শিশুর পিকারোগ

ডা: আশরাফ হোসেন

0
19

বন্ধুরা, তোমরা হয়তো খেয়াল করে থাকবে যে, শিশু তার হাতের নাগালে মাটি বা বালি পেলে খুব আগ্রহের সাথে তা মুখে পুরে নিয়ে খেতে থাকে। শুধু কি মাটি? অনেক শিশু কাগজ, প্লাস্টিক, লবণ, বরফ, কয়লা, ছাইকেও প্রিয় খাবার বানিয়ে নেয়। এ সমস্যাকে ডাক্তারি ভাষায় বলা হয় ‘পিকা’, অর্থাৎ রোগী দিনের পর দিন খাদ্য নয়, অথবা পুষ্টিমান নেই এমন বস্তু গ্রহণ করে। এ ছাড়া পিকা রোগীদের চক, ধুলো, পেনসিলের শিস, চুল, সাবান ইত্যাদির মতো কিছু জিনিস, যা মানুষের খাবার হিসেবে একেবারেই গ্রহণযোগ্য নয়, তেমন জিনিস খাওয়ার প্রবণতাও দেখা যায়। এমনিতে আপাতভাবে কোনো রোগ নেই। দেখলে বোঝাও যায় না যে সুস্থ অবস্থায় কোনও মানুষ খাবার নয়, এমন কোনো জিনিস খেতে পারে। চিকিৎসকদের মতে, এই রোগ বেশি দেখা যায় অন্তঃসত্ত¡া মহিলা এবং শিশুদের মধ্যে। এই রকম সমস্যা দেখা দিলে সাধারণত রক্তে আয়রনের মাত্রা পরীক্ষা করে দেখতে পরামর্শ দেন চিকিৎসকরা। চিকিৎসকদের মতে, এই রোগের জন্য বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায় শরীরে আয়রনের ঘাটতি রয়েছে। তবে আয়রন ছাড়াও জিঙ্ক বা অন্যান্য খনিজের ঘাটতি থাকলেও এই সমস্যা হতে পারে। কারও মানসিক সমস্যা বা ‘স্কিৎজোফ্রেনিয়া’ বা ওসিডি’ থাকলেও এমন সব জিনিস খাওয়ার প্রবণতা দেখা যায়।

বন্ধুরা, পিকার সমস্যা যেহেতু মানসিক, তাই তা সারানোর নির্দিষ্ট কোনো ওষুধ নেই। তবে কারও যদি মাটি, চক, ধুলোবালি, সাবানের মতো কিছু খাওয়ার ইচ্ছা হয়, সে ক্ষেত্রে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। পিকার মতো রোগ দীর্ঘদিন ধরে থাকলে তা পেটের নানা সমস্যার কারণ হতে পারে। ওষুধের পরিবর্তে আয়রন এবং জিঙ্ক সমৃদ্ধ খাবার খেলে এই সমস্যা অনেকটা নিয়ন্ত্রণে আসে। পিকা প্রবণতা শিশুদের ক্ষেত্রে বেশি পাওয়া যায়। তবে প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তিরও ‘পিকা’ হতে দেখা গেছে। অবশ্য তাদের ক্ষেত্রে প্রায়ই মানসিক বৈকল্য রোগ থাকে। শিশুদের ‘পিকা’ দেখলে চিকিৎকরা প্রথমে খোঁজেন তার কোনো অপুষ্টি সমস্যা আছে কি না। বিশেষ করে ‘লৌহ ঘাটতিজনিত রক্তস্বল্পতা’ হলে এ সমস্যাটি বেশি হয়। এছাড়া জিংক ও ক্যালসিয়ামের অভাব হলেও ‘পিকা’ হতে পারে। যে শিশুরা বিষণœতা, পারিবারিক কলহ, বিচ্ছেদ, নির্যাতন, অবহেলা প্রত্যক্ষ করে, তাদের এ সমস্যা হতে পারে। এমনকি যাদের বাসস্থানের আশপাশে বিভিন্ন রাসায়নিক কারখানা, বর্জ্য-নিষ্কাশন হয়, তারা সেখান থেকে তাদের ‘প্রিয় অখাদ্য’টি বেছে নেয়। মানসিক বিভিন্ন রোগ, যেমন সিজোফ্রেনিয়া, শুচিবাই, বুদ্ধি প্রতিবন্ধকতা, বিষণœতা হলে যেকোনো বয়সে ‘পিকা’ হতে দেখা গেছে। বন্ধুরা, ‘পিকা’ হলে কয়েক ধরনের সমস্যা হতে পারে। প্রথমত; পুষ্টিমানহীন বস্তুগ্রহণ করে তারা পেট ভরিয়ে ফেলে। অন্য স্বাভাবিক খাবারে তাদের আর রুচি থাকে না। ফলে তাদের তীব্র অপুষ্টি হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। এসব রোগীর পেটে থাকে প্রচুর
কৃমি। এই কৃমিও রক্তস্বল্পতা সৃষ্টি করে। দ্বিতীয়ত; এসব বস্তু তাদের শরীরে মারাত্মক বিষক্রিয়া (যেমন, সিসা বিষক্রিয়া, অ¤ø বা ক্ষার বিষক্রিয়া) করতে পারে। তৃতীয়ত; ধারালো, শক্ত বস্তু মুখ থেকে শুরু করে খাদ্যনালীতে, এমনকি শ্বাসনালীতেও আঘাত বা রক্তক্ষরণ ঘটাতে পারে। চতুর্থত; এসব বস্তু খাদ্যনালীর প্যাঁচ বা নালী বন্ধ করে দিতে পারে। রোগী তখন আসে পেট ফোলা, ব্যথা, বমি নিয়ে। সময়মতো অস্ত্রোপচার না হলে মৃত্যুও হতে পারে।

পঞ্চমত; এই ‘পিকা’ শারীরিক বা মানসিক
অন্য বড় কোনো সমস্যার সাথেও যুক্ত হতে পারে। বন্ধুরা, পিকা সমস্যার চিকিৎসার ক্ষেত্রে প্রথম এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হচ্ছে কাউন্সেলিং বা রোগ নিয়ে কথা বলা। সাধারণত শিশু রোগীদের ক্ষেত্রে মা-বাবার সাথে কথা বলে, সমস্যাটি বুঝিয়ে বলে, তাদের আশ্বাস বা নির্ভরতার মাধ্যমে এই সমস্যাটি মোকাবেলা করা যায়। লৌহ, জিংক ও অন্যান্য পুষ্টিঘাটতি ওষুধ দিয়ে দূর করা যায়। এসব শিশুর নিয়মিত কৃমিনাশক ওষুধ লাগতে পারে। পরিবারে সঠিক পুষ্টিমানসম্পন্ন আদর্শ খাবারের ব্যাপারে জ্ঞান থাকতে হবে। এর পরের পর্যায়ে মানসিক রোগ চিকিৎসক, কাউন্সেলর এদের ভ‚মিকা আছে। যদি মানসিক কোনো সমস্যা থাকে, তাহলে তার চিকিৎসা খুব জরুরি। পরিবারের সবারই এতে ভ‚মিকা রাখা দরকার। আর যদি ‘পিকা’ থেকে খাদ্যনালী পেঁচিয়ে যাওয়া, ছিদ্র বা বন্ধ হয়ে যাওয়া সমস্যা দেখা দেয়, তখন হয়তো শল্যচিকিৎসার প্রয়োজন হতে পারে।