সিংহ বনের রাজা। সব পশু তার অনুগত প্রজা। সক্কলেই জানে যে সিংহের গায়ে আছে প্রচণ্ড শক্তি। খুব সহজেই সে যে কোনো শিকারকে কাবু করে ফেলতে সক্ষম। থাবায় অনেক জোর। দাঁতে অনেক ধার। এইসব কারণেই সে রাজাধিরাজ। এই গল্প তার কয়েকজন প্রজাকে নিয়ে। হায়েনা, শেয়াল, সজারু, বনবেড়াল এবং আরও কয়েকটি প্রাণী।
একদিন হয়েছে কী, শিকারে বেরিয়েছে সিংহ। হেলতে দুলতে রাজকীয় চালে পথ হাঁটছে। সে অবশ্য একা নয়। তার সঙ্গে আছে শেয়াল, হায়েনা, সজারু, বনবেড়াল। সকাল গড়িয়ে গেছে। এখন দুপুর বেলা। কারও পেটেই কোনো দানাপানি পড়েনি। সক্কলেই ভীষণ ক্ষুধার্ত। কোনো শিকার ধরা গেলে ঝটপট সেটাকে দিয়ে ভূরিভোজ সেরে নেওয়া যাবে। সেরকমই ইচ্ছে আর পরিকল্পনা।
চারদিকে সবাই কড়া নজর রেখে এগোতে থাকে। হঠাৎ হায়েনার চোখ যায় বড়সড় একটা উটের দিকে। হৃষ্টপুষ্ট উট দেখে তার জিভে পানি এসে যায়। উহ্, কী সৌভাগ্য। উমদা একখান শিকার মিলেছে। আনন্দের সঙ্গে সিংহকে সেটা দেখায়। পরম উৎসাহে বলে ওঠে, ‘পাওয়া গেছে। পাওয়া গেছে। ভাগ্য ভালো আমাদের সবার। ওই যে দ্যাখো, মস্ত একখানা শিকার। এই উটটাকে ধরা গেলে আর কোনো ভাবনা নেই। সবাই আমরা পেট পুরে খেতে পারবো। ইসস রে, খিদের জ্বালায় পেটের নাড়িভূঁড়ি হজম হয়ে যাওয়ার জোগাড়।’
উট দেখামাত্র সিংহ ঝাঁপিয়ে পড়ে ওটার ওপর। উটের ঘাড়ে শক্ত কামড় বসিয়ে দেয়। উট ছটফট করে ছাড়া পাওয়ার জন্য। তার সব চেষ্টা বিফল হয়। এক পর্যায়ে হাল ছেড়ে দিতে বাধ্য হয় বেচারা। সিংহের আক্রমণে উটের দফা রফা হতে বিশেষ সময় লাগে না।
সিংহ বিজয়ের আনন্দে ভীষণ গর্বিত। কেশর দুলিয়ে সবার উদ্দেশ্যে বলে, ‘নাও, হলো তো। মনের মতো শিকার পাওয়া গেছে। তোমরা এখন এটাকে ভাগজোক করে নাও।’
হায়েনা চটপট এগিয়ে আসে। মাংস ভাগ করার দায়িত্ব নেয়। হাসিমুখে সিংহকে বলে, ‘আচ্ছা, বেশ। আমি ভাগ করে দিচ্ছি। উটের মাংস সমান দুটো ভাগে ভাগ হবে। এক ভাগ মহারাজ সিংহের। অন্যভাগ আমাদের সবার।’
একথা শুনে সিংহ রাগে কটমট করে। ঝাঁঝিয়ে বলে, ‘কী! কী বলছিস এসব ফালতু কথা? উটটা শিকার করলাম আমি একা। আর তোরা কি না অর্ধেক নিয়ে নিবি? তোরা তো দশ হাত দূরে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মজা দেখলি। একজনও এসে হাত লাগালি না সে কাজে। কেন রে? এটা কোন দেশি কেমনধারা বিচার? দাঁড়া, তোকে আমি ভাগ করা শেখাচ্ছি।’
বলে সিংহ হায়েনার ঘাড় মটকে দেয়। বেচারা হায়েনা। আচমকা হামলার শিকার হবে, কল্পনায়ও ছিল না তার। সে মারা যায় সঙ্গে সঙ্গে।
সিংহ রাগী কণ্ঠে শেয়ালকে বলে, ‘এবার তুমি ভাগ করে দাও দেখি। তোমার বিচার বিবেচনাটা কেমন, সেটা আমি দেখতে চাই।’
শেয়াল বোধহয় আগে থেকেই ঠিকঠাক করে রেখেছে, তার উপরে দায়িত্ব পড়লে সে কী করবে না করবে। সুতরাং তেমন একটা সময় নেয় না। শেয়াল বলে, ‘এই উটের পুরো মাংসই আমাদের সিংহ মহারাজের। তার জয় হোক। তিনি যেন দীর্ঘজীবন লাভ করেন। নিন মহারাজ, এখন আপনার ভোজ শুরু করুন।’
এই সিদ্ধান্ত পেয়ে সিংহ মহা খুশি। আনন্দ, কী আনন্দ। শেয়ালটা তাহলে ন্যায় বিচার করেছে। ভালোমতো বণ্টন করে দিতে চাচ্ছে উটের মাংস।
খুশি খুশি গলায় জানতে চায় সিংহ, ‘ওরে শেয়াল। চমৎকার ভাগ করেছো তুমি। দেখা যাচ্ছে, তোমার বুদ্ধিশুদ্ধি বেশ ভালোই আছে। ভালো, খুবই ভালো। তোমার উন্নতি হবে। তা, হ্যাঁ রে শেয়াল একটা কথা জানবার খুব ইচ্ছে আমার। এইভাবে এমন সুন্দর করে মাংস ভাগ করার কথা তোমার মাথায় কেমন করে এলো? বলো তো, কে তোমাকে শিখিয়েছে এই চমৎকার নিয়মকানুন?’
শেয়াল মিনমিন করে বলে, ‘যদি অভয় দেন তাহলে সত্যি কথাটা বলবো।
সিংহ মাথা নেড়ে সায় দেয়। মানে হলো, আচ্ছা বেশ বলো।’
শেয়াল বেজার মুখে বলে, ‘এই যে একটু আগে আপনি হায়েনার উপর ঝাঁপিয়ে পড়লেন, ওকে হত্যা করলেন, মূল্যবান এই দৃশ্যটাই আমাকে এমন বিচার করতে শিখিয়েছে। বড়োই শিক্ষণীয় ব্যাপার।’
অন্য প্রাণীরা হতবাক। এমন অদ্ভুত ধরনের ভাগবণ্টনের কথা তারা জন্মেও কখনো শোনেনি। শেয়াল এটা কী করলো? তারা শেয়ালের ওপর মহা বিরক্ত। সে তাদেরকে বঞ্চিত করলো খামোখাই।
বনবেড়াল দাঁতমুখ খিঁচিয়ে বলে, ‘শেয়াল, তুমি একটা উজবুক। এক নম্বরের বোকা। বেয়াক্কেলের মতো একটা বিচ্ছিরি কাজ করলে। সিংহকে তুমি সব মাংস দিয়ে দিলে কোন হিসাবে?’
শেয়াল মুচকি হেসে জবাব দেয়, ‘এইমাত্র আমাদের সঙ্গী হায়েনার কী পরিণতি হয়েছে? সবাই তা নিজের চোখে দেখেছো। আমাদের জন্য যদি সামান্য কিছু মাংসও রাখতাম, তাহলে হায়েনার মতোই মর্মান্তিক অবস্থা হতো আমার। হয়তো এরপরে তোমাদের সবারই হতো এমন অবস্থা।
প্রকাশকাল: আগস্ট ২০২৬



