পয়েন্ট নিমো: পৃথিবীর নির্জন ও সুদূরতম স্থান

পয়েন্ট নিমো। নিমো, নামটি শুনলেই অনেকের মনে ভেসে উঠতে পারে ২০০৩ সালে ওয়াল্ট ডিজনির বিশ্বখ্যাত এনিমেশন কার্টুন ছবি ফাইন্ডিং নিমোর সেই মারলিন নামের ক্লাউনফিশটির ছবি, যে তার ছেলে নিমোর সন্ধানে পৃথিবীর সমস্ত সাগর মহাসাগর তন্ন তন্ন করে ফেলে।
শুধু ফাইন্ডিং নিমো নয়, যারা অ্যাডভেঞ্চার কাহিনির পাঠক তাদের মনে পড়তে পারে বিশ্ববিখ্যাত কল্পবিজ্ঞান কাহিনির লেখক জুল ভার্নের “টুয়েন্টি থাউজেন্ড লিগ্স আন্ডার দ্য সি” (১৮৭০) উপন্যাসের নায়ক ক্যাপ্টেন নিমোর অভিযাত্রার গল্পও।
আমরা যে পয়েন্ট নিমোর কথা বলছি, সেটি একটি জায়গার নাম। এই নামটি কিন্তু রাখা হয়েছে জুল ভার্নের নায়ক ক্যাপ্টেন নিমোর নাম অনুসারেই। পৃথিবীর কোনো বিজ্ঞানীই যখন ডুবোযান বা সাবমেরিনের কথা কল্পনাও করতে পারেননি সেই সময় ১৮৭০ সালে জুল ভার্ন তার উপন্যাসে সাবমেরিনে করে ক্যাপ্টেন নিমোকে অভিযানে পাঠিয়েছেন গভীর সাগরের নিচে। সুতরাং ১৯৯২ সালে ক্রোয়েশিয়ার জরিপ প্রকৌশলী হ্রবোজে লুকাতেলা যখন কমপিউটারে ভূ-তাত্ত্বিক সফটওয়্যার ব্যবহার করে পয়েন্ট নিমো আবিষ্কার করেন তখন প্রথমেই তার মনে আসে জুল ভার্নের ক্যাপ্টেন নিমোর কথা। তিনি এই জায়গার নাম রাখেন পয়েন্ট নিমো। এ নামকরণ যথার্থ বলে সারা বিশ্ব সেটি মেনে নিয়েছে।

আমরা আজ পয়েন্ট নিমো সম্পর্কে কিছু মজার তথ্য জানবো।
পয়েন্ট নিমো হচ্ছে দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরের এমন একটি স্থান যেটি পৃথিবীর যে কোনো ভূ-খণ্ড থেকে সবচেয়ে দূরবর্তী। আর এটিই হলো পৃথিবীর নির্জনতম স্থান। কেউ যদি মনে করেন, তিনি মানুষের সমাজ থেকে সরে যাবেন, চলে যাবেন পৃথিবীর এমন কোনো জায়গায় যেখানে কোনো মানুষ নেই, সভ্যতার কোনও ছোঁয়া নেই এবং কোনো মানুষ তাকে খুঁজে পাবে না, তাহলে তিনি পয়েন্ট নিমোতে চলে যেতে পারেন। কারণ এটিই হচ্ছে পৃথিবীপৃষ্ঠের সবচেয়ে দূরবর্তী বিন্দু।
পয়েন্ট নিমো কতদূরে? উত্তর হলো, এর অবস্থান এমন এক জায়গায় যেখান থেকে সবচেয়ে কাছের ভূমির দূরত্ব ২,৬৮৮ কিলোমিটার। সেটি হলো উত্তর দিকে পিটকেয়ার্ন দ্বীপপুঞ্জের একটি দ্বীপ ডুসি (Ducie)। সে দ্বীপেও কোনো মানুষ নেই। এর চেয়ে আরেকটু দূরে উত্তর-পূবে আছে চিলির দ্বীপপুঞ্জের মোতু নুই (Motu Nui) দ্বীপ। আর দক্ষিণে রয়েছে অ্যান্টার্কটিকা মহাদেশের অত্যন্ত ক্ষুদ্র একটি দ্বীপ মেহের (Maher Island)। সেটির দূরত্ব আরও বেশি।
এর মানে হলো, কাউকে যদি পয়েন্ট নিমোতে নিয়ে জাহাজ থেকে নামিয়ে দেয়া হয় তাহলে তাকে বেঁচে ফিরতে হলে কমপক্ষে ২,৬৮৮ কিলোমিটার সাঁতরাতে হবে। এজন্যে পয়েন্ট নিমোকে বলা হয়, পৃথিবীর অগম্যতম বা প্রবেশঅযোগ্য স্থান বা ইনঅ্যাক্সেসিবল (Inaccecible) সামুদ্রিক মেরু।
আশেপাশে প্রায় ৩০০০ কিলোমিটারের মধ্যে কোনো মানুষের চিহ্ন না থাকলেও জেনে অবাক হবে যে, লোকটির খুব কাছে, মাত্র ৪১৫ কিলোমিটারের মধ্যেই কিন্তু মানুষের বসবাস আছে। সেটি অবশ্য পৃথিবীপৃষ্ঠে নয়। মহাশূন্যে। হ্যাঁ, ঠিকই পড়েছো। মহাকাশে যে আন্তর্জাতিক মহাকাশ গবেষণা স্টেশন আছে, সেটি রয়েছে পয়েন্ট নিমো থেকে ৪১৫ কিলোমিটার উপরের আকাশে। সেখানে নভোচারীরা আছেন। কিন্তু পয়েন্ট নিমোতে যাকে নামিয়ে দেয়া হয়েছে, সেই লোকটি এ তথ্য জানলেও কোনো লাভ নেই। তার পক্ষে উড়ে মহাকাশ স্টেশনে যাওয়া সম্ভব না।
পয়েন্ট নিমোর আয়তন সুবিশাল। প্রায় এক লাখ বর্গকিলোমিটার। এখানে শুধু মানুষ নেই তা নয়, আসলে কোনো প্রাণেরই অস্তিত্ব নেই। পানিতে অক্সিজেন এতই সামান্য যে সেখানে জলজ কোনো প্রাণী বা উদ্ভিদ বাঁচতে পারে না।
পয়েন্ট নিমো; এক গোরস্তান:
পয়েন্ট নিমো একেবারে অকাজে পড়ে আছে এমনও না। মানব সভ্যতার জন্য বেশ ভালোই কাজে দিচ্ছে সুদূরতম এই বিশাল নির্জন জলভাগ। সেটি হলো, মহাকাশের আবর্জনার গোরস্তান এটি।
বিশ্বের অনেক দেশ নানা প্রয়োজনে মহাকাশে কৃত্রিম উপগ্রহ পাঠায়। কমপক্ষে আট হাজার কৃত্রিম উপগ্রহ এই মুহূর্তে কক্ষপথে আছে। আর আছে উন্নত দেশগুলোর কয়েকটি মহাকাশ স্টেশন। এসব উপগ্রহ ও মহাকাশ স্টেশনের নির্দিষ্ট মেয়াদ আছে। এরপর সেগুলি অচল হয়ে পড়ে বা পরিত্যক্ত হয়। তখন এরা অন্য উপগ্রহগুলোর জন্য বিপজ্জনক হতে পারে। তাই এগুলিকে কক্ষপথ থেকে সরিয়ে দিতে হয় অথবা পৃথিবীতে ফিরিয়ে এনে ধ্বংস করা হয়। ছোট ছোট উপগ্রহগুলো পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশের সাথে সাথে আগুন ধরে ধ্বংস হয়ে যায়। কিন্তু বড়ো উপগ্রহ এবং মহাকাশ স্টেশন এভাবে ধ্বংস করা যায় না। এগুলিকে পয়েন্ট নিমোতে নামিয়ে দেয়া হয় এবং প্রাণহীন এই বিরান সমুদ্রের গভীরে সেগুলির সলিল সমাধি ঘটে।
এ পর্যন্ত এখানে অন্তত ৩০০ উপগ্রহ ও মহাকাশ স্টেশনের সমাধি হয়েছে। তবে এই পয়েন্টে ফেলার জন্য উপগ্রহ ও স্টেশনগুলোতে কিন্তু আগে থেকেই প্রোগ্রাম করে দেয়া থাকে। এজন্যে মেয়াদ শেষে এগুলি নিজে থেকেই তাদের গোরস্তানে এসে প্রায় আড়াই মাইল গভীর পানির নিচে চিরনিদ্রায় চলে যায়। এখন যে আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন আছে সেটিও ২০৩১ সালে মেয়াদ শেষে এখানেই সমাহিত হবে। সেভাবেই প্রোগ্রাম করা আছে।

প্রকাশকাল: সেপ্টেম্বর ২০২৪