দুপুরের চোখ ঝলসানো রোদে ক্লান্ত হয়ে রাস্তার ধারে থাকা একটি বটগাছের ছায়াতলে বিশ্রামের জন্য বসে পড়ে আবির। বসে বসে দূর আকাশে শরতের স্বচ্ছ নীল আকাশের ভাঁজে ভাঁজে মেঘবিলাস উপভোগ করে সে। কোনো মেঘ ছোট আবার কোনোটা বড়। কোনোটা দেখতে হাতির মতো, কোনোটা ঘোড়া, কোনোটা আবার বিশাল দৈত্যের মতো, আবার কোনোটা দেখতে পাহাড়ের মতো। আহা! কী সেই অপরূপ দৃশ্য। সে মনে মনে চিন্তা করে ‘ইশ্! যদি একবার যেতে পারতাম ঐ মেঘের দেশে।’ এসব ভাবতে ভাবতে ক্লান্ত শরীর নিয়ে ঘুমিয়ে পড়ে সে।
ঘুমের মধ্যে সে স্বপ্ন দেখে। লাল-নীল স্বপ্ন। যা সে সত্যিই সত্যিই চেয়েছে তা। স্বপ্নের দেশ থেকে পরীরা এসে আবিরকে তাদের সাথে স্বপ্নের দেশে নিয়ে যায়। নিয়ে যায় তাদের স্বপ্নের পঙ্খিরাজ ঘোড়ায় করে। সে কী রাজকীয় আয়োজন! মনে হয় যেন সে হচ্ছে স্বপ্নের দেশের রাজা। পরীরা তাকে নামিয়ে দেয় চোখ ধাঁধাঁনো এক রাস্তায়। মনে হয় যেনো সাদা গালিচা বিছানো আছে রাস্তায়। সে হেঁটে চলেছে অপরূপ সুন্দর রাস্তা দিয়ে, যার দু’ধারে সাদা সাদা কাশফুল ফুটে আছে। শীতল ঝিরিঝিরি বাতাস কাশফুলের গায়ে দোলা দিয়ে যায় ক্ষণে ক্ষণে, আর সেই সাথে আবিরের মনকেও প্রফুল্ল করে দিয়ে যাচ্ছে। মেঘের দেশের নীলাকাশ পানে উড়ে চলেছে বকেরা সারি বেঁধে। এসব দৃশ্য দেখে তার মন খুশিতে নেচে উঠে। সে আপনমনে সামনে এগুতে থাকে। যেতে যেতে সে দেখে তাঁর সমবয়সী কিছু ছেলে একটি বাগানে খেলা করছে। আবিরকে দেখে তারা হাত নেড়ে তাকে কাছে ডাকে। আবির গুটিগুটি পায়ে তাদের কাছে যায়। আবিরকে তারা স¦াগত জানায় মেঘের রাজ্যে। তারা আবিরকে তাদের সাথে খেলায় যোগ দিতে বলে। আবিরও খুশি মনে তাদের সাথে খেলায় যোগ দেয়। তাদের মাঝে একজন মেঘ দিয়ে একটি ছাতা তৈরি করে, অন্যজন ঘুড়ি, আরেকজন আস্ত একটি উড়োজাহাজ, আবার কেউবা মেঘের নৌকা তৈরি করে দেখায়।
এবার আবিরের পালা। সবাই তাকে বলে, এবার তুমি আমাদের কিছু তৈরি করে দেখাও। সবার কথায় সে খুব চিন্তিত হয়ে পড়ে। সে আসলে বুঝতে পারছে না যে সে কী তৈরি করবে! অবশেষে সে তৈরি করে ফেলে একটি বাড়ি। একটি কুঁড়েঘর। সবাই বিষ্ময়ে কুঁড়েঘরটির দিকে তাকিয়ে আছে। বাহির থেকে দেখতে যেন একদম রাজপ্রাসাদের মতো লাগছে। আবির ঘরের ভেতরে প্রবেশ করলো; সেই সাথে তার নতুন বন্ধুরাও। ঘরে প্রবেশ করতেই সকলের চোখ ছানাবড়া। ভেতরটা এতো চমৎকার দেখতে! নিজের চোখে না দেখলে কেউ বিশ্বাসই করবে না। ধবধবে সাদা তুলতুলে নরম একটি বিছানা, পাশেই একটি পড়ার টেবিল। টেবিলে কত রকম জানা-অজানা বই। আবির বলে, এটা আমার সেই স্বপ্নের বাড়ি যেখানে মা-বাবা সহ আমি থাকতে চাই। আমাদের ছোট্ট একটি পরিবার।
তারা ঘর থেকে বের হয়। আবিরের নতুন বন্ধুরা তাকে সাথে নিয়ে অন্য এক জায়গায় যায়। সেখানে গিয়ে তো আবিরের চোখ কপালে উঠে যায় প্রায়। কি অপরূপ দেখতে! আসলে এটি মেঘ দিয়ে তৈরি করা একটি ঝরনা। মেঘেরা চুঁইয়ে চুঁইয়ে যেন পড়ছে। তারা মেঘের ঝরনায় নেমে পড়ে। তারা জানে এ ঝরনার পানি দিয়ে গোসল করা যায় না, কিন্তু উপভোগ করা যায় বেশ। অনেকক্ষণ তারা সেখানে খেলা করে। একটু পর মেঘের ভাঁজ কেটে সূর্য্যি মামা উঁকি দেয়। আবিরের চোখে এসে লাগে সূর্যের তাপ। চোখ বন্ধ করে থাকে তবুুুও যেন সে তাপ সহ্য করতে পারে না। মাথা ঘুরিয়ে ধীরে ধীরে চোখ খুলে। চোখ খুলতেই তার ভ্রু কুঁচকে যায়। আরে! একি আমি এখানে কীভাবে? আমি তো মেঘের দেশে ছিলাম! খানিকটা সময় নীরব হয়ে বসে থাকে। অবশেষে তার হুঁশ ফিরে। সে ভেবেছিলো যে এতক্ষণ সে যা যা দেখেছে তা সত্যি সত্যি হয়েছিলো। অবশেষে সে বুঝলো, আসলে সে এতোক্ষণ স্বপ্ন দেখছিলো। আর সূর্যের দিকে তাকিয়ে বুঝলো ওটা আসলে মেঘের ভাঁজ কেটে নয়, বরং গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে সূর্যিমামা উঁকি দিচ্ছিলো।
সে আবারও আনমনা হয়ে যায়। ভাবনার সাগরে হারিয়ে যায়। সেই ছোট্ট কুঁড়েঘর আর তার মা-বাবাকে নিয়ে ভাবতে থাকে। অতঃপর একটা দীর্ঘশ্বাস। সে মনে মনে বলে, আমার মতো এতিম ছেলের জন্য এ স্বপ্ন মানায় না। আমার মা-বাবা সেই কবেই হারিয়ে গেছে। চলে গেছে পৃথিবী ছেড়ে বহুদূরে। ইশ্ যদি সত্যি সত্যি এমনটা হতো!
এসব ভাবতে ভাবতে আবিরের গাল বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ে। গাছের সাথে ঠেস দিয়ে বসে একদৃষ্টে সামনে তাকিয়ে থাকে কিছুক্ষণ। এবার উঠে দাঁড়িয়ে আকাশ পানে চেয়ে অজানা কোনো এক গন্তব্যের উদ্দেশ্যে হাঁটতে শুরু করে সে। মা-বাবার মৃত্যুর পর আবিরও সেই মেঘেদের মতো হয়ে গেছে, যাদের কোনো গন্তব্য নেই। বাতাস যেদিকে মেঘকে নিয়ে যায় মেঘ ঠিক সেদিকেই যায়। আবিরও বুঝি সেই বাতাসের মতো ভেসে চলেছে। কখনো তার জীবন কুভ্র মেঘের মতো হেসে উঠে আবার কখনো ঘন কালো মেঘের মতো তার জীবনে অন্ধকার নেমে আসে।
এরকম অসংখ্য মেঘ আর অসংখ্য আবির ভেসে বেড়াচ্ছে বাতাসে।
প্রকাশকাল: অক্টোবর ২০২৪


