গত সংখ্যায় আমরা বলছিলাম খেয়াল করে দেখার কথা। কী কী জিনিস তোমরা দেখেছ? নতুন করে কোন জিনিসগুলো চোখে পড়েছে তোমাদের? (আমাকে জানাতে পারো মেইল/ চিঠি/ফেসবুক পেইজের মাধ্যমে)
তোমাদের কি চোখে পড়েছে তোমার বয়সী একটি ছেলে বাসের হেল্পারি করছে, কারখানায় কাজ করছে কিংবা ফুটপাথে টোকাইয়ের কাজ করছে? তার জন্য কী করা যায় কখনো কি ভেবেছ?
আচ্ছা, আমরা পড়াশোনা করি কেন? শিক্ষিত হওয়ার জন্য। শিক্ষিত হয়ে আমরা কোনো একটি পেশায় যাবো। তারপর আয় করব, খাবো, বেড়াব। একদিন মরে যাবো। এটাই কি আমাদের জীবনের উদ্দেশ্য?
কখনো কি ভেবেছ— বড় হয়ে আব্বুর জন্য, আম্মুর জন্য কী করবে? তোমার বন্ধুটিকে কিভাবে উপকার করবে? আশেপাশের মানুষের জন্য কী করবে?
পৃথিবীতে যত বড় মাপের মানুষ এসেছেন তারা সবাই মানুষের উপকারের জন্য কাজ করে গেছেন। তার কয়েকটি উদাহরণ দেয়া যাক— নবীজী সা: এবং সেই বুড়ির ঘটনাটি তোমরা হয়তো জানো। এক বুড়ি নবীজীর সা: সাথে শত্রুতা করে প্রতি রাতে তাঁর চলাচলের পথে কাঁটা বিছিয়ে রাখত। সকালে নবীজী যখন বের হতেন তখন যাতে পায়ে কাঁটা ফোটে সেটাই ছিল তার উদ্দেশ্য। নবীজী সা: সকালে কাঁটা সরিয়ে সরিয়ে পথ চলতেন। বেশ কিছুদিন পর নবীজী সা: লক্ষ করলেন কয়েকদিন ধরে পথে কাঁটা নেই। তিনি বুড়ি মহিলার খোঁজ নিয়ে দেখলেন মহিলা অসুস্থ। নবীজী সা: তার সেবার ব্যবস্থা করলেন। মহিলা সুস্থ হয়ে জানতে পারল যার সাথে সে শত্রুতা করেছে, তার বিপদে সেই মুহাম্মাদ সা:-ই সহযোগিতার হাত বাড়িয়েছেন। সে নবীজীর ওপর ঈমান আনল।
একবার ঈদের মাঠে একটি শিশুকে কাঁদতে দেখে রাসূল সা: তাকে জিজ্ঞেস করে জানতে পারলেন সে এতিম। তিনি তাকে বাড়িতে নিয়ে এসে নতুন পোশাক এবং ভালো খাবারের ব্যবস্থা করলেন। তাকে নিজের সন্তানের মতোই লালনপালন করতে লাগলেন।
হজরত ইবরাহীম আ: প্রতিবেলা খাবারের সময় একজন অতিথি নিয়ে বসতেন। খুঁজে খুঁজে অভুক্ত অসহায় পথচারী লোককে অতিথি হিসেবে খাওয়ানোর জন্য নিয়ে আসতেন।
হযরত উমার ফারুক রা: যখন মুসলিম জাহানের খলিফা তখন তিনি বলেছিলেন— ‘ফোরাতের তীরে একটি কুকুরও যদি না খেয়ে মারা যায়, তাহলে আমি উমারকে আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করতে হবে’। তাঁরা নিজেকে নিয়েই ব্যস্ত থাকেননি। তাঁরা মানুষের জন্য তাদের জীবন উৎসর্গ করে গেছেন। তাই আমরা তাঁদের শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করি।
আমেরিকান শিল্পপতি এন্ড্রু কার্নেগি ছোটবেলায় অনেক দরিদ্র ছিলেন। ছোটবেলায় একবার একটি পার্কে বেড়াতে গেলেন তিনি। পার্কের দারোয়ান ছেঁড়া, ময়লা পোশাক দেখে তাকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে বের করে দেয়। তিনি প্রতিজ্ঞা করলেন বড় হয়ে ধনী হলে তিনি পার্কটি কিনে ফেলবেন। ধনী হবার পর তিনি সত্যিই পার্কটি কিনে নিলেন। পার্কের গেইটে লিখে দিলেন— আজ থেকে এই পার্কে দিনে বা রাতে যেকোনো পোশাকে যেকোনো বয়সী লোক প্রবেশ করতে পারবে।
মাদার তেরেসার জন্ম ইউরোপের আলবেনিয়াতে। কিন্তু তিনি ভারতবর্ষে ছুটে এসেছেন কুষ্ঠরোগে আক্রান্ত মানুষের সেবা দিতে। বাংলাদেশেও সেবা দেয়ার জন্য এসেছেন ভ্যালেরি এন টেলর। ব্রিটেনে জন্ম নেয়া টেলর সিআরপি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বাংলাদেশের অসহায় পঙ্গু ও প্যারালাইজড রোগীদের চিকিৎসা দিয়ে যাচ্ছেন।
এখন কথা হলো কেন তুমি পরের জন্য কাজ করবে? তাদের উপকার করে তোমার কী লাভ? আসলে আমরা প্রত্যেকেই একে অন্যের সাহায্য নিয়ে সমাজে টিকে আছি। তোমার খাবারগুলো প্রথমে কোনো কৃষক শস্য হিসেবে উৎপাদন করে। তারপর সেগুলোকে কৃষিবাজারে নিয়ে আসে। সেখান থেকে তোমার শহরের বাজারে আসে। সেখান থেকে তোমার আব্বু হয়তো কিনে আনে। এই যে এতটা পথ পাড়ি দিয়ে আসে সেখানে কত শত শ্রমিক এই পণ্যগুলো পরিবহনে সহায়তা করে ভেবেছ?
তুমি যে পোশাক পরো, শার্ট বা প্যান্ট সেটা কিভাবে পেলে? দোকান থেকে কিনেছ, তাইতো! দোকানি কিভাবে পেল? কোন দর্জি সেটি বানিয়ে দিয়েছে। দর্জি কাপড় পেল কোথায়? কাপড় বুননকারী প্রতিষ্ঠান অনেক শ্রমিকের সহযোগিতায় কাপড় বানিয়েছে। তারা কী দিয়ে বানিয়েছে? সুতা দিয়ে। সুতা বানিয়েছে স্পিনিং মিলের কর্মচারীরা। কী দিয়ে বানিয়েছে? তুলা দিয়ে। তুলা সংগ্রহ করেছে কিছু চাষি তুলার গাছ থেকে। এই যে এতগুলো ধাপ অতিক্রম করে তোমার সুন্দর ডিজাইনের শার্টটি তুমি পরছো, সেটার পেছনে কি এই শত শত মানুষদের সহযোগিতা অস্বীকার করতে পারবে?
তুমি অনায়াসে বলতে পারো— আমি তো নিজের টাকা দিয়ে কিনেছি! এবার লক্ষ করো বৃষ্টির দিনে স্কুলে বা অন্য কোথাও যাবার সময় তুমি যখন রিকশার অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকো তখন টাকা বেশি দিলেও কি সহজে পাওয়া যায়? অথবা তোমার জুতা ছিঁড়ে গেল। এলাকার একমাত্র মুচি যদি সেইদিন ছুটিতে অথবা বেড়াতে চলে যায়, কত টাকা দিয়ে তুমি তাকে খুঁজে আনতে পারবে?
সেজন্য আমাদের মনটাকে উদার করতে হবে। আমাদের পরোপকারী হতে হবে। আমাদের লক্ষ থাকতে হবে বড় হয়ে আমরা মানুষের সেবায় আত্মনিয়োগ করব।
কবি বলেছেন—
সবার সুখে হাসব আমি,
কাঁদব সবার দুখে
নিজের খাবার বিলিয়ে দেবো
অনাহারীর মুখে।
এবার কথা হলো পরোপকারের জন্য কী করতে হবে? তুমি তো হাসপাতাল বানাতে পারবে না, অনেক মানুষের জন্য খাবার বা পোশাকের ব্যবস্থা করতে পারবে না। তুমি কী করতে পারবে? খুব সহজ। নিজের ঘর থেকেই শুরু করো।
তোমার আম্মুকে রান্নার উপকরণগুলো এগিয়ে দাও। আব্বুর জামা-ফাইল ইত্যাদি এগিয়ে দাও। তোমার বাসায় যদি কোনো কাজের লোক থাকে তার সাথে ভালো ব্যবহার করো। তোমার ক্লাসে হয়তো তোমারই কোনো বন্ধু টিফিন আনতে পারেনি, তাকে তোমার টিফিন থেকে কিছু অংশ দাও। কোনো বন্ধুর হয়তো বইয়ের অভাব। তোমরা কয়েক বন্ধু মিলে তাকে বই কিনে দিতে পারো। এসব কাজে বন্ধুত্ব মজবুত হয়। সৌহার্দ্য এবং সম্প্রীতি বাড়ে।
পারস্পরিক সহযোগিতায় কাজে সফলতা আসে বহু গুণে। আজকে তুমি কারো বিপদে সহযোগিতা করলে দেখবে একদিন তোমার বিপদে অন্য কেউ এগিয়ে এসেছে। নিজেকে গড়ার জন্য মনটাকে উদার করা জরুরি। সহযোগিতামূলক মনোভাব ছাড়া বড়মাপের মানুষ হওয়া যায় না।



