শীতকাল চলে এসেছে। শীত এলেই তোমাদের অনেকের গোসলের ভয় শুরু হয়। দিনের পর দিন গোসল করতে ইচ্ছে করে না। ফাঁকিবাজি শুরু করো অনেকে। নানান বাহানা পেশ করো। আচ্ছা, তোমাদের এক রাজার গল্প শোনাই। ফ্রান্সের বিখ্যাত ভার্সাই প্রাসাদ যিনি তৈরি করেছিলেন, তিনি রাজা চতুর্দশ লুই। ১৬৩৮ সালে তার জন্ম। তার বাবা রাজা ত্রয়োদশ লুই যখন মারা যান তখন চতুর্দশ লুইয়ের বয়স মাত্র ৪ বছর। কিন্তু নিয়মানুযায়ী তাকেই রাজা হিসেবে ঘোষণা করা হয়। ৪ বছর বয়সী রাজা কীভাবে দেশ চালাবেন! তাই সেসময় তার মা, কার্ডিনাল ম্যাজারিন এর সহযোগিতায় রাজ্য চালিয়ে নেন। ১৬৬১ সালে ম্যাজারিন মারা গেলে মাত্র ২৩ বছর বয়সে নিজেকে একচ্ছত্র শাসক হিসেবে ঘোষণা করেন লুই। ৪ বছর বয়স থেকে শুরু করে ১৭১৫ সালে মারা যাবার আগ পর্যন্ত তিনি প্রায় ৭২ বছর ধরে ফ্রান্সের রাজা ছিলেন। তিনি ছিলেন ইউরোপের দীর্ঘতম মেয়াদের রাজা। রাজ্য শাসনে তিনি অনেক সাফল্য পেয়েছেন, কিন্তু তার অদ্ভুত বৈশিষ্ট্য ছিল তিনি গোসল করতে ভয় পেতেন। বলা হয়, তিনি সারা জীবনে দুই বা তিনবার গোসল করেছিলেন। ভাবতে পারো, কতটা নোংরা হলে একজন মানুষ এমন করতে পারে! শুধু তিনিই না, তৎকালীন ফ্রান্স এবং ইউরোপীয়দের ক্ষেত্রেও একই দুর্নাম আছে, যে তারা গোসল করতো না। এর পেছনে কারণ হিসেবে কেউ কেউ বলেন যে চতুর্দশ শতকে ইউরোপে প্লেগের আক্রমণ হয় এবং তাতে ইউরোপের প্রায় এক তৃতীয়াংশ মানুষ মারা যায়। তখন তাদের ধারণা ছিল যে প্লেগ পানিবাহিত রোগ। তাই প্লেগের ভয়ে তারা পানি থেকে যথাসম্ভব দূরে থাকতে চেষ্টা করতো।
এবারে এসো মজার ব্যাপারে! যেহেতু তারা গোসল করতো না, তাই তাদের বাধ্য হয়ে সুগন্ধি ব্যবহার করতে হতো। রাজা চতুর্দশ লুই সুগন্ধির ব্যপারে রাষ্ট্রীয় আইন জারি করেছিলেন যে রাজ্যে সবার সুগন্ধি ব্যবহার বাধ্যতামূলক। তার প্রাসাদের সোফা, বেড কভার, পর্দা সবখানেই নিয়মিত সুগন্ধি ঢালা হতো। তিনি গোসল করতেন না, কিন্তু নিজের গায়ে এবং পোশাকে সুগন্ধি ঢালতেন দিনে কয়েকবার। এমনকি তিনি সপ্তাহের সাত দিনের জন্য আলাদা আলাদা সুগন্ধি বানিয়েছিলেন তার সুগন্ধি প্রস্তুতকারকদের দিয়ে। তার রাজসভাকে নাম দেয়া হয়েছিল ‘পারফিউম কোর্ট’ আর তাকে বলা হয় ‘পারফিউম কিং’। তার এই সুগন্ধিপ্রেমের ফলে ফ্রান্সে সুগন্ধি উৎপাদনের বিপ্লব ঘটে যায়। আজ অবধি বিশ্বের সেরা পারফিউম তৈরির ব্র্যান্ডের বেশিরভাগ ফ্রান্সের। যেমন- ডিওর, শ্যানেল, ওয়াইএসএল, হারম্যান, ক্লোই, জুভঞ্চি ইত্যাদি।
চলো, আজ পারফিউম নিয়েই আলাপ করা যাক। পারফিউম শব্দটি এসেছে ল্যাটিন ‘পার ফিউমাম’ থেকে, যার অর্থ ‘ধোঁয়ার মাধ্যমে’। এর ব্যাখ্যা হলো প্রাচীন যুগে কাঠ বা বিভিন্ন উপকরণ পুড়িয়ে সুগন্ধি ধোঁয়া উৎপাদন করা হতো। প্রাচীন মেসোপটেমিয়া (বর্তমান ইরাক অঞ্চল) এবং মিশরে সুগন্ধি উৎপাদনের সুপ্রাচীন ইতিহাস পাওয়া যায়। মিশরের পিরামিডের ভেতরকার মমিতেও পারফিউম ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া যায়। সেই পারফিউম এতই শক্তিশালী ছিল যে হাজার বছর পরে মমির কফিন খুলতে গিয়ে তীব্র সুবাস পাওয়া গেছে। রাণী ক্লিওপেট্রা নিজে ‘কিফি’ নামের সুগন্ধি চালু করেছিলেন।
পরবর্তীতে আরব সভ্যতা বিকাশ লাভ করলে আরবে সুগন্ধি শিল্পের সূচনা হয়। আরব ভূমিতে, বিশেষ করে ওমান, ইয়েমেন এবং পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে সুগন্ধি গাছের নির্যাস পাওয়া যেত, যা প্রাচীন পারফিউম শিল্পের মূল উপাদান।
আরবরা স্পাইস রুট এবং সিল্ক রুটের মাধ্যমে চন্দন বা স্যান্ডালউড, গোলাপ এবং অন্যান্য সুগন্ধি উপাদান ভারত ও চীন থেকে আমদানি করত। ৯ম শতাব্দীর আরব বিজ্ঞানী আল-কিন্দি পারফিউম প্রস্তুতিতে আধুনিক রসায়নবিদ্যার ভিত্তি স্থাপন করেন। তিনি বিভিন্ন তেল, ফুল ও মশলা থেকে সুগন্ধি তৈরি করার পদ্ধতি উদ্ভাবন করেন।
তিনি একটি বই রচনা করেন- ‘ Book of the Chemistry of Perfume and Distillations,’ যেখানে ১০০টিরও বেশি পারফিউম প্রস্তুতির রেসিপি রয়েছে।
এর পর তো ষোড়শ শতকের দিকে রানি ক্যাথারিন মেডিচি ফ্রান্সে সুগন্ধি শিল্পের গোড়াপত্তন করেন। আর রাজা চতুর্দশ লুইয়ের কথা তো শুরুতেই বললাম। এভাবে ইউরোপে সুগন্ধির বিকাশ ঘটে।
সুগন্ধির যে কত রকমফের আছে! সুবাসের উপর নির্ভর করে ৪ ধরনের ভাগ করা যায়।
১. ফ্রেশ বা সজীব সুবাস- সাইট্রাস উদ্ভিদ যেমন লেবু, কমলা ইত্যাদি টকজাতীয় সুবাস দিয়ে তৈরি হয় এই ধরনের পারফিউম।
২. ফুলের সুবাস- গোলাপ, বেলি, জেসমিন, রজনীগন্ধা ইত্যাদি ফুল থেকে তৈরি হয় এসব পারফিউম।
৩. প্রাচ্য ঘরানার সুবাস- অদ্ভুত হলো – লবঙ্গ, দারুচিনি, এলাচি ইত্যাদি মসলার সুবাস থেকে এ ধরনের পারফিউম তৈরী হয়।
৪. কাঠ থেকে তৈরি সুবাস- চন্দন, দেবদারু, এম্বার কাঠ থেকে তৈরি হয় এসব সুবাস।
আবার পারফিউমের আছে ৩টি নোট বা স্তর। পারফিউম গায়ে মাখার পর প্রথমে যে ঘ্রাণটা পাওয়া যায় সেটিকে বলে টপ নোট। কিছুক্ষণ পর এ ঘ্রাণটি মিলিয়ে যাবার পর যে ঘ্রাণটি আসে সেটি মিডল নোট। মিডল নোট দীর্ঘস্থায়ী হয়। সর্বশেষে যে ঘ্রাণটি অবশিষ্ট থাকে সেটি বেইজ নোট।
আবার পারফিউমে মূল সুগন্ধি উপাদান- পারফিউম অয়েল এর পরিমাণের উপর নির্ভর করে পারফিউম কয়েক প্রকার।
১. পারফিউম (Perfume)- এতে ২০-৩০% পারফিউম অয়েল থাকে। এটি ৮-১২ ঘণ্টাপর্যন্ত স্থায়ী হয়। এটি রাতে বা বিশেষ অনুষ্ঠানে ব্যবহারের উপযোগী
২.ও ডি পারফিউম (Eau de Parfum – EDP)- এতে ১০-২০% পারফিউম অয়েল থাকে। এটি ৬-৮ ঘণ্টা সুবাস ছড়ায়। এটি ব্যক্তিগত এবং পেশাগত অনুষ্ঠানের জন্য উপযোগী।
৩.ও ডি টয়লেট (Eau de Toilette – EDT)- এতে ৫-১৫% পারফিউম থাকে। এর সুবাস থাকে ৪-৬ ঘণ্টা। এটি দিনের বেলা এবং অফিসে ব্যবহার উপযোগী।
৪.ও ডি কোলোন (Eau de Cologne – EDC) – এতে ২-৫% সুগন্ধি থাকে। এর সুবাস থাকে ২-৩ ঘণ্টা। এটি গরমের দিনে হালকা সুবাসের জন্য ব্যবহার করা যায়।
৫. ও ফ্রেশ-(Eau Fraiche) এতে ১-৩% সুগন্ধি থাকে। এর সুবাস থাকে ১-২ ঘণ্টা। এটি খেলাধূলা বা ব্যায়ামের পর ব্যবহার উপযোগী।
আতরের মধ্যে আছে পারফিউম ওয়েল এবং স্প্রে। বিখ্যাত আতরের মধ্যে আছে- আল হারামাইন, উদ, মিশক, আসিল, নুআইম, জেসমিন ইত্যাদি। বলে রাখা ভালো- বিশ্ববিখ্যাত আল হারামাইন আতরের মালিক মাহতাবুর রহমান বাংলাদেশের সিলেটের সন্তান।
নবীজী সা. সুগন্ধি ব্যবহারের উপর বিশেষ তাগিদ দিয়েছেন। হাদিসে জুমুআর দিনে এবং ঈদের দিনে সুগন্ধি ব্যবহারের গুরুত্বের কথা বলা হয়েছে। নবীজী সা. চুল দাড়ি এবং হাতে সুগন্ধি লাগাতেন। তিনি বলেছেন- সুগন্ধি ব্যবহার করা সকল নবীর সুন্নাত। তার প্রিয় আতর ছিল মিশক আম্বর। এছাড়া তিনি চন্দন এবং জাফরানের সুগন্ধি ব্যবহার করেছেন। তিনি উপহার হিসেবে সুগন্ধি দেয়ার জন্য উৎসাহিত করতেন এবং তাকে কেউ সুগন্ধি উপহার দিলে তা ফিরিয়ে দিতেন না। নারীদেরও সুগন্ধি ব্যবহারের কথা বলেছেন তিনি। তবে তীব্র সুগন্ধি ব্যবহার করে বাইরে যেতে নারীদের নিষেধ করা হয়েছে হাদিসে। পারফিউমের মধ্যে যেগুলো এলকোহল মিশ্রিত, সেগুলো বর্জন করা শ্রেয় তবে ব্যবহার করা যাবে মর্মে আলেমদের মত রয়েছে।
এখন সুগন্ধি ব্যবহারের নিয়মগুলো জেনে নিই। সুগন্ধি ব্যবহার করতে হয় গোসলের পর। সুগন্ধি কাপড়ে না মেখে শরীরে ব্যবহার করতে পরামর্শ দেন বিশেষজ্ঞরা। তবে নিম্নমানের সুগন্ধিতে ক্ষতিকর কেমিক্যাল থাকে যা ত্বকে এলার্জি তৈরি করতে পারে। সেটা খেয়াল করে ব্যবহার করতে হবে। সুগন্ধি দিতে হয় হাতের কব্জিতে (তালুর দিকে), ঘাড়ের দু পাশে, বুকের দু পাশে, কনুইতে এবং হাঁটুর পেছনে। তাহলে সারাদিন সুবাসিত থাকবে চারপাশ।
পারফিউম তোমার ব্যক্তিত্বকে প্রকাশ করে। তাই তোমার জন্য দেখেশুনে সিগনেচার পারফিউম চয়েস করবে; যেটা নিয়মিত ব্যবহার করবে এবং এর সুবাস পেলেই মানুষ বুঝবে যে তুমি সেখানে আছো। মনে রাখবে, দুর্গন্ধ ছড়ানো মানুষকে কেউ পছন্দ করে না। তাই পরিচ্ছন্ন থাকবে এবং সুগন্ধে সুবাসিত থাকবে। তাহলে মানুষ তোমাকে পছন্দ করবে। পারফিউম আত্মবিশ্বাস বাড়ায়, মনে আনন্দ যোগায়। তবে এত বেশি পারফিউম বা এত উৎকট গন্ধের পারফিউম ব্যবহার করবে না, যাতে পাশে থাকা মানুষের কষ্ট হয়।
প্রকাশকাল: ডিসেম্বর ২০২৪



