রতনের মাঠে ফেরা

বাড়ির সামনে খোলা মাঠ। যেন সবুজ ঘাসের কার্পেট। মাঠের একপাশে গ্রামের স্কুল। অপরাহ্ণে রোদ একটু পড়ে আসলেই সোনাঝরা বিকেল। এ সময় গ্রামের ছেলে-মেয়েরা মাঠে এসে ভিড় জমায়। কেউ গোল্লাছুট কেউ ছি-বুড়ি কেউ দাড়িয়াবান্ধা কেউ বা ফুটবল নিয়ে খেলায় মেতে ওঠে।
এদের মধ্যে একটি বালক খুব দুরন্ত। নাম রতন। ফুটবল নিয়ে তার কসরতের শেষ নেই। সবার দৃষ্টি কাড়ে। গ্রামের বড়রা মাঠের ধারে গাছের ছায়ায় বসে ছেলে-মেয়েদের খেলাধুলা দুরন্তপনা উপভোগ করে।
রতন ক্লাস ফোর-এ পড়ে। লেখাপড়ায় বেশ ভালো। স্কুল ছুটি হলে রতন বাসায় এসে গোসল করে। দুপুরে খাওয়া-দাওয়া, হোমওয়ার্ক সেরে মাঠের দিকে উঁকি দেয়, বন্ধুরা এসেছে কি না!
আজ ক’দিন হলো রতনকে মাঠে দেখা যাচ্ছে না। একজন বয়স্ক ব্যক্তি এটা খেয়াল করেন। তিনি অন্য বাচ্চাদের জিজ্ঞেসা করেন, ‘এই যে, দাদু ভাইরা রতনকে দেখছি না কেনো? ওর কিছু হয়েছে?’
একজন সহপাঠী বলে, ‘না কিছু হয়নি। ও এখন সাইকেল পেয়েছে। সাইকেল চালানো শিখছে। মাঠে আসা বারণ। বাড়ির পাশের রাস্তায় প্রাকটিস করে।’
রতনের বড় ভাই কলেজে পড়ে। কলেজে যাতায়াতের জন্য বাবা একটা বাই-সাইকেল কিনে দিয়েছেন তাকে। ভাইয়া কলেজ থেকে ফিরলে বিকেলের পুরো সময় সাইকেলটা রতনের দখলে থাকে। সীটে বসে সাইকেলের প্যাডেল নাগালে পায় না রতন। তাই আর কী করা। ডান হাতের বগলের নিচে সীট রেখে বাম হাত দিয়ে হ্যান্ডেল ধরে সাইকেল চালায় রতন। দু’দিনের মধ্যেই এভাবে সাইকেল চালাতে শিখেছে ও।
সাইকেল চালানো রতনের কাছে এখন একটা অ্যাডভেঞ্চার। প্রতিদিন সাইকেল নিয়ে ছুটে চলে গ্রামের মেঠোপথে। মাঝে মধ্যে পড়ে গিয়ে ব্যথা পায়, কিন্তু তা কেউ জানতে পারে না। রতন জানে তাহলে সাইকেল পাবে না। বাবা বকা দিবেন। ভাইয়া সাইকেল আটকে রাখবে।
চৈত্র মাস গাছে গাছে কাঁচা আম শোভা পাচ্ছে। বাতাসে দুলছে। মনোহর সে দৃশ্য। রতন সাইকেল চালায় আর সেসব দেখে দেখে অজানায় হারিয়ে যায়। সেদিন স্কুল কলেজ বন্ধ ছিলো। ছুটির দিন। রতন সকালে পড়াশোনা শেষে সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে পড়ে। চিরচেনা গ্রামের সেই মেঠোপথে। কিছুদূর গিয়ে দেখে একদল দুষ্ট ছেলে আমগাছে ঢিল ছুঁড়ছে। রতন রাস্তার পাশে সাইকেল থামিয়ে সেসব দেখতে থাকে। কাঁচা আমের ঘ্রাণ ওর নাকে এসে লাগে। ও আরও উৎসুক হয়ে ওঠে। হঠাৎ সবুজ পাতার ফাঁকে এক প্রকাণ্ড মৌমাছির চাক ওর চোখে পড়ে। ও চিৎকার করে ওঠে- ‘সাবধান সাবধান! ঢিল ছুঁড়বে না। গাছে মৌমাছির চাক আছে। সর্বনাশ হয়ে যাবে।’

রতনের কথা শেষ না হতেই একটা ঢিল চাকে গিয়ে পড়ে। আর কোথায় যাবে। শত শত মৌমাছি ঝাঁপিয়ে পড়ে দুষ্ট ছেলেদের ওপর। সবাই দিগি¦দিক ছুটতে থাকে। রতনও দে ছুট। কিন্তু শেষ রক্ষা হয় না। রতনও আক্রান্ত হয়। সাইকেল রেখে ও মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। দূর থেকে লোকেরা পাশের ইটভাটার চুল্লির কাছে ছুটে যেতে বলে। রতন তাই করে। এবার আক্রমণ কিছুটা কমে। ভাটার শ্রমিকরা রতনের সাহায্যে এগিয়ে আসে। খড়কুটায় আগুন জ্বালিয়ে ধোঁয়া তৈরি করে মৌমাছি তাড়ায়। রতন আশঙ্কামুক্ত হয়। শ্রমিকদের একজন গিয়ে সাইকেলটা এনে দেয়। রতন এখনো বাড়ি ফিরতে ভয় পাচ্ছে। যদি আবার মৌমাছি পিছু নেয়।
খরবরটা বাড়িতে এসে পৌঁছে। বাবা-মা অস্থির হয়ে ওঠেন। মুহূর্তেই ভাই-বোন, পাড়া-প্রতিবেশি বেরিয়ে পড়ে রতনকে উদ্ধারের জন্য। ইটভাটায় এসে রতনকে পাওয়া গেল না। ভাটার লোকজন বললো, ও এখন আশঙ্কামুক্ত। কিছুক্ষণ আগেই বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে গেছে। কিন্তু রতনকে কোথাও পাওয়া গেল না।
রতন ঝুঁকি এড়াতে ভিন্ন পথ ধরে। যে পথে এসেছিল সে পথে না গিয়ে কিছুটা ঘুরে অন্য পথে বাড়ি ফেরার চেষ্টা করে। পথিমধ্যে রতন তার গৃহশিক্ষকের দেখা পায়।
: একি! তোমার এ অবস্থা কেনো?
: স্যার, মৌমাছি আক্রমণ করেছিল।
ও সব খুলে বলে। শিক্ষক দ্রুত ওকে নিজ বাড়িতে নিয়ে গেলেন। কুসুম-কুসুম গরম পানিতে লবণ মিশিয়ে আক্রান্ত ফোলা স্থানে সেঁক দিলেন। ক্ষতস্থানে মধু লাগিয়ে দিলেন। রতন এখন একটু আরাম বোধ করছে। স্যার বললেন, ‘এখন চলো তোমাকে বাড়িতে রেখে আসি।’
: ভয় করছে স্যার! আব্বু ভীষণ বকা দিবেন। ভাইয়া বারণ করেছিল সাইকেল নিয়ে বেরুতে।
: যা হবার তা হয়ে গেছে। বাড়ি চলো চিকিৎসা নিতে হবে না! আমি সবাইকে বুঝিয়ে বলবো।
রতন একটু আশ্বস্ত হলো এবং বাড়ির পথে পা বাড়ালো। ওদিকে বাড়ির লোকদের উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা বেড়েই চললো। ‘ছেলেটা কোথায় গেল। ভাটার লোকেরা বললো, আশঙ্কা মুক্ত তবে রতনটা কোথায় গেল। আসছে না কেনো!’
মা বাড়ির সামনে ছেলের জন্য পথপানে চেয়ে আছেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই স্যার রতনকে নিয়ে হাজির হলেন। মা রতনকে পরম মমতায় জড়িয়ে ধরলেন। রতনকে চেনা যাচ্ছে না। চোখ-মুখ সব ফুলে গেছে। সবাই ছুটে এলো। বকাঝকা করা তো দূরের কথা সবাই রতনকে আগলে রাখলো। ডাক্তার ডাকা হলো।
বাবা আজ রতনকে সকালের নরম রোদে বসিয়ে পরম স্নেহে ক্ষতস্থানে মলম লাগিয়ে দিচ্ছেন। রতন ফিরে এসেছে খেলার মাঠে। বন্ধুদের আনন্দ আর ধরে না। গ্রামের দাদা এগিয়ে এলেন। বললেন, ‘এখন কেমন আছো দাদা ভাই!’
রতন মাথা নাড়লো, ভালো।
: খুব ভয় পেয়েছিলে বুঝি!
: কিছুটা।
: ভয় পেলে চলবে না। সাইকেল চালানো সাঁতার কাটা, খেলাধুলা করা সবই স্বাস্থ্যের জন্য ভালো। দুর্ঘটনা তো ঘটতেই পারে। আমাদের সব সময় সতর্ক থাকতে হবে। বড়দের সম্মান ও ছোটদের স্নেহ করতে হবে। আর…
: আর! অসহায়ের পাশে দাঁড়াতে হবে।
: সাবাস! এই না হলে আমার দাদা ভাই!

প্রকাশকাল: আগস্ট ২০২৬