
ঘটনা-১ : স্কুলে ব্রেক দিয়েছে। সবাই হুড়মুড় করে বাইরে চলে গেছে। দৌড়াদৌড়ি-ছোটাছুটি করছে। কিন্তু তোমার এসব ভালো লাগে না। তুমি ব্রেক টাইমে বসে বসে গল্পের বই/কমিক্স পড়ো, কিংবা ছবি আঁকো। এমনটা প্রায়শই হয়। একদিন হঠাৎ বন্ধুরা জিজ্ঞেস করে- কী রে, তুই এমন কেন? সবাই খেলতে যাচ্ছে, আনন্দ করছে, তুই যাস না কেন? তখন তোমারও মনে হলো- আসলেই তো! আমি এমন কেনো?
ঘটনা-২ : ক্লাস পার্টি হবে কিংবা কোনো অনুষ্ঠান আছে সামনে। শিক্ষক জিজ্ঞেস করলেন- কে কে ভলান্টিয়ার/স্বেচ্ছাসেবক হতে চাও? সবার আগে তুমি হাত তুললে। তোমার আগ্রহ দেখে তোমাকে টিম লিডার বানিয়ে দিলো স্যার। তুমি সবাইকে নিয়ে খুব সুন্দর করে আয়োজনটা সম্পন্ন করলে। কিন্তু তোমার আবার ক্লাসের পড়াশুনাতে মনোযোগ নেই। পরীক্ষায় মধ্যম মানের রেজাল্ট করছো। বাবা-মা সেটা নিয়ে অসন্তুষ্ট। তারা তোমাকে নিয়ে বসলেন। জিজ্ঞেস করলেন- পাশের বাড়ির ছেলেটা তোর ক্লাসমেট। ও কত ভালো রেজাল্ট করছে, পড়াশুনায় এত মনোযোগী! বাইরে সময় কাটায় না, ওই সব প্রোগ্রাম-টোগ্রাম করে না। কত্ত ভালো! তুই এমন কেন? তোর রেজাল্ট ভালো করার কোনো চেষ্টা নাই কেন? তখন তোমার মনে হলো- আমি এমন কেনো?
আসলে আমরা প্রত্যেকটা মানুষ আলাদা। স্রষ্টা আমাদের প্রত্যেককে ভিন্ন ভিন্ন স্বভাবপ্রকৃতি, চিন্তা-ভাবনা, রুচি, পছন্দ-অপছন্দ, আবেগ অনুভূতি, কর্মদক্ষতা দিয়ে সৃষ্টি করেছেন। আর এসব বৈশিষ্ট্য নিয়েই তৈরি হয় আমাদের Personality বা ব্যক্তিত্ব। এ বিষয়টা অনেকটাই জন্মগত। পরবর্তী জীবনে কারো কারো ব্যক্তিত্বে পরিবর্তনও আসে। তবে মৌলিক বৈশিষ্ট্য বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই অপরিবর্তিত থাকে। ব্যক্তিত্বই মানুষকে তার ব্যবহারিক জীবনে, সামাজিক জীবনে ভিন্নতা দেয়।
Personality’র ধরন নিয়ে প্রথমে বই লিখেছিলেন সুইস মনোবিজ্ঞানী কার্ল গুস্তাভ ইয়াং। ১৯২১ সালে তিনি জার্মান ভাষায় লিখেছিলেন Personality Types নামের বইটি। পরবর্তীতে আমেরিকান লেখিকা ক্যাথারিন কুক ব্রিগস এবং তার মেয়ে ইসাবেলা ব্রিগস মেয়ার্স মিলে এই গবেষণাকে এগিয়ে নিয়ে যান। তারা সূচনা করেন Myers–Briggs Type Indicator (MBTI) এর। পার্সোনালিটি যাচাইয়ের জন্য বর্তমানে এই প্রক্রিয়াটি সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয়। এই ইন্ডিকেটর অনুযায়ী মানুষের ব্যক্তিত্বকে মোট ১৬টি ধরনে ভাগ করা হয়। অর্থাৎ এ থিয়োরি অনুযায়ী মানুষ ১৬ ধরনের হয়। এই ষোলটি ভাগ আবার ৪টি মৌলিক ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত।
যেমন-
১. মানুষটি তার প্রাণশক্তি পায় কোথায়/কীভাবে?
২. কোনো বিষয়ে তথ্য বা ধারণা গ্রহণ করে কীভাবে/কোন পদ্ধতিতে?
৩. সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে কোন পদ্ধতিতে?
৪. জীবনযাপনের ক্ষেত্রে/কাজের ক্ষেত্রে কোন পদ্ধতিতে করে?
প্রথমটি, অর্থাৎ মানুষ তার প্রাণশক্তি পায় কোথা থেকে এর উপর ভিত্তি করে মানুষকে দুই ভাগে ভাগ করা হয়-
১. Introvert (I) বা অন্তর্মুখী : এরা মূলত একাকিত্বকে ভালোবাসে। একাকিত্বে স্বাচ্ছন্দবোধ করে। ভিড়কে ভয় পায়। বেশি মানুষের সামনে যেতে বিব্রত হয়। তারা বেশি কথা না বললেও গভীর চিন্তা করে। দেখবে এরা ক্লাসে কম কথা বলে, কিন্তু খাতায় ভালো লেখে। বেশি মানুষের মধ্যে বেশি সময় থাকলে এদের ধীরে ধীরে অস্বস্তি কাজ করতে থাকে। পরে দীর্ঘ সময় একা থাকলে তারা আবার প্রাণশক্তি ফিরে পায়।
২. Extrovert (E) বা বহির্মুখী : এদের প্রাণশক্তির জায়গাটাই হলো মানুষ। তারা আড্ডাবাজ হয়। প্রচুর কথা বলতে ভালোবাসে। একা থাকতে তাদের ভয় হয়। একা হলে তারা মনমরা হয়ে পড়ে। তারা বন্ধুদের সাথে থাকলে আনন্দ পায়, গ্রুপ স্টাডি, বিতর্ক, খেলাধুলা পছন্দ করে। ক্লাসে শিক্ষক কোনো প্রশ্ন জিজ্ঞেস করলে সে যতটুকুই পারুক হাত তুলে উত্তর দেয়।
দ্বিতীয়টি অর্থাৎ কোনো বিষয়ে তথ্য বা ধারণা গ্রহণ করে কীভাবে তার উপর ভিত্তি করে মানুষের ব্যক্তিত্বকে দুই ভাগ করা হয়-
১. Sensing (S) বা অনুভূতিশীল : এরা নিজস্ব অনুভূতির উপর নির্ভরশীল। আমাদের যে পাঁচটি ইন্দ্রিয় আছে- চোখ, কান, নাক, জিহ্বা এবং ত্বক- এর মাধ্যমেই তারা যা অনুভব করে, তার উপর বিশ্বাস করে। এরা তথ্য ভালোবাসে, বইয়ের পড়া, বিভিন্ন তথ্য মুখস্থ করতে পছন্দ করে। এরা বর্তমানের উপর অর্থাৎ ‘এখন কী আছে’ সেটায় মনোযোগ দেয়। এরা যুক্তিবাদী।
২. Intuition (N) বা কল্পনাপ্রবণ : এরা কল্পনা করতে ভালোবাসে। মনের সিদ্ধান্ত বা অন্তর্দৃষ্টির উপর নির্ভর করে। এই শ্রেণির মানুষ গল্প, ভবিষ্যৎ ভাবনা, নতুন আইডিয়ায় আগ্রহী। দেখবে তারা শিল্পচর্চায় বেশি আগ্রহী থাকে। যে কোনো বিষয়ের গভীর জ্ঞান বা তত্ত্বজ্ঞান খুঁজতে চায়। দূর ভবিষ্যতে কী হবে তা নিয়ে ভাবে এরা।
তৃতীয়টি, অর্থাৎ সিদ্ধান্ত গ্রহণ পদ্ধতির উপর নির্ভর করে মানুষকে দুই প্রকারে ভাগ করা যায়-
১. Thinking (T) বা চিন্তাশীল : এরা নিয়ম ও যুক্তিকে গুরুত্ব দেয়। নিয়ম মেনে চলতে এবং মানুষকে নিয়মের মধ্যে রাখতে পছন্দ করে। এরা আবেগে প্রভাবিত না হয়ে যৌক্তিক পদ্ধতিতে চিন্তা করে সিদ্ধান্ত নেয়। নিয়ম মানতে গিয়ে তারা কঠোর হয়। তোমাদের ক্লাস ক্যাপ্টেন বা মনিটররা সাধারণত এই ধরনের হয়। তারা সবাইকে নিয়ম মানতে বাধ্য করে।
২. Feeling (F) বা ভাবপ্রবণ : এরা মানুষের অনুভূতিকে গুরুত্ব দেয়। কাউকে নিয়ম ভাঙার দায়ে অভিযুক্ত করার আগে তারা বলে- ‘তার সমস্যাটা বোঝা দরকার’। তারা সহানুভূতিশীল ও হৃদয়বান হয়, মানবিক হয়। তবে সেকারণে তারা মানুষের দ্বারা প্রভাবিত হয় বেশি। যেমন- কিছু বন্ধু আছে যারা নিজের গুরুত্বপূর্ণ কাজ বাদ দিয়েও বন্ধুত্বের খাতিরে তোমার সাথে আড্ডায় সময় কাটায়।
চতুর্থত, জীবনযাত্রা এবং কাজের পদ্ধতির উপর মানুষ দুই ধরনের হয়-
১. Judging (J) বা বিচারধর্মী : এরা মূলত কাঠামোবদ্ধ জীবন পছন্দ করে। সবকিছু গোছানো এবং পরিকল্পিত করতে পছন্দ করে। পরিকল্পনা অনুযায়ী সময়মতো কাজ শেষ করতে ভালোবাসে। কাজে কোনো হেলাফেলা/অলসতা পছন্দ করে না। যেমন- তোমার কিছু বন্ধু আছে যারা সেমিস্টারের শুরুতেই পরিকল্পনা অনুযায়ী নিয়মিত পড়াশুনা করে, সময়মতো হোমওয়ার্ক জমা দেয়। তারা সাধারণত ফার্স্ট বেঞ্চার হয়।
২. Perceiving (P) বা গ্রহণধর্মী : এরা যে কোনো পরিবর্তন বা অবস্থাকে স্বাভাবিকভাবে সহজে মেনে নেয়। এরা উদার এবং উদাসীন ধরনের হয়। তারা স্বাধীন চলাফেরা পছন্দ করে। বাঁধাধরা কাজ এবং ডেডলাইন তারা মানতে পারে না। কাজ শুরু করে খুব উৎসাহ নিয়ে, কিন্তু সময়মতো শেষ করতে পারে না। দেখবে তোমার কিছু বন্ধু আছে যারা পরীক্ষা চলে আসলে হুড়মুড় করে পড়া শুরু করে। সময়মতো তারা ক্লাসওয়ার্ক জমা দিতে পারে না।
এখন এই যে প্রত্যেকটি ধরনের নামের শুরুর অক্ষর সেগুলো খেয়াল করেছ? সেগুলোকে আলাদা ব্রাকেটে লেখা হয়েছে। কারণ এই আদ্যক্ষরগুলো নিয়েই পরবর্তী কাজ। প্রতিটি ভিত্তির মধ্যে এক ধরনের বৈশিষ্ট্য বাছাই করে নিয়ে যেটি হবে সেটি হলো একজনের সামষ্টিক পার্সোনালিটি বা ব্যক্তিত্বের স্বরূপ। যেমন ধরো- প্রথম ভিত্তি অনুযায়ী কেউ Extrovert (E), দ্বিতীয় ভিত্তি অনুযায়ী Sensing (S), তৃতীয় ভিত্তি অনুযায়ী Feeling (F) আর চতুর্থ ভিত্তি অনুযায়ী Perceiving (P)। তাহলে তার ব্যক্তিত্বের প্রকার দাঁড়াবে- ESFP. তোমার কী মনে হয়? তুমি আসলে কোন ক্যাটাগরিতে পড়ো? একটু চিন্তা করে হিসেব করে দেখো তো!
মনোবিজ্ঞানীরা পার্সোনালিটি অনুযায়ী মানুষের ক্যারিয়ার কেমন হওয়া উচিত, তা নিয়েও গবেষণা করেছেন। কারণ একেক ধরনের ব্যক্তিত্বের মানুষ একেক ধরনের কাজের উপযোগী। নিজের জন্য যথোপযুক্ত কাজ খুঁজে নিতে না পারায় এবং সামাজিক চাপে অনেকে ভুল ক্যারিয়ার চয়েস করে। ফলে সফল হতে পারে না।
আগামী পর্বে আমরা পার্সোনালিটি অনুযায়ী ক্যারিয়ার চয়েসে বিজ্ঞানীদের পরামর্শের বিষয়ে জানবো। তুমি তখন বুঝতে পারবে তোমার পছন্দের জায়গা কোনটি। জীবনে সফল হওয়ার জন্য সঠিক ক্যারিয়ার চয়েস করা কিন্তু খুবই গুরুত্বপূর্ণ।



