মহামারী ভাইরাস করোনা

আব্দুস সালাম

0
150

বার মুখে মুখে এখন করোনা ভাইরাসের কথা। এর ভয়াবহতার কথা। বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ার কথা। সব মানুষ করোনার আতঙ্কে ভুগছে। ছোট্ট আদিবাও তার ব্যতিক্রম নয়। সে বাবা-মায়ের কাছে এই ভাইরাসের কথা অনেকবার শুনেছে। কবে যে তার মনের ভেতর করোনার ভয় বাসা বেঁধেছে সে এখন বলতে পারে না। অনেকের মতো সেও যে ভয়ে কাতর তা তার আচার-আচরণে স্পষ্ট বোঝা যায়। স্কুলে যাওয়ার সময় একদিন হঠাৎ সে আম্মুকে বলে, আমার স্কুলে যেতে খুব ভয় করছে! আমি স্কুলে যাব না। মা আদর করে আদিবাকে বুকের কাছে টেনে নিয়ে বলে, তোমার শরীর খারাপ? ভালো লাগছে না?
− আমি যদি করোনায় আক্রান্ত হই?
− ও তাই? ভয় পেও না। তোমার কিছু হবে না। তাছাড়া আমাদের দেশে তো এখনো কেউ করোনায় আক্রান্ত হয়নি।
− খবরে যে প্রতিদিন দেখাচ্ছে। আমাদের দেশেও করোনায় আক্রান্ত রোগী পাওয়া গিয়েছে।
− হ্যাঁ তুমি ঠিকই বলেছ। ওরা অবশ্য বিদেশে ছিল। তবে ওরা সংখ্যায় খুব কম। এখনো ভয়ের কিছু হয়নি। আর যদি কোনো সমস্যা হয় তাহলে নিশ্চয়ই তোমাদের স্কুল কর্তৃপক্ষ বন্ধ করে দেবে। স্কুলে যাও মা কোনো সমস্যা হবে না। মায়ের সান্ত¡নার কথা শুনে আদিবা স্কুলে যায়। মেয়েকে স্কুলে পাঠিয়ে দিয়ে মা কিন্তু শান্তি পান না। তার মনটা আজ ভালো নেই। কখন জানি কী হয়! সবসময় টিভির পর্দায় চোখ রাখেন। বিশেষজ্ঞ ডাক্তারদের পরামর্শ শোনেন। করোনা ভাইরাস নিয়ে যেসব টকশো হয় তাও তিনি নিয়মিত শোনেন। সকলের মঙ্গলের জন্য
আল্ল­াহর কাছে প্রার্থনা করেন।
স্কুল থেকে আদিবা বাসায় ফিরে এলে মা তার সেবাযত্ন করেন। স্কুলের বন্ধুবান্ধবের খোঁজখবর নেন। শারীরিক অবস্থা কার কেমন আছে তা মেয়ের কাছ থেকে কৌশলে জেনে নেন। করোনা ভাইরাস নিয়ে আদিবার কৌতূহলের শেষ নেই। সে সারাক্ষণ এটা ওটা জিজ্ঞাসা করে। মা কখনো বিরক্ত হন না। বরং খুশিই হন। মা একে একে মেয়ের সব প্রশ্নের উত্তর দেন। আদিবা মায়ের কাছে জানতে চায়, মা, করোনা ভাইরাস কেন হয়? প্রথমে কোথায় দেখা দেয়?
− ঠিক কিভাবে করোনাভাইরাস সংক্রমণ শুরু হয়েছিল তা এখনো কেউ নির্ভুলভাবে বলতে পারে না। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সম্ভবত কোনো প্রাণী এর উৎস ছিল। প্রাণী থেকেই প্রথমে ভাইরাসটি কোনো মানুষের দেহে ঢুকেছে। তারপর এক মানুষ থেকে অন্য মানুষে ছড়িয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন জ্যান্ত মুরগি, বাদুড়, খরগোশ কিংবা সাপ থেকে এ ভাইরাস আসতে পারে। কিছু সামুদ্রিক প্রাণী যেমন বেলুগা জাতীয় তিমি থেকে করোনা ভাইরাস আসতে পারে। মধ্য চীনের উহান শহর থেকে এই রোগের সূচনা। ৩১ ডিসেম্বর ২০১৯ তারিখে ওই শহরে নিউমোনিয়ার মতো একটি রোগ ছড়াতে দেখা যায়। ১১ জানুয়ারি ২০২০ তারিখে ওই রোগে প্রথম একজনের মৃত্যু হয়। এর পর ভাইরাসটি চীনের বিভিন্ন শহরে ছড়িয়ে পড়ে। কিছু দিন পর চিকিৎসকগণ জানতে পারেন এই ভাইরাসের নাম কোভিড-১৯ বা করোনা ভাইরাস। অল্প দিনের মধ্যে এ ভাইরাস চীনের বাইরে বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়ে। ইতালি, ইরান, স্পেন, থাইল্যান্ড, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়াসহ বিশ্বের ১৯৬টি দেশের মধ্যে প্রায় সকল দেশে এই ভাইরাস ছড়িয়ে পড়েছে। এটি এমন একটি ভাইরাস যা একজন মানুষের দেহ থেকে আরেকজন মানুষের দেহে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। লক্ষ লক্ষ মানুষ আজ ওই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে। কত মানুষ যে করোনার আক্রমণে মারা গেছে তা কেউ বলতে পারে না।
− মা, মানুষ কিভাবে বুঝতে পারবে তার করোনা হয়েছে?
− খুব সুন্দর প্রশ্ন। তাহলে বলছি শোনো। প্রথমে ঠা-া লেগে সাধারণ জ্বর হয়। তারপর শুরু হয় শুকনো কাশি। একই সাথে মাথা, গলা ও পেশিতে ব্যথা হতে পারে। সপ্তাহখানেক পরেই শুরু হয়ে যায় রোগীর প্রচ- শ্বাসকষ্ট। ধীরে ধীরে শরীরে মারাত্মক নিউমোনিয়া দেখা দেয়। রোগীরা কষ্ট সহ্য করতে না পেরে জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। অবশেষে সে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে।
− ওষুধ খেলেও সাড়বে না?
− এখন পর্যন্ত করোনা ভাইরাসের কোনো চিকিৎসা বা প্রতিষেধক আবিষ্কার হয়নি। এজন্যই তো এই ভাইরাসকে এত ভয়।
− মা, আমার না খুব ভয় করছে! আমার আবার করোনা হবে না তো?
− ভয় পেও না, মা। একদম ভয় পাবে না। আমরা সবাই সতর্ক থাকব। তাহলে দেখবে আমাদের কিচ্ছু হবে না। এই ভাইরাস থেকে বাঁচতে হলে আমাদের কিছু নিয়ম মেনে চলতে হবে। যেমন ধরো− অকারণে আমরা রোগীর সংস্পর্শে যাবো না। প্রয়োজনে নাক মুখ ঢেকে আক্রান্ত রোগীর সেবাযত্ন করব। এছাড়া আমাদের আরো কিছু নিময় মেনে চলতে হবে। যেমন: মাঝে মাঝে সাবান, পানি বা স্যানিটাইজার দিয়ে হাত ধুতে হবে। পারতপক্ষে হাত না ধুয়ে কেউ মুখ, চোখ ও নাক স্পর্শ করব না। মুখে মাস্ক ব্যবহার করতে হবে। হাঁচি কাশি দেয়ার সময় মুখ ঢেকে রাখতে হবে। বন্য জীবজন্তু কিংবা গৃহপালিত পশুকে খালি হাতে স্পর্শ করব না। পরিচিত বা অপরিচিত ব্যক্তির সঙ্গে হাত মেলানো বা আলিঙ্গন করা থেকে বিরত থাকব। যেখানে সেখানে থুথু ফেলব না। খালি পায়ে হাঁটাহাঁটি করব না। জিনিসপত্র, বাড়িঘর আশপাশের এলাকা সবসময় পরিষ্কার করে রাখব। কাপড়-চোপড় একবার ব্যবহার করে ধুয়ে ফেলব। রান্না করার আগে খাবার ভালো করে ধুয়ে সিদ্ধ করে রান্না করতে হবে। এর পরেও যদি এ রোগের কোনো লক্ষণ দেখা দেয় তাহলে দ্রুত এ রোগের বিশেষজ্ঞগণের সাথে যোগাযোগ করতে হবে।
মায়ের কথাগুলো শুনে আদিবার মুখখানা ভয়ে ফ্যাকাশে হয়ে যায়। মা আদিবাকে বুকের মাঝে টেনে নিয়ে বলেন, তোমাকে একটা দোয়া শিখিয়ে দিচ্ছি। সবসময় পড়বে। তাহলে করোনার মতো ভয়াবহ রোগ কিংবা যেকোনো মহামারীর প্রকোপ থেকে আল্ল­াহ আমাদের রক্ষা করবেন। দোয়াটি হলো–
(বাংলা উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা ইন্নি আউজুবিকা মিনাল বারাছি, ওয়াল জুনুন ওয়াল জুযাম, ওয়া সায়্যিইল আসক্বাম)। দোয়াটি শিখতে পেরে আদিবা খুব খুশি। সে মনে সাহস পায়। করোনার কথা শুনে সে আর ভয় পায় না। সবসময় দোয়াটি মনে মনে পড়তে থাকে। তাকে এখন হাসিখুশি দেখা যায়। সে তার বন্ধুবান্ধবকেও দোয়াটি শিখিয়ে দেয়। আদিবার মন থেকে করোনা ভীতি দূর হওয়ায় তার মা বাবা দু’জনই এখন বেশ খুশি।