ঋতু বৈচিত্র্যে, প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরা আমাদের দেশ বাংলাদেশ। বারো মাসে ছয় ঋতু। পৌষ ও মাঘ মাস এই দুই মাসে চলে আমাদের পঞ্চম ঋতু শীত। উত্তরের হিম হাওয়ায় ঘন সাদা কুয়াশার চাদর মুড়ি দিয়ে আসে এই শীত।
হেমন্তের শেষে আমরা শীতের আমেজ পেতে শুরু করি। শীত এলে সাড়া পড়ে যায় গ্রাম গঞ্জে শহরে নগরে। শীতের কোনো কোনো রাত ছেয়ে যায় সাদা গভীর কুয়াশায়। টুপ টুপ শব্দে গাছের পাতায়, টিনের চালে, সবুজ ঘাসে পড়তে থাকে রাতের শিশির। সকালের সোনালি রোদে ঘাসের উপর জমে থাকা শিশির বিন্দু মুক্তার মতো জ্বলজ্বল করে। তার অপরূপ মোহনীয় রূপে সৃষ্টি হয় এক ভালোলাগার বিশেষ মুহূর্ত। আমাদের হৃদয়কে করে পুলোকিত।
কুয়াশা মোড়ানো শিশির জড়ানো শীতে ফুলে ফুলে ভরে যায় আমাদের চর্তুদিক। বনফুলের সাথে সাথে ফুলবাগান অপরূপ সব রংবাহারি ফুলে হেসে ওঠে। বিভিন্ন রংয়ের ফুল। কোনোটা লাল, কোনোটা সোনালি, কোনোটা বেগুনি, কোনোটা সাদা, আবার কোনোটা বা হলুদ প্রভৃতি। যেমন ডালিয়া, গোলাপ, গাঁদা, দোপাটি, চন্দ্রমল্লিকা, রঙ্গন, পপি, সূর্যমুখী, বেলী, রজনীগন্ধা, নয়নতারা, টগর, কসমস প্রভৃতি।
অন্যান্য ঋতুর তুলনায় শীতে আমাদের বাংলাদেশে দেশি-বিদেশি মিলে বেশি ফুল ফোটে। এসব ফুলের সমারোহে ও সৌরভে অপরূপ মোহনীয়তায় ভরিয়ে রাখে শীতের প্রকৃতি। যেমন চোখ জুড়ানো মোহনীয় রূপ তেমনই এক একটি ফুলের এক এক রকম সুরভি। আবার কিছু ফুল আছে যাদের কোনো গন্ধ নেই। আছে শুধু মোহনীয় অপরূপ সৌন্দর্য। এইসব ফোটা ফুলের মধু সংগ্রহে ছুটে আসে মৌমাছি প্রজাপতি ও অন্যান্য কীটপতঙ্গ। হলুদ সর্ষে ফুলে মাঠ কি মাঠ ছেয়ে যায়। শীতে পাওয়া যায় সর্ষে ফুলের মধু। মৌয়ালরা সর্ষে ক্ষেতের পাশে মধু সংগ্রহের জন্য রানি মৌমাছি দিয়ে বাক্সের ভিতরে মৌচাক তৈরি করে দেয় যাতে মৌমাছিরা সহজে ফুলের মধু সংগ্রহ করে চাকে বসতে পারে।
শীতে আমাদের দেশে বিল, ঝিল, হাওড়, বাওড়, নদীনালা, জলাশয়, লেকে হাজার হাজার বিদেশি পাখি উড়ে আসে। এই সময় আমাদের দেশীয় প্রজাতির পাখি শালিক, ময়না, টিয়ে, ফিঙে, দোয়েল, মাছরাঙা, ঘুঘু, চন্দনা প্রভৃতি পাখিদের সাথে ওদেরও দেখতে পাওয়া যায়। ওরা আসে পৃথিবীর উত্তর গোলার্ধে যখন তাপমাত্রা একদম কমে যায় তখনই। সেই সময় ওখানকার নদীনালা, হ্রদ, জলাশয়ে পানি জমে বরফ হয়ে যায়। তাপমাত্রা হিমাংকের নিচে নেমে আসে। সাইবেরিয়া, হিমালয়সহ সমগ্র ইউরোপে যখন শীতের প্রকোপে মানুষ পশুপাখি গাছপালা লতাপাতা জমাট বেঁধে বরফের স্তুপে পরিণত হয়, তখনই বেঁচে থাকার তাগিদে হাজার হাজার কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে ওরা চলে আসে আমাদের দেশে। শীতের সময় আসে বলে এদের আমরা বলি শীতের পাখি বা অতিথি পাখি। এসব পাখিরা খুবই নিরীহ বা ভদ্র। বিভিন্ন জাতের এই পাখিদের রঙ ও আকার হয় বিভিন্ন প্রকারের। যে সব পাখি আমাদের দেশে আসে তার মধ্যে হাঁসজাতীয় পাখির সংখ্যাই বেশি। যেমন বুনো হাঁস, কালো হাঁস, বালি হাঁস, ভুটি হাঁস প্রভৃতি। এছাড়াও আসে হালকা ওয়ারলার, লেনজি, সিরিয়া, গাংচিল, জলপিপি, চখাচখি, পানকৌড়ি, মরাল, মদনটাক, আবাবিল, পান মোরগ, চক্রবাক, মানিকজোড়, গোল্ডেন গ্লোভার, স্লাইলার, পিংটেইল প্রভৃতি।
শরতের শুরুতেই এরা আমাদের দেশে আসতে শুরু করে। এখানকার আবহাওয়ায় নিজেদের খাপ খাইয়ে শীত শেষ না হওয়া পর্যন্ত অবস্থান করে। এরা যেমন দল বেঁধে আসে তেমনই দল বেঁধে আবার চলে যায়। আমাদের এখানে যতদিন অবস্থান করে ততদিন মনের আনন্দে কাটিয়ে দেয়। ভোর হওয়ার সাথে সাথে সূর্যোদয়ের আগেই এরা জলকেলিতে মেতে ওঠে। ডানা ঝাপটিয়ে ডুব সাঁতার কাটে। ডাকাডাকি কিচিরমিচিরে পরিবেশ মুখরিত করে তোলে।
শীতের পাখিরা আমাদের অতিথি। বিশ্ব প্রকৃতির সম্পদ। এদের আগমনে প্রকৃতির পরিবেশ হয়ে ওঠে সুন্দর নির্মল। ওরা আমাদের এখানে অবস্থানকালে আমাদের দেশীয় প্রজাতি পাখিদের সাথে সংমিশ্রণে বংশ বিস্তার করে। এরা আমাদের পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে। এইসব বিরল প্রজাতি অতিথি পাখিদের আগমনে দেশীয় প্রজাতি পাখিদের মধ্যে একটা উৎসবমুখর পরিবেশের সৃষ্টি হয়। ওরা খাল বিল হাওড় বাওড় জলাশয় পুকুরে নদীর চরে ঝাঁকে ঝাঁকে উড়ে এসে বসে। নীল আকাশে আবার সারি বেঁধে উড়ে বেড়ায়। এমন অপরূপ দৃশ্য সবার মন হরণ করে নেয়। অতিথি এই সব পাখি কেবল জলাশয়ে বসে তা নয়। এরা গাছগাছালি বনবনানীর শাখায় বাসা বেঁধে ছানাও ফুটায়।
পাখি ধরা ও মারা একটি অমানবিক কাজ। শুধু তাই নয় দণ্ডনীয় অপরাধও। অথচ প্রতিবছর একদল লোভাতুর চোরাশিকারী গুলি করে কিংবা ফাঁদ পেতে ওদের শিকার করে। গোপনে চড়াদামে ওরা পাখিদের মাংস লোভাতুর খদ্দেরের কাছে বিক্রি করে।
শীত শেষে অতিথি পাখিরা আবার নির্ভয়ে মনের আনন্দে ফিরে যায় ওদের আপন দেশে। ওদের প্রতি থাকবে আমাদের মানবিক সহনশীলতা। আমাদের অমানবিকতায় কোনো অতিথি পাখি আমাদের দেশে এসে যাতে আর প্রাণ না হারাতে পারে সেদিকে সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে। ওদেরও বেঁচে থাকার অধিকার আছে। ওরাও সৃষ্টিকর্তার মহান সৃষ্টি প্রাণী।
প্রকাশকাল: ডিসেম্বর ২০২৪



