অনেক অনেক বছর আগেকার কথা। এক যে ছিল জলহস্তী। তার নাম ইসানতিম। বিরাট এক রাজ্যে তার বসবাস। বিপুল আয়তন ভূখণ্ডের রাজা সে। স্থল ও জলভাগের জীব জানোয়ার সবাই তার প্রজা। একটা দুটা নয়, সাত সাতটা বউ তার। বেশ আছে জলহস্তী। দিনকাল খুব সুখেই কাটছে তার। দেহের আকার আয়তনে সে বিরাট। একমাত্র হাতিই তার চেয়ে বড়োসড়ো। অন্য কোনো প্রাণীই তার সঙ্গে তুলনীয় নয়। ইসানতিম নামের জলহস্তী ভালো মনের প্রাণী। কোনো ঘোরপ্যাঁচ নেই তার মধ্যে। সে তার বউদের খুবই ভালোবাসে। যেখানেই যায়, তারা সঙ্গিনী হয় তার। একা একা কখনোই সে কোথাও যায় না।
ইসানতিমের ভালো একটা গুণ আছে। সেটার কথা না বললেই নয়। এই গুণের জন্যে সে প্রজাদের খুবই প্রিয়। প্রতি মাসে অন্তত দুই তিনবার সে বিশাল ভোজের আয়োজন করে থাকে। অনেক ভালো খানাপিনা হয় সে উৎসবে। সত্যি বলতে কী, প্রজারা উন্মুখ হয়ে থাকে, কখন আসবে সেই ভোজের দিন। ভালোমন্দ দু’টি খাওয়া যাবে। সবার সঙ্গে সবার দেখা সাক্ষাৎ হবে। ধুম নাচগানের ব্যবস্থা থাকে ভোজ সমাপনের পর। সে কারণে সবাই অধীর আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করতে থাকে, কখন আসে ভোজের নিমন্ত্রণ। সক্কলেরই দাওয়াত থাকে। বুড়ো সুড়ো আণ্ডা বাচ্চা কেউ বাদ যায় না। সবাই নিমন্ত্রিত হয়।
একবার ভোজের আয়োজন করা হয়েছে যথারীতি। ইসানতিমের মাথায় একটা বুদ্ধি এসেছে। খাওয়া দাওয়ার পর্ব শুরু হবে হবে এমন অবস্থা। জলহস্তী রাজা হঠাৎই অদ্ভুত একটা ঘোষণা দিলো। কেউ এ ধরনের কথা শোনার জন্যে তৈরি ছিল না। মুচকি মুচকি হেসে ইসানতিম বললো,
তোমরা আমার নেমন্তন্ন পেয়ে এসেছো, ভালো কথা। তোমাদের একটা প্রশ্ন করতে চাই আজ। কেউ কি আমার নাম জানো? যদি না জানো, তাহলে একটা কথা আছে আমার।
অভিনব ধরনের এই কথা শুনে সবাই অবাক। জলহস্তী রাজা হঠাৎ এমন কথা বলছে কেন? তারা উৎসুক চোখে তাকায়। দেখা যাক, কী বলতে চাইছে সে।
ইসানতিম তাদের বলে,
আমার নাম যদি কেউ বলতে না পারো, তাহলে আজকের খাওয়া দাওয়া বন্ধ। আজ সবাইকে না খেয়ে ফিরে যেতে হবে।
আসলে হয়েছে কী, জলহস্তীর যে কী নাম, সেটা সাধারণ প্রজারা জানে না। এটা জানে শুধু তার বৌয়েরা। প্রজারা কখনো শোনেনি তাদের জলহস্তী রাজার নাম। জানবার অবশ্য কোনো দরকার হয়নি কোনো দিন। তারা এতদিন দাওয়াত পেয়েছে। পেট পুরে খেয়ে দেয়ে হৈ হল্লা আনন্দ ফূর্তি করে চলে গেছে। রাজার নাম জানবার কোনো তাগিদ বোধ করেনি।
সমবেত প্রাণীরা সকলে চুপচাপ। কারো মুখে কোনো কথা নেই। থাকবেই বা কেমন করে? এই প্রশ্নের উত্তর কেউ জানে না। সে কারণেই এ নীরবতা। একজন আরেক জনের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। নিঃশব্দে। ফালতু একটা ঝামেলায় পড়া গেছে বাপু। খিদেয় পেট চোঁ চোঁ করছে এদিকে। এর মধ্যে কী উটকো উল্টাপাল্টা প্রশ্ন। যত্তসব! সবাই মনে মনে খুব বিরক্ত। মজার মজার খানাপিনার আনন্দটা আজ মাঠে মারা গেল। শুধু শুধুই। জলহস্তীর যত্ত পাগলামি। কোনো মানে হয় এসবের? রাজা বলে কথা! প্রতিবাদ করবার সুযোগ নেই।
সবাই উঠে পড়ার উপক্রম করছে। নিতান্ত অনিচ্ছায়। উপোস থাকতে হবে আজ। কারোই তো জলহস্তী রাজার নাম জানা নেই। সুতরাং আজকের এই ভোজসভা বাতিল। সবাই উঠি উঠি করছে। এমন সময় এক বুড়ো কচ্ছপ উঠে দাঁড়ালো। মিনমিন করে রাজাকে উদ্দেশ্য করে বললো সে,
রাজা মশাই ছোট্ট একটা বিষয় জানার আছে আমার। আজকে তো আমরা না খেয়ে দেয়ে চলেই যাচ্ছি। পরের বার যখন ভোজসভা হবে, তখন যদি আমরা আপনার নাম বলতে পারি তাহলে কী হবে? সেটা কি দয়া করে বলবেন?
জলহস্তী সবাইকে বোকা বানাতে পেরে মনে মনে মহাখুশি। সে যে সক্কলের চেয়ে শ্রেষ্ঠ, এটা খুব সহজেই প্রমাণ করা গেছে। মনটা তাই বেশ ফুরফুরে। দুম করে বেফাঁস একটা কথা বলে ফেললো জলহস্তী রাজা। বললো,
তাহলে তো বেশ হবে। আমার নাম যদি বলতে পারো তাহলে তো তুমি জিতে যাবে। তুমি এবং তোমার পরিবারের লোকজন সোজা চলে আসবে ডাঙায়। স্থলভাগে বসবাস করবে তোমরা। আর আমি, আমার পরিবার চলে যাবো পানিতে। সেটাই হবে আমাদের আস্তানা। কী, ঠিক আছে?
কচ্ছপকে একটু চিন্তিত দেখায়। সে বললো,
আচ্ছা বেশ মহারাজ। তাই হবে। আমরা পরবর্তী ভোজসভার জন্যে অপেক্ষায় রইলাম। আপনার মঙ্গল হোক।
২.
কচ্ছপ পড়লো মহা ফাঁপরে। একটানা কয়েকদিন এ নিয়ে মাথা ঘামালো সে। অনেক ভেবেচিন্তে একটা কৌশল ঠিক করা গেল। বুদ্ধিটাকে চমৎকারই বলতে হয়। যদি এটা ঠিকমতো কাজ করে, তাহলে কোনো চিন্তা নেই। জলহস্তী রাজার সঙ্গে যেমনটি কথা হলো, সেই বাজিতে অনায়াসে জিতে যাবে সে। শুধু তাই নয়। প্রজাদের সঙ্গে রাজার এমনতরো উদ্ভট রঙ্গ তামাশার একটা উচিত জবাবও দেয়া যাবে সেই সঙ্গে। হিপ হিপ হুররে। সব প্রজাই বোকাসোকা নয়। কারো কারো মাথায় সামান্য হলেও বুদ্ধি শুদ্ধি আছে। সেটাই এখন দেখানোর পালা।
কচ্ছপ জানে, জলহস্তী রাজা কখনোই একা একা চলাফেরা করে না। তার সাত বউ সঙ্গে থাকে সবসময়। রোজই তারা নদীর পাড়ে যায়। দল বেঁধে। সকালে আর বিকালে। গোসল করে। পানি পান করে। জলহস্তী রাজা থাকে মিছিলের সবার আগে। বউরা চলে একটু পেছন পেছন। এটাই রীতি, নিয়ম। এই বিষয়টিকেই নিখুঁতভাবে কাজে লাগাতে হবে।
এক রাতে কচ্ছপ তাদের চলার পথে একটা গর্ত খুঁড়ে রাখলো। বেশ বড়োসড়ো সেটা। অনেক সময় লেগে গেল এ কাজে। সেই গর্ত ঢেকে রাখলো লতাপাতা দিয়ে। চট করে বোঝা যায় না এখানে কোনো লুকোনো গর্ত আছে।
কচ্ছপ সেই গর্তের কাছেই একটা ঝোপের আড়ালে লুকিয়ে থাকলো। কান পেতে রইলো। কী ঘটে না ঘটে। দুরুদুরু বুকে সে অপেক্ষা করছে। জলহস্তী বাহিনী ওই তো এগিয়ে আসছে। দেখাই যাক না,কী ঘটে এবার।
ফেরার পথে ঘটলো ঘটনাটা। দুই বউ বেশ পিছিয়ে পড়েছিল। নিজেদের মধ্যে গল্পে মশগুল ছিল তারা। ধড়াম করে তারা গর্তে পড়ে গেল। ধপাস করে শব্দ হলো। শুনে ঝোপ থেকে বের হয়ে এলো কচ্ছপ। শুনলো সে, এক বউ জোরেশোরে চিৎকার শুরু করলো তখুনি,
ওগো ইসানতিম, প্রিয় স্বামী আমার। সর্বনাশ হয়ে গেছে। আমি একটা গর্তে পড়ে গেছি। জলদি এসে আমাকে এই গর্ত থেকে উদ্ধার করো। ইসানতিম, ইসানতিম। ওগো রাজা ইসানতিম। তুমি কি শুনতে পাচ্ছো আমার কথা?
ইসানতিমের দল বেশ খানিকটা এগিয়ে গিয়েছিল এরই মধ্যে। তারপরও তারা শুনতে পেল। সাড়াও দিল। এসে উদ্ধার করলো গর্তে পড়ে যাওয়া দুই বউকে।
ওরা ফিরে আসার আগেই কচ্ছপ উধাও। তার যা জানবার, তা তো জানা হয়ে গেছে। তাকে আর পায় কে। আনন্দে সে নাচতে শুরু করে দিয়েছে। খুশি মনে বাড়ি ফিরে গেল। জলহস্তী রাজা হেরে গেছে। এখন অপেক্ষা পরবর্তী ভোজসভার।
৩.
কিছুদিন পরে আবার ভোজসভার আয়োজন করা হলো। অতিথিরা জড়ো হয়েছে যথারীতি। জলহস্তী রাজা হেসে হেসে বললো,
আমন্ত্রিত অতিথিরা। গত বার একটা প্রশ্ন করেছিলাম তোমাদের। কেউ উত্তর দিতে পারোনি সেবার। আমার নাম তোমরা কেউই বলতে পারোনি। আজকেও যদি বলতে না পারো, তাহলে আজও তোমাদের খানাপিনা জুটবে না। কী, কেউ কি জানো, আমার নাম কী? জানা থাকলে বলো।
কচ্ছপ ফিক করে হেসে ফেলে একথা শুনে। সে উঠে দাঁড়ায়। রাজাকে কুর্নিশ করে বলে,
মহারাজ, আপনাকে অভিবাদন জানাই। আশা করি, আপনার কথা আপনি রক্ষা করবেন। আমি আপনার নাম জানতে পেরেছি। আপনার নাম হচ্ছে ইসানতিম। কি, ঠিক বলেছি?
জলহস্তী রাজার মুখ চুপসে যায়। এতক্ষণ ছিল হাসিমুখে। এবার তাকে ভীষণ বেজার দেখায়। গলার স্বর যেন বুজে আসছে। হায়! হায়!! হেরে যেতে হলো তাকে।
জলহস্তীকে মেনে নিতে হয় এই তেতো সত্য। মাথা নেড়ে সম্মতি জানাতে হয় তাকে। কথা দেওয়া হয়ে গেছে। তা মেনে চলতে হবে। না মানলে সবাই ছি ছি করবে।
সমবেত সবাই আনন্দে মেতে ওঠে। কচ্ছপ তাদের মান রেখেছে। আজ তাদের খালিপেটে ফিরতে হবে না। সাবাশ কচ্ছপের পো। হাজারো হাজারো অভিনন্দন তোমাকে। জয় হোক তোমার। দীর্ঘজীবী হও তুমি। কচ্ছপকে নিয়ে সবাই মেতে ওঠে।
দারুণ খাওয়া দাওয়া হলো সেদিন। নাচ গান ফূর্তিও হলো রাতভর। অনেকদিন এমন জমিয়ে খাওয়া দাওয়া হয়নি। সবাই ইচ্ছেমতো খেল। কয়েকবার করে খেল।
জলহস্তী তার সাত বউকে নিয়ে আস্তানা গাড়লো পানির রাজ্যে। সেই থেকে পানিতেই তার বসবাস। সেই যে শুরু, আজও অব্দি চলে আসছে সেই নিয়ম।



