়েটা ভাবে-ভূতের ছানার কাছে ছড়া লেখা, গল্প লেখা, ছবি আঁকা, গান করা যা কিছু আছে ভালো কাজ, সবকিছু সে শিখবে। একদিন এক সন্ধ্যায়, দুষ্টু পাজি ছেলেটা ধুলোমাখা শরীরে ঘরে ফিরলো। ভাইকে আসতে দেখে বোন দৌড়ে এলো, বলল, ‘ভাই ভূতের ছানা কবে দিবি? আমার টাকা জমানো ব্যাংকটা তো নিয়ে গেলি।’ শুনে ছেলেটা মুচকি হাসলো। শরীরের ধূলো ঝাড়তে ঝাড়তে বলল, ‘দেবো রে বোন, দেবো। সপ্তাহ দিন যাক, অপেক্ষা কর, তোকে হলুদ রঙের মিষ্টি একটা ভূত দেবো। বেশ চমৎকার দেখতে! খুব ভদ্র একটা ভূতের ছানা।’ এটুক বলে, বুক পকেট থেকে ছেলেটা বের করলো বিশ-ত্রিশটা মটর দানা। দেখিয়ে বলল, ‘এইগুলো ভূতের ডিম। রাত্রিরে এতে তাপ দেবো। দুই সপ্তাহ পর ডিম ফুটবে। দেখবি ডিম ফুটে কেমন নাদুস-নুদুস ভূতের ছানা বেরুবে!’ মেয়েটা ভারি আশ্চর্য হয়ে বলল, ‘এ মা! বলিস কী! তোর হাতে ভূতের ডিম! দেখি, আমার হাতে দে তো। নেড়েচেড়ে দেখি!’ ছেলেটা বলল, ‘না, না, হাতে দিলে ভেঙে যাবে। হাতে দেওয়া যাবে না।’ ছানা বেরুলে ছানা পাবি। চুক্তি মতো তুই হলুদ একটা ভূতের ছানা পাবি। কিন্তু ডিমের কথা চুক্তিতে নেই! যা গিয়ে পড়তে বস। আমিও আসছি। ডিমগুলো রেখে আসি।’ এই বলে ছেলেটা দাদুর কামরার দিকে এগিয়ে যায়। মেয়েটির মন খারাপ! ভূতের ডিম ছুঁয়ে দেখা হলো না তার। মেয়েটা তাই ভাইয়ের পিছু নিলো। গিয়ে দেখলো এক মজার কাণ্ড! কী জানি খুঁজতে গিয়ে ছেলেটা খাটের নিচে মাথা ঝুঁকালো। ওমনি বুক পকেটে থাকা মটরদানা মানে ভূতের ডিমগুলো পড়লো মেঝেতে। এই যা, ডিমগুলো গড়াতে শুরু করলো। আর গড়াতে গড়াতে ঢুকলো গিয়ে আলমারির নিচে। অনেক পুরোনো দিনের লোহার আলমারি। নিচে অল্প ফাঁকা। সেই ফাঁক দিয়ে হাতও ঢুকানো যায় না। ভারি আলমারিটা এইটুকু ছেলে সরায় কীভাবে! রাগে টগবগ করে ছেলেটা বোনকে কথা শোনালো, বলল, ‘সব দোষ তোর! পিছে পিছে কেন এলি?’ ভাইয়ের কথায় বোনটা বোকা বনে গেলো! কাঁদো কাঁদো গলায় বলল, ‘বারে, আমি আবার কী করলাম!’ ভাইটি কোনো কথা বলল না। চলে গেলো হনহনিয়ে। পরিষ্কার হয়ে নাশতা খেয়ে পড়তে বসলো। চুপচাপ। মেয়েটা পড়তে বসলো কিছুক্ষণ পর। পড়ার টেবিলে বসেই, বলল, ‘ভাই, এখন কী হবে? আমি কি ভূতের ছানা পাব না?’ বোনের কথায় বিরক্ত হয়ে ভাই হাতের বইটি ভাঁজ করলো, বলল, ‘ছানা কীভাবে পাবি, ডিমগুলো তো সব আলমারির নিচে!’ বোন তখন তার হাতে থাকা মটরদানা মানে ভূতের ডিমগুলো দেখিয়ে বলল, ‘এই দেখ, তোর ভূতের ডিম। আমি খুব কষ্ট করে ঝাড়ু দিয়ে বের করেছি। এই নে, ডিমগুলো তুই রাখ। আমার কিন্তু ভূতের ছানা চাই!’ বোন তার হাতে তুলে দেয় সাত-আটটি মটর দানা। মানে ভূতের ডিম! ডিমগুলো দেখে ছেলেটা ভীষণ খুশি! বোনও খুশি! আনন্দে ভাইবোনের চোখে-মুখে হাসির ফুল ফুটলো। একে একে সপ্তাহ ফুরালো। দ্বিতীয় সপ্তাহের পর হঠাৎ এক সকালে বোন ভাইয়ের কাছে ভূতের ছানা চাইলো। ভাইটি তখন বলল, ‘আহ! আর বলিস নে বোন, সাত-আটটা ডিম থেকে তিনটা ছানা বেরুলো। কী সুন্দর নাদুসনুদুস ভূতের ছানারে। একটা হলুদ ভূত, একটা কালো ভূত। সবার ছোটোটা সাদা ভূত। ধবধবে সাদা। কিন্তু!’…
‘কিন্তু! কী? জিজ্ঞেস করে মেয়েটা?’
ছেলেটা ভীষণ মন খারাপ করে অখুশি আর দুঃখী মুখ করে বলল, ‘কিন্তু বোন হলুদ ছানাটা পলোর নিচে পরে মারা গেছে! আর কালো ভূত এবং সাদা ভূত দুটো উড়ে গেছে। পাখির মতো। আমি তো জানতাম না ভূতদের ডানা থাকে। পরির মতো! ’ কথাগুলো বলতে বলতে ছেলেটা কান্না জুড়ে দেয়! সেসব শুনে মেয়েটাও কান্না জুড়ানো কণ্ঠে বলতে থাকে, ‘না, না, এসব মিছে কথা। আমি হলুদ ভূতের ছানাটা চাই। হয় ছানা দাও, না-হয় আমার টাকা জমানো ব্যাংক দাও…! ভাই তাকে আরও কী যেন বলতে চাইলো। কিন্তু বোন কাঁদতে কাঁদতে ছুটে চলল মায়ের কাছে। মা তখন রান্না ঘরে রান্নার কাজে ব্যস্ত। মেয়েটা মায়ের আঁচল টেনে কাঁদো কাঁদো আদর মাখা কণ্ঠে বলল, ‘মা, মা, জানো ভাইয়ার হলুদ রঙের ভূতের ছানাটা মারা গেছে। পলোর নিচে আটকা পড়ে।’
‘ভূতের ছানা! হলুদ রঙ!’ ভাবতে ভাবতে মা ভাবনায় পড়ে যান। তার মনে পড়ে অনেক পুরোনো এক দিনের কথা। এমনই এক বসন্তের সুন্দর সকালে, এ বাড়িতে দুটো ছানাসহ মুরগি এসেছিল। উপহার। পাঠিয়েছিলেন তাওসিফের ফুফু। তাওসিফ তখন খুব ছোটো। মাস তিনেক বয়স। তাওসিফ তখন অসুস্থ। ছোটো রোগের বড়ো অসুখ। নিউমোনিয়া। বাড়ির সবাই তখন দৌড়াদৌড়িতে। ঠিকানা হাসপাতাল আর বাড়ি। হঠাৎ এক সকালে তিনি দেখলেন হলুদ রঙের ছানাটি মারা গেছ। পলোর নিচে চাপা পড়ে। পরদিন লাল রঙের ছানাটি কাকে নিয়ে যায়। আহ! পুরনো ব্যথায় মায়ের চোখ অশ্রুতে ভরে ওঠে। টুপ করে দুই ফোঁটা গড়িয়ে পড়ে মাটিতে। মায়ের গালে লেপ্টে থাকে জলের দাগ। তিনি কাঁদছেন। আঁচলে মুখ মুছতে মুছতে বললেন, ‘হলুদ রঙের ছানা, ছানাটি মরে গেছে!’… মায়ের এসব কথা আর কান্নায় মেয়েটার বিশ্বাস হয়, সত্যি সত্যি ভূতের ছানাটি মরে গেছে। মেয়েটা আরও জোরে কাঁদতে থাকে। না-দেখা হলুদ রঙের ভূতটার জন্যে। কাঁদতে কাঁদতে ছুটে গেল, দাদার কাছে। দাদাকে মেয়েটা ফোঁপাতে ফোপাঁতে বলল, ‘দাদাভাই, দাদাভাই, আমার ভূতের ছানাটি মরে গেছে। সুন্দর হলুদ রঙের ভূতটা!’ দাদা তার মাথায় হাত বুলিয়ে চুলগুলো এলোমেলো করে দেন। চোখের জল মুছতে মুছতে বলেন, ‘কেঁদো না, এসো, এসো, আমরা হাটে যাব। ঘুরবো।’ কথা শেষ হলে দাদা তাসফিয়াকে কোলে নেন, ডাক দেন, ‘তাওসিফ, কই তুমি? চল আমরা হাটে যাই!’ একসাথে গরুর গাড়িতে চড়ে তারা হাটে পৌঁছাল। তারা এখন ছোটো এক চটপটির দোকানে। বেঞ্চে বসা। হাতে গরম ধোঁয়া ওঠা চটপটির বাটি। বাটিতে ঝোলে ডুবানো মটরদানা। দেখতে সেই ভূতের ডিমের মতো। মেয়েটি বাটি থেকে চামচে কয়েকটি মটর দানা তুলল, দাদাকে দেখিয়ে বলল, ‘দাদাভাই, এগুলো কি ভূতের ডিম? ভূতের ডিম মানুষে খায়?’ দাদা অবাক হয়ে একবার নাতনির দিকে একবার নাতির দিকে তাকালেন, বললেন, ‘হ্যাঁ দাদু ভাই, এগুলি ভূতের ডিম! খাও, তুমি খাও!’… দাদুর কথা শেষ হলে, তিনি আর তাওসিফ কী জানি ভেবে হাসলেন। হা! হা! হি! হি! শব্দ করে। অট্টহাসি। এসব দেখে মেয়েটা হাসবে, না কাঁদবে? ভূতের ডিম খাবে, না খাবে না? ভাবতে থাকে। মেয়েটির বড্ড মন খারাপ! কিন্তু দাদা আর ভাই তখনো কেমন অদ্ভুত রকম হাসছিল! ছোটো মিষ্টি মেয়েটি বুঝতে পারে না, কী রহস্য এই হাসির?

প্রকাশকাল: মার্চ ২০২৫