রোজা: বিজ্ঞান ও স্বাস্থ্যের এক অনন্য অনুশীলন

ইসমাইল হোসেন

0
79

একটি বছর পরে আবার ফিরে এলো মাহে রমজান- গানটি নিশ্চয়ই শুনেছো সকলে। মাহে রমজান এলে সবার মনে এক খুশির বার্তা বয়ে যায় বিশেষ করে ছোটদের মনে। সাহরি, ইফতার, তারাবিহ নামাজে মসজিদে ছোটাছুটি আর ঈদের আগাম বার্তার কারণে ছোটদের মনে আনন্দের বান বয়ে যায়। এর সাথে যোগ হয় নতুন জামা-কাপড় কেনাকাটার আনন্দ। সকল কাজের মধ্যে এই মাসে আমরা আলাদা আনন্দ খুঁঁজে পাই। তবে এই মাস যে শুধু আনন্দ করার জন্য নয় তা কিন্তু আমরা সবাই জানি। এই মাস ধৈর্য, আত্মসংযম, শিক্ষার অফুরন্ত সুযোগ ও আল্লাহর রহমত।
রোজা ইসলামের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। এটি শুধু উপোস থাকা বা না খেয়ে থাকা নয়; বরং রোজা মানুষের চরিত্র গঠন, আত্মসংযম শেখানো এবং শারীরিক ও মানসিক সুস্থতার এক সুন্দর প্রশিক্ষণ। রমজান মাস এলেই আমরা রোজা রাখি, নামাজ পড়ি, কোরআন তিলাওয়াত করি
এবং ভালো মানুষ হওয়ার চেষ্টা করি। ছোটদের জন্য রোজা একটি ধীরে ধীরে শেখার বিষয়—যেখানে আনন্দ, শিক্ষা ও ভালো অভ্যাস একসঙ্গে গড়ে ওঠে।
রোজা শব্দটি ফারসি শব্দ যার আবিধানিক অর্থ থেমে থাকা বা বিরত থাকা। আরবি ভাষায় রোজাকে বলা হয় সাওম। সাওম অর্থ – কোনো কিছু থেকে বিরত থাকা। অর্থাৎ রোজা হলো ফজরের সময় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত খাবার, পানীয় ও নির্দিষ্ট কিছু কাজ থেকে নিজেকে বিরত রাখা। নিশ্চয়ই এখন জানতে ইচ্ছা করছে – খাবার বা পানীয় থেকে বিরত থাকা তো বুঝলাম কিন্তু নির্দিষ্ট কাজগুলো আবার কী? চল বিস্তারিত জানার চেষ্টা করি।
রোজা থাকা মানে শুধু না খেয়ে থাকা নয় বরং রোজা থেকে মিথ্যা কথা না বলা, ঝগড়া না করা, খারাপ কথা না বলা, কাউকে কষ্ট না দেয়া, ধৈর্য ও সহনশীল থাকা। এটা তো গেলো ধর্মীয় কথা যেটা আমরা সবাই জানি তাই না? কিন্তু এই আলোচনায় আমরা আলোচনা করবো রোজা কতটা বিজ্ঞানসম্মত। অনেকের ধারণা রোজা বিজ্ঞানসম্মত না। রোজা রাখলে বাচ্চাদের বা বড়দেরও ক্ষতি হয় বা হতে পারে। আসলে আমাদের খাদ্যাভ্যাসের কারণে আমরা কিছুটা সমস্যায় পড়ি।
আমরা সাধারণত স্বাস্থ্যকর খাবার না খেয়ে বরং মুখরোচক খাবার খাই তাই অনেক সময় সমস্যায় পড়ে যাই। রোজা আমাদের দেহের জন্য কতটা ভালো জানার আগে একটি গবেষণা নিয়ে কথা বলি।
‘অটোফেজি’ শব্দটি নিশ্চয়ই শুনেছো। চল সহজ ভাষায় অটোফেজি সম্পর্কে জানার চেষ্টা করি। অটো অর্থ নিজে নিজে আর ফেজি অর্থ খেয়ে ফেলা, অর্থাৎ অটোফেজি মানে নিজে নিজে নিজেকে খেয়ে ফেলা। না তুমি যেটা ভাবছো সেটা নয়, নিজের গোশত নিজে খাওয়া নয়; এটা হলো আমরা যখন না খেয়ে থাকি অর্থাৎ রোজা রাখি তখন আমাদের কোষগুলো বাইরে থেকে কোনো খাবার পায় না। বাইরে থেকে খাবার না পেলে ওরা তো আমাদের মতো রোজা রাখে না তখন কোষগুলো নিজেদের মধ্যে অসুস্থ কোষ বা মৃত কোষগুলো খেতে শুরু করে। মেডিক্যাল সাইন্স এটাকে অটোফেজি বলছে। আরো সহজ করে বলি। আমাদের প্রত্যেকের ঘরে বা পড়ার টেবিলের নিচে একটি ময়লা ফেলার ঝুড়ি বা ডাস্টবিন থাকে, যেটাতে আমরা ময়লা বা অপ্রয়োজনীয় জিনিস ফেলে দিই। পরে সেটা আবার বাইরে ফেলে দিই তাই না? আমাদের কোষের ভিতরেও ডাস্টবিন আছে। সারা বছর আমরা যা খাই তার একটা অংশ ময়লা বা আবর্জনা হিসেবে ডাস্টবিনে জমা হয়। সারা বছর তো এই ময়লাগুলো পরিষ্কার করতে পারে না, কারণ তারা তো আমাদের মতো অলস না; কোষগুলো সারা বছর খুবই ব্যস্ত থাকে। ফলে সারা বছর অনেক ময়লা জমে যায়। যার থেকে অনেক ধরনের রোগ হতে পারে, এমনকি ক্যান্সার পর্যন্ত। আমরা যখন রোজা রাখি বা না খেয়ে থাকি, তখন কোষগুলো ডাস্টবিনের দিকে নজর দেয়; কারণ বাইরে থেকে কোনো খাবার তারা পায় না ফলে নিজের ময়লাগুলো নিজেরা খেয়ে পরিষ্কার করে। এই ঘটনাকেই বিজ্ঞানে অটোফেজি বলে।
এখন বলো রোজা রাখার গুরুত্ব কতটুকু? আমাদের শরীরের কোষগুলোকে সচল রাখতে হলেও আমাদের রোজা রাখা জরুরি। মজার ব্যাপার হলো এই জিনিসটি আবিষ্কারের কারণে জাপানি বিজ্ঞানী ওশেনরি ওসুমি ২০১৬ সালে নোবেল পুরস্কার পান। অথচ আজ থেকে ১৪শত বছর আগে আমাদের প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মদ (স) রোজা রাখার উপকারিতা সম্পর্কে বলে গেছেন। এবং আল্লাহ রাব্বুল আলামিন রোজাকে ফরজ করে দিয়েছেন। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন পবিত্র কুরআনে বর্ণনা করেছেন- “হে মুমিনগণ তোমাদের উপর রোজাকে ফরজ করা হয়েছে, যেমনটি ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্বের লোকেদের উপর, যাতে তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পারো।” তার মানে হলো রোজা শুধু আমাদের উপরই ফরজ হয়নি আমাদের পূর্বে যারা পৃথিবীতে এসেছিলেন তাদের উপরও রোজা রাখার বিধান ছিল।
প্রখ্যাত চিকিৎসক ইবনে সিনা তাঁর রোগীদের ৩ সপ্তাহের উপবাস থাকার পরামর্শ দিতেন। কারণ পাকস্থলীর বিশ্রামের জন্য। চিকিৎসাবিজ্ঞানী ড. ডিউই বলেছেন- রোগাক্রান্ত মানুষটির পাকস্থলী থেকে খাদ্যদ্রব্য সরিয়ে ফেলো, দেখবে রুগ্ন মানুষটি উপবাস থাকছে না, উপবাস থাকছে তার ভেতর বাসা বাঁধা দীর্ঘদিনের রোগটি। চিকিৎসা শাস্ত্রের জনক হিপ্পোক্রিটাস বলেছেন, অসুস্থ দেহে যতই খাবার দেবে, ততই রোগ বাড়বে। রোজা পেপটিক আলসার পর্যন্ত নিরাময় করে। কারণ রোজার কারণে পাকস্থলী খালি থাকে, ফলে আলসার দ্রুত ভালো হয়। রোজায় আলসার বাড়ে এ কথাটি সম্পূর্ণ ভুল ও মিথ্যা। রোজা হাইপারটেনশন কমাতে দারুণ সহায়তা করে।
অনেক সময় আমাদের অভিভাবকরা বাচ্চাদের রোজা রাখতে দেন না। পড়াশোনার ক্ষতি হবে ভেবে। কিন্তু বিজ্ঞান বলছে রোজা রাখলে পড়াশোনায় মনোযোগ বাড়ে, স্মৃতিশক্তি বাড়ে, একবার পড়লে দীর্ঘক্ষণ মনে থাকে। রোজা মস্তিষ্কের কার্যকারিতা বাড়ায়, আবেগ নিয়ন্ত্রণ করে মনকে কেন্দ্রীভূত করতে সহায়তা করে। তবে হঁ্যাঁ, অনেকের ক্লান্তি লাগতে পারে, পর্যাপ্ত বিশ্রাম এবং সুষম খাবার গ্রহণ করলে এই সমস্যা দূর করা যায়। রমজানে পড়াশুনার জন্য একটি সঠিক পরিকল্পনা ও কৌশল গ্রহণ করলে পড়াশুনার কোনো ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা নেই। রোজা রাখলে আমাদের পাকস্থলী কিছুটা বিশ্রাম পায়, সারা বছর ব্যস্ত থাকায় অনেক সময় হজমের সমস্যা তৈরি হয়। রোজা রাখলে হজম শক্তি বাড়ে, গ্যাস ও বদহজম কমে। রোজা আমাদের শরীরে জমে থাকা ক্ষতিকর টক্সিন ধীরে ধীরে বের করে দেয়, একে বলে ডিটক্সিফিকেশন। মস্কো বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. পিটার ভেনিয়ামিনভ ১৭৬৭ সালে একটি রিপোর্টে বলেন রোজার রাখার ফলে পাকস্থলী বিশ্রাম পায় ফলে পাকস্থলীর কর্মক্ষমতা বাড়ে। ড. পিজি স্পাসকি বলেন রোজা রাখলে অনেক জটিল রোগ ভালো হওয়ার সম্ভাবনা আছে কোনো প্রকার মেডিসিন ছাড়াই।

ইসলাম আমাদের শিক্ষা দেয় অতিভোজন নয়, অল্প ভোজন। আমাদের প্রিয় নবী (স) আমাদের পেটটাকে তিনভাগে ভাগ করে খেতে বলেছেন। এক ভাগে খাবার, এক ভাগে পানী ও এক ভাগ খালি রাখতে বলেছেন। অথচ রোজা আসলে আমাদের ইফতার ও সাহরিতে খাবারের পরিমাণ এতো বেড়ে যায় যে, অনেক সময় আমাদের অসুস্থ হয়ে পড়তে হয়, আর এটাকেই অনেকে কাজে লাগিয়ে রোজা সম্পর্কে মিথ্যা প্রপাগাণ্ডা ছড়াতে থাকে। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আমাদের এই মিথ্যা থেকে দূরে থাকার তাওফিক দান করুন।

বন্ধুরা, রমজান মাস যেহেতু আত্মশুদ্ধির মাস সেহেতু মাসটি যেন আমরা সুন্দরভাবে কাটাতে পারি, তাকওয়ার সাথে রমজানের সব রোজা পালন করতে পারি। তাই চলো, এখনই সুন্দর একটি রুটিন তৈরি করে ফেলি। পরিকল্পনা করে চলতে পারলে নিজেকে যেমন আত্মশুদ্ধি করতে পারবে তেমনি পড়াশুনাও ঠিক রাখতে পারবে।