শাওন ভাই একটা বক্স আর একটা ফ্লাক্স হাতে নিয়ে বুলবুলদের বাড়িতে এসেছে। সাথে আছে মেহেদি। বুলবুল আমার বন্ধু। জানালা দিয়ে দেখলাম শাওন ভাই সত্যি সত্যি নতুন এক বক্স বল নিয়ে এসেছে। আমি ছুটে গেলাম পাশের রুমে। বুলবুলকে বললাম, শাওন ভাই সত্যি সত্যি বল নিয়ে চলে আসছে।
বুলবুল বলল, দোস্ত তোকে যা বলেছিলাম তাই কর।
আমি বললাম, আচ্ছা।
আমি কী ব্যবস্থা করেছি তা একটু পরে বলছি। তার আগে বলি যে কারণে শাওন ভাই ক্রিকেটের বল নিয়ে আসছে।
স্কুলের বন্ধুরা মিলে আমাদের পাড়ায় নাইট সার্কেল ক্রিকেট টুর্নামেন্ট এর আয়োজন করেছে। সেই টুর্নামেন্টের খেলার ধারাভাষ্যকর এর ভূমিকা পালন করছে বুলবুল। বুলবুলকে আমাদের ক্লাসের সবাই বকবকানি বুলবুল বলে। প্রচুর কথা বলে। রসিকতাও করে। যেমন ধরো আমাদের বন্ধু সুজন। সুজনের বাবার নাম মোবারক। বুলবুল ঈদ এলেই সবার সাথে কোলাকুলি করে আর বলে ঈদ সুজনের বাবা, ঈদ সুজনের বাবা। সেই শুনে সবার সে কী হাসি।
যা হোক, গতকালকের কথায় আসি। মিয়াপাড়া ক্রিকেট লিগের খেলায় গতকাল হাজীরপাড়ার খেলা ছিল। সেই খেলায় ধারাভাষ্য করতে গিয়ে দারুণ দারুণ সব মজার কথা বলছিল বুলবুল। যেমন চার মারলেই সে বর্ণনা দিচ্ছিল- চমৎকার শট। মাঠ গড়িয়ে গড়িয়ে ফিল্ডারদের ফাঁকি দিয়ে চলে গেল সরাসরি বলের বাইরে। এই ধারা বিবরণী শুনে মাঠভর্তি দর্শক হা হা হি হি করে হাসতে হাসতে গড়াগড়ি খেতে লাগল। এরই মধ্যে ব্যাট করতে নামলো শাওন ভাই। শাওন ভাই ব্যাটিং নেমে একটার পর একটা ডট বল উপহার দিতে থাকল বিপক্ষ দলের বোলারদের। রান পাচ্ছেন না। এই ডট বল দেখতে দেখতে বুলবুল মাইকে ধারা বিবরণীতে বলতে শুরু করলো। ব্যাটসম্যান শাওন একটার পর একটা বল খেয়েই যাচ্ছেন। কিন্তু রান করতে পারছেন না। এভাবে বল খেতে থাকলে আগামী কয়েকদিন তার না খেলেও চলে যাবে। কিন্তু তার পেট ভরলেও এই বল খাওয়াতে দলের যে পেট ভরবে না, সে কথা তিনি হয়তো ভাবছেন না। এই ধারা বর্ণনা শুনে মাঠের দর্শক আবার হা হা হি হি করে হেসে উঠলো। হাজীরপাড়া হেরে গেল। খেলা শেষে সেই শাওন ভাই বল হাতে নিয়ে ছুটে এসেছেন কমেন্ট্রি বক্সে। বুলবুলকে বল খাইয়ে দেবেন। বিপদ দেখে সে যাত্রায় পালিয়ে গেছে বুলবুল। কিন্তু শাওন ভাই নাছোড়বান্দা। বুলবুলকে ক্রিকেটের বল না খাইয়ে তিনি নাকি ছাড়বেনই না।
শাওন ভাইকে বসানো হয়েছে। মেহেদি ভাইও পাশেই বসে আছে।
– ফ্লাক্সে কী মেহেদি ভাই? জানতে চাইলাম আমি।
– চা। শাওনের মনটা একটু নরম হয়েছে তো সেজন্য চা নিয়ে এসেছে। বলল মেহেদি ভাই।
– চা দিয়ে কী হবে?
– চা দিয়ে কী হবে মানে! ক্রিকেটের শক্ত বল বুলবুল কি এমনি এমনি খেতে পারবে নাকি! সেজন্য চা নিয়ে আসা হয়েছে। মগে চা ঢালবে আর বল চুবিয়ে চুবিয়ে খাবে।
– হুম। তবুও বল না খাওয়া পর্যন্ত বুলবুলের মাফ নাই। উচ্চ স্বরে বলল শাওন ভাই।
শুনে আমার ভীষণ হাসি পাচ্ছিল। কিন্তু এমন সিচুয়েশনে কি আর হাসা যায়। এরই মধ্যে মাথা নিচু করে এসে দাঁড়িয়েছে বুলবুল। বুলবুলকে দেখেই শাওন ভাই বলতে শুরু করলো।
– কিরে, বুলবুল বল খাওয়ার জন্য প্রস্তুত তো?
বুলবুল কোনো কথা বলে না।
মেহেদি ভাই বলের বক্স খুলে সামনে দিলো। দেখলাম বক্সে ছয় ছয়টা সাদা রংয়ের ক্রিকেটের বল। মেহেদি ভাই আমার উদ্দেশ্যে বলল, কিরে মামুন, তোর বন্ধু বল খাবে না?
তড়িঘড়ি করে বললাম, খাবে ভাই, খাবে। আপনারা ছয়টি বল নিয়ে আসছেন ও ছয়টি বলই খাবে। কিন্তু…!
– কিন্তু আবার কী? জানতে চায় শাওন ভাই।
আমি বললাম, ভাই ও বল খাওয়ার জন্য সকাল থেকেই প্র্যাকটিস করছিল। অবশেষে সফল হয়েছে। ও জানতো বল না খেলে আপনি মাফ করবেন না। যে কারণে ও সিদ্ধান্ত নিয়েছে বল ও খাবে। তবে তিন ফরম্যাটের বল খাবে।
– তিন ফরম্যাট?
– হ্যাঁ ভাই। ওডিআই, টেস্ট আর টি-টোয়েন্টি ফরম্যাট।
– তাই নাকি! অবাক হয় শাওন ভাই।
– জি ভাই। আমি বলগুলো নিয়ে আসছি। কিন্তু আর একটু সমস্যা আছে।
– কী সমস্যা ? প্রশ্ন করে মেহেদি।
– সমস্যা হলো আপনারা ভাই সামনে মানে কাছাকাছি থাকলে ও একটু বেশি ভয় পাবে। ভয় পেলে গিলতেও কষ্ট হবে। আপনারা দূরে গিয়ে দাঁড়ালে ও আপনাদের দেখিয়ে দেখিয়ে খাবে।
– আচ্ছা, ঠিক আছে। বলেই রাজি হয়ে গেল শাওন ভাই।
আমার কথামতো মেহেদি ভাই আর শাওন ভাই বুলবুলের থেকে কয়েকগজ দূরে গিয়ে দাঁড়ালো।
আমি আগেই এক হাওয়াই মিঠাই বানানোর কারিগরকে চুক্তি করে নিয়ে আসছিলাম। সেই কারিগর সাদা, গোলাপি এবং লাল রংয়ের মোট ছয়টি হাওয়াই মিঠাই বল বানিয়ে দিয়েছে। সেগুলো নিয়ে আসলাম।
বুলবুল সেই হাওয়াই মিঠাইয়ের বল অনেক কষ্টে খাওয়ার অভিনয় করে খেতে থাকলো। ছয় ছয়টি হাওয়াই মিঠাই বল খেতে সময় নিলো সে আধা ঘণ্টা।
খাওয়া শেষ হতেই সামনে ছুটে এলো শাওন ভাই আর মেহেদি ভাই। বলল, আমরা তো শুধু সাদা রংয়ের বল নিয়ে আসছিলাম। ও তিন রংয়ের বল কোথায় পেল?
বললাম, ভাই আমি আগেই বললাম না ও তিন ফরম্যাট এর বল খাবে। যে কারণে ও আগেই বল নিয়ে আসছিল। সাদা বলটা ছিল ওডিআই ফরম্যাটের। লাল বলটা ছিল টেস্ট ফরম্যাটের। আর গোলাপি বলটা ছিল টি-টোয়েন্টি ফরম্যাটের।
আমার কথা শুনে মেহেদি ভাই আর শাওন ভাই অবাক হয়ে বুলবুল এর দিকে তাকিয়ে থাকলো। ওদের তাকানো দেখে আমার আর বুলবুলের সেই রকম হাসি পাচ্ছিল। কিন্তু এরকম সিচুয়েশনে হাসব কি না বুঝছি না।
প্রকাশকাল: মার্চ ২০২৫



