শিশুর ভাইরাল ডায়রিয়া

ডা. আশরাফ হোসেন

0
59

বন্ধুরা, ডায়রিয়া মূলত তিন প্রকারের হয়, ব্যাকটেরিয়াল, প্রোটোজোয়াল এবং ভাইরাল। এগুলোর মধ্যে সবচেয়ে সাধারণ হলো ভাইরাল ডায়রিয়া। রোটাভাইরাস, এন্টেরোভাইরাস বা অ্যাডিনোভাইরাসের মতো বেশ কিছু ভাইরাস আছে, যেগুলো আমাদের খাদ্যনালীতে সংক্রমণ ঘটায়। এই ভাইরাল সংক্রমণ থেকে শরীরে ডায়রিয়ার প্রকোপ দেখা দিলে তাকেই ভাইরাল ডায়রিয়া বলা হয়। বর্তমানে সমগ্র পৃথিবীতে রোটাভাইরাসই ভাইরাল ডায়রিয়ার সবচেয়ে বড় কারণ। প্রধানত পাঁচটি ‘এফ’ থেকে ডায়রিয়া ছড়ায়। এগুলো হলো ফিঙ্গার, ফিসিজ, ফ্লুইড, ফুড ও ফোমাইটস (জামাকাপড়)। আসলে অপরিষ্কার পরিবেশে ডায়রিয়ার মূলে থাকা ভাইরাসগুলো সক্রিয় হয়ে যায়। তাই ডায়রিয়া থেকে বাঁচতে গেলে শিশুদের মধ্যে স্বাস্থ্যবিধি যথাযথভাবে মেনে চলার অভ্যাস তৈরি করা অত্যন্ত জরুরি। এ ছাড়া বাবা-মা এবং শিশুর কাজকর্ম যারা করছেন, তাঁদেরও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকা প্রয়োজন।
বন্ধুরা, এবার এসো আমরা ভাইরাল ডাইরিয়ার লক্ষণগুলো সম্পর্কে জানার চেষ্টা করি। অনেকসময়ই দেখা যায় শিশুদের ভাইরাল ডায়রিয়া শুরু হওয়ার ৩-৪ দিন আগে থেকে সর্দিকাশি এবং হালকা জ্বর হয়। এরপর পানির মতো তরল পায়খানা আরম্ভ হয়। সঙ্গে বমি এবং পেটে ব্যথাও হতে পারে। ভাইরাল ডায়রিয়ার ক্ষেত্রে মলের মধ্যে পানির পরিমাণ বেশি থাকে, অন্যান্য ধরনের ডায়রিয়ার মতো আম বা শ্লেষ্মা (মিউকাস) ততটা বের হয় না। অন্যান্য ধরনের ডায়রিয়ার সঙ্গে ভাইরাল ডায়রিয়ার আর একটি প্রধান পার্থক্য হলো ভাইরাল ডায়রিয়ায় সাধারণত মলের সঙ্গে রক্ত বের হয় না। এই রোগের প্রকোপ প্রথম দু-তিন দিন একটু বেশিরকম থাকে, তারপর ওযুধ প্রয়োগ হলে লক্ষণগুলো আস্তে আস্তে বিদায় নিতে শুরু করে। সাধারণত ৬-৭ দিনের মধ্যে ভাইরাল ডায়রিয়া সম্পূর্ণ সেরে যায়। ভাইরাল ডায়রিয়া এমনিতে খুব মারাত্মক অসুখ না হলেও, সমস্যা হচ্ছে, পায়খানা-বমি দু’টোই একসঙ্গে হলে পানিশূন্যতার ব্যাপারটা চলে আসে। পানিশূন্যতা হলে স্বাভাবিকভাবেই কিডনি শরীরে পানি ধরে রাখতে চেষ্টা করে, তাই প্রশ্রাবের পরিমাণ অনেক কমে যায়। প্রচণ্ড পিপাসা লাগে। অতিরিক্ত পানিশূন্য হয়ে গেলে শিশুর চোখ কোটরে ঢুকে যায়, শরীর ক্লান্ত হয়ে পড়ে। খুব বেশি পানিশূন্যতা হলে শিশু এত নির্জীব হয়ে পড়ে যে তখন পানিও খেতে চায় না। এ ছাড়া পানিশূন্যতায় শিশুর হৃদস্পন্দনের হার বেড়ে যায়, ত্বক ও জিভ শুষ্ক হয়ে যায় এবং নিঃশ্বাস-প্রশ্বাসও অপেক্ষাকৃত অনেক দ্রুত হয়ে যায়।
বন্ধুরা, এবার এসো আমরা ভাইরাল ডায়রিয়ার চিকিৎসা সম্পর্কে জেনে নিই। ডায়রিয়ার কারণে শরীর থেকে প্রয়োজনীয় পানি ও লবণ বেরিয়ে যায়। ডায়রিয়া হলে চিকিৎসকের মূল কর্তব্য শিশুকে পানিশূন্যতার প্রকোপ থেকে উদ্ধার করা। তাই ডায়রিয়ার ক্ষেত্রে প্রধান চিকিৎসা হলো ওআরএস (ওরাল রিহাইড্রেশন সলিউশন)। আসলে পানির সঙ্গে লবণ আর চিনি মিশিয়ে খেলে শরীরের পক্ষে তা শোষণ করতে সুবিধা হয়। ডায়রিয়ার সঙ্গে জ্বর বা অতিরিক্ত বমি হলে জ্বরের এবং বমির ওষুধ দেওয়া হয়। শিশুর ডায়েরিরা হলে কিন্তু বুকের দুধ খাওয়ানো বন্ধ করার কোনো নিয়ম নেই। তবে ছ’মাসের কম যেসব শিশু বুকের দুধপানের ওপর নির্ভরশীল, তারা যদি মারাত্মক পানিশূন্যতার শিকার হয়, তাহলে বুকের দুধের সঙ্গে ওআরএস দিতে হতে পারে। শিশু যত ছোট হয়, তার শরীরে পানির পরিমাণ তত কম থাকে। তাই একদম ছোট শিশুদের ডায়রিয়া হলে সেটা খুব গুরুত্বের সাথে নেওয়া উচিত। ডায়রিয়া হলে পানির পাশাপাশি শরীর থেকে অনেকটা জিঙ্ক বেরিয়ে যায়। তাই ওষুধ দিয়ে জিঙ্ক প্রতিস্থাপন করতে হয়। এ ছাড়া প্রোবায়োটিক জাতীয় ওষুধও অনেকসময় দেওয়া হয়। তবে কোনো কোনো সময়ে পানিশূন্যতা এত বেড়ে যায়, শরীর এত নির্জীব হয়ে পড়ে যে শিশু পানি খাওয়ার অবস্থাতেও থাকে না। অনেকসময় বমির ওষুধ খেয়েও শিশুর বমি বন্ধ হয় না। এইরকম মারাত্মক পানিশূন্যতা হলে কিন্তু হাসপাতালে যাওয়া ছাড়া গতি নেই। শিশু শরীরে একটুও পানি ধরে না রাখতে পারলে দু’টো বিকল্প রয়েছে। নাকের মধ্যে দিয়ে একটা নল ঢুকিয়ে তার মাধ্যমে শিশুকে পানি খাওয়ানোর চেষ্টা করা যেতে পারে। তা না হলে স্যালাইন বা আইভি দিয়ে শরীরের পানি প্রতিস্থাপন করতে হয়। মনে রাখবে, ভাইরাল ডায়রিয়া হলে কিন্তু অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়ানো একদম উচিত নয়। প্রথমত, ভাইরাল ডায়রিয়ায় অ্যান্টিবায়োটিক খেয়ে কোনও লাভ হবে না, কারণ অ্যান্টিবায়োটিক শুধুমাত্র ব্যাকটেরিয়া মারতে পারে, ভাইরাস নয়। দ্বিতীয়ত, অ্যান্টিবায়োটিক খেলে তার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবে ডায়রিয়া আরও খারাপ পর্যায়ে চলে যেতে পারে।
বন্ধুরা, ডায়রিয়া প্রতিরোধ করতে হলে প্রথমেই যথাযথ স্বাস্থ্যবিধি বজায় রাখতে হবে। যেহেতু অস্বাস্থ্যকর পানি এবং ময়লা হাত থেকেই বেশিরভাগ সময়ে এই অসুখ ছড়ায়, তাই এই দু’টোর দিকে বিশেষভাবে নজর দিতে হবে। শিশুকে সবসময় পরিষ্কার, স্বাস্থ্যকর পানি খাওয়াতে হবে। শিশুকে পারতপক্ষে বাইরের পানি বা খাবার খাওয়ানো যাবে না। খাবার খাওয়ার আগে অবশ্যই যেন সাবান দিয়ে ভাল করে হাত ধোয়া হয়, তা খেয়াল রাখতে হবে। আমরা যখন হাত ধুই, তখন অনেকসময়ই অন্যমনষ্ক থাকি, ফলে ঠিকমতো হাত পরিষ্কার হয় না। সেটা যেন না হয়। শিশুর খাওয়ার জন্য যে বাসনপত্র ব্যবহার হচ্ছে, সেগুলো যেন ভালো করে ধুয়ে পরিষ্কার করা থাকে। শিশুর ১-২ বছর বয়সের মধ্যে ফুটানো পানি খাওয়াতে পারলে ভালো হয়। ডায়রিয়া বেশি দিন ধরে চললে দুধ এবং দুগ্ধজাত পণ্য এড়িয়ে চলা ভালো, না হলে হজমের সমস্যা হতে পারে। ফলের রস বা বেশি চিনি দেওয়া খাবার খাওয়ানো যাবে না। ডায়রিয়ায় চাল থেকে তৈরি খাবার, যেমন ভাত, মুড়ি, চিঁড়ে, খই খাওয়া ভালো।