এক সময় আমাদের দেশ শাসন করতো ইংরেজরা। প্রায় দুশো বছর ধরে তারা এ দেশের মানুষের ওপর চালিয়েছিল কঠোর শাসন আর নির্মম অত্যাচার। তখন সাধারণ মানুষের কোনো কথা বলার অধিকার ছিল না। কেউ প্রতিবাদ করলেই পুলিশ এসে ধরে নিয়ে যেত। মানুষ তখন নিজের কথা বলতেও ভয় পেত। সামান্য প্রতিবাদ করলেই ফাঁসি, যাবজ্জীবন কারাদণ্ড কিংবা গুলির মুখে পড়তে হতো। সে ছিল বড়ই দুঃসহ এক সময়। তাই লোকেরা ইংরেজদের বিরুদ্ধে ফুঁসে উঠছিল। কলকাতার ফোর্ট উইলিয়াম হাইকোর্টের এক বিচারপতির নাম ছিল জন প্যাক্সটন নরম্যান। খুবই নিষ্ঠুর প্রকৃতির। শত শত বিপ্লবী, আলেম, ও প্রতিবাদকারীকে বিচারের নামে খুন ও কারাগারে বন্দি করা হতো। সামান্য অজুহাতে দিতো কঠিন সাজা। আবার অনেককে কালাপানির দ্বীপ আন্দামানে পাঠানো হতো নির্বাসনে। আত্মীয় পরিজনহীন সেই ভয়াবহ জঙ্গলে না খেতে পেয়ে তিলে তিলে শেষ হয়ে যেত কয়েদিরা। নিত্য-নতুন আইন তৈরি করতো সে মানুষকে কষ্ট দেয়ার জন্য। তার নাম শুনলেই মানুষের গা শিউরে উঠতো। লোকজন বলতো,
– ‘ওর আদালতে পড়লে আর রক্ষা নেই।’
– ‘বিচার নয়, ও যেন মৃত্যুর হুকুম লেখে!’
নরম্যান নিজেই একদিন সহকর্মী এক সাহেবকে বলেছিল, ‘এই বাঙালিদের ভয় দেখাতে না পারলে শাসন করা যাবে না। কড়া আইনই একমাত্র পথ।’
এসব অন্যায়ের বিরুদ্ধে বাড়ছিল ক্ষোভ। আর সেই আগুনে পুড়ছিল এক সাহসী তরুণ— আবদুল্লাহ। আবদুল্লাহ ছিলেন একজন দেশপ্রেমিক যুবক। তার বাড়ি পাঞ্জাবে। আরবি ফার্সি ভাষায় তার অগাধ পাণ্ডিত্য ছিলো বলে জানা যায়। মানুষের আহাজারি তাকে ভাবিয়ে তোলে। একদিন বাজারের মোড়ে দুজন মানুষের কথা কানে এলো-
– ‘শুনেছিস? কাল রাতে আবার দুজনকে ধরে নিয়ে গেছে,’ একজন চাপা স্বরে বললো।
– ‘কী অপরাধ?’ অন্যজন ভয়ে ভয়ে প্রশ্ন করলো।
– ‘কিছুই না। শুধু ইংরেজের বিরুদ্ধে কথা বলেছিল!’
এই কথা শুনে আবদুল্লাহর বুকের ভেতর কেঁপে উঠলো। সে দাঁতে দাঁত চেপে বললো, ‘আর কতদিন চলবে এ অন্যায়?’
দিনের পর দিন বৃটিশ সরকারের অন্যায় আর নির্যাতন দেখে তার বুকের ভেতরটা ক্রুদ্ধ বাঘের মতো গর্জে উঠলো। আবদুল্লাহ আর চুপ থাকতে পারলো না। মনে মনে প্রতিজ্ঞা করলো— এই জুলুম আর সহ্য করা হবে না। যে করেই হোক, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হবে।
কিন্তু সহজ ছিল না সেই পথ। সে নিজে এক সাধারণ নাগরিক ছাড়া কোনো ক্ষমতা নেই। ইংরেজ সরকার পুলিশকে দিয়েছিল সীমাহীন ক্ষমতা। সন্দেহ হলেই গ্রেপ্তার, ঘরবাড়ি দখল, এমনকি ফাঁসির আয়োজন— সবই চলতো নির্দ্বিধায়। তবু আবদুল্লাহ্ হিম্মত হারালো না। আল্লাহ্ তো বলেছেন অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই করার কথা। আবদুল্লাহ্ নাম লেখালো বিপ্লবীদের দলে। বিপ্লবীদের বাঁচতে হলে নিতে হতো ছদ্মবেশ। তাই আবদুল্লাহও বদলে ফেলে নিজের নাম, পরিচয় ও পোশাক।
বিদায়ের সময় তাঁর বৃদ্ধা মা কাঁদতে কাঁদতে বলেছিলেন, ‘বাবা, তুই আমার একমাত্র অবলম্বন।’
আবদুল্লাহ মায়ের হাত ধরে কাতর কণ্ঠে বললো, ‘মা, আজ পুরো জাতি অসহায়। আমরা যদি জালিমের বিরুদ্ধে না দাঁড়াই, তবে আল্লাহ আমাদের ক্ষমা করবেন না।’
মা চমকে উঠে বললেন, ‘কী বলছিস বাবা? বাইরে গেলে তোরা সবাই ধরা পড়ে যাবি!’
‘মা’ আবদুল্লাহ শান্ত কিন্তু দৃঢ় কণ্ঠে বললো, ‘আজ যদি আমরা চুপ থাকি, কাল আমাদের সন্তানরাও দাস হয়ে জন্মাবে।’
মা আঁচলে চোখ মোছেন। আবদুল্লাহ মায়ের পায়ে মাথা রেখে বললো, ‘মা, আল্লাহ যদি চান, আমি ফিরবো। আর না ফিরলেও জানবে— আমি অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলাম। তবে শেষ বিচারের দিনে নিশ্চয়ই আবার দেখা হবে।’
পরদিন ভোরে সে ঘর ছাড়লো। পেছন থেকে বাবার কণ্ঠ ভেসে এলো, ‘সাবধানে থেকো বাবা। আল্লাহ তোমার সহায় হোন।’
প্রিয় পরিবার ছেড়ে যেতে চোখের পানিতে ভেসে যায় বুক। বাবা, বৃদ্ধা মা, স্ত্রী, সন্তান সবার থেকে বড় হয়ে ওঠে দেশ, দেশের মানুষ। আল্লাহর ওপর ভরসা করে ঝাঁপিয়ে পড়ে কাজে। পরিবার থেকে বিদায় নিয়ে প্রথমে মুলতান, তারপর দিল্লী হয়ে শাহরানপুর চলে যান আবদুল্লাহ্। এরপর স্বাধীনতা সংগ্রামের জনক শাহ্ সৈয়দ আহমদের জন্মস্থান বেরেলীতে যান। তখন মুজাহিদদের শ্রেষ্ঠ কেন্দ্র ছিল পাটনা। তাই পাটনায় চলে আসেন এবং বিপ্লবীদের সঙ্গে যোগ দেন। চারদিকে তখন পুলিশ আর গুপ্তচরের ভয়— যে কোনো মুহূর্তে ধরা পড়লেই সোজা আন্দামান!
বৃটিশ বিরোধী কার্যকলাপের অভিযোগে হাশিমদাদ খাঁ, হাজী দীন মোহাম্মদ, আমির খাঁ, পীর মোহাম্মদ, মোবারক আলী ও আবদুল্লাহ্সহ ধরা পড়ে যান। বহুদিন জেলে থাকার পর ছাড়া পান। এরপর আবদুল্লাহ পাটনা থেকে কলকাতা চলে আসেন। কলকাতায় তেমন কেউ পরিচিত ছিল না। কলুটোলার একটি মসজিদে এসে ওঠেন। নরম্যানের কীর্তিকলাপ এখন শহরে বসেই শোনা যায়। এ অবিচারের প্রতিকার নিজ হাতেই করার সংকল্প করলেন। সেখানে বসে নামাজ ও কুরআন পাঠেই বেশি সময় চলে যেতো। উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে হাইকোর্টে দোভাষীর চাকুরির চেষ্টা করেন। কিন্তু ইংরেজি জানা না থাকায় ব্যর্থ হন।
১৮৭১ সালের ২০শে সেপ্টেম্বর। সকাল বেলার সূর্য-রশ্মি আজ যেন বেশি আলোকিত। বাংলার দিগন্ত জুড়ে ভোরের শিশির অশ্রু হয়ে ঝরছে। বাংলার ফোর্ট উইলিয়াম হাই কোর্টের প্রধান বিচারপতি জন প্যাক্সটন নরম্যান ব্রেকফাস্ট সেরে আদালতে যাওয়ার জন্য তৈরি হচ্ছেন। রাসেল স্ট্রিটের বিশাল বাড়ির দোর গোড়ায় জুড়ি-গাড়ি হাজির। বাঙালি কয়েদিদের শায়েস্তা করতে বেশ কিছু কঠিন আইনের দরকার। গতকাল রাত জেগে সেটাই শেষ করেছেন। তাই ঘুম ভাঙতে একটু দেরি হলো। মি. নরম্যান বেশ খুশিমনে আদালতের কাজে চললেন। তখন সকাল এগারোটা। টাউনহলের সামনে এসে থামলো চীফ জাস্টিসের গাড়ি। আর্দালি কাগজপত্র গুছিয়ে নিচ্ছিলো। তার অপেক্ষা না করেই তিনি নেমে পড়লেন। গম্ভীর মুখে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে লাগলেন। ঘোড়ার সহিসকে একটা কথা বলা দরকার ভেবে মুখ ফিরিয়ে পেছনে তাকালো।
ঠিক সেই মুহূর্তে দরজার ওপাশে লুকিয়ে থাকা কেউ যেন ছুটে বের হলো! কিছু বোঝার আগেই লোকটি বজ্রপাতের মতো ঝাঁপিয়ে পড়লো নরম্যানের ওপর। কাঁধের কিছুটা নিচে পর পর দুইবার ছুরির আঘাত করলো! নরম্যান বুকে হাত চেপে উর্ধ্বশ্বাসে সিঁড়ির নিচের দিকে দৌড়াতে শুরু করলো।
নরম্যানকে দৌড়াতে দেখে আক্রমণকারী ভাবলো আঘাতে বোধহয় কাজ হয়নি, তাই সেও পেছনে দৌড়াতে লাগলো। লোকজন চিৎকার শুরু করলো। নরম্যান সামনে একটা ইট পেয়ে আক্রমণকারীর মাথার দিকে ছুঁড়ে মারে। ইট গিয়ে পড়ল যুবকের মুখে। রক্তাক্ত অবস্থায় সে মাটিতে লুটিয়ে পড়লো। মুহূর্তেই পুলিশ আর জনতা তাকে ঘিরে ধরলো। মারধর করে থানায় নিয়ে যাওয়া হলো। আঘাতকারী আর কেউ নয়- বিপ্লবী আবদুল্লাহ্! জনতা একজন আরেকজনকে বলাবলি করছিল ‘এ তো বিপ্লবী! এমন সাহস আগে দেখিনি!’
থানায় মারধরের মাঝেও আবদুল্লাহ শান্ত গলায় বললো, ‘তোমরা শরীর মারছো, মন নয়।’
এক পুলিশ রেগে গিয়ে বললো, ‘চুপ কর!’
– ‘ইতিহাস কখনো চুপ থাকে না,’ আবদুল্লাহ জবাব দিলো।
নরম্যানের জন্য আসে পালকি। তার আঘাত গুরুতর হলেও প্রথমে বোঝা যায়নি। পালকিতে করে হাসপাতালে নেওয়া হয়। নামকরা ইংরেজ ডাক্তাররা চেষ্টা করলেও শেষ রক্ষা হয়নি। তার আয়ু শেষ হয়ে গিয়েছিল। চীফ জাস্টিসের মৃত্যুতে সারা কলকাতা জুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়লো। আবদুল্লাহ্ একাই অসীম সাহসে কাঁপিয়ে দিয়েছিল সাম্রাজ্যবাদীদের ভিত!
সেদিন ইংরেজরা ভয়ে ঘর থেকে বেরোতেই সাহস পেল না। পুলিশ প্রচুর জেরা করেও আবদুল্লাহর কাছ থেকে কোনো কথা বের করতে পারেনি। বরাবরই তিনি ছিলেন নিশ্চুপ। পালাবার এতটুকু চেষ্টাও করেননি। যেন তাঁর কাজ শেষ হয়েছে, এখন আর কোনো কিছুর পরোয়া নেই। সে সময়ের বাংলার গভর্নর স্যার জর্জ ক্যাম্বেল আব্দুল্লাহ্ সম্পর্কে শ্রদ্ধা ভরে বলেছিলেন ‘মি. নরম্যানকে হত্যা করার পর আততায়ী পলায়নের কোনো চেষ্টাই করেন নাই। ফাঁসিমঞ্চে তাঁকে প্রাণ দিতে হয়েছে সত্য কিন্তু এর কারণ তিনি প্রকাশ করেননি। নিজের অবস্থার প্রতি তাঁর আদৌ কোনো লক্ষ্য ছিল না, অন্যের প্রশংসারও তিনি প্রত্যাশী ছিলেন না।’
এই অসীম সাহসিকতা ও দেশপ্রেমের বিনিময়ে পুরস্কার জুটেছিল ফাঁসি। কিন্তু সেখানেও কেউ তাকে হারাতে পারেনি। ফুলের মালার মতোই গলায় পরেছিলেন ফাঁসির রজ্জু। ছিল দেশের জন্য প্রাণ দেয়ার গৌরবময় হাসি। গেয়েছেন জীবনের জয়গান। পয়তাল্লিশ বছরের এই দেশপ্রেমিকের জন্য সেদিন উপস্থিত সবার চোখে নেমেছিল অশ্রুর বন্যা।
আবদুল্লাহ ধরা পড়েছিলেন। কিন্তু তিনি প্রমাণ করেছিলেন- অত্যাচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর জন্য চাই সাহস ও বীরত্ব। তাঁর সেই উদ্দেশ্য বৃথা যায়নি। পরবর্তীতে স্বাধীন পাকিস্তান ও স্বাধীন বাংলাদেশ তার প্রমাণ।
বিপ্লবীর রক্ত কখনো বৃথা যায় না। সে রক্ত রক্তিম সূর্যের মতো আঁধার পাড়ি দিয়ে আলোর দিকে যাত্রা করে।
প্রকাশকাল: আগস্ট ২০২৬



