ইথান নামের শিশুটির বয়স মাত্র ৬ বছর। স্কুল থেকে ভাইবোনের সাথে বাসায় ফেরার পর পোষা কুকুরের সাথে কোথায় যেন চলে যায়। এফবিআইসহ একাধিক সরকারি বাহিনী আর প্রায় ৬০০ স্বেচ্ছাসেবক অনেক চেষ্টা করেও ইথানকে খুঁজে পাচ্ছিলো না। তখন তাপমাত্রা প্রায় ৩-৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এরকম তাপমাত্রা মানে জানো? আমাদের দেশে শীতকালে যখন অনেক ঠান্ডা, তখনও তাপমাত্রা খুব কমই ১০-১৫ ডিগ্রির নিচে নামে। তাতেই কেমন কাবু হয়ে যায় সবাই। যাই হোক, ঐ ঠান্ডার মধ্যেই সরকারের হেলিকপ্টার, পুলিশের কুকুর ইত্যাদি সব ব্যবহার করেও ইথানের খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিলো না। এমনকি কর্তৃপক্ষ অভিযান স্থগিতের চিন্তা করছিলো। তখন হাজির হন এক প্রফেশনাল ফটোগ্রাফার স্টিভ ফাইনস, তার ড্রোনে থার্মাল ক্যামেরা (যে ক্যামেরা দিয়ে তাপের উপস্থিতি বোঝা যায়) ছিলো। পরে তার সেই ড্রোন ক্যামেরার সাহায্যেই বাড়ি থেকে প্রায় ২.৪ কিলোমিটার দূরে রাতের অন্ধকারে ভুট্টাখেতের মধ্যে শিশু ইথানকে সেই কুকুরটির সাথে শুয়ে থাকতে পাওয়া যায়। কুকুরটি অবশ্য উষ্ণতা দিয়ে ইথানকে সুস্থই রেখেছিলো।
উপরের এই ঘটনার মতো অনেক ঘটনা পৃথিবীতে এখন ঘটে চলেছে, যেখানে ড্রোনের সাহায্যে মানুষ অনেক জটিল কাজকেও সহজে করতে পারছে। আজ আমরা জানবো এই উড়ন্ত রোবট বা ড্রোন সম্পর্কে।
ড্রোন বললে এখন আমাদের মনের চোখে প্রথমে ভেসে ওঠে চারটা পাখায় ভর করে উড়ে চলা একটি ছোট্ট যন্ত্র, যেটি দিয়ে অনেক উপর থেকেও ছবি তোলা যায়, তাই না? এখন কোনো বড় প্রোগ্রাম হলেই মাথার উপরে অনেকগুলো ড্রোন উড়তে দেখা যায়। আমার তো এক প্রোগ্রামে গিয়ে ভয় হচ্ছিলো, ড্রোনগুলো একটা আরেকটার সাথে কখন জানি আবার ধাক্কা খেয়ে ফেলে! কেবল বড় প্রোগ্রাম নয়, এখন ছেটোখাটো, এমনকি ইনডোর প্রোগ্রামেও ড্রোনের ব্যবহার রেগুলার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু ড্রোন কী শুধু ছবি তোলার কাজই করে?
না, ড্রোন শুধু ছবি তোলার কাজ করে না। এমনকি ড্রোনের মূল কাজও আসলে ছবি তোলা নয়। ড্রোন আসলে কী কাজ করে বা করতে পারে, তার কিছুটা ধারণা আজ আমরা অর্জন করার চেষ্টা করবো।
ড্রোনের সুন্দর নাম হলো Unmanned Aerial Vehicle বা মনুষ্যবিহীন উড়ন্ত যান। নামের মধ্যে থেকে আমরা বুঝতে পারি, ড্রোনের প্রাথমিক বৈশিষ্ট্য। প্রথমত এটি উড়ে চলার একটি যান, দ্বিতীয়ত এতে কোনো মানুষ বসে একে চালায় না। এই দুটি বৈশিষ্ট্য ঠিক রেখে যে কাজেই ব্যবহার করা হোক না কেনো, তাতে ড্রোন আপত্তি করবে না!
এই যেমন বিগত জুলাই মাসেরই কথা। ইন্দোনেশিয়ার এক কলা চাষি করে বসলেন এক আজব কারবার। যে ড্রোনটির সাহায্যে তিনি তার কলাবাগানে চারা, সার, ঘাস ইত্যাদি আনা নেয়া করেন, সেটিতে নিজেই চড়ে বসলেন। প্রায় ১.৫ কিলোমিটারের এই যাত্রা ভিডিও করে প্রচার করার পর তা বেশ ভাইরাল হয়ে যায়। ড্রোনটি ছিলো পণ্য বহনের কাজে নিয়োজিত, যেটি প্রায় ১৫০ কেজি বহন করতে পারতো। এখন ড্রোন তো আর জানে না, সে ঘাস বা সার বহন করছে, নাকি মানুষ। তবে তিনি নিজেই স্বীকার করেছেন, তার এ কাজ মোটেই নিরাপদ ছিলো না। একটু এদিক সেদিক হলেই ভীষণ দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারতো।
এখন আমরা আগে যে ছবি তোলার ড্রোনের কথা বলেছি, তা কি এই পণ্য বা মানুষ বহন করতে পারতো? অবশ্যই না। ছবি তোলার ড্রোনে এমন ওজনদার কিছু লাগিয়ে দিয়ে উড়তে বললে, ওটা নিশ্চিত ঘোঁৎ ঘোঁৎ করে জ্ঞান হারাবে। এটুকু পড়ে আমরা এতটুকু নিশ্চিত হলাম, ড্রোন আসলে নির্দিষ্ট কোনো যন্ত্রের নাম নয়, বরং এটি একটি টাইপের নাম। একে বিভিন্নভাবে, বিভিন্ন কাজের জন্য তৈরি করা যায়।
মজার ব্যাপার হলো, আধুনিক প্রযুক্তির এই ড্রোন পৃথিবীতে নতুন হলেও প্রকৃতিতে ড্রোন কিন্তু অনেক পুরনো বাসিন্দা। অবাক হলে? হ্যাঁ, একদম ঠিক পড়েছো। প্রকৃতিতে ড্রোন অনেক আগে থেকেই আছে। তবে সেটা কোনো যন্ত্র নয়, বরং একটি প্রাণী, আমাদের বেশ পরিচিত একটি প্রাণী। পুরুষ মৌমাছিকে ইংরেজিতে উৎড়হব বলা হয়। আর এখান থেকেই আধুনিক ড্রোনের নামকরণ বলে ধারণা করা হয়।
ড্রোন বা এ টাইপের কিছুর সূচনা খুঁজতে হলে আমাদের যেতে হবে ইউরোপে। ১৮৪৯ সালের দিকে অস্ট্রিয়ানরা একটা নতুন আইডিয়া ব্যবহার করেছিলো। তারা অনেকগুলো বোমার ফিউজে আগুন লাগিয়ে সেগুলো বেলুনে করে অবরুদ্ধ ভেনিস শহরের দিকে করে বাতাসে ছেড়ে দেয়। কিন্তু এ ঘটনা ডেকে আনে এক বিপত্তি। কিছু বেলুন ভেনিসের উপর গেলেও বেশকিছু বাতাসের দিক বদলে আবার অস্ট্রিয়ান সৈন্যদের উপর এসেই বিস্ফোরিত হয়। কী দুর্দশা দেখো! এর প্রায় ৫০ বছর পর বিজ্ঞানী নিকোলা টেসলা তারবিহীন রিমোট কন্ট্রোলের জাদু দেখিয়ে সবাইকে তাক লাগিয়ে দেন। আজও কিন্তু অধিকাংশ ড্রোন রিমোটেই চলে।
কিন্তু এই ছোট্ট যন্ত্র এত স্মার্টভাবে আকাশে ব্যালেন্স রেখে উড়ে আর কাজ করে কীভাবে? এর সাথে থাকা চারটি পাখার সাহায্য এটি আকাশে ভেসে ওঠে আর এদিক সেদিক যেতে পারে। আর এর ভেতরে থাকা বিভিন্ন সেন্সর কোনোদিকে কাত হলে, অথবা কোথাও ধাক্কা বা টান খেলে সংযুক্ত কম্পিউটারকে খবর দেয়, সে অনুযায়ী কম্পিউটার পাখাগুলোর গতি এডজাস্ট করে ব্যালান্স করে নেয়। অপারেটর রিমোট কন্ট্রোলের সাহায্যে ড্রোন কোনদিকে যাবে, উপরে না নিচে আসবে, তা বলে দেয়। এতে জিপিএসও থাকে, যা ড্রোনকে বলে দেয়, সে এখন কোথায় আছে। এখন তো অনেক ড্রোন ব্যাটারি ফুরিয়ে গেলে নিজে নিজেই বাড়ি ফিরতে পারে।
ড্রোনের শুরুর দিকে যুদ্ধে ব্যবহার হলেও এখন ড্রোনের ব্যবহার হয়েছে বহুমুখী। শুরুতেই আমরা শিশু ইথানকে খুঁজে পেতে ড্রোনের ব্যবহারের কথা বলেছি। এরপরে ‘ফ্লাইং ডেলিভারি ম্যান’ হয়ে এখন ঘরে ঘরে পণ্য ডেলিভারিতেও ড্রোনের ব্যবহার হচ্ছে। কখনো কখনো অত্যন্ত নাজুক পরিস্থিতিতে ড্রোন রীতিমত সেভিয়র হয়ে আসে। আফ্রিকার দেশ রুয়ান্ডায় ২ বছরের শিশু ঘিসলানের জন্য অত্যন্ত জরুরি রক্তের দরকার হচ্ছিলো। তার চিকিৎসা যেখানে হচ্ছিলো, সেখানে স্বাভাবিক নিয়মে রক্ত পৌঁছাতে লেগে যেত প্রায় ৩/৪ ঘণ্টা। কিন্তু ড্রোন ডেলিভারির মাধ্যমে মাত্র ৬ মিনিটে রক্ত পৌঁছে যায় সেই হাসপাতালে, আর বেঁচে যায় শিশু ঘিসলানের প্রাণ। এটি ২০১৬ সালের কথা।
ড্রোন দিয়ে বিশাল বিশাল ড্রোন শো করাটা ইতোমধ্যেই বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। আগে বিভিন্ন উন্নত দেশের ড্রোন শো দেখে আমরা মুগ্ধ হলেও, এখন আমাদের দেশেই এই ড্রোন শো আয়োজিত হচ্ছে। আগে যেখানে আতশবাজির আলোর সাথে বিকট শব্দ আর পরিবেশ দূষণ একদম ‘ফ্রি’ পাওয়া যেত, ড্রোন শো-তে কিন্তু সেই ঝামেলা নেই। কোনো শব্দ ছাড়াই আকাশ জুড়ে তৈরি হয় আলোর ম্যাজিক! সেই শো এখন দীর্ঘসময় ধরে তো চলছেই, তার উপর একই ড্রোন অনেকবার ব্যবহার করা যাচ্ছে।
ড্রোন নিয়ে উদ্ধারকাজ একটা বেশ গুরুত্বপূর্ণ এবং যুগান্তকারী ব্যাপার এখন। এই তো, কিছুদিন আগের কথা। আমেরিকার হাওয়াই অঙ্গরাজ্যের নাম শুনেছো? আসলে এটি প্রশান্ত মহাসাগরের মাঝে একগুচ্ছ দ্বীপ। এটি আগ্নেয়গিরির জন্য বিশেষভাবে বিখ্যাত। ২০১৮ সালের একদিন তারা একটা আগ্নেয়গিরি থেকে অগ্ন্যুৎপাতের ম্যাপিং করছিলেন। তখন তারা জানতে পারেন যে, রাস্তায় লাভার স্রোতের জন্য একটি বাড়িতে একজন মানুষ আটকা পড়ে গেছেন। তারা সেখানে একটি ড্রোন পাঠায় এবং রেডিওতে লোকটিকে বলে, তিনি যেন ড্রোনটিকে অনুসরণ করে বের হয়ে আসেন। এভাবে রাতের অন্ধকারে মোবাইলের টর্চ জ্বালিয়ে জঙ্গলের মধ্য দিয়ে ড্রোনকে অনুসরণ করে লোকটি নিরাপদ স্থানে চলে আসতে সক্ষম হন।
যখন কোথাও আগুন লাগে, তখন মানুষের পক্ষে বেশি কাছে যাওয়া সম্ভব হয় না। কিন্তু ড্রোন একেবারে কাছাকাছি গিয়েও তাতে পানি বা কেমিক্যাল ছিটাতে পারে। এছাড়া ভূমিকম্প বা বন্যা হলেও মানুষের পক্ষে সবখানে গিয়ে অবস্থা জানা সম্ভব হয় না। তখন সব জায়গাতে ড্রোন পাঠিয়ে ডিটেইল অবস্থা জানা সম্ভব হয়।
উপরের ঘটনাগুলো পড়ে হয়তো তোমার মনে প্রশ্ন জাগছে, আমাদের দেশে কী ছবি তোলা ছাড়া আর কোনো কাজে ড্রোন ব্যবহার হয় না? ভালো খবর হচ্ছে, হয়। বাংলাদেশে এরই মধ্যে কৃষিকাজে ড্রোনের ব্যবহার শুরু হয়েছে। বিশাল বিশাল কৃষিজমিতে সার ছিটাতে, কীটনাশক স্প্রে করতে, এমনকি জমিতে ক্ষতিকর পোকা পর্যবেক্ষণসহ সার্বিক দেখাশোনাতেও ড্রোনের ব্যবহার হচ্ছে। এতে যে কাজ করতে আগে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাগতো, তা এখন ১০/১৫ মিনিটেই হয়ে যাচ্ছে। যদিও এই ব্যবহারের পরিমাণ এখনো কম, কিন্তু দিন দিন এর পরিমাণ বাড়ছে।
২০১৯ সালেই ঢাকায় ড্রোনের সাহায্যে এডিস মশার বাসা খোঁজার ‘অপারেশন’ চালানো হয়েছিলো এবং মাত্র ২১৪ একর জায়গায় প্রায় ৫,৩৪৭টি সম্ভাব্য প্রজননস্থল চিহ্নিত করা হয়েছিলো। গেল বছর ঢাকায় ড্রোন শো হয়েছে একাধিকবার, তোমরা অনেকেই হয়তো দেখে থাকবে। আর টাটকা খবর হচ্ছে, বাংলাদেশের বগুড়ায় তুরস্কের সহায়তায় ড্রোনের কারখানা হতে চলেছে! কী ভীষণ আনন্দের খবর, তাই না? দেখা যাবে আজ যারা এই লেখা পড়ছো, তোমাদের মধ্যেও কেউ হয়তো এই ড্রোনের কারখানাতেই কিছুদিন পর ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে কাজ করবে! হয়তো এমন দিনও আসবে, যেদিন দুর্গম চর বা হাওরে কোনো অসুস্থ মানুষের জন্য ওষুধ নিয়ে ছুটে যাবে বাংলাদেশে তৈরি ড্রোন, ঠিক যেমনটা রুয়ান্ডায় ছুটে গিয়েছিলো ঘিসলানের জন্য। ভাবতেই রোমাঞ্চ লাগে, তাই না?
বন্ধুরা, আমরা আজ ড্রোন নিয়ে কিছুটা জানার চেষ্টা করলাম। ড্রোন এখন যেন উড়ন্ত এক কম্পিউটার। একে কাজে লাগিয়ে ভালো কাজ যেমন চলছে, তেমনি অনেকেই একে খারাপ কাজেও ব্যবহার করছে। মানুষ বাঁচাতে যেমন ড্রোনের ব্যবহার হচ্ছে, অন্যায়ভাবে মানুষ মারতেও ড্রোন ব্যবহার করছে অনেক দেশ। কিন্তু তুমিই বলো, আমরা মানুষ হয়ে যদি ন্যায়-অন্যায়, সঠিক-বেঠিক না বেছে চলি, তাহলে আমরা আর সত্যিকারের মানুষ হলাম কীভাবে? তাই প্রযুক্তিকে যেন আমরা মানুষের উপকারেই কেবল কাজে লাগাই; একে হাতে পেয়ে আমরা নিজেরা যেন অমানুষ হয়ে না যাই। আমাদের বিশ্বাস, বড় হয়ে তোমরাই তৈরি করবে আগামীর সুন্দর পৃথিবী। তোমাদের সবার জন্য অনেক দোয়া ও শুভকামনা। আল্লাহ হাফেজ।
প্রকাশকাল: আগস্ট ২০২৬



