দ্য আল্টিমেট রাইভালরি

হাসান মাহমুদ সাইফুল্লাহ

0
20

ক্রিকেটে ভারত বনাম পাকিস্তানের ম্যাচ হলেই একটা অন্যরকম উত্তেজনা কাজ করতো আগে। ম্যাচের টিকেট দ্রুত ফুরিয়ে যাওয়া, মাঠ এবং মাঠের বাইরে ক্রিকেট ফ্যানদের লড়াইসহ একটা আমেজ তৈরি হতো। কিন্তু বর্তমানে ভারত-পাকিস্তানের লড়াই খুব একটা জমে না। এর কারণ হিসেবে বলা যায়, বড় আসরগুলোতে পাকিস্তান হট ফেবারিট থাকলেও ভারতের বিপক্ষে খুব কম ম্যাচেই জয়ের মুখ দেখতে পায়। এমনকি ম্যাচ তো একতরফাভাবেই শেষ হয় বেশি। স্মৃতি হাতড়ে দুয়েকটা ম্যাচ পাওয়া যায় যেখানে পাকিস্তান ভালোভাবেই জিতেছিলো। যেমন ২০২১ সালের টি-২০ ওয়ার্ল্ড কাপে ১০ উইকেটের জয়, যা ছিলো ১৩ বারের প্রচেষ্টায় পাকিস্তানের প্রথম জয়। আবার ২০১৭ সালের চ্যাম্পিয়নস ট্রফি ফাইনালে ১৮০ রানের জয়ের কথা বলা যায়।

কিন্তু বর্তমানে ভারত-পাকিস্তান দ্বৈরথের তুলনায় বাংলাদেশ-ভারত ম্যাচ এক অনন্য উত্তেজনা বহন করে। বড় আসরগুলোতে বাংলাদেশের অবস্থা করুণ হলেও ভারতের সাথের ম্যাচগুলো আলাদা রকম রোমাঞ্চকর মুহূর্ত উপহার দেয়। আজ চলো আমরা তেমনই কিছু ম্যাচের ঘটনা নিয়ে কথা বলি!

শুরুটা তাইলে ২০০৭ ওয়ানডে বিশ্বকাপ দিয়েই করি। বাংলাদেশ সেবার তারুণ্যে ভরা দল নিয়ে খেলতে গিয়েছিলো। আশরাফুল, সাকিব, তামিম, মুশফিক, মাহমুদউল্লাহ, মাশরাফিদের মতো তরুণদের পাশাপাশি ছিলো অভিজ্ঞ হাবিবুল বাশার, মোহাম্মদ রফিক, সৈয়দ রাসেল প্রমুখ।
তো ভারত প্রথমে ব্যাটিং করতে নামে। ওপেনিংয়ে নামা ভিরেন্দ্রর শেহবাগকে মাশরাফির দ্রুত গতির বলে বোল্ড করে শুরু হয় ভারত বধের কাহিনি। তারপরে একে একে উইকেটের আসা যাওয়া।
শেষমেশ ভারত ৪৯.৩ ওভারে ১৯০ রানেই অল আউট হয়ে যায়। মাশরাফি ৪ উইকেট নিয়ে হয়েছিলেন ম্যাচ সেরা।
রান তাড়া করতে গিয়ে বাংলাদেশ শুরুর দিকে খেই হারিয়ে ফেললেও পরে সাকিব, তামিম, মুশফিকের অর্ধ শতকে জয়ের বন্দরে নোঙর করে। সেদিন তামিম ইকবাল ভারতের কিংবদন্তি পেসার জহির খানকে ডাউন দ্যা গ্রাউন্ডে এসে ছয় হাঁকিয়ে রীতিমতো ক্রিকেট দুনিয়ায় সাড়া ফেলে দিয়েছিলেন।
পরবর্তীতে ২০১১ সালের বিশ্বকাপে বাংলাদেশকে কোনো সুযোগই দেয়নি ইন্ডিয়া। সেই শেহবাগের তোপে ৩৭০ রানের পাহাড় গড়ে ভারত। যা টপকানো সম্ভব হয়ে ওঠেনি বাংলাদেশের। ২৮৩ রানেই থামতে হয়েছিলো তাদের।

২০১৫ সালের বিশ্বকাপ তো বাংলাদেশের অন্যতম সেরা বিশ্বকাপ ছিলো। ইংল্যান্ডকে হারিয়ে সেবার প্রথমবারের মতো কোয়ার্টার ফাইনালে খেলেছিলো বাংলাদেশ। প্রতিপক্ষ ছিলো ভারত। সে ম্যাচ আজও সমালোচিত। প্রথমে ব্যাটিংয়ে নেমে ওপেনার রোহিত শর্মাকে ফুলটস বলে ক্যাচ আউট করেন রুবেল। কিন্তু আম্পায়ার সেটাকে নো বল কল করেন। যেটা যথেষ্ট বিতর্কের সৃষ্টি করে।
আবার দ্বিতীয় ইনিংসে মাহমুদউল্লাহ রিয়াদের শটে থার্ড ম্যানে দাঁড়িয়ে ক্যাচ নিয়েছিলেন শিখর ধাওয়ান। যেটা বাউন্ডারি লাইন টাচ করা নিয়েও ছিলো বিতর্ক। তো এতো সব বিতর্ক পেরিয়ে বাংলাদেশের আর জেতা হয়নি। সেবারের আসর থেকে বিদায় নিতে হয়েছিলো।

২০১৬ সালে টি-২০ ভার্সনে আয়োজিত এশিয়া কাপের ফাইনালে হারে বাংলাদেশ। ১৫ ওভারের ম্যাচে বাংলাদেশের দেয়া ১২১ রানের টার্গেট ৮ উইকেট হাতে রেখেই জিতে যায় ভারত। বাংলাদেশ কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতাই করতে পারেনি। এটি ছিলো কোনো টুর্নামেন্টের ফাইনালে বাংলাদেশের দ্বিতীয় হার। ২০১২ সালে পাকিস্তানের কাছে প্রথমবারের মতো ফাইনাল হেরেছিলো বাংলাদেশ। তাও মাত্র ২ রানে!

এবারে ২০১৬ সালের টি-২০ বিশ্বকাপ। সেটা ছিলো বাংলাদেশের বড় সুযোগ মিস, পরবর্তী রাউন্ডে যাওয়ার ক্ষেত্রে।
ম্যাচে ভারত খুব বেশি রান করতে পারেনি। ভালো বোলিংয়ের পরে ভালো ব্যাটিংয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশও ধীরে ধীরে ম্যাচকে জয়ের প্রান্তেই নিয়ে যায়। কিন্তু শেষে গিয়ে এমন জগাখিঁচুড়ি পাকায় যে শেষ ৩ বলে ২ রান নিতে গিয়ে ৩ উইকেট বিলিয়ে ১ রানে ম্যাচ হেরে বসে বাংলাদেশ। শেষ ওভারে প্রয়োজন ছিল ১১ রানের। ওভারের ১ম বলে সিঙ্গেল নেয় মাহমুদউল্লাহ। তারপরের দুই বলে টানা দুইটা চার মারে মুশফিক। ৯ রান হয়ে গেছে। আর মাত্র ২ রান লাগে তখন।
কিন্তু চতুর্থ বলে ক্যাচ তুলে আউট মুশফিক। পঞ্চম বলে ফুল টসে ক্যাচ দিয়ে সাজঘরে ফিরেন মাহমুদউল্লাহ। শেষ বলে স্ট্রাইক প্রান্তে শুভাগত হোম ব্যাটে বলে কানেক্ট করতে না পারলেও রানের জন্য দৌড় দেন, যেন ম্যাচটা ড্র হয়। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি। রান কম্পলিট করার আগেই অপর প্রান্তের স্ট্যাম্প ভেঙে মুস্তাফিজকে রান আউট করে দেন ধোনি। ভারতও ১ রানে জিতে যায় ম্যাচটি। বাংলাদেশের অন্যতম কলঙ্কিত ম্যাচ ছিলো এটি।

২০১৮ সালের ওয়ানডে এশিয়া কাপের ফাইনালেও খুব বাজেভাবে হারে। প্রথমে ব্যাটিংয়ে লিটন-মিরাজ জুটিতে ভালো সংগ্রহের দিকে আগাচ্ছিলো। কিন্তু বিতর্কিতভাবে লিটন দাস স্টাম্পড হয়ে যাওয়াতে ওপেনিং পার্টনারশিপ শেষ হয়। কিন্তু মিডল অর্ডার ব্যাটারদের ব্যাটিং ধ্বসে ২২২ রানে অল আউট হতে হয়। ভারত সহজেই টপকে যায় এবং চ্যাম্পিয়ন হয়ে যায়। এটি ছিলো কোনো টুর্নামেন্টের ফাইনালে বাংলাদেশের তৃতীয় হার।

পরবর্তী শ্বাসরুদ্ধকর ম্যাচটি ছিলো ২০১৮ সালের নিদাহাস ট্রফিতে। একটি না প্রায় প্রতিটি ম্যাচই শ্বাসরুদ্ধকর ছিলো বলতে হবে। কেননা, গ্রুপ পর্বে ভারতের সাথে ছাড়া বাকি ম্যাচগুলোও ছিলো ব্রেথটেকিং।
শ্রীলঙ্কায় সেবার টি-২০ ফরমেটে ট্রাই নেশন সিরিজটি আয়োজিত হয়েছিলো বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা ও ভারতকে নিয়ে। বাংলাদেশ দল ভালো ফর্মে ছিলো। টপ অর্ডারে তামিম, সাব্বিরের পাশাপাশি মিডলে সাকিব, মুশফিক এবং ফিনিশিংয়ে মাহমুদউল্লাহরা ছিলো ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা ফর্মে। বোলিংয়ে নাজমুল অপু এবং তার নাগিন ডান্স ছিলো টুর্নামেন্টের অন্যতম আকর্ষণ।
গ্রুপ পর্বে ভারতের সাথে ১ম ম্যাচে ৬ উইকেটে এবং ২য় ম্যাচে ১৭ রানে হেরে যায় বাংলাদেশ। কিন্তু অন্যদিকে শ্রীলঙ্কার সাথে দুইটা ম্যাচই জিতে বাংলাদেশ। ১ম ম্যাচে ২১৫ রান চেজ করে এবং ২য় ম্যাচে ২ উইকেটে জিতে। এই ২য় ম্যাচটাও একটা দারুণ ম্যাচ ছিলো। চলো একটু স্মৃতি রোমন্থন করি!
রান তাড়া করতে গিয়ে ২০তম ওভারে লাগে ১২ রান। স্ট্রাইকে মুস্তাফিজ। ১ম বলে বাউন্সারে ব্যাটে বলে হয়নি। দ্বিতীয় বলও বাউন্সার দেয়, কিন্তু মাহমুদউল্লাহ স্ট্রাইক নেয়ার জন্য দৌড়ে আসে। মুস্তাফিজ রান আউট হয়ে যায়। এদিকে লেগ আম্পায়ার দুইটা বাউন্সে নো বল ডাকে। কিন্তু পরে আবার বাদ দিতে চায়। এতে তো বাংলাদেশের অধিনায়ক সাকিব আল হাসানসহ বাকিরা ভীষণ চটে যায়। শ্রীলঙ্কার খেলোয়াড়দের সাথেও উত্তপ্ত মুহূর্তের সৃষ্টি হয়। পরে পরিস্থিতি শান্ত হলে ব্যাটিংয়ে ফিরে আসে মাহমুদউল্লাহ। ৩য় বলে লং অফ দিয়ে দারুণ একটা চার বের করেন। ৪র্থ বলে রুবেলের সাথে দৌড়ে ২ রান নেন। ৫ম বলটি ইসুরু উদানা মাহমুদউল্লাহর পায়ের মধ্যে দেয়। সাথে সাথে ফ্লিক শটে বল গ্যালারিতে পাঠিয়ে দুই হাত উঁচিয়ে জয়োৎসব শুরু করে দেন।
পরবর্তীতে শ্রীলঙ্কা ভারতের সাথেও হেরে যাওয়াতে ফাইনালে চলে যায় বাংলাদেশ।
ফাইনাল ম্যাচে বাংলাদেশ আগে ব্যাটিং করে ১৬৭ রানের লক্ষ্য দেয় ভারতকে। ভারত শুরুতে ভালো করলেও মিডল অর্ডারের ব্যর্থতায় চাপে যায়। লাস্ট দুই ওভারে ৩৪ রানের পরিসংখ্যানে চলে যায় ম্যাচ। কিন্তু দীনেশ কার্তিক এদিন খেলেন তার ক্যারিয়ারের ম্যার ক্যামিও। পুরো ম্যাচে ভালো বল করা রুবেল ১৯তম ওভারে দিয়ে বসে ২২ রান। শেষ ওভারে ক্যাপ্টেন সাকিব বল তুলে দেয় সৌম্য সরকারের হাতে। ১ম বল ওয়াইড, ২য় বল ডট, ৩য় বল ১ রান, ৪র্থ বল ১ রান, ৫ম বলে চার মারেন দীনেশ কার্তিক। শেষ বলে প্রয়োজন ৫ রান। অর্থাৎ সিক্স মারতেই হবে জেতার জন্য। সৌম্য বল করেন ওয়াইড আউটসাইড অফে। কিন্তু দীনেশ কার্তিক সেটাকেই টেনে দেন। বল লং অফ দিয়ে ফ্ল্যাট সিক্স। সৌম্য তো বসে কান্নাই করে ফেললেন। চতুর্থ টুর্নামেন্ট ফাইনাল হেরে বসে বাংলাদেশ।

এরপরে ২০২২ সালে টি-২০ বিশ্বকাপও ছিলো শ্বাসরুদ্ধকর। ভারত আগে ব্যাটিং করে ১৮৪ রানে থামে। কিন্তু বৃষ্টি আইনে বাংলাদেশের প্রয়োজন ১৫ ওভারে ১৫১ রানের। ব্যাটিংয়ে রীতিমতো ঝড় তুলেন লিটন কুমার দাস। কিন্তু ২৭ বলে ৬০ রান করে রান আউট হতে হয় তাকে। শেষমেশ বাংলাদেশ মাত্র ৫ রানে হেরে যায় ম্যাচটি।

দ্বিপাক্ষিক সিরিজে হোম গ্রাউন্ডে বাংলাদেশ সাম্প্রতিক সময়ে ভারতের বিপক্ষে ভালো পরিসংখ্যান ধরে রেখেছে। বিশেষ করে ওয়ানডে। ২০১৫ সালে মুস্তাফিজ একাই সিরিজ জিতিয়ে দিয়েছিলো। পৃথিবী চিনেছিলো কাটার মাস্টারকে। আর ২০২২ সালেও মিরাজের অলরাউন্ড পারফরম্যান্সে সিরিজ জিতেছিলো।
২০২২ সালের ম্যাচের ঘটনা বলি তাহলে!
প্রথম ম্যাচে তো ভারতকে ১৮৬ রানে অল আউট করে দেয়। চেজ করতে নেমে ১৩৬ রানে বাংলাদেশের ৯ম উইকেটের পতন হয়। সবার অবস্থা খারাপ। তখনও প্রায় ৫০ রান লাগে, হাতে মাত্র ১ উইকেট। মেহেদী হাসান মিরাজ তখন মুস্তাফিজকে সাথে নিয়ে আরো ৭ ওভার খেলা চালিয়ে নেয়। প্রতিটি বলেই মনে হচ্ছিলো এবারই আউট। কিন্তু না, পরবর্তীতে ম্যাচটি ১ উইকেটে জিতেই শেষ করে বাংলাদেশ।
দ্বিতীয় ম্যাচেও ছিলো নাটকীয়তা। মাহমুদউল্লাহর ৭৭ এবং মিরাজের ১০০ রানে ২৭১ রানের পুঁজি পায় বাংলাদেশ। চেজ করতে নেমে ভারতের শুধু শ্রেয়াস আইয়ার ছাড়া আর কেউ দাঁড়াতে পারেনি। রোহিত শর্মা শুরুতেই রিটায়ার্ড হার্ট হয়ে ফিরে যান। কিন্তু যখন আইয়ার আউট হয়ে যায় এবং ভারতের ৭টি উইকেটের পতন হয়। তখন রোহিত ফিরে আসে এবং বোলারদের বেধড়ক পেটাতে থাকে। কিন্তু কাটার মাস্টার মুস্তাফিজের নৈপুণ্যে শেষ ওভারে গিয়ে মাত্র ৫ রানে ম্যাচটি জিতে নেয় বাংলাদেশ।
তৃতীয় ম্যাচে অবশ্য বাংলাদেশ পাত্তা পায়নি। ঈশান কিশানের ডাবল সেঞ্চুরিতে ৪০০ রানের পাহাড় টপকাতে গিয়ে বাংলাদেশ ১৮২ রানেই গুটিয়ে যায়। কিন্তু সিরিজ তো আগেই জিতে নিয়েছিলো বাংলাদেশ।

এই ছিলো এবারের মতো। চলতে থাকুক এমন রাইভালরি। কথা হবে নতুন কোনো ঘটনা নিয়ে। ভালো থেকো সবাই।