বৃষ্টির দিনগুলো শেষ হয়ে এলে আমাদের মাঝে হাজির হয় স্নিগ্ধ একটি ঋতু, শরৎ। বর্ষাকালের চিরায়ত দৃশ্যপট বদল হয়ে প্রকৃতিতে আসে নতুন এক ধারা। কমবেশি বৃষ্টি থাকে এ সময়টাতে কিন্তু তাতে দেখা দেয় বিরতি। আর বর্ষার একটানা ঝমঝমাঝম বৃষ্টির ছাঁট থাকে না। আসে এক নতুন আবহ। তারই নাম শরৎ। আষাঢ়-শ্রাবণে ‘ঝরো ঝরো মুখর বাদলদিনে’র ঘনঘোর বর্ষা শেষে শরৎ আসে ভিন্ন একটা চিত্রপট নিয়ে।
আমরা জানি, ছয় ঋতুর দেশ বাংলাদেশ। আমাদের দেশে প্রতি দুই মাস পর পর ঋতু পরিবর্তিত হয়। ভাদ্র ও আশ্বিন মাস মিলে শরৎ, বাংলার ষড়ঋতুর তৃতীয় ঋতু। গ্রীষ্মের দাবদাহ বা প্রচণ্ড গরম থাকে না, থাকে না বর্ষাকালের বাদলের একটানা বর্ষণ। তাই শরৎ আমাদের কাছে আদরণীয় একটি ঋতু। শরৎকে ইংরেজিতে ‘অটাম’ বলা হয়। আর হেমন্তকে বলা হয় লেইট অটাম। তবে উত্তর আমেরিকায় অটামকে ‘ফল’ হিসেবে ডাকা হয়।
ছয় ঋতুর নাম ইংরেজিতে কী এবারে জেনে নেয়া যাক। ১) Summer (সামার) = বাংলায় হচ্ছে গ্রীষ্মকাল ২) Rainy season- (রেইনি সীজন) = বাংলায় হচ্ছে বর্ষাকাল, ৩) Autumn- (অটাম) = বাংলায় হচ্ছে শরৎকাল, ৪) Late Autumn (লেইট অটাম) = বাংলায় হচ্ছে হেমন্তকাল, ৫) Winter (উইনটার) = বাংলায় হচ্ছে শীতকাল, ৬) Spring (স্প্রিং) = বাংলায় হচ্ছে বসন্তকাল। মজার বিষয় হচ্ছে বহু দেশে কিন্তু ৬টি ঋতু নেই। পৃথিবীর ৪টি প্রধান ঋতুর একটি হচ্ছে শরৎকাল। উত্তর গোলার্ধে সেপ্টেম্বর মাসে এবং দক্ষিণ গোলার্ধে মার্চ মাসে গ্রীষ্মকাল ও শীতকালের মধ্যবর্তী ঋতু হিসেবে শরৎকাল আগমন করে। এসময় রাত তাড়াতাড়ি আসে এবং আবহাওয়া ঠান্ডা হতে থাকে। এই সময়ের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হচ্ছে পত্রঝরা বৃক্ষের পাতার ঝরে যাওয়া।
বলছিলাম সাদা মেঘের কথা। হ্যাঁ, শরতের একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য হচ্ছে আকাশে সাদা সাদা মেঘ উড়ে বেড়ায়। কবির কল্পনায় এই মেঘগুলো যেন ভেলা। সাদা সাদা এই মেঘের আনাগোনা কার না ভালো লাগে? শরতের অন্যান্য ফুলের জগতেও ভিন্নতা দেখা যায়। শরতের ফুল হচ্ছে হিমঝুরি, গগনশিরীষ, ছাতিম, পাখিফুল, পান্থপাদপ, বকফুল, মিনজিরি, শেফালি বা শিউলি, কলিয়েন্ড্রা, কাশফুল ইত্যাদি। শরতের ফল হচ্ছে আমলকী, জলপাই, তাল, জগডুমুর, করমচা, চালতা ইত্যাদি। করমচা অবশ্য বর্ষাতেও দেখা যায়।
এখন আষাঢ়-শ্রাবণের ভরা বর্ষাকালে সারা দেশে খুব একটা বৃষ্টিপাত হয় না। আগের মতো একটানা ৭/১০দিন ধরে বৃষ্টি প্রতি বছর আর দেখা যায় না। প্রকৃতিতে পরিবর্তন এসেছে বলে এমনটা হয়। এ বছর গড়ে স্বাভাবিকের চেয়ে অর্ধেকেরও কম বৃষ্টিপাত হয়েছে। আগের বছরে হয়েছে আরো কম।
পহেলা ভাদ্র (১৬ আগস্ট) ষড়ঋতুর বাংলাদেশে ঋতুর পালাবদলে শরতের রাজত্বকাল শুরু। মিষ্টি ঘ্রাণের শিউলি চুপি চুপি বলে যায় শরৎ এসেছে।
কবি লিখেছেন-
‘আজ ধানের ক্ষেতে
রৌদ্রছায়ায় লুকোচুরি খেলা রে ভাই,
লুকোচুরি খেলা
নীলাকাশে কে ভাসালে সাদা মেঘের ভেলা রে
ভাই লুকোচুরি খেলা’
কবি রবীন্দ্রনাথ এভাবে শরৎকালকে মনে করেছেন। তিনি শরৎকে ‘স্বল্পায়ু’ বলেছেন। আসলেও তাই। দেখতে দেখতে হেমন্ত এসে বলবে তোমার সময় শেষ।
ষড়ঋতুর বাংলাদেশে প্রতিটি ঋতুই ভিন্ন ভিন্ন রূপবৈচিত্র্য নিয়ে আসে। নতুন করে সাজে প্রকৃতি। গ্রামে যেমন, শহরেও তাই। এখন গ্রামের বিস্তীর্ণ মাঠ জুড়ে নবীন ধানের সঙ্গে কাশফুলের দোলা আর শহরের নীল আকাশে ভেসে বেড়ায় সাদা মেঘের ভেলা।
শরৎ হচ্ছে আকাশ ও মাটির মিলন। একদিকে নীলাকাশ, আরেক দিকে কচি ফসলের দুরন্তপনা। একদিকে সোনারোদ, আরেক দিকে সবুজের কচি মুখ। তা আমাদের হৃদয়কে নাড়া দিয়ে যায়। ভাদ্র মনকে উদ্বেল করে। প্রকৃতির সবুজ ছড়িয়ে পড়ে মাঠে-ঘাটে। প্রকৃতি তার ভালোবাসা দিয়ে আপন করে নিতে চায় সব মনকে।
শরতের শিউলি ফুল কবি নজরুলকে মুগ্ধ করেছিল। কবি লেখেন-
‘শিউলি ফুলের মালা দোলে শারদ-রাতের বুকে ঐ
এমন রাতে একলা জাগি সাথে জাগার সাথি কই…।’
নীল আকাশে সাদা মেঘের ভেলায় চড়ে প্রকৃতিতে এসেছে শরৎকাল। ঋতুচক্রের বর্ষ পরিক্রমায় বর্ষার বিষণ্নতা পরিহার করে শরৎ আসে। শরতের মেঘহীন নীল আকাশে সাদা মেঘের ভেলা কেড়ে নেয় প্রকৃতি প্রেমিকদের মন। বিলে শাপলা, গাছে গাছে শিউলির মন মাতানো সুবাস অনুভূত হয় শরতের ছোঁয়া। শরতের রূপ যেনো শান্ত-স্নিগ্ধ-কোমল। যেখানে মলিনতা নেই, আছে নির্মল আনন্দ আর অনাবিল উচ্ছ্বাস।
শরতে শেফালি, মালতি, কামিনী, জুঁই, টগর আর সাদা সাদা কাশফুল মাথা উঁচিয়ে জানান দেয় সৌন্দর্য। মিষ্টি সুবাস ছড়িয়ে দেয় চার পাশে। গ্রামীণ প্রকৃতিতে শরৎ আসে সাড়ম্বরে। যদিও ইট-কাঠের নগরীতে শরৎ থেকে যায় অনেকটা অন্তরালে। গ্রামবাংলার দিঘিতে ফোটে পদ্মফুল, দিঘির পাশেই শেফালি গাছ। প্রভাতে গাছ থেকে ঝরে পড়ে শত শত শেফালি বা শিউলি ফুল। এর সুগন্ধ মনে লাগায় ভালোবাসার রং। কেউ বা গাঁথে ফুলের মালা। শরতের রাতে ফোটে শিউলি ফুল। ঝরে যায় ভোরবেলায়। শেষ রাতে শিউলির সুবাস ছড়িয়ে পড়ে বহুদূর। ফুল ছোট, রং সাদা। দেখতে কিছুটা জুঁই ফুলের মতো; বাসন্তী রঙের বোঁটা ফুলের মাঝখানে দেখা যায়। শরতের সকালে হালকা শিশির ভেজা সবুজ ঘাসের ওপর শুভ্র শিউলি ফুল ছড়িয়ে পড়ে। শরৎ মানেই যেন শিউলির শুভ্রতা। একে ডাকা হয় শেফালি নামেও।
আবার কাশফুলও যেন শরতেরই স্মারক। নদীর ধারে, খালের পাশে কাশফুল ফুটে থাকে। সাদা হয়ে ওঠে প্রকৃতি। শহরের আনাচে কানাচেও দেখা যায় কাশফুলের ঝাড়। দূর থেকে দেখে আমোদিত হয় মন। নীল আকাশে সাদা মেঘের ভেলা আর কাশফুল দেখলেই আমরা বুঝি শরৎ এসেছে। কারণ, কাশফুল শরতের আগমনের প্রতীক। বাতাসে দোলে মোহনীয় ভঙ্গিমায়। কাশ তৃণ বা ঘাসজাতীয় গাছ। শরৎকালে কাশের সাদা ও রুপালি ফুল ফোটে। শরতের হালকা বাতাসে সাদা কাশফুল দুলতে থাকার দৃশ্য মনোরম।
মাঠে মাঠে চিরসবুজ ধানক্ষেতের নয়নাভিরাম দৃশ্য, ধানের শীষে আগামী দিনের ফসলের মুকুল। শরতের শান্ত ও স্নিগ্ধ এ রূপ মনে এক প্রশান্তি এনে দেয়। দিনের সোনালি রোদ্দুরের ঝিলমিলি আর রাতের ধবধবে জ্যোৎস্নার টানে মন হয়ে ওঠে মাতোয়ারা।
শরতে ফোটা আরো কিছু ফুল:
শরতে নানা ফুল ফোটে। প্রকৃতি এদের নিয়ে হয়ে ওঠে সুন্দর। কয়েকটির পরিচয়-
শাপলা: এ সময় পুকুর, ডোবা, হাওর, বিল সব জায়গায় ফুটে থাকে শাপলা ফুল। শাপলার কন্দ বা মূল পানির নিচে মাটিতে থাকে। পাতা বড়, গোলাকার, বোঁটা লম্বা। ফুল বড়, রং সাদা। শাপলার পরিণত ফলকে ঢ্যাপ বা ভেট বলে। ঢাকার বলধা গার্ডেনে দেখা যায় দুর্লভ হলুদ শাপলাও।
দোলনচাঁপা: শরতের হিমহিম বাতাসের দোলায় দোল খাওয়া আরেকটি ফুলের নাম দোলনচাঁপা। শরতের বিভিন্ন ফুলের মতোই স্নিগ্ধতা আর সাদা রেশমি চাদর গায়ে চেপে আগমন দোলনচাঁপার। এ ফুলগুলো গুচ্ছ আকারে বের হয় এবং ফোটার পর দেখতে বেশ ভালো লাগে।
জবা: জবা আমাদের দেশের ফুল পরিবারের আরেক প্রাণবন্ত সদস্য। কিছু জবা সারা বছরই ফুটতে দেখা গেলেও জবা ফোটার সময় মূলত শরৎকাল। রক্তরঙা লাল টকটকে এ ফুলটি দেখতে বেশ আকর্ষণীয়। গোল ডিম্বাকার লাল রঙের ফুলের পাপড়ির মাঝে লম্বা একটি দণ্ড। আর এর মাথায় ফুলের রেণু, যার বুকে প্রজাপতি থেকে মৌমাছির আনাগোনা লেগেই থাকে।
বকুল: দেখতে খুব ছোট হলেও তেমনি আরেকটি ফুল হচ্ছে বকুল। যুগে যুগে ভালোবাসার স্মৃতি আর নানা আয়োজনে বকুল ফুলের মালা অনেকটা অংশ জুড়ে আছে। তবে শুধু বকুলের ফুলই বকুলগাছের আকর্ষণের কারণ নয়। এর ঢেউ খেলানো পাতা আর গাছ বরাবরই সবাইকে আকৃষ্ট করে। এর ফুলগুলো খুব ছোট ছোট হওয়ায় একে তারার সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে।
প্রকাশকাল: আগস্ট ২০২৪



