সেই ছেলেটি

একটি ক্লাসে দশ জন ছাত্র থাকলে, দশজন দশ রকমের হয়। কেউ একটু বেশি চঞ্চল- পুরো ক্লাস মাতিয়ে রাখে। কেউবা একটু অন্তর্মুখী- নীরব থাকতে পছন্দ করে। আবার কেউ খুব মেধাবী- আলাদা একটা গাম্ভীর্য নিয়ে থাকে। শিশু মনের এই বিচিত্র ভাবধারা (ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্যবোধ) স্রষ্টারই সৃষ্টি। মহান আল্লাহ তাঁর সৃষ্টিকে রূপময় করে তুলতে এই বৈচিত্র্য দান করেছেন।
একজন আদর্শ শিক্ষক বিষয়টি জানেন। তাই তিনি সবার মধ্যে ভাব বিনিময়, মতবিনিময়ের পরিবেশ গড়ে তোলার চেষ্টা করেন। যাতে ক্লাসে সবার অংশগ্রহণ সমান হয়। কিন্তু সমস্যা হয়ে যায় অন্তর্মুখী ছেলে-মেয়েদের নিয়ে। এদের সহজে মেলে ধরা যায় না। কবি হয়তো তাই বলেছেন,
“করিতে পারি না কাজ
সদা ভয় সদা লাজ
সংশয়ে সংকল্প সদা টলে
পাছে লোকে কিছু বলে।
আড়ালে আড়ালে থাকি
নীরবে আপনা ঢাকি,
সম্মুখে চরণ নাহি চলে
পাছে লোকে কিছু বলে।”
অন্তর্মুখীদের কেউ লাজুক বলে। কেউবা বলে সুবোধ বালক। আবার কেউ বলে লক্ষ্মী ছেলে। কেউবা আবার তাদের নিয়ে হতাশ। যারা এর বিপরীত সমাজে তাদের সফলতা বেশি। নিজেকে তুলে ধরার বা প্রেজেন্ট করার যোগ্যতা সমাজ জীবনে ইতিবাচক ফল বয়ে আনে। অন্তর্মুখীরা সেটা পারে না। তাই তাদের পরিচিতি নেই। নাম নেই। যশ নেই।
ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ুয়া আসিফ সে রকমই একজন ছেলে। সে বেশ মেধাবী। প্রাথমিকে ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি পেয়েছে। সে তার সমস্যার কথা বোঝে। সে অনেক চেষ্টা করেছে তার এই চুপচাপ নীরব বলয় থেকে বেরিয়ে আসতে। কিন্তু পারেনি। অন্তর্মুখীতাই বরং তাকে বেশি টানে। তার এই স্বভাবের জন্যে দু’একজন শিক্ষকের ভর্ৎসনাও শুনতে হয়েছে তাকে। একদিন তো অংকের টিচার বলেই বসলেন, “এ্যাই, তুমি এত চুপচাপ থাকো কেন, তুমি গোয়েন্দা নাকি? সেদিন ক্লাসে সবাই হেসেছিলো। সে লজ্জা পেয়ে দু’দিন স্কুলেই আসেনি।
শিক্ষিকা মিসেস নাসরিন জাহান অবশ্য আসিফকে নিয়ে হতাশ নন। তিনি আসিফের অন্তর্মুখীতা (ওহঃৎড়াবৎংরড়হ) বেশ উপভোগ করেন। তিনি ওর চোখে মুখে একটা মেধার দীপ্তি দেখতে পান। তিনি ভাবেন, সবার সহযোগিতা পেলে সে একদিন ওর অন্তর্মুখী বলয় থেকে বের হয়ে আসতে পারবে।
আসিফ লেখাপড়ায় খুব ভালো। ক্লাসে বেশ নিয়মিত। অপরের প্রতি সহানুভূতিশীলও।
প্রতিবছর স্কুলে বার্ষিক ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতায় কোনো বিষয়ে আসিফকে অংশগ্রহণ করতে দেখা যায় না। এবারই প্রথম সে অংশগ্রহণ করেছে, তাও আবার নির্ধারিত বিষয়ে রচনা প্রতিযোগিতায়। বিষয়বস্তু ছিল “ছাত্রজীবনে প্রেজেন্টেশন ক্লাসের গুরুত্ব।”
আজ সকালে এক পশলা বৃষ্টি হয়ে গেছে। মেঘ ভেঙে রোদ্দুর বেরিয়েছে। নরম রোদ। হলুদ বরণ রোদ। বৃষ্টি ভেজা দখিনা মৃদুমন্দ বাতাস ছেলেদের চুল ছুঁয়ে যাচ্ছে। ছেলেদের হৈ হল্লা আর ছোটাছুটিতে জেগে উঠেছে স্কুল আঙিনা। রঙ বেরঙের বেলুন আর ফেস্টুনে সাজানো হয়েছে চারপাশ। স্কুলে আজ বার্ষিক পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান। সবাই পুরস্কার নিবে। যে কোনো ইভেন্টেই ভালো করতে পারেনি সেও পাবে সান্ত্বনা পুরস্কার। তাই সবার মনেই আনন্দ।
প্রতিযোগিতার ফল ঘোষণা হলো। আসিফ প্রতিযোগিতায় প্রথম হয়েছে। কী আশ্চর্য! যে কি না ক্লাসে দাঁড়িয়ে কথাই বলে না। কোনো প্রেজেন্টেশন দেয় না, সেই আবার সেই বিষয়েই প্রথম! ক্লাসের ছাত্রদের মধ্যে সাড়া পড়ে যায়। অভিভাবকদের আগ্রহের শেষ নেই। চারদিকে গুঞ্জন শুরু হয়-“চুপচাপ সেই ছেলেটি।”
বছরের প্রথম দু’মাস হইচই করেই কেটে গেল। এখন পুরোদমে ক্লাস চলছে। এপ্রিলের শেষে বেশ গরম পড়েছে। হঠাৎ সেদিন একটা বিপত্তি ঘটলো আসিফদের স্কুলে। অ্যাসেম্বলি চলছিলো। এমন সময় অষ্টম শ্রেণির একটি ছেলে অজ্ঞান হয়ে পড়ে। মুহূর্তের মধ্যে আরো কয়েকজন ছাত্র জ্ঞান হারায়। শিক্ষকরা কী করবেন বুঝে উঠতে পারেন না। এমন সময় আসিফ চিৎকার করে বলতে থাকে, সবাই সরে দাঁড়াও, ভিড় করবে না। মুক্ত বাতাস আসতে দাও। আমি এর প্রাথমিক চিকিৎসা জানি। ওদের একদিকে কাত করে দাও, যাতে মুখে ও গলায় যে লালা বা নিঃসরণ আছে তা বেরিয়ে আসতে পারে। জুতা খুলে দাও। পায়ের দিকটা একটু উঁচু করে ধরো। স্যার! দ্রুত অ্যাম্বুলেন্স কল করুন, ট্রিপল নাইন-এ ফোন দিন।”

সবাই আসিফের সেবা দেখে হতবাক হয়ে যায়। দূর থেকে কে যেন বলে ওঠে, “এ্যাই সেই ছেলেটি।”
কিছুক্ষণের মধ্যেই অ্যাম্বুলেন্স সাইরেন বাজিয়ে স্কুল আঙিনায় ঢোকে। সাইরেনের বিকট শব্দে চারদিকে ভীতি ছড়িয়ে পড়ে। খুব দ্রুত অসুস্থ হয়ে পড়া- শিক্ষার্থীদের হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়।
সাধারণভাবে এটাকে অজ্ঞাত রোগ বলে। তবে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় “ম্যাস সাইকোলজিক্যাল ডিজিজ” বা গণ হিস্টরিয়া। আতংকের ফলে একজন থেকে আরেক জনে এ রোগ ছড়ায়। এই বয়সে সমস্যা বেশি হয়। মন খারাপ, ভয় থেকে এ সমস্যা হতে পারে।
আসিফকে বন্ধুরা ঘিরে ধরেছে। সবাই বাহ্বা দিচ্ছে। শিক্ষকরাও তার প্রশংসা করছে। একজন অভিভাবক বললেন, তুমি এতকিছু কীভাবে জানলে। আসিফ বললো, সে পত্র-পত্রিকায় স্বাস্থ্যপাতার বিভিন্ন আর্টিকেল পড়ে এসব জেনেছে।
ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই ভালো খবর এলো, অসুস্থ শিক্ষার্থীরা সুস্থ হয়ে উঠছে। ভয়ের কোনো কারণ নেই।

দু’দিন স্কুল বন্ধ থাকার পর আজ আবার খুলেছে। অসুস্থ শিক্ষার্থীরা ঘরে ফিরেছে। আজ অ্যাসেম্বলি খুব সংক্ষিপ্ত করা হলো। হেডস্যার ঘোষণা করলেন, এখন থেকে প্রতিদিন অ্যাসেম্বলি-তে তোমরা ধারাবাহিকভাবে বিভিন্ন রোগের প্রাথমিক চিকিৎসা বিষয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করবে। এ ব্যাপারে তোমরা পড়াশোনা করে আসবে। তিনি সেদিনের ঘটনায় আসিফের ভূমিকার জন্য তাকে ধন্যবাদ দিলেন, সাধুবাদ জানালেন।

আসিফের মুখ লজ্জায়, গর্বে আর কৃতজ্ঞতায় রক্তিম হয়ে উঠলো।

প্রকাশকাল: ফেব্রুয়ারি ২০২৫