“আজ যে শিশু পৃথিবীর আলোয় এসেছে
আমরা তার তরে একটি সাজানো বাগান চাই”
পৃথিবীতে যা কিছু সুন্দর ও নির্মল তার মধ্যে অনিন্দ্য সুন্দর শিশুরা। শিশুরা জাতির ভবিষ্যৎ এবং আগামীর কাণ্ডারী। পৃথিবীর সকল সুবাসিত ফুলের ন্যায় শিশুরাও। তারা জাতির তরে সুবাস বিলায় সর্বত্র, স্বপ্ন লালন করে একটি সুন্দর সমাজ গঠনের। ঠিক যেমনটি আমাদের প্রিয় নবীজির শৈশব থেকে আমরা জানতে পেরেছি। ছোট্ট বয়সেই তিনি সবার নিকট আল-আমিন উপাধিতে ভূষিত হন। গড়ে তোলেন হিলফুল ফুজুল নামের সেই কল্যাণময় সংঘ, প্রতিষ্ঠিত করেন মানুষের অধিকার। মানুষ ফিরে পায় তার প্রাপ্য সম্মান ও মর্যাদা।
বন্ধুরা, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসের সম্পূর্ণ নতুন এক স্বাধীন বাংলাদেশে তোমাদের প্রতি প্রীতি ও শুভেচ্ছা জানিয়ে শুরু করছি। আশা করছি তোমরা অনেক ভালো আছো। আজ আমরা আলোচনা করব শিশুদের তথা তোমাদের অধিকার নিয়ে। শিশু অধিকারের নানাবিধ বিষয় নিয়ে তোমাদের জানা-অজানা নানান দিকগুলো তুলে ধরতে চেষ্টা করবো। চলো তাহলে দেরি না করে জেনে নেয়া যাক।
তুমি কি জানো শিশু কারা?
শিশু অধিকার কনভেনশনের প্রথম অনুচ্ছেদেই বলা হয়েছে, ‘আঠারো বছরের কম বয়সী সকল মানুষই শিশু।’ তথা আমাদের বয়স যাদের এখনো ১৮ হয়নি সে পর্যন্ত আমরা সবাই শিশু।
শিশু অধিকার বলতে কী বোঝায়?
একজন শিশুর জীবনধারণ ও পরিপূর্ণ বেড়ে ওঠার জন্য যা যা প্রয়োজন হয় সেটি যথাযথ পাওয়ার অধিকারের নামই হলো শিশু অধিকার। এক কথায় শিশু অধিকারের মধ্যে তার বেঁচে থাকার অধিকার, মানসিক ও শারীরিক বিকাশের অধিকার, সুরক্ষার অধিকার, মতামত দেয়া ও অংশগ্রহণের অধিকার প্রভৃতি বিদ্যমান থাকে। তোমরা হয়তো অনেকেই জাতিসংঘ শিশু অধিকারের নাম শুনে থাকবে। এটি হলো শিশুদের অধিকার সুরক্ষার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক চুক্তি। যা ১৯৮৯ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে গৃহীত হয় যার অপর নাম Convention on the Rights of the Child সংক্ষেপে (CRC)। এই সনদে শিশু অধিকার সম্পর্কে ৫৪টি ধারা রয়েছে। যা শিশুর বেঁচে থাকা, বিকাশ, সুরক্ষা এবং অংশগ্রহণের অধিকারকে নির্ধারণ করে থাকে।
শিশু অধিকার কেন গুরুত্বপূর্ণ?
তোমাদের মননে প্রশ্ন জাগতেই পারে শিশুরা তো সাধারণত বাবা-মা, সমাজ কিংবা রাষ্ট্র থেকেই তার প্রাপ্য অধিকারটুকু পেয়ে থাকে তবুও জাতিসংঘের মতো একটি বড় জায়গায় তাদের অধিকার নিয়ে আইন করার প্রয়োজনীয়তা কেনই বা দেখা দিলো? চলো তাহলে আমরা সেটি নিয়ে আলোচনা করি। তোমার চোখদুটো তাহলে এবার বন্ধ করো এবং যুদ্ধ বিদ্ধস্ত ফিলিস্তিনের কথা ভাবো, কী দেখতে পাও? নিশ্চয়ই ধ্বংসযজ্ঞ আর মানুষের নিথর মৃতদেহ। একই সাথে মৃত বাবা মার পাশে হয়তো দেখতে পাও ছোট্ট শিশুটির কান্না কিংবা সেই শিশুটির কোনো সহপাঠির ছিন্ন ভিন্ন শরীর! তাহলে কি সেই শিশুদের জীবনধারণের অধিকার নেই? নাকি অন্যায় আর অসত্যের বলি হয়ে তারা শাহাদাতের নাজরানা পেশ করেই যেতে থাকবে? এই প্রশ্ন তোমার কিংবা আমার নয় বরং এটি সবার প্রশ্ন। ঠিক এসব কারণেই শিশুদের অধিকার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শুধু তাই নয় তাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সুরক্ষা, সামাজিক ন্যায়বিচার, সহিংসতা ও নির্যাতন থেকে সুরক্ষা দিয়ে তাদের জন্য আলাদা করে কাজ করাটাই হলো শিশু অধিকার। এছাড়া বিশ্বজুড়ে অনেক শিশু রয়েছে যারা নানাবিধ প্রতিকূলতার সম্মুখীন হয়, যেমন: ক্ষুধা, দারিদ্র, স্বাস্থ্যহীনতা এবং শিক্ষা বঞ্চনা। শিশু অধিকার আইন এই চক্রগুলোকে ভেঙে শিশুদের অধিকার নিশ্চিত করার জন্য কাজ করে থাকে।
বিশ্বব্যাপী শিশু অধিকার ও সুরক্ষার চ্যালেঞ্জসমূহ:
জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদ অনুযায়ী তথা Convention on the Rights of the Child এর বিস্তৃত সুরক্ষানীতি থাকলেও বিশ্বজুড়ে শিশু অধিকার সুরক্ষার ক্ষেত্রে অনেক চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। এই চ্যালেঞ্জগুলো ভিন্ন ভিন্ন দেশ অনুযায়ী বিভিন্নতর হয়ে থাকে। যেগুলো মূলত সেই দেশের অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক এবং রাজনৈতিক কাঠামোর উপর নির্ভর করে থাকে। চ্যালেঞ্জগুলো হলো:
ক্ষুধা ও দারিদ্র:
আমাদের মৌলিক চাহিদাগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা ও শিক্ষা। আমরা যদি সবার আগে চিন্তা করি কোনটির প্রয়োজনীয়তা সবচেয়ে বেশি, নিঃসন্দেহে তুমি উত্তর দেবে খাদ্য। কারণ খাদ্য ছাড়া মানুষ কেন, পৃথিবীর কোনো জীবের পক্ষেই বেঁচে থাকা সম্ভব নয়। আর এই খাবারের জন্যই মানুষের প্রয়োজন হয় কর্মের, অর্থের কিংবা শ্রমের। সুতরাং খাদ্যই কেবল নয় বরং শিশুদের জন্য নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করাটাই মুখ্য বিষয়। ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী ২০২৪ সালে বিশ্বব্যাপী পাঁচ বছরের কম বয়সী প্রায় ২৫% শিশু (প্রায় ১৮১ মিলিয়ন) গুরুতর খাদ্য দারিদ্রের সম্মুখীন হচ্ছে। যার অর্থ হলো তাদের জন্য নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাদ্য সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে এই শিশুদের মারাত্মকভাবে অপুষ্টিতে ভোগার সম্ভাবনা রয়েছে। একই সাথে তাদের বৃদ্ধি, বিকাশ ও সামগ্রিক স্বাস্থ্যের উপর গুরুতর কিংবা দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব বিস্তার করতে পারে। বিশেষ করে ফিলিস্তিনের গাঁজা, সিরিয়া এবং সোমালিয়া অঞ্চলে এই পরিস্থিতি আরো বেশি ভয়াবহ। যেখানে প্রায় ৯০% শিশু ভয়াবহ খাদ্য ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে যা তাদের সামগ্রিক বিকাশের পক্ষে বিরাট অন্তরায়। একই সাথে নিরাপদ পানি ও স্বাস্থ্যসেবা থেকে তারা বঞ্চিত হচ্ছে।
শিক্ষা:
মানুষের মৌলিক চাহিদা ও অধিকারের মধ্যে অন্যতম হলো শিক্ষা। গুণগত ও মানসম্মত শিক্ষা পাওয়ার অধিকার সব শিশুর। একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্ভর করে সে জাতি তার শিশুদের কীভাবে গড়ে তুলছে তার উপর। অথচ বিশ্বব্যাপী লাখ লাখ শিশু বিশেষত মেয়েরা বিভিন্ন কারণেই এ অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়। দারিদ্রতা ও সংঘাত এর অন্যতম কারণ। আমরা যদি জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদ (CRC) এর দিকে তাকাই তাহলে সেটির ২৮নং ধারায় সকল শিশুর বিনামূল্যে ও বাধ্যতামূলকভাবে প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করার ব্যাপারে স্পষ্ট করে উল্লেখ করা আছে। কিন্তু এরপরেও তা সঠিকভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না। আমাদের দেশের কথাই চিন্তা করো, তোমার গ্রাম, পাড়া বা মহল্লার সব শিশুই কি সঠিকভাবে স্কুলে যেতে পারছে? উত্তর হলো পারছে না। এর কারণ মূলত দারিদ্রতা এবং পারিবারিক বা সামাজিক বাধা। ফলে ঐসব শিশু তার মৌলিক অধিকার থেকে ক্রমাগত বঞ্চিত হচ্ছে।
সহিংসতা ও নির্যাতন:
বিশ্বব্যাপী শিশুদের অধিকারের চরম লঙ্ঘন হলো তাদের উপর চালানো সহিংসতা ও নির্যাতন। আমাদের প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) শিশুদের খুব ভালোবাসতেন। তিনি তার সাহাবাদের যুদ্ধের নীতি শিখিয়েছেন। বলেছেন, কোনো শিশু, বৃদ্ধ, মহিলা কিংবা অসহায় নিরস্ত্রকে আক্রমণ করা যাবে না বরং তাদের নিরাপত্তা দিতে হবে। এমনকি জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদের ১৯, ৩৪ ও ৩৭নং ধারা অনুযায়ী তাদের যাবতীয় সুরক্ষার কথা থাকলেও তা হরহামেশাই লঙ্ঘিত হচ্ছে।
ফিলিস্তিনের অসংখ্য শিশুকে হত্যা করা হয়েছে যা শুধু শিশু অধিকারের প্রশ্নেই নয় বরং এটি একটি গণহত্যা। এটি নিষ্ঠুরতা ও চরম অমানবিকতার বহিঃপ্রকাশ। এছাড়াও শিশুশ্রম নিষিদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও যে শিশুরা দারিদ্রতার কারণে কর্ম বেছে নিতে বাধ্য হয় সেই কর্মস্থলেও তারা নিরাপদ থাকতে পারে না। বিভিন্ন ধরনের শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয় যা শিশু অধিকারের গুরুতর লঙ্ঘন।
শিশুশ্রম ও শোষণ:
বাংলাদেশে শিশুশ্রম একটি বড় সমস্যা। UNICEF এর তথ্য অনুযায়ী ২০২৪ সালে বাংলাদেশে ৫-১৭ বছর বয়সী প্রায় ৮.৯% শিশু শিশুশ্রমে নিয়োজিত। এর মধ্যে ৮% শিশু ঝুঁকিপূর্ণ কাজের সাথে জড়িত। বিশেষ করে বাংলাদেশে গার্মেন্টস শিল্পে অনেক শিশু কাজ করে। যদিও শিশুশ্রম বন্ধ আইন আছে তবে সেই আইন কার্যকর ও বাস্তবায়নের অভাবে তা পুরোপুরি নির্মূল করা আজও সম্ভব হয়নি। জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদের ৩২ ও ২৮নং ধারায় শিশুশ্রম প্রতিরোধে আইনের কথা থাকলেও সেটির বাস্তবায়ন ছাড়া শিশুদের অধিকার সংরক্ষণ কিংবা তাদের সামগ্রিক বিকাশ নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। পৃথিবীর উন্নত দেশসমূহে এই আইনের যথাযথ প্রয়োগ দেখা গেলেও উন্নয়নশীল ও তুলনামূলক কম উন্নত দেশগুলোতে শিশুশ্রম এখনো চোখে পড়ার মতো। বিশেষ করে এশিয়া ও আফ্রিকা মহাদেশে এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি দেখা যায়।
তাহলে কোন কোন উদ্যোগের মাধ্যমে আমরা শিশু অধিকারগুলো প্রতিষ্ঠিত করতে পারি চলো তাহলে সে সম্পর্কে জানা যাক।
শিশু অধিকার সুরক্ষায় প্রচেষ্টাসমূহ:
পারিবারিক ও সামাজিক সচেতনতা: শিশুদের অধিকার সুরক্ষায় সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো পারিবারিক ও সামাজিক সচেতনতা। একটি শিশু কেবল মাত্র পরিবারের সম্পদ নয় বরং সে সমাজ ও দেশের সম্পদ। তার যথাযথ বিকাশ ও প্রবৃদ্ধির প্রয়োজন। এই সম্পর্কে চাই ব্যাপক সচেতনতা।
শিশু অধিকার সনদ: আমরা আগেই বলেছি শিশু অধিকার সনদ শিশুদের সুরক্ষার নিশ্চয়তা প্রদান করে। সুতরাং সেটি সম্পর্কে অবগত হওয়া এবং শিশু অধিকার সনদ বাস্তবায়ন করাটা খুবই জরুরি।
সরকারি উদ্যোগ: ইতোমধ্যেই বাংলাদেশ সরকার শিশু অধিকার সুরক্ষায় বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। যেমন- শিশুশ্রম নির্মূলের জন্য জাতীয় কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন এবং শিশুদের জন্য বিশেষ আদালত স্থাপন করা।
আন্তর্জাতিক ও বেসরকারি উদ্যোগ: Save the Children এবং UNICEF সহ অনেক মানবিক সংস্থা আছে যারা শিশুদের অধিকার ও সুরক্ষায় কাজ করে যাচ্ছে। তারা শিশুদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং সুরক্ষা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন প্রকল্প পরিচালনা করছে। তাদের এইসব কাজকে আরো বেশি বেগবান করা।
সর্বোপরি শিশুদের অধিকার সুরক্ষিত করতে সকলের একসঙ্গে কাজ করা জরুরি। পরিবার, সমাজ, এবং রাষ্ট্রের সম্মিলিত প্রচেষ্টায়ই শিশুরা নিরাপদ এবং সুখী জীবন পেতে পারে। শিশুদের প্রতি আমাদের দায়িত্ববোধ এবং ভালোবাসা তাদের একটি উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করবে। শুধুমাত্র তখনই আমরা একটি সুখী ও সমৃদ্ধ সমাজ গড়ে তুলতে পারবো।
প্রকাশকাল: সেপ্টেম্বর ২০২৪



